ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG

মাহমুদ ফারাজী, জবি প্র‌তি‌নি‌ধি

১৪ জানুয়ারি ২০১৯, ১৬:০১

ঐতিহ্যবাহী সাকরাইনের আমেজে উৎসবমুখর পুরান ঢাকা

10301_সূচিপত্র.jpg
পৌষের শেষ দিনে পুরান ঢাকার প্রাণের উৎসব সাকরাইনে মেতে উঠে বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী এলাকাগুলো। এসময় দেখা যায় আকাশে নানান রঙ-বেরঙের ঘুড়ি আর ছোট বড় সকলের মুখে ধ্বনি উঠে ভাকাট্টা লোট। মূলত বাংলা ক্যালেন্ডারের নবম মাস পৌষের শেষ দিনটিতে পুরান ঢাকার এলাকা গেন্ডারিয়া, সূত্রাপুর, দয়াগঞ্জ, নারিন্দা, ওয়ারী, মুরগিটোলা, কাগজিটোলা, ধূপখোলা মাঠ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, শাঁখারী বাজার, সদরঘাট, কোর্টকাচারী, তাঁতীবাজার, গোয়ালনগর, লক্ষ্মীবাজার ও লালবাগের আশপাশের এলাকাগুলোতে সাকরাইনের উৎসবে তারা বেশি মেতে উঠে।

দিনের প্রদীপ উঠার সাথে সাথেই পুরান ঢাকার বাহান্ন রাস্তার তেপ্পান্ন গলির বাড়ির ছাদগুলোতে দেখা মেলে ঘুড়ি উড়ছে তার মনিবের দেয়া নির্দেশনায়। দিনের আলো বাড়ার সাথে ঘুড়ির সংখ্যাও বাড়তে থাকে, অন্যদিকে দেখা মেলে সুতোয় মাঞ্জা দেওয়ার ধুম। বিকেলের আকাশে দেখা মেলে বাহারী রঙের হাজারো ঘুড়ির ছড়াছড়ি, উড়ানোর প্রতিযোগিতায় ঘুড়ি কেটে গেলে পরাজিত হওয়ার দিকে ছুড়ে দেওয়া হয় পরিচিত শব্দ ভাকাট্টা লোট, ভাকাট্টা লোট আর ভুয়া ভুয়া। সাকরাইনে আকাশে নানান রঙের বাহারী ঘুড়ি দেখতে যেমন নামও বাহারী রকমের চোখদ্বার, মালাদ্বার, চশমাদ্বার, কাউঠাদ্বার, চানদ্বার, নাকপান্দার, চিলা, চাপরাশ, মাখখি, গাহেল, ভোয়াদ্বার, মাছলেজা, সিংদ্বার, রঙধনু, চরকীসহ কত কি। ঘুড়ির নামের পাশাপাশি নাটাইগুলোর নামও বাহারী- মুখছাড়া, বাটিওয়ালা, মুখবান্দা ইত্যাদি। দিনের আলোর বিদায়ী মুহূর্তে দেখা যায় কেরোসিনের তেলে আগুন নিয়ে মাতামাতি আর আতশবাজির ঝলকানী। এতে নতুন এক চিত্র খুঁজে পায় ঢাকাবাসী যা পুরো আকাশের রঙকে মনোমুগ্ধকর পরিবেশে মেলে ধরে। এভাবেই উদযাপিত হয় পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সাকরাইন উৎসব।

এ প্রসঙ্গে পুরান ঢাকার বাসিন্দা ইমরান ইমু বলেন, সাকরাইনকে কেন্দ্র করে আমরা বন্ধুরা মিলে একটু ভিন্ন ধরনের আয়োজন করে থাকি। বন্ধুবান্ধব মিলে সাকরাইন উৎযাপন করি পুরান ঢাকার ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্য। তিনি আরও বলেন, সুতো মাঞ্জা মেরে ঘুড়ি উড়ানোর মজাই আলাদা তবে ইদানীং চায়না রক সুতো বাজারে এসে আমাদের এ ঐতিহ্যকে নষ্ট করে ফেলছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রায় ৪০০ বছর ধরে ঢাকায় এ উৎসব হচ্ছে। ধারণা করা হয়, ১৭৪০ সনে নবাব নাজিম মুহাম্মদ খাঁ ঘুড়ি উৎসবের সূচনা করেন। অতীতে সাকরাইনে পুরান ঢাকায় শ্বশুরবাড়ি থেকে জামাইদের নাটাই, বাহারি ঘুড়ি উপহার দেওয়া এবং পিঠার ডালা পাঠানো ছিলো অবশ্য পালনীয়। ডালা হিসেবে আসা ঘুড়ি, পিঠা আর অন্যান্য খাবার বিলি করা হতো আত্মীয়-স্বজন এবং পাড়া-প্রতিবেশীদের মাঝে। একটা নীরব প্রতিযোগিতা চলতো কার শ্বশুরবাড়ি হতে কত বড় ডালা এসেছে। আজ এই সব চমৎকার আচারগুলো বিলুপ্তির পথে। ঢাকার আদি বসবাসকারী সকল মানুষ আজও এই ঐতিহ্যগুলোর স্মৃতিকে স্মরণ করে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে পৌষের বিদায়লগ্নে এই উৎসব পালনের রীতি চালু আছে। ভারতে মকরসংক্রান্তি, উত্তর ভারতীয় এ ঘুড়ি উৎসবটিকে স্থানীয়রাও ‘সাকরাইন’ নামে অভিহিত করে। এছাড়া নেপালে বলে মাঘি, থাইল্যান্ডে সংক্রান, মিয়ানমারে থিং ইয়ান, কম্বোডিয়ায় মহাসংক্রান নামে অভিহিত করেন। সেখানের মানুষ সুন্দর সুন্দর ঘুড়ির মাধ্যমে সূর্যদেবতার কাছে নিজেদের ইচ্ছা ও আকুতি প্রেরণ করেন।