ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG

এনএন বিডি, ঢাকা

২২ জানুয়ারি ২০১৯, ১৩:০১

বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের সামনে কেবলই বঞ্চনার চিত্র

10557_382467_165.jpg
মহানগর এলাকায় সরকারি প্রাইমারি স্কুলের একজন দফতরি চাকরির শুরুতে মোট বেতন পান ১৫ হাজার ৭১২ টাকা। গ্রামে এ বেতন ১৩ হাজার ৫৫০ টাকা। আর বেসরকারি হাইস্কুলের একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষকের (বিএড ছাড়া) চাকরির শুরুতে সর্বসাকল্যে বেতন ১৪ হাজার টাকা। এ থেকে শতকরা ৬ ভাগ কেটে রাখা হয় অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের নামে।

ফলে দেখা যাচ্ছে সরকারি প্রাইমারি স্কুলের পিওনের চেয়েও কম বেতন পান বেসরকারি হাইস্কুলের এমপিওভুক্ত শিক্ষক।

সরকারি প্রাইমারি স্কুলের পিওনের ন্যূনতম যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণী পাস। অপর দিকে হাইস্কুলে শিক্ষকতার ন্যূনতম যোগ্যতা ডিগ্রি পাস। প্রাইমারি স্কুলে প্রশিক্ষণবিহীন শিক্ষক শুরুতে সব মিলিয়ে বেতন পান ১৭ হাজার ৫২০ টাকা। অপর দিকে কলেজের একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষক চাকরির শুরুতে বেতন পান ২২ হাজার টাকা। এর সাথে এক হাজার টাকা বাড়িভাড়া, ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান।

কলেজে অনার্স মাস্টার্স পাস ছাড়া শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয় না। দেশের কলেজগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স মাস্টার্স পাস করা ব্যক্তিরা শিক্ষকতা করছেন সীমিত বেতনে। এমনকি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করেও কেউ কেউ হাইস্কুলে শিক্ষকতা করছেন এবং সরকারি প্রাইমারি স্কুলের পিওনের সমান বেতন পাচ্ছেন। হাইস্কুল ও কলেজের শিক্ষকরা সরকাররের তরফ থেকে এমপিও হিসেবে যে অনুদান পান তার বাইরে অনেকে স্কুল-কলেজ থেকে আর কোনো আর্থিক সুবিধা পান না। হাইস্কুলের অনেক শিক্ষক এখনো মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে টিউশনি করেন। কলেজ পর্যায়ের গণিত ও ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক প্রাইভেট পড়ানোর মাধ্যমে উপার্জন করতে পারলেও অন্য বিষয়ের অনেক শিক্ষকের সে সুযোগও নেই। ফলে সারা জীবন সীমিত আয়ে পার করতে হয় অনেককে।

অন্যদিকে সরকারি কলেজে একজন প্রভাষকের চাকরির শুরুতে মূল বেতন ২৩ হাজার টাকা। এর সাথে মূল বেতনের ৪০ ভাগ বাড়িভাড়া এবং দেড় হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা পান। খুলনা অঞ্চলের সরকারি কলেজের একজন সহকারী অধ্যাপক জানান, তিনি পাঁচ বছর আগে সহকারী অধ্যাপক হয়েছেন এবং বর্তমানে সব মিলিয়ে ৭০ হাজার টাকার কিছু বেশি বেতন পান। বেসরকারি কলেজের এমপিওভুক্ত সহকারী অধ্যাপকের বেতনের দ্বিগুণ এ বেতন।

বেসরকারি কলেজে সহকারী অধ্যাপকের পরে আর কোনো পদোন্নতি নেই। এমনকি সারা জীবনে তাদের দুটির বেশি টাইম স্কেলও দেয়া হয় না। কিন্তু সরকারি কলেজে সহকারী অধ্যাপকের পর সহযোগী অধ্যাপক এবং এরপরে পূর্ণ অধ্যাপক পর্যন্ত পদোন্নতি পান।

বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মূল বেতনের মাত্র ২৫ শতাংশ উৎসব ভাতা দেয়া হয়। আর কর্মচারীদের দেয়া হয় ৫০ শতাংশ। ২০১৫ সালের পে-স্কেলে তাদের বার্ষিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং পদোন্নতি বন্ধ করে দেয়া হয়। গত বছর দীর্ঘ আন্দোলনের পর বার্ষিক এ প্রবৃদ্ধি আবার চালু করা হয়েছে এবং সাথে বৈশাখী ভাতা যুক্ত হয়েছে।

হাইস্কুলে বর্তমানে বিএড কোর্সধারী একজন এমপিওভুক্ত শিক্ষকের বেতন শুরুতে ১৬ হাজার টাকা। ১০ বছর পর তাদের বেতন হয় ২২ হাজার টাকা এবং ১৬ বছরের মাথায় এক হাজার টাকা বেতন বেড়ে হয় ২৩ হাজার টাকা। এ ছাড়া তাদের আর কোনো বেতন ধাপ বাড়ে না। আর নেই পদোন্নতির কোনো ব্যবস্থা। যাদের বিএড কোর্সে নেই তাদের বেতন ১০ বছর পরে হয় ১৬ হাজার টাকা।

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের এককালীন অল্প পরিমাণ অবসর ভাতার ব্যবস্থা রয়েছে কিন্তু মাসিক কোনো পেনশনের ব্যবস্থা নেই। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অবসর সুবিধার জন্য প্রতি মাসের বেতন থেকে ৬ ভাগ টাকা কেটে রাখা হয় অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্ট খাতে। আর চাকরি শেষে অবসরকালীন সুবিধা পেতে সাধারণত চার থেকে পাঁচ বছর পার হয়ে যায়। বছরের পর বছর ধরনা দিতে হয় এবং অনেক শিক্ষক তা না পেয়েই মৃত্যুবরণ করেন।

বাংলাদেশ বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী ফোরামের সভাপতি সাইদুল হাসান সেলিম বলেন, বর্তমানে দেশে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ২৯ হাজার।

হাতে গোনা কিছু সরকারি স্কুল-কলেজ ছাড়া মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা মূলত পরিচালিত হচ্ছে বেসরকারি খাতে। অন্য চাকরির ক্ষেত্রে নানা কারণে বঞ্চিত হয়ে, অনেকে স্বেচ্ছায় যোগ দিয়েছেন বেসরকারি স্কুল-কলেজে শিক্ষকতায়। বেসরকারি স্কুল-কলেজে শিক্ষকতার সাথে যুক্ত শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন অনেক উচ্চ শিক্ষিতযোগ্য শিক্ষক। কিন্তু মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের বেসরকারি এ শিক্ষাখাতে সরকারের অবহেলা, উদাসীনতা আর বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যমূলক নীতির কারণে বছরের পর বছর যুগের পর যুগ বঞ্চনা আর হতাশার শিকার দেশের অগণিত শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী। দীর্ঘ দিন ধরে বেসরকারিপর্যায়ের এ শিক্ষকেরা তাদের বঞ্চনা অবসানের লক্ষ্যে বারবার রাজপথে অনেক আন্দোলন সংগ্রাম করলেও ফিরে পাননি তাদের ন্যায্য অধিকার আর মর্যাদা।