ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

৭ এপ্রিল ২০১৮, ১২:০৪

 পরমত সহিষ্ণুতা ও আইনের শাসন

আধুনিক বিশ^ গণতন্ত্রায়নের বিশ^। বিশে^র প্রায় সকল দেশেই গণতান্ত্রিক পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা চালু আছে। বস্তুত, গণতান্ত্রিক চর্চা ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রায় প্রতিটি জাতি-রাষ্ট্রই উন্নয়ন, অগ্রগতি, প্রগতি ও সার্বিক শান্তির পথ খুঁজছে এবং এর সুফল পাচ্ছে সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু তৃতীয় বিশে^র রাষ্ট্রগুলোতে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এখনও পুরোপুরি বিকশিত হতে পারে নি। যদিও এই ঘরানার প্রায় সকল রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থা প্রচলিত আছে। কারণ, এসব দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো খুবই দুর্বল ও ভঙ্গুর। কারণ, বিশে^র উন্নয়নশীল ও উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে যে মানের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ চর্চা করা হয় তৃতীয় বিশে^র রাষ্ট্রগুলোতে এর অনেকটাই ব্যতিক্রম।
মূলত এসব রাষ্ট্রে সুস্থ্যধারা ও উদারনৈতিক গণতন্ত্র চর্চার অভাবটা বেশ প্রকট। কারণ, এসব দেশের রাজনীতি আবর্তিত হয় ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে। শাসকগোষ্ঠীর যেকোন ভাবে ক্ষমতা লাভ এবং তা যেকোন পন্থায় চিরস্থায়ী বা দীর্ঘায়িত করণের একটা অশুভ প্রতিযোগিতা হয়ে ওঠে রাজনীতি সংশ্লিষ্টদের ধ্যান ও জ্ঞান। তাই এসব শাসকগোষ্ঠী ও রাজনীতিকদের দেশ ও জনগণের কল্যাণের কথা খুব একটা ভাবার সুযোগ থাকে না।  খুব সঙ্গত কারণেই দেশের গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও আইনের শাসন যেমন উপেক্ষিত হয়, ঠিক তেমনিভাবে শাসনকাজে জনগণের সম্পৃক্ততাও থাকে না। আর যেসব রাষ্ট্রে শসনকাজে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে পারে না সেসব রাষ্ট্র কোন অবস্থাতেই উন্নতির চরম শিখরে আরোহন করতে পারে না।
আমরা যদি ফরাসী বিপ্লবের দিকে তাকাই তাহলে দেখা যায় এক কষ্টার্জিত বিপ্লবের পর দেশ ও জাতির দ্রুত উন্নয়ন-অগ্রগতির জন্য তারা রাষ্ট্রের শাসনকাজে দেশের মানুষকে সম্পৃক্ত করতে সক্ষম হয়েছিল। ফলে ফরাসী জাতি জাতীয় বিপ্লব পরবর্তী সময়ে অতিদ্রুত দেশ ও জাতিকে একটি মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিল। বিশ^ পরবর্তী জাতীয় সমস্যাগুলোও কেটে গিয়েছিল অতিদ্রুত।  কারণ, শাসনকাজে জনগণকে সম্পৃক্ত করার কারণেই তারা দেশ ও জাতি সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছিল এবং তারা নিজেরাই তাদের করণীয় নির্ধারণ করেছিল। এর কাঙ্খিত সুফলও পেয়েছিল তারা। কিন্তু আমাদের দেশ এর পুরিপুরি ব্যতিক্রম।
মূলত আমাদের দেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে একটি শিশু রাষ্ট্রের পূনর্গঠনে জাতিকে যেভাবে ঐক্যবদ্ধ করা দরকার ছিল সে ক্ষেত্রে আমরা অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছি বরং হীন রাজনৈতিক স্বার্থেই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার পরিবর্তে করেছি বহুধা বিভক্ত। আর এ জন্য আমাদেরকে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে, এখনও হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এ থেকে পরিত্রাণ লাভের আপাত কোন সম্ভবনা দেখা যাচ্ছে না। মূলত রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জনগণকে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হয়নি। যে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা মুক্তিসংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম স্বাধীনতা দীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হওয়ার পরও সে সুফলগুলো আমরা পুরোপুরি ঘরে তুলতে পারিনি। ফলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা আমাদের পক্ষে এখনও সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তাই আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্য আরও অধরায় রয়ে গেছে।
গণতন্ত্রের অন্যতম মূলমন্ত্র হচ্ছে বাকস্বাধীনতা ও পরমতসহিষ্ণুতা। আমাদের দেশের রাষ্ট্রীয় সংবিধানের প্রধান চারটি স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম স্তম্ভ গণতন্ত্র হলেও দেশের গণতন্ত্র চর্চা এখনও কাঙ্খিত মানে পৌঁছেনি। অবাধ বাকস্বাধীনতা তথা মত প্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে স্বাধীন গণমাধ্যমে অন্যতম অনুসঙ্গ। কিন্তু আমাদের দেশের গণমাধ্যমগুলো পুরিপুরি স্বাধীনতা ভোগ করতে পারছে না বরং প্রভাবশালী মহলের অনৈতিক প্রভাবের কারণেই গণমাধ্যমের হাতপা এখন শৃঙ্খলাবদ্ধ। ফলে আমাদের দেশে গণমাধ্যম বন্ধের ঘটনা ঘটেছে এবং এখন ঘটছে। এমনকি গণমাধ্যম কর্মীরা নানাভাবে নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন। তারা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ ও ক্ষেত্রবিশেষে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদগুলোও প্রকাশ করতে পারছে না। ফলে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিকমূল্যবোধ ও আইনের শাসন যেমন বিকশিত হচ্ছে না ঠিক তেমনিভাবে আইনের শাসনও থাকছে উপেক্ষিত।
মূলত গণতন্ত্র, পরমতসহিষ্ণুতা ও আইনের শাসন একে অপরের পরিপূরক। কিন্তু আমাদের দেশের উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক চর্চা না থাকার কারণেই আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার এসব গুরুত্বপূর্ণ অনুষজ্ঞ কোন ভাবেই পূর্ণতা পাচ্ছে না। ফলে আমাদের দেশের প্রচলিত রাজনীতিতে দেশ ও জাতির স্বার্থরক্ষায় খুব একটা ফলপ্রসূ হতে পারছে না। মূলত গণতান্ত্রিক সমাজ বিনিমার্ণের মাধ্যমে একটি সুখী, সমৃদ্ধ, ন্যায়-ইনসাফ ও আইনের শাসন ভিত্তিক গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। অন্যথায় আমাদের সকল অর্জনই ম্লান হতে বাধ্য। তাই দেশের আত্মসচেতন মানুষ সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের কাছে দায়িত্বশীল আচরণ আশা করে।