ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

২৩ ডিসেম্বর ২০১৭, ১১:১২

সাহিত্য : জীবনের সুখ

116_9.jpg

কথায় বলে ‘ত্রিভুবন’। স্বর্গ-মর্ত-পাতালময়, অর্থাৎ সব কিছুকে জড়িয়ে থাকা। যেমনটা বলা যায় সাহিত্যের ক্ষেত্রে। আকাশ, সমুদ্র, মাটিজুড়ে; অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ ঘিরে; আলো, ছায়া, আঁধারে জীবনময় সাহিত্যের আবাস।

কেউ যদি প্রশ্ন করেন, সাহিত্য কী বা কাকে বলে? তাহলে প্রথমে বোঝা প্রয়োজন সাহিত্য শব্দের অর্থ কী। সাহিত্য শব্দটির অর্থ হলো- সহিত, মিলন, যোগ বা সংসর্গ। ভালোভাবে বোঝার জন্য সাহিত্য শব্দটিকে দু’টি বা তিনটি শব্দে ভেঙে দেখতে পারি। দু’টি শব্দে, সাহিত্য = সহিত (যোগ) + হিত (কল্যাণ) এবং তিন শব্দে, সাহিত্য = সাহি (আনন্দদায়ক) + সহিত + হিত শব্দসমূহ পাওয়া যাবে। শব্দগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কোনো কিছুতে অন্য কিছুর সংযুক্তি বোঝায়, যা হলো মিলন বা সম্মিলন এবং সেটা কল্যাণের উদ্দেশে। সাহিত্যের সূচনাই হয়েছিল মানুষের কল্যাণের উদ্দেশে। আজ থেকে হাজার বছর আগেও মানুষ সাহিত্য চর্চা করেছে। যখন কাগজে লেখাপড়া ছিল কল্পনাতীত তখনো হয়েছে সাহিত্য চর্চা। বই আকারে সাহিত্য যখন মানুষের দোরগোড়ায় আসেনি তখন মানুষ গিয়েছে সাহিত্যের কাছে। দিনক্ষণ ঠিক করে আসর বসিয়ে উপস্থাপন করেছে যে যার রচনা, ব্যক্ত করেছে তাদের চিন্তা, স্বপ্ন, আশা; শুনিয়েছে নিরাশার কাহিনী; গেয়েছে স্রষ্টার জন্য স্তুতি; আর কান পেতে শুনেছে শ্রোতা ও দর্শকেরা। সাহিত্যের আছে এমন সব গৌরবগাথা অতীত, যা এখনো আমাদের বিমোহিত করে। কালক্রমে বদলেছে সমাজ, মানুষের রুচি, শিক্ষার ধরন, বদলেছে মানুষের জীবনব্যবস্থাও। ভাষায় যোগ হয়েছে নতুন কিছু, বিলুপ্তও হয়েছে অনেক শব্দ। যদিও মানবজীবনের মৌলিক বোধ বিষয়গুলো থেকে গেছে একই, যা অপরিবর্তনীয়।
মানুষের সুখানুভূতি, দুঃখবোধ, চাওয়া-পাওয়া, জন্ম-মৃত্যুসহ অনেক কিছুকে ঘিরেই আজো মানুষ বাঁচে, যা কিছু আজো মিশে আছে জীবনের অস্তিত্বে, যা বলা চলে চিরন্তন। সাহিত্য আসলে এই অস্তিত্বেরই আরেক রূপরেখা। সাহিত্য হলো- হিতোদ্দেশে শৈল্পিক লেখনীর মাধ্যমে জীবনের আনন্দ ও কষ্টের অনুভূতি, পার্থিব বা আধ্যাত্মিক মনন চেতনায় সৌন্দর্য যোগে বার্তা উপস্থাপন। যা কল্যাণের উদ্দেশ্যে জীবনের আলোÑ অন্ধকার, ন্যায়-অন্যায় বা সারল্য ও কাঠিন্যের স্বরূপকে মানব সমাজে সংসর্গ ঘটায়। আর এই সংসর্গের কাজটি যিনি করেন, তিনিই হলেন সাহিত্যিক। মঙ্গল উদ্দেশে একজন সাহিত্যিক তার মনে ছুঁয়ে যাওয়া বিষয়টি সম্পর্কে আপন ভাবাবেগের কারুকার্যে ভাবনা বোধকে প্রকাশ করেন। সাহিত্যিক হবার জন্য বাধাধরা কোনো নিয়ম নেই। তেমনিভাবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতার মাপকাঠিরও প্রয়োজন হয় না, তবুও নির্দিষ্ট কিছু গুণ তো থাকা চাই। যে গুণগুলো তাকে সাহিত্যিক হিসেবে করবে সুযোগ্য, মানুষ হিসেবে মর্যাদাশীল, জ্ঞানী হিসেবে উন্নত। নৈতিক বোধে অলিখিত দাবি কিংবা সভ্য পাঠকের আকাক্সক্ষা যা-ই বলি না কেন, তিনি হবেন স্বচ্ছ চিন্তাশক্তিসম্পন্ন একজন ভাবাবেগি জ্ঞানী মানুষ। যার মধ্যে বাস করবে আরেকজন সৃজনশীল সৎ মানুষ। যার কাছে নাম-যশ কিংবা অর্থার্জনের আগে স্থান পায় নৈতিকতা ও কল্যাণকামিতা, তিনিই হলেন সত্যিকারের হিতকর সাহিত্যিক।
সাহিত্য সম্পর্কিত সামগ্রিক যেকোনো বিষয় বোঝাতে বলা হয় সাহিত্য জগৎ। সাহিত্যের সাথে আরেকটি শব্দ এসে যায় তা হলো শিল্প। শিল্পের সাথে সাহিত্য যে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কাব্যিক কথায় সুর দিলে তা হয়ে যায় গান। অভিনয়ে গল্প নেয় নাট্যরূপ। চিত্রকরের পটের ছবিটার মাঝেও রঙের পরতে পরতে ঢাকা থাকে সাহিত্যময় কোনো একটি গল্প। শাখা-প্রশাখার সংযোগে সাহিত্য একটা বিশাল জগৎই বটে। এ জগৎটা এতই বড় যে, এক জীবনে এর সব দিক দিগন্তে দক্ষতার সাথে বিচরণ করা বেশ কঠিন। আর যারা এ কাজটি করতে পারেন, তারা নিঃসন্দেহে উচ্চ যোগ্যতার গুণীজন। একজন লেখক সাহিত্যিক রূপে আসলে চার দিকে ছড়ানো-ছিটানো সুখ-দুঃখানুভূতির যাপিত জীবনের প্রতিনিধিত্ব করেন। যিনি নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে অন্যের কাছে তুলে ধরেন চার পাশে তার দেখা, শোনা ও বোঝাকে। সেই সাথে তার লেখনী চিত্রে ভেসে ওঠে তার শিক্ষা, রুচি, সততা বা নৈতিকতা।
সাহিত্য হলো সেই মাধ্যম যা বহন করে জ্ঞান, বোধশক্তি, সচেতনতা, আনন্দ বা বিনোদনের মতো কল্যাণকর বিষয়গুলো। মানুষের জীবনে অপরিহার্য একটি দিক হলো খাদ্য। সাহিত্যকে সেই খাদ্যের সাথে তুলনা করা যায়। একজন মানুষ যেভাবে পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয় এবং অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করে নিজের ক্ষতি করে, তেমনি সুশিক্ষণীয় বা রুচিশীল সাহিত্য মানুষকে জ্ঞানে, সচেতনতায়, উন্নত বোধশক্তিতে সমৃদ্ধ করে। আনন্দিত সুখী পরিবেশে মানুষ লাভ করে সুস্থ বিনোদন। সাহিত্যের প্রতিটি লেখা, হোক তা কবিতা, গল্প, উপন্যাস বা প্রবন্ধ, তাতে থাকে নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু যা লেখক, সাহিত্যিকগণ বার্তা হিসেবে প্রেরণ করেন এবং পাঠকেরা তা গ্রহণ করেন। পাঠক প্রভাবিত হন লেখকের চিন্তাচেতনায়, সমৃদ্ধ করেন নিজেকে সে ভাবধারার জ্ঞানে। আমরা এ দিকে নিজেদের ভাগ্যবান বলতে পারি। কারণ, আমাদের আছে এমন সব গুণী লেখক যারা আমাদের সমাজকে জ্ঞানে করেছেন শৌর্যশালী, সুস্থ বিনোদনে করেছেন সমৃদ্ধ। তাদের মধ্যে অনেকে সময়মতো হয়তো যথার্থ মূল্যায়ন পাননি। পদবি, ক্ষমতা আর সহযোগিতার অভাবে কদর হয়নি তাদের যোগ্যতার, তাদের নৈতিক চেতনার। অনেকে হয়তো পূর্ণ যোগ্যতা থাকার পরও প্রমাণ করতে পারেননি নিজেকে। তবে প্রচার-প্রসার না থাকলেও তাদের অনেকে অবশ্যই সাহসী, সম্মানিত ও উঁচুমানের সাহিত্যিক। কোটি পাঠক হয়তো তাদের নেই, যারা আছে তারা ঠিক জানে এবং বোঝে তারা কতটা উপকারী ও উঁচুমানের সাহিত্যিক। আবার এমন অনেক লেখকও আছেন, যারা আধুনিকতা, মুক্তমনা, সংস্কারমুক্ত, প্রগতি, চেতনার ছদ্মবেশে অশ্লীলতা আর উগ্রতার প্রসারণ করে চলেছেন। হতে পারে তাদের লক্ষ-কোটি পাঠক, তাদের বই বাজারে এলেই শেষ হয়ে যায়, প্রকাশক বই বের করে পাঠকচাহিদা মেটাতে পারেন না। প্রচার-প্রসার, আর্থিক সচ্ছলতা, পাঠক সৃষ্টির ক্ষমতায় তারা যোগ্য। সফল যোগ্যবান ও ভাগ্যবান লেখক। কিন্তু নৈতিকতা ও সততায় এতটা সুযোগ্য কি? আদর্শ বোধশক্তিসম্পন্ন উপকারী জ্ঞানসন্ধানী সচেতন পাঠকেরা সেই অখ্যাত সাহিত্যিকদেরই কদর করেছেন, করেন এবং করবেন।