ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG

২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৫:০২

মাতৃভাষার মর্যাদা ও গুরুত্ব

মা, মাতৃভূমি ও মাতৃভাষা সকল জাতিরাষ্ট্রের কাছেই শ্রদ্ধার বিষয়। কিন্তু একথা সত্য যে, বিশে^র সকল ভাষারই একটা সর্বজনীনতা আছে। ভাষাকে কোন দেশ-রাষ্ট্র, সমাজ বা কোন চৌহদ্দির মধ্যে আটকে রাখা সম্ভব নয়। আবার ভাষার কোন ধর্ম বা জাত-পাতও নেই। ব্যক্তি তার পছন্দের ধর্মের অনুশীলন ও অনুসরণ করে যেকোন ভাষায় মনে ভাব প্রকাশ করতে পারে। এতে কোন বাধা-প্রতিবন্ধকতা নেই। ধর্ম পালনে ভাষা যেমন প্রতিবন্ধক নয়, ঠিক তেমনি ধর্মও কোন ভাষার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে না। কিন্তু এ নিয়ে আমাদের অতীত মোটেই সুখকর নয় বরং খুবই বেদনাদায়ক। আমরা অনেকটা অজ্ঞতাবশতই অতীতে ভাষার সাথে ধর্মের বিরোধ সৃষ্টি করেছি। কিন্তু এতে আমাদের কোন লাভ হয় নি বরং আমরা পিছিয়েছি অনেক ক্ষেত্রে। আর বিষয়টি যখন আমরা উপলব্ধি করতে পেরেছি, ততদিনে ভাগিরতী ও গঙ্গায় অনেক জল গড়িয়ে গেছে। আর তাই সেই ক্ষতি এখন পর্যন্ত আমরা পুষিয়ে উঠতে পারিনি। যা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনকই বলতে হবে।
বিশ^র অসংখ্য ভাষা প্রচলিত থাকলে কোন ভাষা বিশেষ কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নিজস্ব সম্পত্তি বলে মনে করার কারণ নেই। কারণ, ভাষাতত্ত্ব পর্যালোচনায় এখন পর্যন্ত কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে ভাষার আবিস্কারক বা প্রতিভূ হিসেবে সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। মূলত ভাষা অতিপ্রকৃত। প্রাকৃতিকভাবেই এর উৎপত্তি এবং ক্রমবিবর্তন। তাই কোন ভাষাকে বিশেষ কোন ধর্ম ও গোষ্ঠীর নিজস্ব মনে করার কোন সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু আমরা অহমিকা বশত ভাষাকে একটা সংকীর্ণ গুন্ডির মধ্যেই আবদ্ধ করে ফেলেছি। ফলে অনেক অনাকাঙ্খিত ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে। এজন্য সভ্যতাকেও দিতে হয়েছে বেশ চড়া মূল্য।
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, অতীতে ভারতীয় উপমহাদেশের একশ্রেণির মুসলমান বাংলা ভাষাকে বিজাতীয় ভাষা করতেন। তাই এই ভাষায় কথোপকথন, শিখন, চর্চা ও সাহিত্য রচনাকে ধর্মবিরোধী বা পাপকর্ম বলেই বিবেচিত হতো। মূলত তাদের এই মানসিকতাকে কুপমন্ডুকতা বলা ছাড়া কোন উপায় ছিল আছে বলে মনে হয় না। কারণ, বাংলা ভাষা বিশেষ কোন ধর্ম বা গোষ্ঠির প্রতিভূ অতীতে ছিল না এমনকি এখনও নয়। কিন্তু এই ভাষাকে কেন্দ্র করেই আমরা অতীতে অনেক অনাকাঙ্খিত ঘটনার জন্ম দিয়েছি। যা আমাদের জাতীয় অগ্রযাত্রাকেই ক্ষত-বিক্ষত করেছে।
এই বিষয় নিয়ে শুধু উপমহাদেশীয় মুসলমানদের মধ্যেই কুসংস্কার প্রচিলত ছিল তা নয় বরং বাংলা ভাষা নিয়ে হিন্দুরাও বেশ হীনমন্যতায় ভুগেছেন। তারা মনে করতেন বাংলা ভাষা শেখা ও চর্চা করা বড় ধরনের অপরাধ বা পাপ। কারণ, এই ভাষা চর্চা করলে তাদেরকে ‘রৌরব’ নামাক নরকে যেতে হবে বলে মনে করা হতো। তাই এক শ্রেণির হিন্দুরা নরকবাস এড়ানোর জন্যই বাংলা ভাষাকে মনে প্রাণে গ্রহণ করতে পারেনি। এমন কথা মুসলমানদের জন্য সমাজভাবে প্রযোজ্য ছিল। কারণ, তারাও অজ্ঞতাবশত মনে করতো যে, বাংলা বিজাতীয় ভাষা। তাই এই ভাষা শেখা ও চর্চা করা অতিশয় গুনাহের কাজ। সঙ্গত কারণেই অতীতে তাড়াও এই ভাষা শেখা ও চর্চার বিষয়ে লোকজনকে নিরুৎসাহিতই করতেন।
পরিস্থিতি যে কত ভয়াবহ ছিল তা মধ্যযুগীয় কবি আব্দুল হাকিমের ‘বঙ্গভাষা’ কবিতা থেকে কিছুটা হলেও উপলব্ধি করা যায়। তিনি বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে বিষোদগারকারীদের তীর্যক সমালোচনাকরে তার কবিতায় লিখেছেন, ‘ ‘যেসবে বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/ সে সবে কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’। মূলত কবি বাংলা ভাষা বিরোধীদের একটা দাঁতভাঙ্গা জবাব দেয়ার জন্যই এমন কঠিন কথায় বলেছিলেন। শ্রুতিকটু মনে হলেও তা আমাদের চেতনা ফিরতে অনেকটা সহায়ক হয়েছে বলেই মনে হয়।
মধ্যযুগের একশ্রেণির মুসলমানরা যে বাংলা ভাষা নিয়ে হীনমন্যতায় ভুগতেন তার বাস্তবচিত্র ফুটে উছেছে মধ্যযুগের আরেক খ্যাতিমান কবি সরদার জয়েন উদ্দীনের কাব্যে। তিনি তার ‘কেফায়াতুল মুসাল্লিন’ কাব্যের সূচনায় কৈফিয়ত দিতে গিয়ে লিখেছেন, ‘ আরবীতে সকলে ন বুঝে ভালমন্দ/তে কারণে দেশীভাষে রচিলু প্রবন্ধ/মুসলমানী শাস্ত্রকথা বাঙ্গালা করিলু/বহু পাপ হইলো মোর নিশ্চয় জানিলু/কিন্তু এমন আশা আছে মনান্তরে/ বুঝিয়া মো’মিন দোয়া করিবে আমারে/মো’মিনের আশির্বাদে পূণ্য হইবেক/অবশ্য গফুর আল্লাহ পাপ ক্ষেমিবেক।’
বাংলা ভাষা নিয়ে যে মুসলিম সমাজে কুসংস্কার চালু ছিল তা সরদার জয়েন উদ্দীনের কতিবায় সুষ্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। কিন্তু মধ্য যুগের অবসানের পর আমরা সেই সংকীর্ণ বৃত্ত থেকে পুরোপুরি বেড়িয়ে আসতে পারিনি। যার প্রতিফলন আমরা দেখেছি ১৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। সেদিন শাসকগোষ্ঠীর ভাষা বিদ্বেষের কারণেই সালাম, বরকত, রফিক ও জব্বারের মত যুবাদের প্রাণ দিতে হয়েছে। তারা যদি ভাষাকে সর্বজনীন মনে করতে পারতেন এবং মাতৃভাষার গুরুত্ব ও মর্যাদার কথা বুঝতেন তাহলে হয়তো সেই দুঃখজনক পরিণতি এড়ানো সম্ভব হতো।
আসলে সকল ভাষায় সর্বজনীন হলে মাতৃভাষা তথা মায়ের মুখের ভাষা সবার কাছে প্রিয়। এর মর্যাদা ও গুরুত্ব অপরাপর ভাষার চেয়ে বেশি। কারণ, এই ভাষাতেই ব্যক্তি তার ব্যক্তিত্বের বিকাশ ও প্রতিভার স্ফূরণ ঘটায়। মায়ের মুখের ভাষা ব্যক্তির কাছে যতটা সহজবোধ্য অন্যভাষা ততটা নয়। তাই মাতৃভাষার মাধ্যমেই আমাদেরকে উন্নতি ও অগ্রগতির স্বর্ণসোপানে আরহণ করতে হবে। আমরা ১৯৫২ সালে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষা করেছি। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, আমরা এখনও ভাষা শহীদদের স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তবায়ন ক রতে পারিনি। শহীদদের যথাযথ মর্যাদা দেয়াও সম্ভব হয়নি। রাষ্ট্রের সকল পর্যায়ে বাংলা ভাষার প্রচলন করাও সম্ভব হয়নি। এমনকি চিকিৎসা, প্রকৌশল বিদ্যা, আইনশাস্ত্র ও গবেষণা গ্রন্থগুলো আজও বিদেশী ভাষার তালায় আবদ্ধ। তাই ভাষার মাসে শুধু মুখে মুখে বাংলা ভাষার জয়গান করলে হবে না বরং বাংলা ভাষার মর্যাদাকে উচ্চকিত করার জন্য আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
আসলে মাতৃভাষা মানুষের জন্য শ্রষ্ঠার শ্রেষ্ঠ দান। তাই মাতৃভাষা ভিন্ন অন্য কোন ভাষাতেই ব্যক্তিত্বের বিকাশ ও প্রশান্তি লাভ সম্ভব নয়। তাই কবিয়াল রামনিধি গুপ্তের ভাষায় বলতে হয়, ‘ নানান দেশের নানা ভাষা/ বিনে স্বদেশী ভাষা পুুরে কি আশা/কত নদী সরোবর কি বা ফল চাতকীর/ ধারা জল বিনে মিটে কি তৃষা।’