ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG

এনএনবিডি, ঢাকা:

১৫ জানুয়ারি ২০১৯, ২৩:০১

নির্বাচন নিয়ে টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদন

অনিয়ম হয়েছে ৫০ আসনের ৪৭টিতেই

10359_tib.jpg
একাদশ সংসদ নির্বাচনকে ত্রুটিপূর্ণ, প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত বলে অভিহিত করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশ (টিআইবি)। জাতীয় নির্বাচন নিয়ে এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্বৈবচয়নে বাছাই করা ৫০ আসনের মধ্যে ৪৭টিতেই কোনো না কোনো পর্যায়ের অনিয়ম হয়েছে। এর মধ্যে ৩৩টি আসনের এক বা একাধিক কেন্দ্রে আগের রাতেই ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভরা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে এ প্রতিবেদনে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, সরকারের নৈতিক অবস্থান নিশ্চিত করার জন্য প্রতিবেদনে যে অভিযোগগুলো উত্থাপিত হয়েছে সেগুলোর বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানাই। কারণ গণতন্ত্রের জন্য এ ধরনের নির্বাচন ইতিবাচক নয়।

মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমণ্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

'একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা' শীর্ষক এই প্রতিবেদনে বলা হয়, গবেষণার জন্য তারা দ্বৈবচয়নের ভিত্তিতে ৩০০টি আসন থেকে ৫০টি আসন নির্দিষ্ট করে প্রত্যেক আসনে স্থানীয় জনগণের মতামতের ভিত্তিতে প্রধান দুটি দল বা জোটের প্রার্থী বাছাই করে প্রার্থী ও তাদের কার্যক্রমের ওপর তথ্য সংগ্রহ করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের ও রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান প্রমুখ।

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিবন্ধিত সবক'টি রাজনৈতিক দল এতে অংশ নিলেও টিআইবি বলছে, নির্বাচনকে 'অংশগ্রহণমূলক' বলা গেলেও তা 'প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ' হতে পারেনি। সব দলকে সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে ইসি ব্যর্থ হয়েছে। নির্বাচন নিয়ে যত অভিযোগ উঠেছে তার বিচার বিভাগীয় তদন্তও দাবি করেছেন তারা।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অনিয়ম ও আচরণবিধি যেভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে, তাতে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত হয়েছে। সব দল অংশগ্রহণ করলেও নির্বাচনে প্রচার থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে সমান সুযোগ পাননি অনেক দলের প্রার্থীরা। ভোটারদের ভোট দেওয়ার সুযোগও ছিল আংশিক।

নির্বাচনকে আংশিক অংশগ্রহণমূলক কেন বলা হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সর্বোপরি আংশিকভাবে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়েছে। কারণ একদিকে সকল রাজনৈতিক দল প্রার্থিতার মাপকাঠিতে নির্বাচনে ছিল; কিন্তু নির্বাচনী প্রচার ও সক্রিয়তার বিবেচনায় বৈষম্য ছিল প্রকট। অনেক ক্ষেত্রে ভোটাররা অবাধে ভোট দিতে পারেননি। তিনি বলেন, আচরণবিধি ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা লজ্জাজনক ও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার ভূমিকাও ছিল বিতর্কিত। এসব কারণে এ নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ এবং অভূতপূর্ব বলা যায়। যার ফলাফলও অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য হিসেবে আলোচিত হয়েছে। তাই আমরা সরকারের নৈতিক অবস্থান নিশ্চিত করার জন্য যে অভিযোগগুলো উত্থাপিত হয়েছে সেগুলোর বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানাই। কারণ গণতন্ত্রের জন্য এ ধরনের নির্বাচন ইতিবাচক নয়।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, একটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র আসে না, আবার একটি নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র ধ্বংসও হয় না। এটিকে প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা উচিত। তিনি বলেন, সংসদ ভেঙে নির্বাচন দেওয়ার ব্যাপারে তাদের কোনো অবস্থান নেই। এটি সাংবিধানিক ব্যবস্থা। সংবিধানে যেভাবে আছে সেভাবে নির্বাচন হয়েছে। তবে সংসদ বহাল থাকার কারণে সরকারি দল নির্বাচনে সুবিধা পেয়েছে। নতুন নির্বাচন দেওয়ার দাবি করবেন কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই। নির্বাচন গ্রহণযোগ্য কি-না সে বিষয়েও মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি।

টিআইবি ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়েছে কি-না সে বিষয়ে মন্তব্য করতে এই গবেষণা করা হয়নি। তবে নির্বাচনে যদি সবার জন্য সমান সুযোগ না থাকে তাহলে নির্বাচনটা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়, বিতর্কিত হয়ে যায়। যেভাবে এবারের নির্বাচনটা পরিচালিত হয়েছে, তাতে প্রচুর ত্রুটি ছিল। নির্বাচন কমিশন এই ত্রুটিগুলো দেখে পরবর্তী নির্বাচনে পুনরাবৃত্তি রোধে ব্যবস্থা নেবে- এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

টিআইবির গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ৫০টি আসনের মধ্যে ৪৭টিতেই অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে জানিয়ে এতে বলা হয়, এর মধ্যে ৪১টি আসনে জাল ভোট; ৪২টি আসনে প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর নীরব ভূমিকা; ৩৩টি আসনে নির্বাচনের আগের রাতে ব্যালটে সিল মেরে বাক্সে ভরে রাখা; ২১টি আসনে আগ্রহী ভোটারদের হুমকি দিয়ে তাড়ানো বা কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা; ৩০টি আসনে বুথ দখল করে প্রকাশ্যে সিল মেরে জাল ভোট; ২৬টি আসনে ভোটারদের জোর করে নির্দিষ্ট মার্কায় ভোট দিতে বাধ্য করা; ২০টিতে ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার আগেই ব্যালট বাক্স ভরে রাখা; ২২টিতে ব্যালট পেপার শেষ হয়ে যাওয়া; ২৯টিতে প্রতিপক্ষের পোলিং এজেন্টকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে না দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গবেষকরা জানান, ৪৭টি আসনের এক বা একাধিক কেন্দ্রেই এসব অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। সব দলের সভা-সমাবেশ করার সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হয়নি। বিরোধীদের দমনে বিতর্কিত ভূমিকার পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসনের বিরুদ্ধে কোনো অবস্থান নেয়নি নির্বাচন কমিশন। সব দলের প্রার্থী ও নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা সমানভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। নির্বাচনী অনিয়ম ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে- বিশেষ করে সরকারি দলের প্রার্থী ও নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কমিশন উপযুক্ত ভূমিকা পালন করেনি। এ ছাড়া নির্বাচনের সময়ে তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ যেমন- পর্যবেক্ষক ও সংবাদমাধ্যমের জন্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা; মোবাইলের জন্য ফোর-জি ও থ্রি-জি নেটওয়ার্ক বন্ধ; জরুরি ব্যতীত মোটরচালিত যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা নির্বাচনের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্ভুক্ত সব আসনেই নির্বাচনী প্রচারণার ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা এককভাবে সক্রিয় ছিলেন। কোনো কোনো আসনে ক্ষমতাসীন দল প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে সরাসরি প্রচারণার জন্য সুবিধা পেয়েছে। অন্যদিকে ৫০টির মধ্যে ৩৬টি আসনে বিরোধী দলের প্রচারে বাধা দানসহ ৪৪টি আসনে সরকারবিরোধী দলের প্রার্থীদের মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকেই দলীয় নেতাকর্মীদের নামে মামলা, পুলিশ বা প্রশাসন কর্তৃক হুমকি ও হয়রানি, প্রার্থী ও নেতাকর্মী গ্রেফতার এবং ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী ও কর্মী কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে ভয়-ভীতি দেখানোর তথ্য পাওয়া যায়।

প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয়ের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সার্বিকভাবে তফসিল ঘোষণার পূর্ব থেকে নির্বাচন পর্যন্ত প্রার্থীদের গড় ব্যয় ৭৭ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫ টাকা, যা নির্বাচন কমিশন দ্বারা নির্ধারিত ব্যয় সীমার (আসন প্রতি সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা) তিনগুণেরও বেশি।

নির্বাচনী ব্যবস্থা সুষ্ঠু ও কার্যকর করতে টিআইবির পক্ষ থেকে ছয় দফা সুপারিশ পেশ করা হয়েছে। এর মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বহুমুখী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে তাদের ব্যর্থতা নিরূপণ করে তা জনসমক্ষে প্রকাশ, কমিশনের গৃহীত পদক্ষেপের পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের উদ্যোগ গ্রহণ, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের প্রক্রিয়া ও যোগ্যতা নির্ধারণ করে আইন প্রণয়ন করার মাধ্যমে সৎ, যোগ্য, সাহসী ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করা অন্যতম।

টিআইবির পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, গবেষণার জন্য নভেম্বর ২০১৮ থেকে জানুয়ারি ২০১৯ পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্নেষণ করা হয়। তবে তফসিল ঘোষণার পূর্ব থেকে শুরু করে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রাথমিক প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। পরে নির্বাচন-পরবর্তী পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করবেন তারা।