ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG

শহীদুল ইসলাম

২৭ মার্চ ২০১৯, ১৭:০৩

পরিবহন সেক্টরে শৃঙ্খলার নামে চলছে শুধু মামলা

11128_7.jpg
প্রতিকী ছবি
কয়েকদিন আগে রাজধানীর নর্দায় একটি বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের একজন ছাত্র বাস চাপায় নিহত হলে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে ছাত্ররা। তারা রাস্তা অবরোধ করে এই মর্মান্তিক ঘটনার প্রতিবাদ জানায়। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে পর পর তিনদিন ছাত্ররা রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্ট অবরোধ করে ৮দফা দাবি জানায় সরকারের কাছে।পরে ঢাকা উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলামের কতিপয় তড়িৎ সিদ্ধান্ত এবং ছাত্রদের দাবি বিষয়ে সমাধানের আশ^াস দিলে এক সপ্তাহের জন্য আন্দোলন স্থগিত করে ছাত্ররা।
ছাত্রদের আন্দোলন স্থগিত হলেও সড়কে মৃত্যুর মিছিল থেমে নেই।দুদিন আগেও রাজধানীর শেওড়াপাড়ায় তেতুলিয়া পরিবহনের একটি বাসের চাপায় আরো একজন ছাত্রের মৃত্যু হয়েছে।আর সারাদেশে তো প্রতিদিনই মানুষ মারা যাচ্ছে। এর যেন কোন প্রতিকার নেই।তবে কোন ঘটনা যখনই কোন চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে তখনই সরকার কিছু পদক্ষেপ নেয়। জনরোষ থেকে বাচার জন্য নেয়া এসব পদক্ষেপের কিছু ভাল দিক থাকলেও তা সুদূরপ্রসারি চিন্তার অভাবে হিতে বিপরিত হয়।

নর্দায় ছাত্র নিহত হওয়ার পর বিক্ষোভের মুখে সুপ্রভাত পরিবহনটি সরকার বন্ধ করে দিয়েছে।এতে তাৎক্ষনিকভাবে ক্ষোভের নিরসন হলেও জনদুর্ভোগ কি পরিমান বেড়েছে তা ভুক্তভোগি সাধারণ মানুষরাই জানে।এই পরিবহনের শতাধিক বাস চলাচল করে। তার সব বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জনদুর্ভোগ চরমে পৌছেছে।জনগণের জন্য কোন বিকল্প বাসের ব্যবস্থা না করেই এতগুলো গাড়ি বন্ধ করে দেয়ায় জনদুর্ভোগের পাশাপাশি এসব বাস মালিক,শ্রমিক কর্মচারিদের পরিবারে নেমে এসেছে হাহাকার।

এঘটনার পর আবারো পুলিশের হয়েছে পোয়া বারো।এরই মধ্যে রাজধানীতে ট্রাফিক শৃঙ্খলা সপ্তাহ পালিত হয়েছে।তাতে কি করা হয় বা পুলিশ কি দায়িত্ব পালন করে তা সবার চোখে পড়ার মত। গাড়ি দেখলেই চাপাও। তারপর ডাম্পিং এর হুমক্।ি কিছু নগদনারায়নের মীমাংসা হয়ে গেলে একটা মামলা দিয়েই তাদের দায়িত্ব শেষ। ছাত্ররা আমাদেরকে যে শিক্ষা দিয়েছিল তার ধারে কাছেও নেই পুলিশ। ট্রাফিক কনস্টেবল সারাদিন দাড়িয়ে থেকে গাড়ির দিক নির্দেশনা দেয় । আর সার্জেন্টরা নিরাপদ জায়গায় দাড়িয়ে থাকে পয়সার ধান্ধায়।

উল্লেখ্য,গত বছরের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় ঢাকা সেনানিবাসস্থ শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজের দু’জন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদে ফেটে পড়ে।এ দুর্ঘটনার পর সরকারের এক মন্ত্রীর হাসি ও তার কিছু মন্তব্যে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার দাবি আদায়ের লক্ষ্যে লাগাতার আন্দোলন শুরু করে। এই আন্দোলনে শিশু বয়সের শিক্ষার্থীরা চোখে আঙ্গুল দিয়ে আমাদের যা শিক্ষা দিয়েছে তার বাস্তবায়ন সম্ভব হলে এই সেক্টরের বিরাজমান নৈরাজ্য বন্ধ হতে পারে।

ঢাকা মহানগরেিত যাত্রীর সংখ্যা বাড়ানোর জন্য এক বাসের সঙ্গে অন্য বাসের যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, তাতেও অনেক যাত্রীর অঙ্গহানি হচ্ছে। একের পর এক এ রকম ঘটনা ঘটে গেলেও এর প্রতিকারের কোনো লক্ষণ চোখে পড়ে না।দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব দুর্ঘটনাকে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে শুরু করে ক্ষমতাসীন দলের উগ্র নেতারা দুর্ঘটনার আসল কারণ বের করে তা সমাধানের পরিবর্তে বিভিন্ন বক্তৃতা-বিবৃতির মাধ্যমে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে।

বিগত বছরে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের চোখে পড়া অনিয়মগুলো জাতিকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।তাতে সড়কের অনিয়ম এবং দূর্ঘটনার কারণগুলো উঠে এসেছে। তাদের দেখানো পথে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে হয়তো নৈরাজ্য বন্ধ হবে।তবে এর সাথে জড়িত রয়েছে কতকগুলো সেক্টর যা মেরামত করা জরুরি।বিআরটিএ, ট্রাফিক পুলিশ, থানা,ট্রাফিক বিভাগ।তাদেরকে সন্তুষ্ট না করে ঢাকা শহরে কোন গাড়ি চালানো সম্ভব নয়। সাপ্তাহিক কিংবা মাসিকভিত্তিক অর্থকড়ি যথাসময়ে ‘ওনাদের’ পকেটে পৌঁছে দিতেই হয় বাস মালিকদের।

অভিজ্ঞ মহল বলছেন,গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রই দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়ায় সর্বস্তরেই চলছে নৈরাজ্য।পরিবহন সেক্টর তার একটি মাত্র।ছাত্র আন্দেলনে অংশগ্রহনকারি ছাত্র-ছাত্রীদের কার্যক্রমেও তা উঠে এসেছে।
বিআরটিএ হলো পরিবহন সেক্টরের একটি মাদার অর্গানাইজেশন।চালকের লাইসেন্স প্রদান থেকে শুরু করে গাড়ির রেজিষ্ট্রেশন,ফিটনেস,ট্যাক্স টোকেনসহ যাবতীয় কাগজপত্র দিয়ে থাকে সড়ক পরিবহন মন্ত্রনালয়াধীন এই সরকারি সংস্থা।কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানটি দূর্নীতিতে আকন্ঠ নিমজ্জিত। ঘুষ এবং দালাল ছাড়া এখানে কোন কাজ হয়না।লাইসেন্স প্রদানের জন্য ওয়ানস্টপ সার্ভিস নেই।ফলে দক্ষ ও চিহ্নিত দালালের মাধ্যমে যারা উৎকোচ নিয়ে যেতে পারে সে গাড়ি চালাতে না জানলেও লাইসেন্স পায়।এই তরিকা যার জানা নেই সে যত ভাল ড্রাইভারই হোক সে লাইসেন্স পায়না।ফিটনেসের ক্ষেত্রে দালাল ছাড়া গেলে গাড়ি নিয়ে গিয়ে দিনের পর দিন ঘুরেও ফিটনেস পাওয়া যায়না।এই সমস্যা সেই সমস্যা বলে ঘোরাবে।কিন্তু দালালের মাধ্যমে গেলে বড় অংকের টাকা নিয়ে ফিটনেস দিয়ে দেয় একদিনেই ।

রাস্তায় স্পিড ব্রেকার আছে কিন্তু মার্কিং বা সতর্ককারি চিহ্ন বা সাদা দাগ দেয়া নেই অধিকাংশ রাস্তায়। আবার আছে খানা-খন্দকে ভরা।এসব দেখার কেউ নেই।এটা দুর্ঘটনার অন্যতম বড় কারণ ।কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নজরে সেটা এলেও যারা এসব রাস্তার অথরিটি তারা সব সময়ই থাকেন বেখবর।

রাস্তায় গাড়ি চালনায় যাত্রী ধরার জন্য রয়েছে অসম প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতার ফলে দূর্ঘটনা বেড়েই চলেছে। ট্রাফিক সার্জেন্টরা একটু আন্তরিক হলেই সিরিয়ালে গাড়ি চালাতে চালকদের বাধ্য করতে পারে। কিন্তু রাস্তায় তাদের দেখা যায় নিরাপদ একটি জায়গায় দাড়িয়ে গাড়ি থামিয়ে উৎকোচ আদায় অথবা মামলার কোটা পূরনে তারা ব্যস্ত। জনদুর্ভোগ রোধ করতে তাদের তেমন কোন ভুমিকা দেখা যায়না।

লাইনে গাড়ি চালনা,ওভারটেক না করা এবং ইমার্জেন্সি লাইন রাখার শিক্ষা দিয়েছিল আমাদের শিশু ছাত্ররা। মুমুর্ষূ রোগি যানজটে আটকা পড়ে মরছে অহরহই। অযান্ত্রিক আর যান্ত্রিক যানবাহন চলছে এক সাথে। যে রাস্তায় বাস আসে সেখানে লেগুনাও চলে। সুন্দর গণপরিবহন ব্যবস্থা হলে আমার মনে হয় ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার প্রবনতাও কমে যেত।

এবার আসুন মহাসড়কের কথা। মহাসড়কে শৃংখলা মোটেও নেই। মানুষের পারাপারের নিরাপদ জায়গা নেই। মহাসড়কে লেইনের কোন শৃংখলা নেই। ওভার টেকিং এর আইন থাকলেও প্রয়োগ নেই।অযান্ত্রিক এবং নি¤œগতির যানবাহন একসাথেই চলছে।আলাদা লেইন আমাদের দেশে রোড সিস্টেমেই নেই। সেই সাথে রাস্তার উপরে রয়েছে হাট বাজার এবং যত্রতত্র যাত্রী উঠা-নামা।এমন মহাসড়ক ব্যবস্থা আমাদের চেয়ে দরিদ্র দেশ নেপাল বা ভুটানেও আমার চোখে পড়েনি।

এসবের জন্য আসলে প্রয়োজন গোটা সিস্টেমেই পরিবর্তন আনা যা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার ।তবে এর সাথে যারা সরাসরি জড়িত তারা যদি আন্তরিক হোন তবে একসময় গোটা সিস্টেমেই পরিবর্তন আসবে এবং সড়কে লাশের মিছিল কমবে।তবে একটা কথা স্মরন রাখতে হবে উন্নত দেশগুলোতে এসব সিস্টেম থাকা সত্তেও দুর্ঘটনা ঘটে।সেখানেও মানুষ মারা যায়।পার্থক্য হলো সেখানে কোন কিছু ঘটলে সংশ্লিষ্টরা তার কারণ অনুসন্ধান করতে আইন প্রয়োগকারি সংস্থাকে সহযোগিতা করে,আইন নিজের হাতে তুলে নেয়না।একটি অপরাধের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আরেকটি অপরাধ করেনা,গাড়ি ভাংচুর,অগ্নিসংযোগের মত ঘটনার অবতারনা করেনা।বিচারহীনতা থেকেই হয়তো আমাদের দেশের মানুষ দুর্ঘটনা ঘটলেই এহেন অপরাধে লিপ্ত হয়ে পড়ে গোটা সিস্টেমে যেমন পরিবর্তন আনা প্রয়োজন তেমন প্রয়োজন আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে বরং সহযোগিতা করা।

সাম্প্রতিক ঘটনার প্রেক্ষিতে ঢাকা মহানগরীতে চলাচলরত বাসসমুহকে ৬টি রুটে বিভক্ত করে চালানো হবে বলে শোনা যাচ্ছে। বাসের মধ্যে কোন ভাড়া নেয়া হবেনা। ভাড়া নেয়া হবে কাউন্টার থেকে।এতে বাসসমুহের মধ্যে যাত্রী ধরার অসুস্থ প্রতিযোগিতা দুর হবে বলে ধারনা করছেন সংশ্লিষ্টরা।তবে এতে পুলিশের অবৈধ আয় কমে যেতে পারে। এমন আশঙ্কা থেকেই হয়তো তা কার্যকর করা নাও হতে পারে।আর সরকার পুলিশের স্বার্থের বাইরে যাবেনা বলেই সবার ধারনা।