ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

কক্সবাজার প্রতিনিধি

২০ মে ২০১৮, ১৮:০৫

ভয়ঙ্কর যৌন সহিংসতায় ৪৮ হাজার রোহিঙ্গার জন্ম

3539_10569_132.jpg
যৌন সহিংসতার শিকার অন্তঃসত্তা রোহিঙ্গা নারীদের সন্তান প্রসবজনিত সমস্যা মোকাবেলা করতে হিমশিম খাচ্ছেন বিশ্বের বৃহত্তম উদ্বাস্তু শিবিরের সাহায্য কর্মীরা। স্বেচ্ছাসেবকরা অন্তঃসত্তা রোহিঙ্গা নারীদের খোঁজ করছেন। অনেক রোহিঙ্গা নারী তাদের ভয়ঙ্কর স্মৃতি লুকাতে নিজেদের আড়াল করে রাখছেন। তাদের ভয়, ওই লজ্জাজনক ঘটনা প্রকাশ হয়ে পড়লে তথা নবজাতকের জন্ম হলে তাদেরকে পরিবার থেকে পরিত্যক্ত করা হবে।

হবু মায়েরা এমনটি করলে তাদের ও মৃত্যুর আশঙ্কা করছেন সাহায্য কর্মীরা । এমনই এক সাহায্যকর্মী তসমিনারা। যিনি রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু হয়েও মাসের পর মাস এসব নারীদের খুঁজে বের করে তাদের পরিচর্যা করার চেষ্ঠা করছেন। তাদেরকে সাহস দিচ্ছেন ভরসা দিচ্ছেন।

তিনি জানান, আমরা তাদেরকে একটি পাসওয়ার্ড দিচ্ছি। তারা হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে এটি ব্যবহার করতে পারেন। এর মাধ্যমে তারা সরাসরি সঠিক জায়গায় পৌঁছাতে পারবেন। তিনি বলেন, তারা অনেক সময় লজ্জা পায়। সামনে আসতে ভয় পায়।

গত আগস্টে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর নির্মম দমন অভিযানের পর প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেন। তাদের অনেকে ধর্ষণের শিকার হয়। তবে ঠিক কতজন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, তা জানা যায়নি।

মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘ সহকারী মহাসচিব অ্যান্ড্রু গিলমর বলেন, গত আগস্ট সেপ্টম্বরে ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীরা অল্প সময়ের মধ্যেই সন্তান প্রসব শুরু করবে।

এক হিসাবে দেখা গেছে, চলতি বছর রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে প্রায় ৪৮ হাজার নারী সন্তান জন্ম দেবে। ধর্ষণের শিকার নারীরা বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে বেড়ার ঘরে কোনো ধরনের চিকিৎসা সুবিধা ছাড়াই সন্তান জন্ম দিতে যাচ্ছে।

রোহিঙ্গা নেতা আব্দুর রহিম বলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ধর্ষণের শিকার দুইজন নারীকে চেনেন। তারা চলতি মাসেই সন্তান প্রসব করবে। তিনি বলেন, মিয়ানমার সামরিক বাহিনী তাদের ধর্ষণ করেছে। এসব শিশু হলো তাদের অপরাধের প্রমাণ।

ধাত্রীদের প্রশিক্ষণ দানের কাজে নিয়োজিত নুরজাহান বলেন, অনেক সময় এসব সন্তান অনাকাঙ্খিত বিবেচিত হয়। এই লজ্জা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অনেক কিশোরী গর্ভপাতের আশ্রয়ও গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিহঙ্গাদের অর্ধেকের বেশি নারী ও বালিকা। তবে কিশোরীদের জনসম্মুখে খুব একটা দেখা যায় না। তাদের অভিভাবকেরা তাদেরকে ঘরের ভেতরেই রাখতে চেষ্টা করে। এতে করে রোহিঙ্গা নারীদের সত্যিকারের অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

স্বেচ্ছাসেবীরা বলছেন, অনেক পরিবার অন্তঃসত্তার বিষয়টি লুকাতে জোর করে কিশোরীদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। অনেকে আশঙ্কা করছে, নবজাতকদের পরিত্যক্ত করা হবে। সাহায্যকর্মীরা এখন সম্ভাব্য সব ধরনের পরিস্থিতির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পরিত্যক্ত শিশুদের কিভাবে পরিচর্যা করা যায়, তা নিয়েও তারা ভাবছেন।

১০ দিন আগে সন্তান জন্ম দেয়া হাসিনা আক্তার নামের এক রোহিঙ্গা নারী জানান, তার সন্তানের নাম রাখা হয়েছে জান্নাত আরা। নিজে তেমন পুষ্টিকর খাবার না পাওয়ায় মেয়েকে বুকের দুধ খাওয়াতে সমস্যা হচ্ছে।

কক্সবাজারের উখিয়া রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬০টি রোহিঙ্গা শিশুর জন্ম হচ্ছে। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ এ তথ্য জানিয়েছেন। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনীর নৃশংসতা চালিয়েছে ৯ মাস আগে। এতে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে প্রতিবেশি বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। তারা ঠাঁই নিয়েছে গাদাগাদি করে গড়ে ওঠা আশ্রয় শিবিরে। এগুলো অস্থায়ী আশ্রয় শিবির। কিন্তু এর মধ্যেই গড়ে প্রতিদিন জন্ম হচ্ছে প্রায় ৬০ টি শিশুর।

বাংলাদেশে ইউনিসেফের একজন প্রতিনিধি এডুয়ার্ড বেইগবেদার বলেছেন, নিজ দেশ থেকে দূরে ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে প্রতিদিন জীবনের প্রথম নিঃশ্বাস নিচ্ছে প্রায় ৬০টি শিশু। তারা জন্ম নিচ্ছে সেই সব মায়ের গর্ভে যারা বাস্তুচ্যুত, সহিংসতার শিকার, আতঙ্কগ্রস্থ ও ধর্ষণের শিকার। সুষ্ঠুভাবে জীবনের সূত্রপাত ঘটায় যে পরিবেশ এসব আশ্রয় শিবিরে সে পরিবেশ অনেক দূরে।

বিশ্বের নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোহিঙ্গারাই সব চেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার। তাদের কোনো নাগরিকত্ব নেই। মিয়ানমার সরকার ব্যাপক বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড, অগ্নিসংযোগ, গণধর্ষণ, যৌন সহিংসতার ঘটনা ঘটিয়েছে। সম্প্রতি মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার করা হবে কিনা এ জন্য তদন্তের অনুমতি চাওয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে।

ইউনিসেফ বলছে, যৌন সহিংসতার শিকার যেসব নারী ও বালিকা বেচেঁ আছেন, শরণার্থী শিবিরগুলোতে তারা সব চেয়ে বিপন্ন ও একপেশে অবস্থায় আছেন। তারা মানসিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। নির্যাতিত এসব নারী বা বালিকার অনেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সহায়তা পাচ্ছেন না। নতুন জন্ম নেয়া রোহিঙ্গা শিশু, যারা ধর্ষণের কারণে জন্ম নিচ্ছে তাদের প্রকৃত সংখ্যা জানা অসম্ভব ব্যাপার। তবে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, যে সব মা সন্তান জন্ম দিতে যাচ্ছেন এবং জন্ম নেয়া প্রতিটি শিশু যেন সহায়তা ও সেবা পান।