ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা

৮ মার্চ ২০১৮, ১১:০৩

আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ভাবনা

আজ ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘সময় এখন নারীর ঃ উন্নয়নে তারা, বদলে যাচ্ছে গ্রাম-শহরের কর্ম-জীবনধারা’। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও এই দিবসটি যথাযথ মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। রাজনৈতিক, সামাজিক ও নারী সংগঠনগুলো দিবসটি উপলক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে।  অতীতের এবারও  সুন্দর সুন্দর কথা মালার ফুলঝুড়িতে এবারের প্রতিপাদ্যও নির্ধারিত হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, নারী যথাযথ মর্যাদা আজও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। কারণ, আমরা কথা ও কাজের মধ্যেই সামঞ্জস্য রাখার ব্যাপারে খুবই উদাসীন। তাই আমরা এখনও লক্ষ্যে পৌঁছতে সম্ভব হইনি।
মূলত  নারী অধিকার নিয়ে অনেক মনোরঞ্জিকা, উৎসাহব্যঞ্জক ও চটকদার কথা বলা হলেও আমাদের সমাজে নারীরা এখনও  অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত, অবহেলিত, নির্যাতিত ও অধিকারবঞ্চিত। পারিবারিক ও সামাজিক জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সকল পর্যায়ে নানাভাবে বৈরী পরিস্থিতির মুখোমুখি আমাদের নারী সমাজ। নারীরা শুধু আমাদের দেশেই নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন না বরং বিশ্বব্যাপীই তারা নানাভাবে উপেক্ষা ও নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন। মূলত বিশ্বব্যাপী নারী সমাজকে অবমূল্যায়নের কারণে মানব সভ্যতা যথাযথভাবে বিকশিত হয়নি। তাই সভ্যতার অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে ও আগামীর পৃথিবীকে সর্বাঙ্গসুন্দর এবং সমৃদ্ধ করতে হলে নারী সমাজকে যথাযথ মর্যাদা প্রদানের কোন বিকল্প নেই।
‘বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের রচনায় নারীর এ বীরত্বগাথায় কোনো বাহুল্য নেই বরং তা বাস্তবসম্মত ও নায্য। নারীর ভূমিকা সমাজ-সভ্যতার অগ্রযাত্রার ইতিহাসে পুরুষের  সমান্তরাল। ইতিহাসের এই সরল স্বীকৃতি নারী জাতিকে সভ্যতার উচ্চাসনে স্থান করে দিয়েছে। মানুষ হিসেবে একজন নারী পরিপূর্ণ অধিকারের দাবিতে সুদীর্ঘকাল যে আন্দোলন চালিয়ে আসছে, তারই স্বীকৃতি স্বরূপ পালিত হয় নারী দিবস। কিন্তু অতীব পরিতাপের বিষয় যে, নারীর সমস্যাগুলো যেমন প্রাতিষ্ঠানিক বা রাষ্ট্রীয়ভাবে চিহ্নিত করা হয়নি, ঠিক তেমনি সম্ভাবনাগুলোকেও কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। আর এটিই আমাদের পশ্চাদপদতার অন্যতম কারণেগুলোর একটি।
প্রতি বছর নির্দিষ্ট একটি দিন গোটা বিশ্ব আলাদা করে স্মরণ করে নারীরাই এই সৃষ্টি নিচয়ের শক্তির উৎস আর প্রেরণা। কিন্তু কাঙ্খিত দাবি নারী সমাজ আজও আদায় করতে পারেনি বরং সমাজের সকল ক্ষেত্রেই নারীরা সীমাহীন বৈষম্য ও নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন। কর্মক্ষেত্রে নারীর মজুরি পুরুষের চেয়ে অপেক্ষাকৃত কম। আন্তর্জাতিক ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশনের ২০০৯-এর এক রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমান বিশ্বে পুরুষের চেয়ে নারী ১৬ শতাংশ পারিশ্রমিক কম পায়। অন্য এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, পৃথিবীতে নারীরা কাজ করছে শতকরা ৬৫ ভাগ। বিপরীতে তার আয় মাত্র শতকরা ১০ ভাগ। পৃথিবীতে নারী-পুরুষের সংখ্যানুপাত প্রায় সমান। অথচ দুনিয়ার মোট সম্পদের একশ ভাগের মাত্র এক অংশের মালিক মেয়েরা। মেয়েদের গৃহস্থালি কাজের আর্থিক স্বীকৃতি এখনো দেওয়া হয়নি। এটা নারী জাতির প্রতি অসম্মান বৈ কিছু নয়।
শুধু তাই নয় দক্ষিণ এশিয়া, আফ্রিকা তো বটেই, এমনকি উন্নত বিশ্বের চিত্রটাও অনেকটা একই। কখনো শ্লীলতাহানি, কখনো যৌন নির্যাতন, কখনো মেয়ে হিসেবে জন্মানোর জন্য চূড়ান্ত নিপীড়ন, আবার কখনো ধর্ষণ। বিশ্ব, সমাজ, যুগ যত তাল মিলিয়ে এগোচ্ছে, ততই এগিয়ে চলার চেষ্টা চালাচ্ছে মেয়েরা। কিন্তু মহল বিশেষের হীনমন্যতা,  লোভ-লালসা, আর নেপথ্য শক্তি নারীর অগ্রযাত্রায় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াছে। তাই নারী সমাজের পথচলাকে এখনও কন্টনমুক্ত করা যায়নি। তাই সমস্যা যে তিমিরে ছিল এখন প্রায় সে তিমিরেই রয়ে গেছে। তাই দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নিতে হলে নারীর প্রতি অবিচার ও বৈষম্য বন্ধ করে তাদেরকে যথাযথ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। মূলত জন শক্তির অর্ধাংশকে উপেক্ষিত রেখে কোন জাতিই উন্নতির স্বর্ণশিখরে আরোহন করতে পারে না।
আমাদের সমাজের ‘নারীর সমঅধিকার’ নিয়ে একটি অতি চটকদার স্লোগান প্রচলিত থাকলেও তা সাম্প্রতিক সময়ে ত্রুটিপূর্ণই মনে হচ্ছে। কারণ, অধিকার কখনো সমাজ হয় না। এই বিশ^ চরাচরের প্রতিটি মানুষই পৃথক স্বত্ত্বা এবং প্রত্যেকের অধিকারও আলদা। কেউ কারো সমান্তরাল নয়। তাই নারীর সমঅধিকার নয় বরং নায্য অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। আর এটিই আন্তর্জাতিক নারী দিবসের ভাবনা হওয়া উচিত।