ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG

শহীদুল ইসলাম

১ এপ্রিল ২০১৯, ১৬:০৪

আমাদের জানমালের নিরাপত্তা নেই

11159_1553795378_16.jpg

দেশে বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় অগ্নিকান্ডের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। বাড়ছে জীবনহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও। বেশির ভাগ অগ্নিকাণ্ড ঘটছে বৈদ্যুতিক ত্রুটির কারণে। ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক উপকরণ ব্যবহার এবং রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা বিপর্যয় ডেকে আনছে। আর দুর্ঘটনার পর দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে আমাদের সংশ্লিষ্ট বিভাগের জন্য দুরুহ হয়ে পড়ছে আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে। এক্ষেত্রে কতৃপক্ষের দুর্বলতা কোথায় কারো বোধগম্য নয়।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতিবছর গড়ে অন্তত ১৬ হাজার অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটছে। গত ৮ বছরে সারা দেশে ১ লাখ ৩০ হাজার ২১৫টি অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৯২৮ জন। আহত হয়েছেন ১২ হাজার ৮২৫ জন। ক্ষতির পরিমাণ সোয়া ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি। সংঘটিত অগ্নিকান্ডের ৬৫ থেকে ৭০ ভাগ বৈদ্যুতিক ত্রুটির কারণে ঘটছে।

দেশে বিদ্যুৎ ও আগুনের ব্যবহার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অগ্নিকান্ডের ঘটনাও বাড়ছে। অগ্নিকান্ড কখন ঘটবে সে বিষয়টি অনুমান করার উপায় নেই। তবে সচেতন হলে দুর্ঘটনা অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব হয়। এ জন্য  বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, তার ইত্যাদি ব্যবহারের সময় তার মান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হবে। বাড়িঘর কলকারখানায় অগ্নিনির্বাপকের ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোথাও আগুন লাগলে সঙ্গে সঙ্গে ফায়ার সার্ভিসকে জানালেও প্রাণহানি এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব।

ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির কারণে বড় অগ্নিকান্ড সবার দৃষ্টি কাড়লেও প্রকৃতপক্ষে প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও আগুনের ঘটনা ঘটছে। বৈদ্যুতিক ত্রুটির পাশাপাশি সিগারেটের আগুন, গ্যাসের চুলা, গ্যাস সিলিন্ডার, রাসায়নিক দ্রব্য, বিস্ফোরণ, আগুন নিয়ে খেলা ও অসতর্কতাসহ নানা কারণে ঘটছে প্রলয়ঙ্করী অগ্নিকান্ড। অগ্নিকান্ডে বিপুল সংখ্যক মানুষের হতাহতের ঘটনা যেমন ঘটছে তেমন ভস্মীভূত হচ্ছে কোটি কোটি টাকার সম্পদ। বছরে গড়ে ৫০০ কোটি টাকারও বেশি সম্পদ নষ্ট হচ্ছে।

দেশে আইন আছে প্রতিটি কারখানায় পর্যাপ্ত দরজা থাকতে হবে, বিকল্প ও প্রশস্ত সিঁড়ি থাকতে হবে। বিল্ডিং এর উপরের তলাগুলো থেকে দ্রুত বের হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক ঝুলন্ত সিঁড়ি (ফায়ার এক্সিট) থাকতে হবে। শুধু তাই নয়, এর পাশাপাশি অগ্নি নির্বাপনের যন্ত্রপাতিসহ পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকতে হবে। কিন্তু অনেক গার্মেন্টস মালিক এই সব আইন-কানুন মানছেন না। যারা মানছেন তারা পুরোপুরি মানছেন না। এ ক্ষেত্রে তাদের অবহেলাজনিত কারণে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পরোক্ষ দায় দায়িত্ব তাদের ওপর বর্তায়। এমনকি যেসব কর্তৃপক্ষের এইসব আইন কার্যকর করার কথা তারাও দায়িত্ব এড়াতে পারেন না।

তবে এক্ষেত্রে দুর্নীতিও কম দায়ি নয়। শিল্প কারখানার জন্য ফায়ার সার্টিফিকেট থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ফায়ার সার্টিফিকেট না থাকলে সরকারি কোন সুযোগ সুবিধা পাবেননা সেসব কারখানা ।এই আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দেখা যায় ব্যাপক দুর্নীতি। ফায়ার সার্টিফিকেট পাওয়ার জন্য কারখানা মালিকরা একটি বিকল্প সিঁড়ি দেখিয়ে দেন। অথচ এই সিঁড়ি দিয়ে বিপদের সময় কেউ বের হতে পারেনা।কারখানা ভিজিটের নিয়ম আছে সার্টিফিকেট পাওয়ার জন্য। সেখানেও ব্যাপক দুর্নীতি।সংশ্লিষ্ট ভিজিটরকে নগদ কিছু ধরিয়ে দিলেই তিনি ফাইল পাস করে দেন।

আমাদের দেশে দুর্যোগ বা দুর্ঘটনা মোকাবিলার প্রস্তুতি খুবই অপ্রতুল। বিশেষ করে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে। যে ক্ষেত্রে আগুন নেভানো, মানুষকে সরিয়ে নেয়া এবং জরুরি উদ্ধার কার্য পরিচালনা করা দরকার, সেই সব ক্ষেত্রে আমাদেরকে আরো প্রস্তুতি নিতে হবে।বনানীর অগ্নিকান্ডের সময় দেখা গেছে সেখানে ফায়ার ব্রিগেডের ২২টি ইউনিট কাজ করলেও বেশির ভাগ ইউনিটে পানি ছিলনা।সেইসাথে উপরে উঠার মত পর্যাপ্ত মইও ছিলনা। মোট কথা আগুন দ্রুত নেভানো এবং মানুষকে উদ্ধার করার সরঞ্জমাদি পর্যাপ্ত নেই।

একটি বড় দুর্ঘটনা ঘটলেই আলোচনায় আসে প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত অগ্নি নির্বাপন সরঞ্জামাদি ক্রয়ের বিষয়টি। কিন্তু দুর্ঘটনা শেষ হলে আর খবর থাকেনা।কেন এমন হয় তা কারো বোধগম্য নয়।

শুধু অগ্নি দুর্ঘটনাই নয় সড়ক দুর্ঘটনা,লঞ্চ দুর্ঘটনা বা অন্য কোন দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া বা মানুষকে দ্রুত উদ্ধার করার ব্যবস্থা নেই বললেই চলে।সময়ের সাথে সাথে মানুষের রুচি বদলেছে,মানুষ অনেকটা আরামপ্রিয় হয়েছে। যানবাহনের আকার বেড়েছে।কিন্তু সেইসাথে দুর্ঘটনা ঘটলে উদ্ধার করার ব্যবস্থার কোন আধুনিকায়ন হয়নি।যেমন ধরুন লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটলে সেকেলের ‘হামজা আর রোস্তম ’ আছে তো আছেই। বর্তমানে লঞ্চের আকার বেড়েছে অনেক। উল্লেখিত ২টি উদ্ধার জাহাজের সেই সক্ষমতা নেই যে দক্ষিণাঞ্চলে চলমান কোন একটি লঞ্চ ডুবে গেলে তা টেনে তুলবে।

কয়েক বছর আগে রাজধানীর শাহজাহানপুরে একটি পরিত্যক্ত কুয়ার মধ্যে একটি শিশু পড়ে যাওয়ার পর তাকে উদ্ধার করতে কতনা চেষ্টা তদবির করলেন সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো। দীর্ঘ চেষ্টার পর তারা ব্যর্থ হলে এলাকার সাধারণ ছেলেরা তাকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।এক্ষেত্রে প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল আমাদের ফায়ার সার্ভিস বা সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের কর্মদক্ষতা বা সক্ষমতা নিয়ে।

পরিশেষে একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আমরা অবশ্যই দাবি করব দুর্ঘটনা থেকে মানুষকে দ্রুত উদ্ধারের জন্য যত আধুনিক সরঞ্জামাদি প্রয়োজন তা কেনা হোক। আমরা বার বার দুর্ঘটনাজনিত কারনে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার শিরোনাম হতে চাইনা।আমাদের নাগরিকদের জান-মালের নিরাপত্তা চাই। আর সেটা নাগরিক হিসেবে খুব সাধারণ এবং ন্যায্য দাবি।