ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

স্টাফ রিপোর্টার

২৪ মে ২০১৮, ১৫:০৫

সাত ব্যাংকের আদায় শূন্যের কোটায়

3661_11643_167.jpg
খেলাপি ঋণের পাশাপাশি ব্যাংকের খাতায় যেসব ঋণ নিয়মিত দেখানো হচ্ছে ওই সব ঋণও এখন আদায় হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সাত ব্যাংকের নিয়মিত ঋণ আদায়ে খরা চলছে। ব্যাংকগুলো গত ছয় মাসে এক টাকাও আদায় করতে পারেনি। এর মধ্যে পাঁচটিই নতুন প্রজন্মের ব্যাংক।

খেলাপি ঋণের পাশাপাশি নিয়মিত ঋণ আদায় কমে যাওয়াকে উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করার অপসংস্কৃতি চালু হওয়ায় যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করছেন তারাও আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। নিয়মিত ঋণ আদায় না হলে এসব ঋণ শিগগিরই অনিয়মিত হয়ে যাবে। তাতে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ আরো বেড়ে যাবে। ফলে ব্যাংকের ঋণ বিতরণ সক্ষমতা ভেঙে পড়তে পারে। ব্যাংক ঋণের সুদহার আরো বেড়ে যাবে। ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করার মতো ঋণ পাবেন না। পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। এতে বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারিয়ে দেশী পণ্য মার খাবে বিদেশী পণ্যের কাছে। সবমিলে জাতীয় প্রবৃদ্ধির গতি শ্লথ হয়ে যাবে।

জানা গেছে, নিয়মিত, অনিয়মিতসহ সব ধরনের ঋণ আদায়ের চিত্র নিয়ে প্রতি তিন মাস অন্তর প্রতিবেদন তৈরি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সংক্রান্ত সর্বশেষ পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে গত ডিসেম্বরভিত্তিক তথ্য নিয়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) পাঁচ ব্যাংক এক টাকাও আদায় করতে পারেনি। এর মধ্যে সমস্যাকবলিত ফারমার্স ব্যাংক চার হাজার ৬৮৮ কোটি টাকার মধ্যে এক টাকাও আদায় করতে পারেনি ছয় মাসে। বেসরকারি ইউনিয়ন ব্যাংকের ৯ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা নিয়মিত ঋণের মধ্যে গত ছয় মাসে এক টাকাও আদায় হয়নি। নিয়মিত ঋণ আদায় না হওয়ার তালিকায় আরো রয়েছে সাউথবাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক। ব্যাংকটির তিন হাজার ৮০ কোটি টাকার এক টাকাও আদায় হয়নি এ সময়। এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের নিয়মিত ঋণ রয়েছে পাঁচ হাজার ১৯৪ কোটি টাকা। কিন্তু গত তিন মাসে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) ব্যাংকটির নিয়মিত ঋণ আদায়ের হার শূন্য ।
সীমান্ত ব্যাংকের নিয়মিত ঋণ দেখানো হয়েছে ২২৫ কোটি টাকা। কিন্তু ব্যাংকটি উল্লিখিত সময়ে এক টাকাও আদায় করতে পারেনি।

অপর দিকে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের ২০ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা নিয়মিত ঋণের মধ্যে গত তিন মাসে আদায় হয়েছে মাত্র ৯৬ কোটি টাকা, আদায়ের হার দেখানো হয়েছে শূন্য দশমিক ৪৭ শতাংশ। একই সাথে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের নিয়মিত ঋণ রয়েছে ১৭ হাজার ৯৮২ কোটি টাকা। আর গত তিন মাসে আদায় হয়েছে মাত্র ১৮৬ কোটি টাকা। আদায়ের হার ১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ।
নিয়মিত ঋণও আদায় না হওয়ায় ব্যাংকগুলো তীব্র তারল্য সঙ্কটে পড়েছে। ফারমার্স ব্যাংকের মতো কিছু কিছু ব্যাংক গ্রাহকদের বড় অঙ্কের আমানত ফেরত দিতে পারছে না। ফলে কেউ কেউ কলমানি মার্কেটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করার চেষ্টা করছে। কিন্তু ফারমার্স ব্যাংকের অবস্থা দেখে গ্রাহকেরা আর নতুন ব্যাংকে টাকা রাখতে ভরসা পাচ্ছেন না। ফলে নতুন ব্যাংকগুলোর তহবিল ব্যবস্থাপনা ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর হাল-হকিকত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

নিয়মিত ঋণ আদায়ের গতি শ্লথ হওয়ার কারণ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, ঋণ নিয়ে পরিশোধ না করার সংস্কৃতি চালু হওয়ায় যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করতেন তারাও উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। নিয়মিত ঋণ আদায় কমে যাওয়ার এটাই বড় কারণ বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, নিয়মিত ঋণ আদায় কমে গেলে এসব ঋণ আবার খেলাপি হয়ে যাবে। তিনি মনে করেন, ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি সরকারের দিক থেকেও কোনো সদিচ্ছা নেই ব্যাংকিং খাত নিয়ে। তা না হলে, যেখানে একই পরিবারের দু’জন পরিচালক ছিল সেখানে চারজন করা হয় কি করে। সাবেক এ গভর্নরের মতে, দেশের অর্থনীতির স্বার্থে বাংলাদেশ ব্যাংককে আরো কঠোরভাবে মনিটরিং করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা যথাযথ পরিপালনে ব্যাংকগুলোকে বাধ্য করতে হবে। অন্যথায় খেলাপি ঋণ আরো বেড়ে যাবে। ইতোমধ্যে খেলাপি ঋণের পাহাড় জমে গেছে। এ পরিস্থিতিতে বেকায়দায় পড়বে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। আর মাঝারিরা উঠতে না পারলে বড় উদ্যোক্তা সৃষ্টি হবে না। সব মিলে দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বিপর্যয় এড়ানো যাবে না। তিনি বলেন, পরিস্থিতি উত্তরণে ব্যাংকারদের ঋণ আদায়ে সচেষ্ট থাকতে হবে। বিশেষ করে ভালো গ্রাহকদের পুরস্কার বা বিশেষ সুবিধা দিতে হবে। এটা দেখে মন্দ গ্রাহকও ঋণ পরিশোধে এগিয়ে আসবেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের একটি ব্যাংকের এমডি জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ সুবিধা নিয়ে যেসব ঋণ পুনর্গঠন ও নবায়ন করা হয়েছে ওই সব ঋণ আদায় হচ্ছে না। তার ব্যাংকের এমন ১০ জন গ্রাহক রয়েছেন, যাদের ব্যাংক থেকে ঋণ নবায়নে নিরুৎসাহিত করা হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন নিয়ে ঋণ নবায়ন করা হয়েছে। ওই সব গ্রাহক ঋণ পরিশোধ করছেন না। আবার অন্য উপায়ে সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করছেন। তাদের দেখে অনেক ভালো গ্রাহকও ঋণ পরিশোধে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। ওই এমডি জানান, বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক শক্ত অবস্থান নিয়েছে। এ অবস্থা ধরে রাখতে হবে।