ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

এনএনবিডি ডেস্ক:

১৬ আগস্ট ২০১৮, ০৮:০৮

গুলশান হেলথ ক্লাব পার্ক

পুরনো ইট-রড দিয়ে চলছে উন্নয়ন কাজ!

6153_1.......jpg
অবিশ্বাস হলেও সত্য বটে! রাজধানীর অভিজাত আবাসিক এলাকা গুলশানে বিচারপতি শাহাবুদ্দিন পার্কের (হেলথ ক্লাব পার্ক) উন্নয়ন কাজে পুরনো ইট, রড ও নিুমানের মালামাল ব্যবহার করা হচ্ছে। সচেতন এলাকাবাসী এ রকম জোড়াতালির কাজে বাধা দিয়েও কূলকিনারা করতে পারছেন না।

নিয়মবহির্ভূতভাবে কাজ অব্যাহত রেখেছে প্রভাবশালী ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান পিএফ কর্পোরেশন লিমিটেড। অনিয়ম-দুর্নীতিতে নিমজ্জিত নিুমানের কাজ বন্ধ করতে এলাকাবাসী উত্তর সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার হস্তক্ষেপ কামনা করলে তিনি উল্টো ঠিকাদারের পক্ষে অবস্থান নেন।

গুলশান হেলথ ক্লাবের কয়েকজন সদস্য যুগান্তরকে জানিয়েছেন, পার্কের উন্নয়ন কাজে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান চুরি নয়, রীতিমতো ডাকাতি করছে। অথচ সিটি কর্পোরেশনের এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। এ অবস্থায় তারা দ্রুত এর প্রতিকার চান। তা না হলে ভুক্তভোগী এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে কার্যকর কর্মসূচি দেয়া হবে।

তথ্যানুসন্ধানে সরেজমিন দেখা গেছে, গুলশান-২ এর ৮৬ নম্বর সড়কের বিচারপতি শাহাবুদ্দিন পার্কটি এখন কার্যত বন্ধ। সীমানাপ্রাচীর ভেঙে টিন দিয়ে পার্কের একাংশ ঢেকে ভেতরে উন্নয়ন কাজ করা হচ্ছে। বহিরাগতদের প্রবেশ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এরপরও স্থানীয় বাসিন্দারা সকালে নির্মাণকাজ শুরু করার আগ পর্যন্ত শরীরচর্চা করে থাকেন।

দেখা যায়, পার্কের হেলথ ক্লাব সংলগ্ন তৈরি করা হচ্ছে ‘ভিজিটর শেড’। শেড নির্মাণের প্রাথমিক কাজ চলমান রয়েছে। সেখানকার উন্নয়ন কাজে শুরু থেকেই পুরনো ইট ব্যবহার করা হচ্ছে। যদিও পুরো কাজই নতুন ইট দিয়ে করার কথা। মঙ্গলবার সকাল ৮টায় পার্কে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণ শ্রমিকরা পুরনো ইট দিয়েই নির্মাণকাজ করছেন। এ ব্যাপারে তাদের কাছে জানতে চাইলে তারা বলেন, আমাদের এ ইট দিয়ে নির্মাণকাজ করতে বলা হয়েছে।

জানা যায়, প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক গুলশান হেলথ ক্লাবের সদস্যদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পার্কটির উন্নয়নে প্রকল্প গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করেন। ওই নির্দেশনার আলোকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) পরিবেশ, জলবায়ু ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের তত্ত্বাবধানে চলমান প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কাজ শুরু হয়েছে মার্চে। শেষ হওয়ার কথা রয়েছে আগামী বছরের মার্চে। প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১৮ কোটি টাকা।

প্রকল্প সিডিউল অনুযায়ী এখানে বাস্কেটবল কোর্ট, জিমন্যাশিয়াম, ভিজিটর শেড, মসজিদ, লাইব্রেরি, বাউন্ডারি ওয়ালসহ আরও বেশ কিছু উন্নয়ন কাজ হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু গত তিন মাসে এসব উন্নয়ন কাজে অন্তত ৪০ হাজার পুরনো ইট ও ২৫-৩০ টন পুরনো রড ব্যবহার করা হয়েছে। ইট ব্যবহারের দৃশ্যমান প্রমাণ থাকলেও নিুমানের রড মাটির নিচে চলে গেছে। এ কারণে কোনো একটি নির্মাণকাজ ভেঙে না দেখলে সেটা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। তবে ওই পার্কে নিয়মিত ব্যায়াম করতে আসা

এলাকাবাসীরা বলছেন, তারা নিজেদের চোখে পুরনো রড ব্যবহার করতে দেখেছেন। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সামনে সংক্ষুব্ধরা যুগান্তর প্রতিবেদকের কাছে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, নিয়মকানুনের কোনো তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। ঠিকাদার ইচ্ছে মতো কাজ করছেন।

গুলশান হেলথ ক্লাবের প্রবীণ সদস্য মো. নুরুল ইসলাম বলেন, ‘১৫ বছর ধরে সকালে এ পার্কে হাঁটাচলা করি। কোনো দিন কোনো দুর্ঘটনার শিকার হতে শুনিনি কাউকে। পার্কটি সিটি কর্পোরেশনের হলেও সবসময় আমরা পার্কটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখায় ব্যবহারে স্বস্তি বোধ করি। অথচ গত তিন মাসে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন কাজের নামে পার্ক বেহাল করে রেখেছে।’ তিনি বলেন, ‘দু-তিনদিন আগে হাঁটার সময় ওয়াকওয়েতে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের তরল নির্মাণ সামগ্রী ফেলে রাখায় পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছি। এখন হাঁটাচলা করতে আমার খুবই অসুবিধা হচ্ছে।’

গুলশান হেলথ ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক পারভেজ আলম খান স্বপন বলেন, ‘পার্কের উন্নয়ন কাজ শুরু করার সময় ঠিাকাদার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল দৈনিক ১০০-১৫০ জন শ্রমিক কাজ করবেন। অথচ এখন ১৫-২০ জনের বেশি লোক কাজ করে না। কাজের গতি দেখে মনে হয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারবে না ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। অথচ এ ব্যাপারে ডিএনসিসির প্রকৌশলীদের কোনো মনিটরিং লক্ষ করা যাচ্ছে না। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কী কাজ করছে না করছে, সে ব্যাপারে তাদের কোনো খবরদারি নেই। ঠিকাদার ও ডিএনসিসির সমঝোতা দেখে মনে হচ্ছে, যোগসাজশ করেই হচ্ছে সবকিছু।’

এ বিষয়ে গুলশান হেলথ ক্লাবের সভাপতি ও ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা এমএ কাদের খান বলেন, ‘প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের বিশেষ উদ্যোগে এ পার্কের উন্নয়ন কাজ শুরু করা হয়। তিনি নেই বলে এখনকার প্রশাসন যা খুশি তা করবে, সেটা তো হতে পারে না। জনগণের টাকার যথাযথ ব্যবহার করতে হবে। আমরা সে চেষ্টা করে যাচ্ছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি এ পার্কের মানহীন কাজের বিষয়ে জানাতে গিয়েছিলাম প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী ড. তারিক বিন ইউসুফের কাছে। তিনি আমাকে বলেন, ‘আমার কি এসব তদারকি করার কথা?’ একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তির কাছ থেকে এমন মন্তব্য শুনে তিনি হতবাক হন।

কাদের খান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘একজন সচেতন নগরবাসী হিসেবে ডিএনসিসির উন্নয়ন কাজের ভালো-মন্দের বিষয়ে কথা বলার অধিকার রয়েছে আমারও। কিন্তু বাস্তবতা হল, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের সখ্য রয়েছে বলেই আমাদের সমালোচনা প্রকৌশলীরা সহ্য করতে পারছেন না।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ পার্কে আমরা এক কোটি টাকা খরচ করে ওয়ার্কওয়ে নির্মাণ করেছি। নিষেধ করা সত্ত্বেও গভীর রাতে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ওয়ার্কওয়ে দিয়ে পার্কে নির্মাণ সামগ্রী ঢুকাচ্ছে। এতে আমাদের কষ্টের টাকায় নির্মিত ওয়ার্কওয়ে নষ্ট করে ফেলছে। তাই ডিএনসিসির কাছে আমাদের জোরাল দাবি- নষ্ট ওয়ার্কওয়ে জনগণের চলাচলের জন্য দ্রুত ঠিক করে দিতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘নির্মাণকাজে পুরনো ইট, রড ও মানহীন নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি বন্ধ করে মানসম্মত নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার করতে হবে। আমাদের এ দাবি ডিএনসিসি ও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান না শুনলে আমরা এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে এ ব্যাপারে কঠোর হতে বাধ্য হব।’

অভিযোগ প্রসঙ্গে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান পিএফ কর্পোরেশনের গুলশান হেলথ ক্লাব উন্নয়ন প্রকল্পের সাইট ম্যানেজার মো. আজিজুর রহমান বলেন, ‘যেসব জায়গায় শুধু ঢালাই দেয়ার কথা, ইট ব্যবহার করার কথা নয়; সেসব জায়গায় ঢালাই মজবুত করতে পার্কের পুরনো ইট ব্যবহার করা হচ্ছে। এ বিষয়ে ডিএনসিসির অনুমোদন নেয়া আছে।’ তবে কোনো উন্নয়ন কাজে পুরনো রড ব্যবহার করা হচ্ছে না বলে দাবি করেন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের এই কর্মকর্তা।

এ প্রসঙ্গে ডিএনসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক ড. তারিক বিন ইউসুফ যুগান্তরকে বলেন, ‘পার্কের উন্নয়ন কাজে কোনো অনিয়ম হচ্ছে কি না, সেটা আমার জানা নেই। তবে বিষয়টি যেহেতু আমার দৃষ্টিতে এনেছেন, আজই (মঙ্গলবার) ঘটনাস্থল পরিদর্শন করব।’ সুত্র : যুগান্তর