ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG

২৩ মার্চ ২০১৮, ১৭:০৩

 রূপসী নগরী ঢাকার ঐহিত্য রক্ষা করতে হবে

তিলোত্তমা নগরী ঢাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য খুবই পুরনো। এটি দেশের অন্যতম প্রাচীন শহর এবং বর্তমানে বাংলাদেশের রাজধানী। বিভিন্ন ইতিহাস গ্রন্থ থেকে জানা যায়, খ্রীষ্টিয় ৭ম শতক থেকে ঢাকায় লোক বসবাস শুরু করে। ফলে তখন থেকেই নগরায়নের গোড়া পত্তন শুরু হয় এবং তা ফুলে-ফলে সুশোভিত হয়ে বর্তমান পর্যায় পর্যন্ত এসেছে। জানা যায়, নবম শতকে সেন শাসন শুরু হওয়ার আগে ঢাকা বৌদ্ধ রাজ্য কামরূপ-এর অধীনে ছিল।  সেন পরবর্তী যুগে ঢাকা তুর্কি ও আফগান শাসনাধীন হয়। এসময় ঢাকা দিল্লী সালতানাত নির্ধারিত শাসকদের দ্বারা শাসিত হয়। এ সময় ঢাকার উল্লেখ্যযোগ্য উন্নয়ন সাধিত হয়।
১৬০৮ সালে ঢাকায় প্রথম মুঘলদের পা পড়ে। ১৬১০ সালে সুবেদার ইসলাম খান  ঢাকার নামকরণ করেন জাহাঙ্গীর নগর। সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মোগল সাম্রাজ্যে দুর্বলতা দেখা দেয়ায় আঠারো শতকের শুরুতেই দেওয়ান মুর্শিদকুলী খান ঢাকা থেকে রাজধানী সরিয়ে নেন মুর্শিদাবাদে। সে সময় ঢাকা নগরী কিছুটা হলেও গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। ১৭৫৭ সালে পশাশী ট্রাজেডি ও বাংলার স্বাধীনতা অস্তমিত হওয়ার পর ঢাকা প্রায় ১৯০ বছর ব্রিটিশ শাসনাধীন ছিল। পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে ঢাকা পূর্ব বঙ্গের রাজধানি হিসেবে পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত হয়। ১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চ ঢাকাকে পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী হিসেবে মর্যাদা দেয়া হয়। ১৯৭২ সালের সংবিধান অনুযায়ি ঢাকাকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাজধানী হিসেবে ঘোষনা করা হয়। সে থেকেই ঢাকা নগরীর অভিযাত্রা নতুন করে শুরু হয় এবং কালের বিবর্তনে ও সময়ের প্রয়োজনে ঢাকা নগরী তিলোত্তমা তথা রূপসী নগরীর মর্যাদা লাভ করে।
ইতিহাসের গতিধারায় ঢাকাকে রূপসী নগরী আখ্যা দেয়া হলেও এ নগরীর দুর্বলতাগুলোও বেশ চোখে পড়ার মত। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে সবকিছুতেই আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও আমাদের নগরব্যবস্থা সেই সনাতনী ভাবধারা থেকে বেড়িয়ে আসতে পারেনি। ঢাকা নগরীতে জনসংখ্যার চাপ পৌণপৌণিকভাবে বৃদ্ধি পেলেও এই বর্ধিত জনসংখ্যার জন্য মানসম্পন্ন আবাসনের ব্যবস্থা করা যায়নি। নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থাও একেবারে সেকেলে। পয়নিষ্কাষণ ব্যবস্থাও প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল। রাস্তা-ঘাট এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাপনায়ও অনিয়মের বিষয়টি সহজেই দৃশ্যমান। ঢাকা নগরীর সমচেয়ে বড় সমস্যা হলো অপরিকল্পিত নগরায়নের। ফলে নগরীর বর্জব্যবস্থায়ও গতিশীলতা আসেনি। ঢাকা নগরীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত কল-কারখানার বর্জ ও বিষাক্ত ধোঁয়াও নগরবাসীর জন্য গোদের ওপর বিষ ফোঁড়া।  তাই ঢাকা নগরীকে তিলোত্তমা নগরী বলা হলেও সরকার ও নগর প্রশাসনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের অভাবেই ঢাকা নগরী এখন বায়ুদুষণের নগরীতে পরিণত হয়েছে। যা সাম্প্রতিক পরিচালিত জরিপে সুূষ্পষ্ট হয়ে ওঠেছে।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক জরিপের ফলাফলে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরীর তালিকায় এবারও ঢাকা দ্বিতীয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। যা ঢাকা নগরীর বিশেষণের সাথে মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আর এ তালিকার প্রথম অবস্থানে রয়েছে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু। ইউএস এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সের (একিউআই) জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে। সূচকে এর আগেও ঢাকার অবস্থান ছিল দ্বিতীয়তে। এবার ঢাকার বাতাসকে বলা হয়েছে ‘ভেরি আনহেলদি’ বা অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর।  গত ২১ মার্চ প্রকাশিত এই সূচকে ঢাকার স্কোর ২৩৮। স্মার্টফোনের একটি এপ্লিকেশন এয়ার ভিসুয়াল দিয়ে বাতাসের ডাটা সংগ্রহ করে এই সূচক করা হয়। এ হিসাবে সবচেয়ে দূষিত থেকে পর্যায়ক্রমে ১০টি শহর হলো নেপালের কাঠমান্ডু, বাংলাদেশের ঢাকা, পাকিস্তানের লাহোর, চীনের শেনিয়াং, বেইজিং, ভারতের কলকাতা, থাইল্যান্ডের চিয়াংমাই, চীনের চেংদু, ভারতের দিল্লি ও চীনের সাংহাই।
এদিকে চলতি বছরের ১৮ মার্চ প্রকাশিত ইউএস এনভায়রনমেন্ট প্রটেকশন এজেন্সির জরিপেও দূষিত শহরের তালিকায় ঢাকা শীর্ষে রয়েছে। ওই তালিকায় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা হলো বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরীর মধ্যে চতুর্থ। সূচক মূল্যায়ন যার ১৯৫। ওই জরিপেও সবচেয়ে বেশি দূষিত নগরী হিসেবে নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুকে দেখানো হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত জরিপের ফলাফলে যা ওঠে এসেছে তা সত্যিই উদ্বেগজনক।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ঢাকা নগরীর ইতিহাস-ঐতিহ্য খুবই প্রাচীন। বিভিন্ন সময়ে এই ঐহিত্যবাহী নগরী ইতিহাসের উচ্চাসনে স্থান করে নিয়েছে। এক সময় ঢাকার মসলিম শিল্প ছিল জগৎ বিখ্যাত। ঢাকার অনেক ঐতিহাসিক ও প্রাচীন স্থাপনা বাংলার ইতিহাস ঐতিহ্যের স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এমনকি সময়ের বিবর্তনে ও কালের প্রয়োজনে ঢাকা নগরী এখন আমাদের দেশের রাজধানী। আমরা অনেক ত্যাগ ও কোরবানীর বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করলেও আমরা ঢাকা নগরীকে এখনও দুষণমুক্ত ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে পারিনি। এটা আমাদের জাতীয় ব্যর্থতায় বলতে হবে। তাই ঢাকা নগরীকে দুষণমুক্ত করে নগরীর ঐতিহ্য রক্ষায় দলমত নির্বিশেষ সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।