ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৩:০২

গালগল্প কবে শেষ হবে ?

শুধু আমাদের দেশের লোকই যে অপরাধ প্রবণ এমনটা মনে করার কোন সুযোগ নেই। অপরাধ প্রবণতা সকল দেশেরই সব সময়ই ছিল, এখনও আছে এবং আগামী দিনেও থাকবে। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটটা সম্পূর্ণ। অন্য দেশে অপরাধ প্রকাশ পেলে তা তাৎক্ষণিতভাবে আমলে নেয়া হয় এবং অপরাধীদের পাকড়াও করে আইনের হাতে সোপর্দের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটটা সম্পূর্ণ আলাদা। আমাদের কারো অপরাধ প্রকাশ পেলে সাময়িক কিছু হৈ চৈ হয়। কর্তাদের কথামালার ফুলঝুড়ি চলে বেশ কিছু দিন। কিন্তু এক সময় তা শুন্যে মিলিয়ে যায়। অপরাধীদেরকে আইনের আওতায় আনা বা তাদেরকে শাস্তির মুখোমুখি করা হয় না। ফলে অপরাধীরা পরবর্তীতে দ্বিগুণ উৎসাহ নিয়ে নতুন করে অপরাধ মূলক কাজে জড়িয়ে পরে। আমাদের সমস্যাটা এখানেই।
বিগত কয়েক বছরে আমাদের দেশের অর্থনৈতিক সেক্টরে অনেকগুলো সাগর চুরির ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু কোন ক্ষেত্রেই অপরাধীদের ধৃত করে আইনের আওতায় আনা হয়নি। এমনকি ২০১৬ সালে ৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে চুরি হয় ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার। টাকায় ৮০৮ কোটি। ডিজিটাল পদ্ধতিতে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে চুরি হওয়া এ অর্থ জমা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে। এই চুরির ঘটনায় মামলা হলে তদন্তে নামে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগটি। কিন্তু রিজার্ভ চুরির দীর্ঘদিন অতিক্রান্ত হলেও অপরাধীরা এখন পর্যন্ত অধরায় থেকে গেছে। সরকার, অর্থমন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে বিভিন্ন সময় অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হলেও তা রীতিমত বাগারম্বরের মধ্যেই থেকে গেছে। বিভিন্ন সময় অপরাধী সনাক্তের কথা বলা হলেও এর কোন দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়নি। ফলে বিষয়ে কালের গর্ভে চাপা পড়বে বলেই মনে করা হয়েছিল।
সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে রিজার্ভ চুরি বিষয়ক খবর প্রকাশিত হয়েছে এবং এখন হচ্ছে। এতে ধারণা করা যায় যে, বিষয়টি এখনও শুণ্যে মিলিয়ে যায় নি। দাবি করা হচ্ছে যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের বহুল আলোচিত রিজার্ভ চুরির ঘটনায় পাঁচ দেশের অন্তত ৪৩ ব্যক্তি ও পাঁচ প্রতিষ্ঠান জড়িত বলে তথ্য পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। এখানেই শেষ নয়, সন্দেহের তালিকায় আছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের পাঁচ শাখায় কর্মরত অন্তত ১৪ জন কর্মকর্তা ও একটি বেসরকারি ব্যাংকের এমডি। সিআইডির বরাত দিয়ে সম্প্রতি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ইনডিপেনডেন্ট টিভির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
সিআইডি বলছে, রিজার্ভ চুরির ঘটনায় কোনে না কোনভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাঁচ শাখার অন্তত ১৪ জন কর্মকর্তা জড়িত। বেসরকারি একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকও আছেন সন্দেহের তালিকায়। তিনি চুরির সময় সুইফট এসোসিয়েশনের নেতৃত্বে ছিলেন। গোয়েন্দা সূত্র মতে, সন্দেহের তালিকায় আছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসেব ও বাজেট শাখার একজন যুগ্ম পরিচালক, দুজন উপ-পরিচালক, একজন উপ-মহাব্যবস্থাপক, পেমেন্ট সিস্টেম বিভাগের একজন উপ-মহাব্যবস্থাপক, দুজন যুগ্ম পরিচালক ও দুজন উপ-পরিচালক পদমর্যাদার কর্মকর্তা।
এছাড়া আইটি শাখার একজন উপ-মহাব্যবস্থাপক, এফএসএসএস পিডি বিভাগের একজন উপ-মহাব্যবস্থাপক ও ফরেক্স শাখার একজন উপ-পরিচালক আছেন সন্দেহের তালিকায়। সিআইডি বলছে, ফরেক্স শাখার সন্দেহভাজন ওই কর্মকর্তার কক্ষেই হ্যাকাররা প্রথম আক্রমণ চালায়। সন্দেহভাজন কর্মকর্তারা হ্যাকারদের সুযোগ করে দিতে ভূমিকা রেখেছেন।
সিআইডি বলছে, ভারতীয় একটি কোম্পানির মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফটের সঙ্গে আরটিজিএস কানেকশন দেয়ার পরই রিজার্ভ চুরির সুযোগ তৈরি হয় বলেও প্রামাণ মিলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফটের সাথে আরটিজিএস কানেকশন দেয়ার কাজ দিতে ভারতীয় নাগরিক এডি হাদ্দাদকে সহায়তা করেছিলেন নির্বাহী পরিচালক পদমর্যার এক কর্মকর্তা। আরটিজিএস কানেকশন দেয়ার পরই সুইফটের নিরাপত্তা দুর্বল হয়ে পড়ে। আর তখন থেকেই চুরির পরিকল্পনা করে চক্রটি। আর হ্যাক হওয়ার কথা জেনেও এডি হাদ্দাদ ও বাংলাদেশ সুইফট এসোসিয়েশনের তৎকালীন এক নেতা গভর্নরকে সুইফট খোলা রাখতে চাপ দিয়েছেন।
সিআইডি মনে করছে, এই তিনজন রিজার্ভ চুরির ঘটনায় সরাসরি জড়িত। এদের আইনের আওতায় আনতে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন সিআইডি কর্মকর্তারা। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, ফিলিপাইনের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান সরাসরি রিজার্ভ চুরিতে জড়িত। প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে আরসিবিসি ব্যাংক, ফিল্ডরেম মানি এক্সচেঞ্জ, বিকন কারেন্সি, ক্যাসিনো সোলেয়ার ও ইস্টার্ন হাওয়াই। পাশাপাশি ফিলিপাইন, চীন, শ্রীলঙ্কা, জাপান ও ভারতের অন্তত ৪৩ ব্যক্তি রিজার্ভ চুরিতে জড়িত।
সন্দেহের শীর্ষে সুইফটের প্রেসিডেন্ট এডি হাদ্দাদ, কর্মকর্তা নীলা ভান্নান, আর্থেস সুদিন্দ্র, প্রীতম রেড্ডি, অভিজিত কুমার সাহা, রবি সুভ্রানিয়াম ও সৌরভ কুমার। এডি হাদ্দাদের পরিকল্পনায় পাঁচজন হ্যাকিংয়ে জড়িত হয়। অন্যদিকে চীনের নাগরিক গাওসুয়া, ডিংজে, শ্রীলংকার শালিকা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শালিকা প্যারেরাসহ পাঁচ পরিচালক, জাপানের গাড়ি ব্যবসায়ী সাসাকি ও তার পূর্বপরিচিত জয়দেবা রিজার্ভ চুরিতে সরাসরি জড়িত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। আর ভুয়া নাম ঠিকানায় অ্যাকাউন্ট খুলতে সহায়তা করে আরসিবিসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান লরেন্স তান তৎকালীন ম্যানেজার মায়া দিগুতিসহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে রিজার্ভ চুরির একটি নাতিদীর্ঘ চিত্র ফুটে উঠেছে। কিন্তু এ ধরনের গল্প আমরা বেশ আগে থেকেই শুনছি। কিন্তু কোন অপরাধীর বিরুদ্ধে কার্যকর কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায় নি। তাই আমরা মনে করি দেশের সচেতন মানুষ এ বিষয়ে আর গালগল্প শুনতে চায় না বরং অপরাধী সনাক্ত করে দায়িদের দৃষ্টান্তমূলত শাস্তি দেখতে চায়। জনগণ সরকারের কাছে দায়িত্বশীল আচরণ আশা করে।