ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

এনএনবিডি ডেস্ক

১৬ মার্চ ২০১৮, ১৭:০৩

ট্রেনচালকের চ্যালেঞ্জিং পেশায় ১৫ নারী

1998_14.jpg
“ছাত্র জীবনে প্রতিদিন বাড়ি থেকে ট্রেনে করে কলেজে যেতাম। একদিন তড়িঘড়ি করে ট্রেন ধরতে গিয়ে টিকেট কাটতে পারিনি। কিন্তু ওই দিনই টিটির মুখোমুখি হতে হয়। শেষটায় জরিমানার হাত থেকে রেহাই পেতে বলি আমি রেল স্টাফের মেয়ে (বাবা রেলকর্মচারী)। কিন্তু টিটি আমার কথার গুরুত্ব না দিয়ে বলেন, ‘তোমার কপালে কি সিল মারা আছে, তুমি স্টাফের মেয়ে।’ টিটির কথায় খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। এরপর মনঃস্থির করি ট্রেনের চালক হব। কারণ আমার আগে ২০০৪ সালে বাংলাদেশ রেলওয়েতে প্রথমবারের মত নারীচালক হিসেবে নিয়োগ পান সালমা খাতুন। তিনি যখন পেরেছেন, আমিও পারবো।
কথাগুলো বলছিলেন বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলে (পার্বতীপুর লোকশেডে) কর্মরত নারী ট্রেনচালক ফরিদা আক্তার। ২০১২ সালে রেলে নিয়োগ দেওয়া হয় ৫৩ জন সহকারী চালককে। তার মধ্যে একমাত্র নারী সদস্য তিনি। বগুড়ার মেয়ে ফরিদা আক্তার দু’কন্যা সন্তানের জননী। স্বামী মত্স্য বিভাগের কর্মকর্তা। ট্রেন চালাতে কেমন লাগে এমন প্রশ্নের জবাবে ফরিদা বলেন, ‘যখন চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি, তখন এটাকে ভাল লাগতেই হবে। প্রথম দিকে কিছুটা খারাপ লাগতো, কারণ অনেকে অনেক কথা বলতো। এখন আর বলে না, কারণ আমরা যারা কাজ করছি তারা সবাই চ্যালেঞ্জ নিয়েই ট্রেন চালকের আসনে বসেছি। যাত্রী নিয়ে এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশন, দারুণ উপভোগ করি।’
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ রেলওয়েতে চালক ও সহকারী চালকের সংখ্যা প্রায় ১৪শ’। এদের মধ্যে মাত্র ১৫ জন নারী ট্রেন চালক। ইতোমধ্যে তারা মেধা দিয়ে যোগ্যতা ও দক্ষতার প্রমাণ পেয়েছেন। এদের মধ্যে ১০ জন রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল ও ৫ জন পশ্চিমাঞ্চলে দায়িত্ব পালন করছেন।
বাংলাদেশ ট্রেন চালক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী বলেন, রেলের দীর্ঘ ইতিহাসে নারী ট্রেন চালকের পথ চলা খুব বেশি দিনের নেয়। ১৯৮৯ সালে এশিয়ার প্রথম নারী ট্রেন চালক হিসেবে যোগদান করেছিলেন ভারতীয় মুমতাজ। এর ২৫ বছর পর বাংলাদেশ রেলওয়েতে প্রথম যুক্ত হন নারী ট্রেন চালক সালমা খাতুন। তার দেখাদেখি অন্যরাও এসেছেন। তিনি বলেন, প্রথম দিকে একটু ভয় ছিল, তবে তাঁরা (নারী ট্রেনচালক) যোগ্যতার প্রমাণ রেখেছেন।
নারী ট্রেন চালকদের অগ্রদূত সালমা খাতুন টাঙ্গাইলের মেয়ে। ২০০৪ সালের ৮ মার্চ রেলওয়েতে যোগদান করেন। ট্রেন চালকের আসনে পার করেছেন ১৩ বছর। কেমন লাগছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ভাল না লাগলে কি এত সময় অতিক্রম করতে পারতাম। সফলতা বা ব্যর্থতার কথা আপনারাই বলতে পারবেন। তবে আমি আমার পেশার প্রতি অবিচল আস্থা রেখেই এগিয়ে যাচ্ছি।’ সালমা আরো বলেন, ‘আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী নারী, স্পিকার নারী। সব জায়গায় নারীদের অগ্রগতি বাড়ছে। কে কি বললো সেদিকে কান না দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে, তাহলে আমাদের দেশের নারীরা অনেক ভাল কিছু করতে পারবে।’
পার্বতীপুরের সহকারী লোকো মাস্টার (চালক) বেবি ইয়াসমিন বললেন, ‘কাজের ক্ষেত্রে পুরুষ যা পারে নারীরাও তাই পারে। দাদু ও বাবা দু’জনেই চাকরি করতেন রেলওয়েতে। সে সুবাদে এখানে আসা। আর ট্রেন চালক হিসেবে যোগদান করতে পেরে আমি গর্বিত।’ নরসিংদীর মেয়ে সালমা বেগম উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে যোগ দেন এএলএম হিসেবে। সম্প্রতি তিনি পদোন্নতি পেয়েছেন। অনুভূতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘প্রথম দিকে ভয় ছিল। এখন আর কোন ভয় স্পর্শ করে না।’
চাঁদপুরের মেয়ে কুলসুম আক্তার। মা-বাবার উত্সাহ ও প্রেরণায় এ পেশায় এসেছেন তিনি। কেন এই পেশা বেছে নিলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘চ্যালেঞ্জিং পেশায় কাজ করার আগ্রহ ছোটবেলা থেকেই। প্রিয় খেলনা ছিল ট্রেন, সেই থেকেই ট্রেনের প্রতি ভালোবাসা। স্বামী গোলাম মোস্তফাও ট্রেন চালক। চট্টগ্রাম বিভাগে ট্রেন চালাই আমরা।’
নড়াইলের লোহাগড়ার মেয়ে কৃষ্ণা সরকার। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে অনার্সসহ মাস্টার্স করে এ পেশায় এলেন কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ট্রেন চালকরা যদি শিক্ষিত হন তাহলে এ পেশার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা আরও বাড়বে।’
চাঁদপুরের মেয়ে কুলসুম আক্তার ইডেন কলেজ থেকে গণিত বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে ডিগ্রি নিয়ে ২০১১ সালে যোগ দেন সহকারী লোকোমাস্টার পদে। তিনি বলেন, ‘মেয়ে হয়ে এ পেশায় এসেছি। এ নিয়ে গর্ববোধ করি। তবে সবাই যখন বলে এটি আসলে পুরুষের কাজ, তখন হতাশ হই।’ ট্রেন চালক হিসেবে কাজ করতে এসে পরিবারের সহযোগিতা কতটুকু পেয়েছেন জানতে চাইলে লালমনিরহাট এলাকার মুনিফা আক্তার বলেন, ‘পরিবার থেকে খুব উত্সাহ পেয়েছি।’
কুমিল্লার মেয়ে রেহানা আবেদিনের নানা ছিলেন রেলের লোকোমাস্টার। বাবাও রেলের কর্মকর্তা। তাই উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে নিজেও চলে আসেন এ পেশায়। মাঝেমধ্যেই ট্রেনে সহকারী চালক হিসেবে থাকেন। তিনি বলেন, ‘ট্রেনের চালক হিসাবে আমাদের নিয়ে মানুষের অনেক আগ্রহ।’ দিনাজপুরের পার্বতীপুরের মেয়ে নাছরিন আক্তার ডিগ্রি পাস করে রেলে যোগ দেন। এখন ডেমু ট্রেনের সহকারী চালক হিসাবে কাজ করছেন। তিনি বলেন, ‘এ কাজ দারুণ উপভোগ করি।’
নাছরিন আক্তারের সঙ্গে একই সঙ্গে চাকরিতে যোগদান করেন চট্টগ্রামের মেয়ে উম্মে সালমা সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলায় ট্রেন অনেক বড় মনে হতো। এখন যখন ট্রেনের সহকারী চালক হিসেবে থাকি, তখন আর এত বড় মনে হয় না।’ একই ব্যাচে যোগ দেওয়া লালমনিরহাটের মেয়ে আফরোজা বলেন, ‘অনেকে চালকের স্থানে একজন নারীকে দেখে বিস্মিত হন। এই বিস্ময় উপভোগ করি। অনেক স্কুল-কলেজের ছাত্রীরা জানতে চায় কাজটা কেমন? আমি তাদের উত্সাহ দেই।’ আফরোজার স্বামীও ট্রেন চালক। আরেক সহকারী ট্রেন চালক খুরশিদা আক্তার জানান, ‘কাজটি বেশ কঠিন। তবে করতে করতে এখন সহজ হয়ে গেছে।’