ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা

১৪ মার্চ ২০১৮, ১৩:০৩

রোহিঙ্গা সিনড্রম ও লঙ্কান মুসলমান

 
 সম্প্রতি সার্কভূক্ত রাষ্ট্র শ্রীলঙ্কায় সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর উগ্রপন্থী বৌদ্ধদের আবারও হামলার ঘটনা ঘটেছে। যা দ্বীপ রাষ্ট্রটিকে আবারও অশান্ত করে তুলেছে। এতে ৩  জনের প্রাণহারীর ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে। সেখানে বসবাসরত মুসলিমরা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন এবং তারা এখন রীতিমত নিরাপত্তাহীনতায়। উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার জরুরি অবস্থা বা কার্ফূ ঘোষণা করলেও অপরাধীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের দৃশ্যত কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে মনে হচ্ছে না বরং সরকারি উদ্যোগ প্রকারান্তরে  উগ্রবাদীদেরই অনুকুলেই গেছে। যা শান্তিপ্রিয় মানুষকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে।
প্রাপ্ততথ্য মতে, সংখ্যাগুরু বৌদ্ধ সিনহালা সম্প্রদায় বিভিন্ন মসজিদ এবং মুসলিমদের মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালায়। মুসলমানদের সাথে বিবাদকে কেন্দ্র করে একজন বৌদ্ধ তরুণের মৃত্যুর গুজবে তারা কারফিউ উপেক্ষা করে এসব হামলা চালায়। মসজিদ ও মুসলমানদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের উপর একের পর এক হামলার পর দেশটিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়। গত ৬ মার্চ ক্যান্ডিতে একটি পুড়ে যাওয়া বাড়ির ভেতর থেকে এক মুসলিম তরুণের মৃতদেহ পাওয়ার পর থেকে সেখানে মুসলিমরা প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে উঠতে পারে এবং আবারো সংঘাত শুরু হতে পারে এমন আশংকা করে কর্তৃপক্ষ।
শ্রীলঙ্কা দক্ষিণ এশিয়ার একটি দ্বীপ রাষ্ট্র। রাজধানীর নাম কলম্বো। প্রায় ২ কোটি জনসংখ্যার দেশটি প্রাচীনকাল থেকেই বৌদ্ধ ধর্মাম্বলীদের তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত।  নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সংবলিত সমুদ্রসৈকত, ভূদৃশ্য তদুপরী সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য শ্রীলঙ্কাকে সারা পৃথিবীর পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তুলেছে। সিংহলি সম্প্রদায় শ্রীলঙ্কার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী।  শ্রীলঙ্কার মুসলমানরা মুর নামে পরিচিত। তারা দেশটিতে তৃতীয় বৃহত্তম জাতিগত সম্প্রদায়।
দেশটির মোট জনসংখ্যার দশ শতাংশ মুসলমান। বর্তমানে শ্রীলঙ্কায় ১৫শ’টি মসজিদ, ১০০টি কুরআন শিক্ষাকেন্দ্র এবং ২০০টির মতো মাদরাসা ও স্বতন্ত্র ইসলাম শিক্ষাকেন্দ্র রয়েছে। যেগুলো ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত। শ্রীলঙ্কার মুসলিম জনগোষ্ঠী দেশটির গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। দেশটিতে রয়েছে ঐতিহাসিক ও প্রাচীন অনেক মসজিদ। তন্মধ্যে কুরগালায় দশম শতাব্দীতে নির্মিত মসজিদটি উল্লেখযোগ্য। আর শ্রীলঙ্কার মধ্যাঞ্চল ডাম্বুলার সবচেয়ে বড় মসজিদের বয়স ৬০ বছরের বেশি। যা শ্রীলঙ্কায় মুসলিম মুসলিম ঐতিহ্যের স্মারক পরিচিত।
অতীতের ধারাবাহিকতায় প্রমাণিত হয় যে,  শ্রীলঙ্কার মুসমানরা উড়ে এসে জুড়ে বসা কোন বিচ্ছিন্ন জনগোষ্ঠী নয় বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেখানে তারা শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছে। কিন্তু উগ্রবাদী বৌদ্ধরা কখনোই তাদেরকে শান্তিতে থাকতে দেয় নি । এমনকি এর সাথে যোগ হয়েছিল সন্ত্রাসবাদী তামিলরাও। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শ্রীলঙ্কায় মুসলিম নিগ্রহের ঘটনা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। এখন তারা প্রতিনিয়ত উগ্রবাদীদের প্রতিহিংসা ও আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন। মূলত বাংলাদেশ সহ বিশ্ব জুড়েই এখন প্রচার মাধ্যমে আরাকানের রোহিঙ্গাদের বিড়ম্বিত জীবনের কথা প্রচারিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। রোহিঙ্গাদের করুণ আর্তি এত প্রকট ও গভীর যে, দীর্ঘদিন ধরে ‘মুসলিম বিদ্বেষী’ হিসেবে পরিচিত পশ্চিমের অনেক প্রচার মাধ্যমও রোহিঙ্গাদের বিপন্নতায় সম্পাদকীয় নীতিতে সংশোধন ঘটাতে বাধ্য হয়েছে। রোহিঙ্গাদের মানবিক বিপর্যয় তুলে ধরার পাশাপাশি সেসব প্রচারমাধ্যমে এখন আরাকানের চলমান বর্বরতার পেছনে মায়ানমারের বৌদ্ধ সমাজের একাংশের উদীয়মান ধর্মতাত্ত্বিক উগ্রতার ভূমিকাও খতিয়ে দেখছে।
ঠিক এমনি এক সময়ে শ্রীলঙ্কা থেকেও রোহিঙ্গা ইস্যুকে কেন্দ্র করে মুসলমানবিরোধী উত্তেজনার খবর মিলছে। মাত্র ৩১ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী আছে দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কায়। তার মধ্যে ১৬ জনই শিশু। প্রায় পাঁচ মাস আগে তামিলনাড়ু থেকে অজ্ঞাত উদ্দেশ্যে সাগর পাড়ি দেয়ার সময় শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী এদের উদ্ধার করে। জাতিসংঘের একটা সেফ হাউসে রাখা হয়েছিল তাদের। কিন্তু বৌদ্ধ ধর্মগুরুদের একাংশ এই শরণার্থীদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে অভিহিত করে দেশ থেকে বহিস্কারের দাবি তুলেছেন।
একথা অনস্বীকার্য যে, ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশে বহুকাল ধরেই মুসলমান-হিন্দু উত্তেজনা, রেষারেষি ও দাঙ্গার অনাকাঙ্খিত অতীত রয়েছে। কিন্তু এখন মায়ানমার ও শ্রীলঙ্কার সর্বশেষ পরিস্থিতি এমন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, উপমহাদেশে ধর্মীয় বিদ্বেষের চোরাবালিতে নতুন চরিত্র হিসেবে বৌদ্ধ উগ্রবাদীদেরও অভিষেক ঘটতে চলেছে। অর্থাৎ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিপীড়িত জাতিসত্তাগুলোর আন্তঃসম্পর্ক এবং ‘প্রবল’ জাতিগুলোর সঙ্গে তাদের বিবাদ ধর্মতাত্ত্বিক রূপ দিয়ে এ অঞ্চলে নয়া এক বিপজ্জনক কালের সূচনা ঘটাতে চলেছে। যার ফল হবে আরও বিদ্বেষ, আরও দাঙ্গা, আরও শরণার্থী সংকট। যা পুরো দক্ষিণ এশিয়াকেই অশান্ত করে তুলবে বলেই মনে করা হচ্ছে।
ভারত ও মায়ানমারে যেভাবে মুসলমানরা মূলত একমুখী ধর্মীয় ও সামাজিক চাপের মুখোমুখি শ্রীলঙ্কায় পরিস্থিতি সেদিক থেকে আরও জটিল। কারণ সেখানে গত প্রায় ৫০-৬০ বছর ধরেই মুসলমান সমাজ সিংহলি ও শ্রীলঙ্কান তামিলদের তরফ থেকে দ্বিমুখী ঘৃণা ও প্রতিহিংসার শিকার। শ্রীলঙ্কার মুসলমানরা তামিলভাষী হলেও এবং তামিলপ্রধান দুটি প্রভিন্সের বাসিন্দা হয়েও বরাবরই হিন্দু ধর্মীয় শ্রীলঙ্কান তামিলদের অবিশ^াস ও প্রতিহিংসার শিকার।
মুসলমানদের বসবাস কমবেশি পুরো শ্রীলঙ্কা জুড়ে থাকলেও নর্দান ও ইস্টার্ন প্রভিন্সের মুসলমানরা প্রভাকরণের নেতৃত্বাধীন এলটিটিইর অত্যাচারে অস্থির হয়ে উঠেছিল সবচেয়ে বেশি। ফলে প্রভাকরণের মৃত্যু ছিল সিংহলি শাসক এলিটদের পাশাপাশি নর্দান ও ইস্টার্ন প্রভিন্সের মুসলমানদের জন্যও চরম স্বস্তির। আবার আরাকানে রাজনীতি সচেতন রাখাইনরা বহু দশক ধরে বর্মার সেনাবাহিনীর নিপীড়ন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার সংগ্রাম করে গেলেও এখন দেখা যাচ্ছে, রোহিঙ্গা প্রশ্নে তারা মায়ানমার রাষ্ট্রীয় সশস্ত্রবাদীতাকেই সমর্থন করছে। অথচ আরাকানে যুগের পর যুগ রোহিঙ্গাদের মতোই রাখাইনরাও বর্মাপ্রধান সেনাবাহিনীর নিপীড়নের শিকার। কিন্তু নিপীড়িত রাখাইন ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে মৈত্রী তো দূরে থাক পারস্পরিক সহানুভূতিও নেই।
আরাকানের বর্তমান দৃশ্য তাই শ্রীলঙ্কার হিন্দু তামিল ও মুসলমান তামিলদের বিদ্বেষের সঙ্গে বেশ মিলে যায়। আবার কলম্বোতে ৩১ জন রোহিঙ্গা শরণার্থীর বিরুদ্ধে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বিক্ষোভও মায়ানমারের বৌদ্ধ নেতাদের আচরণের পুনঃমঞ্চায়ন মাত্র মনে হয়। উপরন্তু মায়ানমার ও শ্রীলঙ্কার এইরূপ ঘটনাপ্রবাহের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া শুধুই দুই দেশে আটকে নেই, কারণ তাতে প্রকাশ্যেই মদদ আসছে ভারতের আরএসএস থেকে। শ্রীলঙ্কায় দেখা যাচ্ছে, উগ্রবাদী সিংহলিদের বিভিন্ন সভা-সেমিনারে প্রকাশ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যেসব ঘৃণামূলক বক্তব্য প্রচারিত হচ্ছে তা মূলত ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ও তার ভাবাদর্শিক মিত্র আরএসএস-এর দৃষ্টিভঙ্গী দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। সিংহলি দক্ষিণপন্থী সংগঠনগুলো, যেমন বিবিএস বলছে, শ্রীলঙ্কার জন্য মুসলমানরা এখন নতুন ‘হুমকি’, ‘তাদের জন্ম হার বেশি’, ‘তারা বৌদ্ধদের ধর্মান্তরিত করছে’ এবং তাদের মধ্যে ‘বহু বিয়ের প্রচলন’ রয়েছে।
এক্ষেত্রে তারা প্রচারণার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করছে দেশটির সর্বশেষ ২০১২ সালের শুমারি তথ্যকে। যেখানে দেখা যাচ্ছে, ১৯৮১ থেকে ২০১২ সালে মুসলমান জনসংখ্যা বেড়েছে ১১ লাখ ২১ হাজার থেকে ১৯ লাখ ৬৭ হাজারে। এসব তথ্যের মাধ্যমে সিংহলি এবং তামিল উভয় সমাজের একদল চিন্তাবিদ মুসলমানদের নিয়ে ভীতি ছড়াচ্ছেন। সিংহলি বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীদের এইরূপ অভিযোগ ভারতে বিজেপি’র মুসলমানবিরোধী বক্তব্যের প্রায় অনুরূপ এবং এক্ষেত্রে তারা বক্তব্যের ন্যায্যতা প্রমাণের জন্য ভারতীয় গবেষণা সূত্রেরও উল্লেখ করছে। প্রায় একইরূপ বর্ণবাদী প্রচারণা আমরা দেখবো বর্মায় রোহিঙ্গা জনসংখ্যা বৃদ্ধি সম্পর্কে।
শ্রীলঙ্কা দেশ হিসেবে ছোট হলেও জাতিগত বৈচিত্র্য সেখানে বিপুল। দেশটির জাতিগত বৈচিত্রের অন্যতম অংশীদার মুসলমানরা এবং ইসলাম সেখানে তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ ধর্ম। কিন্তু তামিলদের সঙ্গে সিংহলি প্রভাবিত সরকারের দশকের পর দশক ধরে চলা সংঘাতের অন্যতম শিকারও দেশটির মুসলমান সমাজ। তাদের ক্ষেত্রে বিপর্যয় অধিকতর নির্মম এ কারণে যে, তামিলদের পাশে ভারতের শক্তিশালী উপস্থিতি এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ধারাবাহিক সংহতি থাকলেও তামিলভাষী মুসলমানদের বিপন্নতায় সকলেই উদাসীন।
শ্রীলঙ্কার মুসলমানদের দাবি, দেশটিতে তারা জনসংখ্যার প্রায় ৯ শতাংশ, ১৯ লাখের মতো। দ্বীপ রাষ্ট্রটির এই মুসলমানরা মূলত শত শত বছর আগে আসা আরব বণিকদের বংশধর। যেমনটি দাবি করে আরাকানের রোহিঙ্গারাও। আরব নৃতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের কারণেই ঔপনিবেশিক শক্তির দলিল দস্তাবেজে শ্রীলঙ্কার মুসলমানদের পরিচয় লেখা ‘মুর’ হিসেবে। ষোড়শ শতাব্দিতে আসা পর্তুগিজরা শ্রীলঙ্কার মুসলমানদের ‘মুর’ পরিচয়ের স্রষ্টা। আর শেকসপিয়ারের মুর ‘ওথেলো’র মতোই ট্রাজেডির শিকার শ্রীলঙ্কান মুররাও।
শ্রীলঙ্কার মুসলমান সমাজ পেশাগতভাবে ব্যবসায় বেশি সক্রিয় বিধায় তামিলরা মুসলমানদের অধস্তনতা নিশ্চিত করতে তাদের বাণিজ্যিক কাজ বাধাগ্রস্ত করারও কৌশল নেয়। এইরূপ প্রক্রিয়া যখন যথেষ্ট সফলতা আনেনি তখন মুসলমানদের সশস্ত্র উপায়ে নির্মূলের চেষ্টা করে এলটিটিই। আবার সিংহলি এলাকাগুলোতেও মুসলমান তামিলরা একইরূপ আচরণ পেয়েছে এবং পায় এখনও। সেখানে তাদের অপরাধ তারা ‘তামিল’।
এক সময় শ্রীলঙ্কার উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে মুসলমানরা হিন্দু তামিলদের ফেডারেল পার্টিকে সমর্থন দিয়েছিল। সেই স্মৃতির কারণে সিংহলিদের কাছে তারা তামিল জাতীয়তাবাদেরই বি-টিম হিসেবেই চিহ্নিত। অন্যদিকে, সিংহলিরা নানা নীতিগত সিদ্ধান্তের  মধ্যদিয়ে তামিল বনাম মুসলমান দূরত্ব তৈরি করাকে একটি কৌশল হিসেবে নিয়েছিল।
সিংহলি-বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের অন্যতম কেন্দ্রিয় তাত্ত্বিক অঙ্গরিকা ধর্মপালা একদা দেশটির মুসলমানদের ‘বিদেশী মানুষ’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। ঠিক যেভাবে বর্মায় রাষ্ট্র ও বৌদ্ধ ভিক্ষুরা এক সুরে এখন রোহিঙ্গাদের ‘বিদেশী’ বলছে। একই সুর শুনবো আমরা আসামেও। সেখানে লাখ লাখ মুসলমান বাংলা ভাষীকে ‘বিদেশী’ আখ্যা দিয়ে বহিস্কারের দাবি রয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি কার্যত এক নতুন ও বিপজ্জনক দক্ষিণ এশিয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে থাকা নিপীড়িত জাতিসত্তাগুলোর ঐতিহাসিক বেদনা ও অসমাপ্ত মুক্তি আন্দোলন এই পরিস্থিতির উত্তরাধিকার সূত্র হলেও তাতে প্রলেপ পড়ছে ধর্মীয় পরিচয়ের। ফল হিসেবে দেখা যাবে, আফগানিস্তানে ‘প্রবল’ পশতুনদের দ্বারা নিপীড়িত ‘ক্ষুদ্র’ হাজারারা প্রচারমাধ্যমে ‘শিয়া’ হয়ে পড়ে। আবার একই পশতুনরা ‘সুন্নী’ হয়েও পাকিস্তানে আরেক সুন্নী পাঞ্জাবীদের কাছে বঞ্চনার শিকার হচ্ছে দশকের পর দশক। এই দুই সুন্নীরা আবার অপর সুন্নী বাঙ্গালিদের ধরে রাখতে পারেনি ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানে।
একইরূপ স্ববিরোধিতা আমরা দেখবো ভারতীয় কাঠামোতেও। ভারত শ্রীলঙ্কার হিন্দু তামিল এবং তিব্বতের বৌদ্ধদের জাতীয়তাবাদী সংগ্রামের ঐতিহাসিক মিত্র হলেও নিজ দেশে কাশ্মীরী মুসলমান ও পাঞ্জাবের শিখদের স্বাধীকারের ঘোরতর বৈরী। আবার পাকিস্তান কাশ্মীরীদের আন্দোলনের উচ্চকিত সমর্থক হলেও বালুচদের স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে তদ্রুপ বিরোধী।
বলাবাহুল্য, ভারত-চীনের এই ভূমিকা দক্ষিণ এশিয়ায় মোটেই শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে না। উপমহাদেশের সকল নিপীড়িত জাতিসত্তার ঐতিহাসিক বেদনা ও ক্ষোভের সুযোগ নিতে চাইবে বিশ্বের অন্যান্য ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো যারা এই অঞ্চলে তাদের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে মরিয়া এখন। এর ফল একটাই দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে আরও অস্থিরতা, আরও রক্তপাত, আরও শরণার্থী। বর্মার রোহিঙ্গা-সিনড্রম ছড়িয়ে পড়ছে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে। আমরা সকলে যেন তার ফলাফলের জন্য প্রস্তুত থাকি।
মূলত পশ্চিমাদের কাছে শান্তিপূর্ণ মতবাদ হিসেবে বৌদ্ধবাদকে তুলে ধরা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে দেখা যাচ্ছে উগ্র বৌদ্ধদের সহিংসতা। কিছু বৌদ্ধ ভিক্ষুর নেতৃত্বে এই গ্রুপগুলো ছোট হলেও দ্রুতই বাড়ছে তাদের প্রভাব।  সম্প্রতি শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধদের মুসলিমবিরোধী সহিংসতায় নিহত হয়েছেন অন্তত তিনজন। ধ্বংস করা হয়েছে মুসলিমদের মালিকানাধীন দুই শতাধিক বাড়ি ও প্রতিষ্ঠান। ভাঙচুর করা হয়েছে অনেক মসজিদে, যা সম্প্রতিক সময়ের বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীদের সর্বশেষ সহিংসতার নজির।
মিয়ানমারে কুখ্যাত ভিক্ষু উইরাথুর নেতৃত্বে দেশটির সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর সহিংসতা হয়েছে, এরই ধারাবাহিকতায় ওই অঞ্চলে সেনা অভিযানে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে সাত লাখ রোহিঙ্গাকে। নিহত হয়েছে কয়েক হাজার। প্রায় একই সময়ে থাইল্যান্ডে এক শীর্ষস্থানীয় ভিক্ষু তার অনুসারীদের আহ্বান জানিয়েছে মসজিদগুলো পুড়িয়ে দিতে। ধর্মীয় নেতাদের এমন উসকানির পর সহিংসতা হওয়াটিই কি স্বাভাবিক নয় ?
যুক্তরাষ্ট্রের ইয়াংসটাউন স্টেট ইউনিভার্সিটির ধর্মবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাইকেল জেরিসন জানান, বৌদ্ধরা অনেকে তাদের সহিংসতার জন্য ধর্মকে কাজে লাগায়। বৌদ্ধ মতবাদ ও সহিংসতাবিষয়ক একটি বইয়ের এই লেখক বলেন, ‘শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড- সর্বত্রই একই চিত্র। মূলত এতে বৌদ্ধবাদই হুমকির মুখে আছে।’ এই গবেষক বলেন, ‘প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব ইতিহাস, কারণ ও উসকানিদাতা রয়েছে। তবে এই উসকানিদাতারা পরস্পরের সাথে সংযুক্ত।’
শত বছরের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরও বৌদ্ধ উগ্রবাদীরা ইসলামকে আক্রমণাত্মক হিসেবে দাবি করে। তারা মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় বৌদ্ধ সাম্রাজ্যের পতনের জন্যও মুসলিমদের দায়ী করে। তারা এমনও দাবি করেছে যে, আধুনিক বৌদ্ধ রাষ্ট্রগুলোতে মিলিশিয়া কার্যক্রম ও উচ্চ জন্মহারের কারণে মুসলিমরা এই রাষ্ট্রগুলোর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বস্তুনিষ্ঠতা ও সত্যের মানদন্ডে যা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।
মিয়ানমারের ভিক্ষু উইরাথু ব্যক্তিগতভাবে ও ফেসবুকে ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণা চালাতেন ব্যাপকভাবে। গত জানুয়ারিতে তার ফেসবুক পেজটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। মিয়ানমারের জনসংখ্যার চার শতাংশেরও কম মুসলিম। উইরাথু তার ভক্তদের বলতেন, হাজার বছর ধরেই মুসলিমরা বৌদ্ধ মতবাদকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। তার মা বা থা গ্রুপ কঠোরভাবে আন্তঃধমীর্য় বিয়ে ও ধর্মান্তরিত হওয়ার বিরুদ্ধে কাজ করত। শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধদের মিলিশিয়া তৎপরতা মূলধারায় চলে এসেছে, তারা অনেকবারই দাঙ্গা পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে এবং সরকারবিরোধী বিক্ষোভ করেছে। ২৬ বছরের নৃশংস গৃহযুদ্ধের সময় দ্বীপদেশটির উগ্র জাতীয়তাবাদীদের হিংসাত্মক প্রচারণা ও কর্মকান্ডের লক্ষ্য ছিল দেশটির তামিল হিন্দুরা। কিন্তু ২০০৯ সালে তামিল টাইগারদের পরাজয়ের পর এই সহিংসতাবাদীরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে লেগেছে। দেশটিতে মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ মুসলিম।
এসব কর্মকান্ডের নেতাদের একজন ভিক্ষু গালাগোদাত্তে গানাসারা কুরআন অবমাননা ও হিংসাত্মক বক্তৃতার অভিযোগের মামলায় বর্তামনে জামিনে আছে। কিছু দিন আগে সরকারকে উদ্দেশ করে তিনি বলেছিলেন, ‘এই দেশে কুরআন নিষিদ্ধ করা উচিত। যদি আপনারা না করেন, আমরা এটি নিষিদ্ধ করার জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারণা চালাব।’
বিবিএস বা বৌদ্ধবাহিনী নামে তার সংস্থাটির আমন্ত্রণে ২০১৪ সালে শ্রীলঙ্কায় এসেছিল মিয়ানমারের কুখ্যাত ভিক্ষু ও মুসলিমবিদ্বেষী দাঙ্গার মূল হোতা উইরাথু। এশিয়ার দেশগুলোতে অপেক্ষাকৃত কম মুসলিমবিরোধী সহিংসতা হয়েছে থাইল্যান্ডে। দেশটির কলামিস্ট সানিতসুদা একচাই মনে করেন, বছরের পর বছরের দুর্নীতির কারণে থাইল্যান্ডের সাধারণ মানুষের ওপর ভিক্ষুদের প্রভাব অনেক কমে গেছে। তিনি বলেন, ‘মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কার তুলনায় এখানকার ভিক্ষুদের সাথে সরকার ও সাধারণ মানুষের সম্পর্ক অনেক কম।’ তবে তারপরও দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে মালয় মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় বেশ উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। গত দশকে এই অঞ্চলে এক নৃশংস বিদ্রোহে সাড়ে ছয় হাজারের বেশি বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে। এই নিহতদের বেশির ভাগই মুসলিম।
মূলত মায়ানমারের রোহিঙ্গা সিনড্রমের পালে হাওয়া লেগেছে দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কাসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়ায়। বৌদ্ধ ও হিন্দু উগ্রবাদীরা প্রতিনিয়ত মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে এবং ক্রমেই দক্ষিণ এশিয়াকে অশান্ত করে তুলেছে। ফলে এই অঞ্চলের মুসলিম জনগোষ্ঠী এখন মারাত্মক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। যার জ¦লন্ত প্রমাণ হলো গত ৬ মার্চে শ্রীলঙ্কায় মুসলমানদের ওপর পরিকল্পিত হামলা। ফলে দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার মুসলমানরা মারাত্মক নিরাপত্তাহীনতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। তারা এখন নিজ দেশেই পরবাসী!