ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

ফিরোজ মাহবুব কামাল

১১ মে ২০১৮, ২২:০৫

বাংলাদেশে ভোট-ডাকাতদের নাশকতা ও জনগণের দায়বদ্ধতা

3290_12.jpg
প্রতীকী ছবি
চোর-ডাকাতেরাও যখন নেতা হয়!
প্রতি সমাজে যেমন ভাল মানুষ থাকে, তেমনি ভয়ানক চোর-ডাকাতও থাকে। তেমনি সত্য ধর্মমত যেমন থাকে, তেমনি মিথ্যা অপধর্মও থাকে। তাই শুধু বিষাক্ত কীট ও হিংস্র জন্তু-জানোয়ারদের চিনলে চলে না, সমাজের চোর-ডাকাতদেরও চিনতে হয়। থাকতে হয় মিথ্যা থেকে সত্যকে চেনার সামর্থ্য। মহান আল্লাহতায়ালা শুধু নামায-রোযা দেখেন না। দেখেন ঈমানদারের সে সামর্থ্যটিও। সে সামর্থ্যের মধ্যেই প্রকাশ পায় ব্যক্তির সত্যিকারের ঈমান, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা। সে সামর্থ্যটি না থাকলে দুনিয়ার জীবনে সত্যের পক্ষ নেয়া যেমন অসম্ভব, তেমনি অসম্ভব হলো আখেরাতে জান্নাতের ধারে-কাছে যাওয়া। এরাই যুগে যুগে স্বৈরাচারি দুর্বৃত্তদের সকল কুকর্মের সেপাহি হয়। হজ-যাকাত এবং সারা জীবন নামায-রোযা আদায় সত্ত্বেও যারা ইসলামের শত্রুপক্ষের বিজয়ে ভোট দেয়, অর্থ দেয় ও যুদ্ধ করে পরকালে তাদের জন্য যে কতবড় বিপদ অপেক্ষা করছে সেটি বুঝা কি এতই কঠিন? এটি তো মিথ্যার ভিড়ে সত্যকে চেনার ভয়ানক সামর্থ্যহীনতা। অথচ সে সামর্থ্যটুকু থাকার কারণে এমন অনেকেই জান্নাতে স্থান পাবে যারা জীবনে এক ওয়াক্ত নামায বা এক দিন রোযা আদায়ের সুযোগও পাননি। ফিরাউনের দরবারে হযরত মূসা (আঃ)র সাথে প্রতিদ্বন্দিতা দিতে এসে যে কয়েক জন যাদুকর মূসা (আঃ)র রবের উপর ঈমান এনে শহীদ হয়েছিলেন –তাদের উপর যে মহান আল্লাহতায়ালা কতটা খুশি হয়েছেন সেটি তো পবিত্র কোরআনে বার বার ঘোষিত হয়েছে। সত্যের পক্ষে সাক্ষ্য দিতে তাঁরা ছিলেন নির্ভীক; প্রস্তুত ছিলেন প্রাণ দেয়ার জন্য। যাদের প্রস্তুতিটি জান্নাতের জন্য -তাদের কোরবানি তো এরূপ হওয়াই স্বাভাবিক। মানব ইতিহাসের অতি শিক্ষণীয় সে অবিস্মরণীয় ঘটনাটির রিপোটিং করেছেন অন্য কেউ নন, বরং সর্বদ্রষ্টা মহান আল্লাহতায়ালা খোদ নিজে এবং চিরস্থায়ী করেছেন পবিত্র কোরআনে –যাতে মানুষ যুগ যুগ তা থেকে শিক্ষা নিতে পারে।

মিশরের ফিরাউন তো মরে গেছে বহু হাজার বছর আগে, কিন্তু ফিরাউনের আদর্শ নিয়ে বহু ফিরাউন আজও বহু দেশে বেঁচে আছে। ঈমানদারের দায়িত্ব হলো এসব ফিরাউনদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। এক্ষেত্রে কাপুরুষতা চলে না। তবে আজকের ফিরাউনগণ ক্ষমতায় আসে ভোট ডাকাতির মাধ্যমে। তাই আধুনিক ফিরাউনদের পরাজিত করতে হলে দাঁড়াতে হয় তাদের ভোট-ডাকাতির বিরুদ্ধে। নইলে কষ্টে অর্জিত অর্থ যেমন ঘরে থাকে না, তেমনি ইজ্জত আবরু, মানবিক মূল্যবোধ এবং মৌলিক অধিকারটুকুও বাঁচে না। কারণ, ভোট ডাকাতদের টার্গেট শুধু রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে নেয়া নয় এবং অর্থলুটও নয়, বরং তাদের স্ট্রাটেজী ধর্মীয় মূল্যবোধ, নাগরিক অধিকার, সামাজিক সম্প্রীতি ও সুস্থ্য রাজনীতি বিনাশ। কারণ, নর্দমার কীটের নয় চোর-ডাকাতগণ শুধু কলুষিত মন নিয়ে বাঁচে না, বাঁচতে চায় কলুষিত মূল্যবোধ, সমাজ ও রাষ্ট্র নিয়েও। কারণ সমাজে সুস্থ্য মূল্যবোধ বাঁচলে তাদের ইজ্জত বাঁচে না। ফলে, যেদেশে চোর-ডাকাত ও ভোট ডাকাতদের সংখ্যা বাড়ে, সেদেশে শুধু চুরি-ডাকাতি ও নারীধর্ষণই বাড়ে না, বিপুল ভাবে বাড়ে মিথ্যার প্রচার, বাড়ে দুর্নীতি এবং প্রবলতর হয় মৌলিক অধিকার হননের রাজনীতি। এবং বিলুপ্ত হতে থাকে ধর্মীয় চেতনা।

রাষ্ট্রজুড়ে ডাকাতির বিশাল বিশাল ক্ষেত্র আবিস্কৃত হওয়ায় চোর-ডাকাতদের নীতিতেও আমূল পরিবর্তন এসেছে। বড় বড় ডাকাতগণ এখন আর গ্রামগঞ্জে গিয়ে লোকদের ঘরে ঘরে হানা দেয় না। কারণ মানুষের ঘরে আর কত টাকা থাকে? তাদের তো চাই কোটি কোটি টাকা। আর সে বিশাল অংকের টাকা থাকে ব্যাংকে, শেয়ার মার্কেটে, এবং সরকারের তহবিলে। ফলে তাদের গভীর ক্ষুধা কেবল রাষ্ট্রীয় অর্থ ভাণ্ডারই মেটাতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ভাণ্ডারের উপর ডাকাতি করতে হলে তো হাতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা চাই। ফলে ডাকাতগণ এখন আর ডাকাত দল গড়ে না, বরং রাজনৈতীক দলে যোগ দেয়। এবং সেটি সরকারি দলে। এরই ফল হলো, বাংলাদেশের রাজনীতিতে যারা সরকারি দলের নেতা-নেত্রী তাদের কেউই মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ, নবাব সলিমুল্লাহ, শেরে বাংলা ফজলুল হক, শহীদ সহরোওয়ার্দী ও নবাব খাজা নাজিমুদ্দীনের ন্যায় পেশাদার আইনবিদ বা জমিদার না হয়েও বিপুল সম্পদের মালিক। রাজনীতিতে কিছু দেয়ার বদলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তাদের নেয়ার অংকটি যে কতটা বিশাল তা তাদের ঘরবাড়ি ও সম্পদের দিকে নজর দিলেই বুঝা যায়। তাদের জন্য অভিজাত আবাসিক প্রকল্পের জমি জোগাতে ডাকাতি হয় শুধু ঢাকা শহরেই নয়, বরং দেশের অন্যান্য বড় শহরের আদিবাসিদের জমির উপর। অল্প মূল্যে জমি কেড়ে নিয়ে তাদের উদ্বাস্তু করা হয়। ১৯৭১ য়ে এদের হাতেই ডাকাতি হয়েছিল চার লাখের বেশী অবাঙালীর ব্যবসা-বাণিজ্য, ঘরবাড়ি ও সহায়-সম্পদের উপর। আজ যে বীভৎস বর্বরতা সংঘটিত হচ্ছে রোহিঙ্গা মুসলিমদের সাথে একাত্তরে সেটিই ঘটেছে অবাঙালী মুসলিমদের সাথে। অথচ সে বিশাল ডাকাতির জন্য কোন অপরাধীকেই আদালতে উঠতে হয়নি, কারো কোন শাস্তিও হয়নি। বাংলাদেশে ডাকাতদের পুরস্কৃত করা এভাবেই রাজনীতির সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।

স্বৈরাচারি শাসন ও ভোট-ডাকাতির রাজনীতি
স্বৈরাচার ও ভোট-ডাকাতির রাজনীতি সব সময়ই একত্রে চলে। কারণ, ভোট-ডাকাতির রাজনীতি ছাড়া কখনোই স্বৈরাচার বাঁচে না। ভোট-ডাকাতির রাজনীতি বাঁচাতে প্রতিটি স্বৈরাচারি শাসকই তাই সমাজের চোর-ডাকাতদের দলে টানে। তারা জানে, ভাল মানুষদের দলে টেনে ডাকাতির রাজনীতি বাঁচানো যায় না; কারণ, তারা কখনো তাদের দলের সৈনিক হয়না। বরং মানুষদের কারণে ডাকাতির খবর অন্যরা জেনে ফেলে। অপর দিকে সরকারি দলে যোগ দেয়ায় চোর-ডাকাতদের লাভটা বিশাল। বাজেটে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকার যে বরাদ্দ দেয়া হয়, তাতে থাকে তাদেরও অংশ। পুলিশ ও সেনাবাহিনী পালার চেয়ে এসব চোর-ডাকাত প্রতিপালন করাই স্বৈরাচারি সরকারে কাছে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তারাই হলো স্বৈরাচারি শাসকদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য লড়াকু সেপাহি, রাজপথে এরাই সরকার-বিরোধীদের পেটাতে অস্ত্র হাতে খাড়া হয়। কারণ, এখানে স্বার্থ শুধু ভোট-ডাকাত সরকারের নয়, তাদেরও। কারণ, স্বৈরাচারি সরকার বাঁচলে সরকারি দলের চুরি-ডাকাতিতে তাদের প্রাপ্তির অংকটিও বাড়ে। এ জন্যই প্রতিটি সরকারি প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দের মধ্যে থাকে এসব চোর-ডোকাত প্রতিপালনে কোটি কোটি টাকার অলিখিত অর্থ বরাদ্দ থাকে। প্রকল্পের কাজ শুরুর আগে প্রতিটি ঠিকাদারদের দলের পক্ষ থেকে চিহ্নিত প্রাপককে তার প্রাপ্য অংকটি প্রথমে পরিশোধ করতে হয়। এভাবেই তাদের জুটে বিশাল অর্থপ্রাপ্তি। এ কারণেই কোন বড় চাকুরি বা বিশাল কোন ব্যবসা না করেও এসব রাজনৈতীক ডাকাতগণ বাংলাদেশে এবং বাংলাদেশের বাইরে বড় বড় বাড়ি, গাড়ি ও কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়। হাজার এরূপ চোর-ডাকাতদের নামে বিপুল অর্থ জমা হচ্ছে বিদেশী ব্যাংকে।

অথচ ডাকাতির এরূপ সুযোগ অরাজনৈতীক ডাকাতদের থাকে না। রাতের আঁধারে গ্রামগঞ্জে ডাকাতি করতে গিয়ে তাদের দীর্ঘ মাঠঘাট পাড়ি দিতে হয়। গ্রামবাসীর সম্মিলিত হামলায় অনেক ডাকাতের প্রাণও যায়। কিন্তু সরকারি দলের ডাকাতদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি ভিন্ন। সরকার দলীয় হওয়ায় খোদ পুলিশ, সরকারি প্রশাসনের কর্মচারি, সরকারি উকিল ও আদালেতর বিচারকগণও তাদের সমীহ করে চলে। ন্যায্য অর্থে বাড়ি নির্মাণ করেও অন্যদের যেখান আয়কর বিভাগের টার্গেট হতে হয়, সরকারি দলের চোর-ডাকাতদের সে ভয় থাকে না। এরূপ বিশাল অর্থপ্রাপ্তি ও সরকারি সুযোগ-সুবিধার কারণে বিপ্লব এসেছে চোর-ডাকাতদের জীবনে। ছিঁচকে চোরও পরিণত হয়েছে ভয়ংকর ডাকাতে। স্বৈরাচারি রাজনীতিতে অতি দ্রুত দুর্বৃত্তায়ন ঘটে তো একারণেই। মূলতঃ এ কারণেই বাংলাদেশ বিশ্বের প্রায় ২০০টি দেশকে হারিয়ে দুর্বৃত্তিতে পর পর ৫ বার প্রথম হতে পেরেছে। অথচ আজ থেকে শত বছর আগে বাঙালীর এমন নৈতীক পচন নিয়ে আশংকা করাও অসম্ভব ছিল। দেশে দেশে হাজার হাজার স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং মসজিদ-মাদ্রসা গড়েও এ নৈতীক পচন রোধ করা যাচ্ছে না। কারণ, রাজনীতির মধ্য দিয়ে দুর্বৃত্তায়নের যে সুনামী সৃষ্টি হয় সে রুখার সামর্থ্য কি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের থাকে? মানব ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ মানব হযরত মুহামম্দ (সাঃ) তাই রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ নিজ হাতে নিয়েছেন। দুর্বৃত্তেদর নির্মূলে ও সুনীতির প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রের অবকাঠামোকে ব্যবহার করেছেন। অথচ আজকের মুসলিমগণ বেঁচে আছে নবীজীর সে মহান সুন্নতকে বাদ দিয়ে। রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ দুর্বৃত্ত ভোট-ডাকাতদের হাতে ছেড়ে দিয়ে তারা আশ্রয় নিয়েছেন মসজিদের চার দেয়ালের মাঝে। এবং নিজেদের পরিচয় দিচ্ছেন আশেক রাসূল (সাঃ) রূপে! সিরাতুল মুস্তাকীম থেকে আজকের মুসলিমদের এ হলো সবচেয়ে বড় বিচ্যুতি।

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়ার মাত্র দুটি উপায়ঃ হয় সামরিক শক্তি, নয় ভোটের শক্তি। সেনাবাহিনীর লোকেরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ছিনতাই করতে ব্যবহার করে সামরিক শক্তি –যেমন সেনাপ্রধান এরশাদ করেছিল একটি নির্বাচিত সরকারকে উচ্ছেদ করতে। ছিনিয়ে নেয়া ক্ষমতাকে স্থায়ী করতে তাকে নামতে হয়েছিল লাগাতর ভোট ডাকাতিতে। এভাবে দীর্ঘ ১১ বছর সে ক্ষমতায় থাকে। তাতে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছে যেমন সে নিজে, তেমনি তাঁর দুর্বৃত্ত সাঙ্গপাঙ্গগণ। তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভোট ডাকাতির শুরু স্বৈরাচারি এরশাদের হাতে হয়নি, হয়েছে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবের হাতে। শেখ হাসিনা তাঁর পিতার সে নীতিকেই আরো শক্তিশালী করেছে। শেখ মুজিবের শাসনামলে তাঁর দলের বাইরে থেকে কারো পক্ষে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়াটা অসম্ভব ছিল।