ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG

মাহমুদ ফারাজী

২১ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:০১

ইতিহাস ঐতিহ্যে পুরনো ঢাকার "বাহাদুর শাহ পার্ক"

10533_images(22).jpg
বর্তমান 'বাহাদুর শাহ পার্কে'র পূর্ব নাম ছিল 'ভিক্টোরিয়া পার্ক' ।১৮৫৮  সালে রানী ভিক্টোরিয়া ভারতবর্ষের শাসনভার গ্রহণ করার পর এই পার্কেই এ সংক্রান্ত একটি ঘোষনা পাঠ করে শোনান ঢাকা বিভাগের কমিশনার। সেই থেকে এই স্থানের নামকরণ হয় "ভিক্টোরিয়া পার্ক"। ১৯৫৭ সালের আগে পর্যন্ত পার্কটি এই নামেই পরিচিত ছিল।

১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর এক প্রহসনমূলক বিচারে ইংরেজ শাসকেরা ফাঁসি দেয় অসংখ্য বিপ্লবী সিপাহিকে। তারপর জনগণকে ভয় দেখাতে সিপাহিদের লাশ এনে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় এই ময়দানের বিভিন্ন গাছের ডালে।

১৯৫৭ সালে (মতান্তরে ১৯৬১) সিপাহি বিদ্রোহের শতবার্ষিকী পালন উপলক্ষে এখানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় 'বাহাদুর শাহ পার্ক'।

সিপাহী বিদ্রোহ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ইংরেজ শাসনের সমাপ্তি ঘটিয়ে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ এর শাসন পুনরায় আনার জন্য। তাই তাঁর নামানুসারে এর নতুন নামকরণ করা হয় "বাহাদুর শাহ পার্ক"।

উনিশ শতকের প্রথমার্ধে নওয়াব স্যার আব্দুল গণির উদ্যোগে ঢাকার সদরঘাট এলাকায় ‘আন্টাঘর’ নামের একটি আর্মেনীয় ক্লাবঘরের ধ্বংসাবশেষের উপর পার্কটি তৈরি করা হয়েছিল।

প্রাথমিক পর্যায়ে পার্কটিকে লোহার রেলিং দিয়ে ঘেরাও করে এর চার কোণে চারটি দর্শনীয় কামান স্থাপন করা হয়েছিল। অচিরেই স্থানটি জীর্ণ হয়ে গেলে নওয়াব আব্দুল গণির উদ্যোগে এটিকে পুনরায় ভেঙ্গে মাঠের মতো তৈরি করা হয়। তখনো এর চারপাশে অনেক আর্মেনীয় বাস করত। ১৮৪০ সালেও এটি ছিল কয়েকটি রাস্তার মাঝে এক টুকরো খালি জায়গায় বৃত্তাকার একটি বাগান (জেমস্‌ টেলরের বর্ণনা অনুসারে)।

এই মাঠটি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করে ১৮৫৭  সালের সিপাহী বিদ্রোহের সময়। ১৮৫৭ সালের ২২শে নভেম্বর ইংরেজ মেরিন সেনারা ঢাকার লালবাগের কেল্লায় অবস্থিত দেশীয় সেনাদের নিরস্ত্র করার লক্ষ্যে আক্রমণ চালায়। কিন্তু সেপাহীরা বাধা দিলে যুদ্ধ বেধে যায়। যুদ্ধে আহত এবং পালিয়ে যাওয়া সেনাদের ধরে এনে এক সংক্ষিপ্ত কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে তাদের দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। বিচারের পর ১১ জন সিপাইকে আন্টাঘর ময়দানে এনে জন সম্মুখে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেয়া হয়। স্থানীয় লোকদের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করতে লাশগুলো বহু দিন যাবৎ এখানকার গাছে গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয়। এ ঘটনার পর বহুদিন পর্যন্ত এই মাঠের চারপাশ দিয়ে হাঁটতে ঢাকাবাসী ভয় পেত, কারণ এ জায়গা নিয়ে বিভিন্ন ভৌতিক কাহিনী ছড়িয়ে পড়েছিল।

সিপাহী বিদ্রোহ দমনের পর ইংরেজরা তাদের সেনাদের স্মরণে আন্টাঘর ময়দানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করেছিল। যেটি এখনও অক্ষয় হয়ে কালের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এই স্মৃতিসৌধটি চারটি পিলার এর উপর দাঁড়ানো চারকোনা একটি কাঠামো। উপরে রয়েছে একটি ডোম। অপর পাশে রয়েছে একটি ওবেলিস্ক, যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ও ভারতবর্ষের সম্রাজ্ঞী হিসেবে রানী ভিক্টোরিয়ার সিংহাসনে আরোহণকে মনে করিয়ে দেয়।

আর্মেনীয় ক্লাবঘরের চার কোণায় বসানো সীমানা নির্দেশক চারটি ব্রিটিশ কামান পরবর্তীকালে তুলে এনে পার্কের ভিতরে বসানো হয়েছে। এ পার্কের উন্নয়নে নওয়াব আব্দুল গণির ব্যক্তিগত অবদান ছিল। অন্যদিকে ১৮৮৪ সালে তাঁর নাতি এবং নবাব খাজা আহসানুল্লাহর জেষ্ঠ্য পুত্র খাজা হাফিজুল্লাহর অকাল মৃত্যু ঘটলে নবাব পরিবার তথা সাড়া ঢাকা শহরই শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে । পুত্রশোকে নবাব আহসানুল্লাহ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পুত্রশোকের কারণে ইংরেজদের বিনোদনের পৃষ্ঠপোষক নবাব আহসানুল্লাহ তাদের আমোদ ফুর্তির জন্য কোন আয়োজন করতেন না। তখন ইংরেজরা নবাবকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য এবং খাজা হাফিজুল্লাহর স্মৃতিকে জীবিত রাখতে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তার পরিচিতিমূলক একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করেন।

তৎকালীন ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে গ্রানাইট পাথরের তৈরি বৃহদাকার স্মৃতিস্তম্ভটি জাহাজে করে আনা হয়। স্তম্ভটির চারপাশ মসৃণ এবং চক চক করে দেখতে। গোড়ার দুই দিকে পরিচিতমূলক লিপি খোদাই করা রয়েছে। ১৮৮৫ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে চারটায় বঙ্গের ছোট লাট সাহেব এক আড়ম্বরপূর্ণ অনু্ষ্ঠানের মধ্য দিয়ে 'খাজা হাফিজুল্লাহ' স্মৃতি স্তম্ভটি উদ্ভোধন করেন।

যেটি বর্তমানেও দর্শনার্থীদের নজর কেড়ে যাচ্ছে।

সাম্প্রতিককালে পুরনো ঢাকার বুকে এই প্রাচীন পার্কটি জনমানুষের বিশ্রামাগারে পরিণত হয়েছে। বাণিজ্যিক এলাকার পাশাপাশি লঞ্চ টার্মিনাল থাকায় এই এলাকায় মানুষের উপচে পড়া ভিড় নিত্যকার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি হাঁটাচলা করতেও মানুষে মানুষে গা বেধে যায় এই জনাকীর্ণ এলাকায়। এসব অসুবিধার বিদ্যমানতায় বাহাদুর শাহ পার্কটি যেন বিস্তীর্ণ মরুর বুকে এক টুকরো বাগান । ক্লান্ত মরুচারীরা যেখানে মুক্ত বাতাসের খোঁজে ভিড় জমায়। শ্রান্তি দূর হলে নীড়ে ফিরে যায়।