ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

শহীদুল ইসলাম

১৪ মে ২০১৮, ১৬:০৫

কোটা নিয়ে কূটলামী

3368_Kowta.jpg
জাতীয় সংসদে দেয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কোটা বাতিলের ঘোষণার পর এক মাস পেরিয়ে গেলেও তা প্রজ্ঞাপন আকারে জারি না হওয়ায় দেশব্যাপী আবরো ছাত্রধর্মঘট পালন করছে আন্দোলনকারীরা। কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) ধর্মঘট পালন করেছে তারা।দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও ধর্মঘটের খবর আসে।আবারো উত্তাল শিক্ষাঙ্গন। দেশের প্রধাননির্বাহী যার কথাই আইন তার ঘোষণার পর একমাসেও তার প্রজ্ঞাপন কেন জারি হলোনা-এটা স্বাভাবিক প্রশ্ন। এটা কি তাহলে প্রধানমন্ত্রীর কোন কূটচাল ছিল এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।

সোমবার (১৪ মে) সকালে ঢাবির কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হয় হাজারো শিক্ষার্থী। এসময় কোন কালক্ষেপণ না করে অবিলম্বে চাকরিতে কোটা পদ্ধতি সংস্কারে প্রজ্ঞাপন জারির আহ্বান জানিয়ে শ্লোগান দেয় তারা। অবরোধ চলাকালীন বেশ ঢা’বিসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস বর্জন করে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে শিক্ষার্থীরা।

চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে কোটা প্রথা সংস্কারের দাবিতে বিভিন্ন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করে আসছিল শিক্ষার্থীরা। গত ৮ এপ্রিল শাহবাগ অবরোধ করে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। কিন্তু পুলিশ তাদের টিয়ারশেল, লাঠিচার্জ এবং রাবার বুলেট নিক্ষেপের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে হস্তক্ষেপ করলে দেশব্যাপী বিক্ষোভে ফেটে পড়ে গোটা ছাত্রসমাজ। সে রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাসভবনে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর ও তান্ডব চালায় অজানা দুর্বৃত্তরা। পরে এ আন্দোলন নিয়ে দেশব্যাপী তুমুল আলোচনা-সমালোচনার মুখে জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলাকালীন গত ১১ এপ্রিল কোটা বাতিলের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর থেকে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশের দাবি জানাচ্ছে আন্দোলনকারীরা। পরে সরকার সমর্থিত নেতাকর্মীরা বিভন্ন সময় এ ব্যাপারে আশ্বাস দিলেও ঘোষণার একমাস পরেও প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি।

৯ এপ্রিল ঢাবির মানববন্ধন থেকে ১০ এপ্রিলের মধ্যে প্রজ্ঞাপনের দাবি জানান। অন্যথায় ১৩ এপ্রিল থেকে তারা ফের আন্দোলনের নামার ঘোষণা দেন তারা। পরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কোটা সংস্কারে কমিটি গঠনের প্রস্তাব পাঠায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। কমিটি গঠনের এ উদ্যোগকে আন্দোলন ভন্ডুলের ষড়যন্ত্র আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনকারীরা।তারপর থেকে শুরু হয়েছে আবারো আন্দোলন।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বলেছেন, সর্বশেষ সংশোধিত তালিকা অনুযায়ী বেসামরিক মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা এক লাখ ৮০ হাজার ৫১৩ জন।

১৯৭১ সালে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তাদের সন্তানদের সুবিধা দেবার জন্য প্রথমে এ কোটা চালু করা হয়েছিল ১৯৭২ সালে । কিন্তু ক্রমান্বয়ে এই কোটার পরিধি বেড়েছে।এখন মুক্তিযোদ্ধাদের নাতী-নাতনীদের জন্য এ কোটা প্রযোজ্য হচ্ছে। ৬৪টি জেলার জন্য কোটা আছে। মূলত দেশের অনগ্রসর মানুষকে সুবিধা দেবার জন্যই জেলা কোটা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল।

খবর নিয়ে জানা গেছে,বাংলাদেশের বিভিন্ন ধরনের সরকারি চাকরিতে এখন ২৫৮ ধরনের কোটা আছে। তার মধ্যে বাংলাদেশের পাবলিক সার্ভিস কমিশনের অধীণে প্রথম শ্রেণীর চাকরিতে মোট পাঁচটা ক্যাটাগরিতে কোটার ব্যবস্থা রয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে মুক্তিযোদ্ধা কোটায়।
প্রথম শ্রেণীর সরকারি চাকরিতে কোটা নি¤œরুপ:মুক্তিযোদ্ধা কোটা: ৩০ শতাংশ,
জেলা কোটা: ১০ শতাংশ,নারী কোটা: ১০ শতাংশ,উপজাতি কোটা: ৫ শতাংশ
প্রতিবন্ধী কোটা: ১ শতাংশ।সব মিলিয়ে কোটা ৫৬ শতাংশ। মেধাবীদের জন্য বাকি থাকে মাত্র ৪৪ শতাংশ পদ।

আন্দোলনকারীরা বলছেন ৫৬% কোটার মধ্যে ৩০ শতাংশই মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দ। সেটিকে ১০% এ নামিয়ে আনতে হবে।এই কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে মেধাতালিকা থেকে শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া।মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের ক্ষেত্রে চাকরীর বয়সসীমা ৩২। কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য ৩০। অভিন্ন বয়সসীমার দাবি করেছেআন্দোলনরতরা।

কিছু ক্ষেত্রে সাধারণ শিক্ষার্থীরা চাকরি আবেদনই করতে পারেন না কেবল কোটায় অন্তর্ভুক্তরা পারে। তাই তাদের দাবি- কোটায় কোনও ধরনের বিশেষ পরীক্ষা নেয়া যাবে না এবং চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় একাধিকবার কোটার সুবিধা ব্যবহার করা যাবে না।

বাংলাদেশে প্রচলিত কোটা ব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনা শুধু শিক্ষার্থী বা চাকরি-প্রার্থীদের মাঝেই নয়, বিশেষজ্ঞদেরও মতামত রয়েছে কোটা সংস্কারের পক্ষে।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে এক সাক্ষাতকারে সাবেক মন্ত্রীপরিষদ সচিব আকবর আলি খান বলেন, বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত।এ কোটা ব্যবস্থার কারণে অনেক মেধাবী প্রার্থীরা চাকরির পরীক্ষা দিতে রাজী হয়না।

সংবিধানের তৃতীয় ভাগের ২৯ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে। এই অনুচ্ছেদের ২৯ এর (৩) এর (ক) তে বলা হয়েছে, নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশ যাহাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব লাভ করিতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যে তাঁহাদের অনুকূলে বিশেষ বিধান-প্রণয়ন করা হইতে, রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।

সর্বশেষ তথ্য নিয়ে জানা গেছে,শিক্ষার্থীদের পূনরায় আন্দোলনের প্রেক্ষিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় নড়ে চড়ে উঠেছে।একটা কিছু হবে। তথ্যাভিজ্ঞদের মতে,প্রধানমন্ত্রী কোটা থাকবেনা বলে ঘোষনা দিয়েও একটু চিন্তা করছেন। তার দল এবং জোটের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে।তাই ধীরে চলার নীতি নিয়েছেন।যেদিন তিনি ঘোষণা দিলেন তার আগের দিন বিশেষভাবে মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংস্কারের দাবির তীব্র সমালোচনা করেন কয়েকজন মন্ত্রী ও এমপি। কৃষিমন্ত্রীর মত সিনিয়র মোষ্ট মন্ত্রী আন্দোলনকারিদের রাজাকারের বাচ্চা বলতেও কসুর করেননি।ঘোষণা দেয়ার পরেও প্রধানমন্ত্রী দলের ও জোটের মধ্যে একটু অসন্তোষ দেখেছেন। তাই চুপ ছিলেন যে,অন্যপথে সমস্যার সমাধান করা যায় কিনা।শেষ পর্যন্ত সেই কূটচাল আর কাজে লাগবে বলে মনে হয়না। চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত যেকোন সময়ে এসে যেতে পারে।