ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG

এনএনবিডি ডেস্ক

১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৭:০৯

ডায়রিয়ায় আক্রান্ত চার লাখ মানুষ

6880_DSC06883-1.jpg
ফাইল ছবি
স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, এ বছরে এ পর্যন্ত চার লাখ মানুষ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। বর্তমানে ঢাকাসহ সারাদেশে ডায়রিয়ায় প্রকোপ অনেকাংশে কম । হিসেব বলছে বর্তমানে তা চার লাখে রয়েছে। তবে আক্রান্ত হওয়ার এই সংখ্যাটা একেবারেই কম নয়।

রুমানা জামান রাজধানীর মিরপুর-৬ নম্বর এর বাসিন্দা। গত শুক্রবার তিনি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হন। তিনি বলেন, আমার শুক্রবার একসঙ্গে বমি, জ্বর এবং প্রচণ্ড ডায়রিয়া শুরু হয়। এরপর দ্রুত মহাখালীর আইসিডিডিআর,বি’তে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসকরা আমাকে ভর্তি করাতে চেয়েছিলেন, আমি রাজি হইনি। তারা আমাকে যাওয়ার পরই স্যালাইন দিয়েছে। আর ৭ দিন বাসায় রাইস স্যালাইন ও এ্যামোডিস ট্যাবলেট খেতে বলেছে। আমি এখন এগুলো খাচ্ছি।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ন্যাশনাল হেলথ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের ১৭ সেপ্টেম্বর রাত আটটা পর্যন্ত দেওয়া তথ্যানুযায়ী, সারাদেশে ডায়রিয়ায় গত ২৪ ঘণ্টায় ৯শ’ ৫৬ জন আক্রান্ত হয়েছেন । গত সাতদিনে আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ৯ শ’ ২২ জন। গত এক মাসে আক্রান্ত হয়েছেন ২৯ হাজার ৯শ’ ১৬ জন। গত জানুয়ারি থেকে এই পর্যন্ত চার লাখ এক হাজার ৪৯ জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। এই পরিসংখ্যান দেশের ২৯টি ডায়রিয়াপ্রবণ জেলা থেকে সংগ্রহ করে স্বাস্থ্য অধিদফতর। এতে ঢাকার আইসিডিডিআর,বি’র তথ্যও রয়েছে।

তবে, বিভিন্ন জেলার সিভিল সার্জনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণে ডায়রিয়ার জন্য ব্যবহৃত ওরস্যালাইন এবং ঔষধ মজুত আছে। আর এখন ডায়রিয়ার প্রকোপও কম। এ প্রসঙ্গে চুয়াডাঙ্গা জেলার সিভিল সার্জন ডা. মো. খাইরুল আলম বলেন, এখন ডায়রিয়া পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক ভালো। এখন ১০/১২ জন রোগী হয়ত থাকে। এখন আমাদের এখানে ডায়রিয়ার জন্য স্যালাইন ও ঔষধের কোনও ঘাটতি নেই। স্বাস্থ্যশিক্ষা প্রত্যেক ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে দেই। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে আমরা প্রতিটি ওয়ার্ডে এবং হাসপাতালে শিক্ষা দেই। এগুলি সাধারণত প্রতিরোধক ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

টাঙ্গাইল জেলার সিভিল সার্জন ডা. মো. শরীফ হোসেন খান বলেন, আমাদের জেলায় এখন ডায়রিয়ার কোনও প্রকোপ নেই। খুব বেশি যে রোগী হচ্ছে এমনটি নয়। সাধারণ দিনে যে কয়জন রোগী ভর্তি হয় তেমন হচ্ছে। আমাদের ডায়রিয়া প্রতিরোধের জন্য পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট আছে। ডায়রিয়া হলে খাওয়ার স্যালাইন দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। টাঙ্গাইল সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে খাবার স্যালাইন আছে। মাঠকর্মী যারা তৃণমূলে কাজ করেন তাদের কাছেও খাওয়ার স্যালাইন থাকে। খাওয়ার স্যালাইন এবং পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটের কোনও সংকট নেই।

চট্টগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন বলেন, আমার এখানে ডায়রিয়ার কোনও প্রকোপ নেই। পরিস্থিতি ভালো আছে।

গত মে মাসে স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, দেশের সার্বিক ডায়রিয়া পরিস্থিতি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সব সরকারি হাসপাতালে ডায়রিয়া রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য চিকিৎসক, নার্স প্রস্তুত আছে এবং পর্যাপ্ত ওষুধ ও স্যালাইন মজুত আছে।

ডায়রিয়া এমন একটি রোগ যে রোগে শিশু, গর্ভবতী নারী এমনকি বয়স্করা আক্রান্ত হয়। তাই এটি প্রতিরোধের দিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন উল্লেখ করে স্বাস্থ্য অধিদফতরে কর্মরত ডা. মো. মারুফুর রহমান অপু বলেন, বাংলাদেশে ডায়রিয়া একটি এন্ডেমিক রোগ। এ রোগে শিশু থেকে বৃদ্ধ যে কেউই আক্রন্ত হতে পারে এবং এর কারণ শুধুমাত্র এক ধরনের জীবাণু নয় বরং কয়েক ধরনের জীবাণু। শিশুদের ডায়রিয়া অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোটা ভাইরাস এর সংক্রমণ থেকে হয় এছাড়াও কলেরা ও অন্যান্য ডায়রিয়া সৃষ্টিকারী ব্যাক্টেরিয়া থেকে হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ডায়রিয়া খুব দ্রুত ঝুকিপূর্ণ অবস্থা তৈরি করতে পারে।

তিনি শিশুদের ডায়রিয়া প্রসঙ্গে বলেন, ডায়রিয়া’র চিকিৎসায় শরীরের লবণ ও পানির অভাব পূরণ করাটাই মূল। প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর প্রয়োজনমতো খাবার স্যালাইন খাওয়াতে হবে। খাবার স্যালাইন খাওয়ানোর ক্ষেত্রে অনেকে যে ভুলটি করেন সেটি হলো সঠিক পরিমাণ পানিতে স্যালাইন মেশান না, আধা লিটারের কম পানিতে ১ প্যাকেট স্যালাইন মেশালে হাইপারটনিক দ্রবণ তৈরি হয় যা শিশুর কিডনির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ডায়রিয়ায় শুধু স্যালাইন নয়, অন্যান্য তরল খাবারও খাওয়ানো যাবে এবং যেসব বাচ্চা বুকের দুধ খাচ্ছে তাদের বারবার বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। এছাড়া জিংক সাপ্লিমেন্ট বাচ্চাদের ডায়রিয়া নিরাময়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মনে রাখতে হবে, শিশুদের ডায়রিয়া অধিকাংশই ভাইরাসজনিত যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাময় হয় (৪-৭ দিন লাগতে পারে), এতে এন্টিবায়োটিক এর ভূমিকা নেই। পরিমাণমত তরল খাবার ও স্যালাইন এর মাধ্যমে পানিশূন্যতা রোধ করাটাই মূল চিকিৎসা। ডায়রিয়ারোধ করতে হলে বাচ্চাকে খাওয়ানো এবং বাচ্চার মল পরিষ্কার করার ক্ষেত্রে সব সময়েই সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। প্রতিবার মল পরিষ্কারের পর ও খাওয়ানোর আগে ভালো করে হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে এবং খাবার পাত্র, চামচ ইত্যাদিও পরিষ্কার রাখতে হবে। বাচ্চার পানিশূন্যতা বেড়ে গেলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে।

গর্ভাবস্থা প্রসঙ্গে বলেন, গর্ভাবস্থায় ডায়রিয়া হলে বিশেষ করে শেষ ট্রাইমেস্টারে ডায়রিয়াজনিত পানি শূন্যতা সময়ের পূর্বেই প্রসব এর সূচনা করতে পারে। তাই পানিশূন্যতা পূরণের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে হবে। খাবার স্যালাইন সঠিক নিয়মে ও অন্যান্য তরল খাবার খেতে হবে। এরপরেও অতিরিক্ত দুর্বলতাসহ অন্যান্য পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে, বাচ্চার নড়াচড়া কম মনে হলে দ্রুত ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। ডায়রিয়া প্রতিরোধের জন্য বিশুদ্ধ খাবার পানি, খাবার পাত্র বিশুদ্ধ পানি দিয়ে ধোয়া ও মলত্যাগের পর এবং খাবার গ্রহণের আগে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, ডায়রিয়া মূলত পানিবাহিত রোগ বিধায় সঠিকভাবে হাত ধোয়া এবং বিশুদ্ধ পানি ব্যবহারের মাধ্যমেই প্রায় শতভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

আইসিডিডিআরবির প্রধান চিকিৎসক ও হাসপাতালের প্রধান ডা. আজহারুল ইসলাম খান বলেন, ডায়রিয়া মূলত পানিবাহিত রোগ। তাই এটি প্রতিরোধে পানি কীভাবে দূষিত হচ্ছে সেটি বের করা খুব জরুরি।