ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG

স্টাফ রিপোর্টার

১৭ জানুয়ারি ২০১৯, ১১:০১

খেলাপি ঋণ কমানোর বিকল্প উপায় খোঁজা হচ্ছে

10406_Money.jpg
২০১৪ সালের নির্বাচনের পর শীর্ষ ঋণখেলাপিদের ঋণ পুনর্গঠনের নামে বড় ধরনের ছাড় দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রথমবার খেলাপি ঋণ নবায়ন করতে হলে ১৫ শতাংশ ব্যাংকের নগদ টাকা পরিশোধ করতে হয় ঋণখেলাপিদের। কিন্তু ওই সময়ে মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টের মাধ্যমে ১৪টি বড় শিল্প গ্রুপকে ১৫ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নবায়ন করার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। এতে খেলাপি ঋণের হিসাব থেকে রাতারাতি ১৫ হাজার কোটি টাকা কমে যায়।

এবার নির্বাচনের পর নতুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের নির্দেশে খেলাপি ঋণ কমানোর বিকল্প উপায় খুঁজছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ইতোমধ্যে দায়িত্ব নিয়েই তিনি ব্যাংক পরিচালকদের সংগঠন বিএবির সাথে বৈঠক শেষে বলেন, ‘আজ থেকে এক টাকাও খেলাপি ঋণ বাড়বে না।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতির লাগাম টেনে ধরে ঋণের সুদহার কমানোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন নতুন অর্থমন্ত্রী। একই সাথে তিনি ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় জোরালো পদক্ষেপ নেয়া, ঋণের সুদহার কমাতে কম সুদে আমানত সংগ্রহের ক্ষেত্র তৈরি এবং বেসরকারি খাতে ঋণের জোগান বাড়ানোর জন্য বিকল্প তহবিল সৃষ্টি করার পথ খোঁজার নির্দেশনা দিয়েছেন।

গত রোববার বিকেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরসহ ব্যাংকের শীর্ষপর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তাকে ডেকে এসব নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। তার এই নির্দেশনা পাওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকটি বিভাগ ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। তারা খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর কী পরিমাণ তহবিল আটকে আছে, সেগুলো কিভাবে অবমুক্ত করে সচল করা যায়- এই বিষয়টি এখন খতিয়ে দেখছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ঋণ নবায়ন করতে হলে ঋণখেলাপিদের নীতিমালা অনুযায়ী নির্ধারিত পরিমাণ টাকা এককালীন পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু ব্যাংকের খাতায় যারা শীর্ষ ঋণখেলাপি তারা কোনো অর্থই পরিশোধ করছেন না। এর ফলে প্রতি মাসেই আসলের সাথে আরোপিত সুদ যুক্ত হয়ে খেলাপির পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু নতুন অর্থমন্ত্রী বলেছেন, খেলাপি ঋণ কমানোর বিকল্প উপায় বের করতে হবে। এ কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে কোনো অর্থ পরিশোধ ছাড়া খেলাপি ঋণ কমানোর একমাত্র বিকল্প উপায় হচ্ছে ঋণ অবলোপন।

সাধারণত দীর্ঘদিনের খেলাপি ঋণের বিপরীতে সমপরিমাণ সম্পদ বা জামানত রেখে ঋণ অবলোপন করা হয়। অবলোপনকৃত ঋণ খেলাপি ঋণের হিসাব থেকে আলাদা করে রাখা হয়। ফলে কমে যায় খেলাপি ঋণ। সেপ্টেম্বর শেষে পুঞ্জীভূত অবলোপন করা ঋণের পরিমাণ রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। এসব ঋণ আদায়ের জন্য ব্যাংক গ্রাহকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। কোনো কোনো মামলা ১৫-২০ বছর পর্যন্ত চলছে। কিন্তু মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় তা আদায় হচ্ছে না। আবার কোনো কোনো অবলোপনকৃত ঋণখেলাপিদের উদ্যোক্তাদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আবার ওই সব ঋণের বিপরীতে যে সম্পদ জামানত রাখা হয়েছে তাও সঠিক কাগজপত্র না থাকায় তা উদ্ধার করা যাচ্ছে না।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপি , পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৮৩ হাজার কোটি টাকাই মন্দ। অর্থাৎ মোট খেলাপি ঋণের ৮৪ শতাংশই মন্দ। এর মধ্যে সরকারি ৬ ব্যাংক অর্থাৎ সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের রয়েছে ৪০ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা।

সরকারি এ ৬ ব্যাংকের মন্দ ঋণের হার তাদের মোট ৪৮ হাজার ৮০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণের প্রায় ৮৫ ভাগ। এসব মন্দ ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের আয় স্থগিত করে রাখা হয়েছে প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকা। এসব ঋণের বিপরীতে মামলা পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা, জামানত পাহারা দেয়া, আইনজীবী নিয়োগের ক্ষেত্রে আরো অর্থ খরচ হচ্ছে। এ ছাড়া এসব আমানতের বিপরীতে গ্রাহকদেরকে সুদ দিতে হচ্ছে নিয়মিত। অথচ এর বিপরীতে ব্যাংকের কোনো আয় নেই। ফলে ব্যাংক সব দিক থেকে বিপাকে পড়েছে।

ইতোমধ্যে নানা কারণে তহবিল সঙ্কটে পড়েছে বেশির ভাগ ব্যাংক। এ তহবিল সঙ্কটের কারণে ব্যাংকের বিনিয়োগ ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। নতুন অর্থমন্ত্রীর নির্দেশে তহবিল সঙ্কট মেটানোর বিকল্প উপায় বের করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে, ব্যাংকিং খাতে তারল্য বাড়ানোর চারটি পথ রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো- সরকারের রাজস্ব আয়, অন্যান্য খাত থেকে আয় বাড়লে এবং বৈদেশিক উৎস থেকে সরকারের তহবিলের জোগান বাড়লে সেগুলো ব্যাংকিং খাতে তারল্যের জোগান বাড়াবে।

রফতানি আয় ও প্রবাসীদের রেমিট্যান্স বাড়লেও ব্যাংকে টাকার প্রবাহ বাড়বে। সরাসরি গ্রাহকদের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ বাড়লেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ ছাড়া খেলাপি ঋণের কারণে আটকে থাকা তহবিল ছাড় করাতে পারলেও ব্যাংকে তারল্য প্রবাহ বাড়াবে। এসব বিষয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে নেই, সরকারের হাতে রয়েছে। এসব খাত থেকে দ্রুত তহবিলের জোগান বাড়ানোও সম্ভব হবে না। এ জন্য বিকল্প উৎস অর্থাৎ বৈদেশিক ঋণ বিশেষ করে বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক থেকে তহবিল সংগ্রহ করে সেগুলো দিয়ে শিল্প খাতে ঋণ বিতরণের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে বলে মনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এসব বিষয় নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকটি বিভাগ ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে।

এর আগে গত ১০ জানুয়ারি বিভিন্ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণগ্রহীতার তালিকা চেয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি ওই দিন বিএবির নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানান, ধীরে ধীরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমিয়ে আনা হবে। আজ থেকে আর এক টাকারও খেলাপি ঋণ বাড়বে না। এ বিষয়ে ব্যাংকের মালিকেরা আমাকে কথা দিয়েছেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বৈঠকে বসার আগেই আমার শর্ত ছিল একটা। কোনো কিছু আলাপ করার আগে আমার এক দফা। আজকের পর থেকে খেলাপি ঋণ এক টাকাও বাড়তে পারবে না। আপনারা কিভাবে বন্ধ করবেন, কিভাবে টেককেয়ার করবেন, কিভাবে ম্যানেজ করবেন, সেটা আপনাদের ব্যাপার। তারা আমাকে আশ্বস্ত করেছেন। তাই বলছি, আজকের পর থেকে খেলাপি ঋণ বাড়বে না ইনশাআল্লাহ।’