ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

এনএনবিডি ডেস্ক

১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৯:০৯

চট্টগ্রামের দরজা উন্মুক্ত

উত্তর-পূর্ব ভারতের লাভটা কী?

6913_বন্দর.jpg
উত্তর-পূর্ব ভারতের ব্যবহারের জন্য চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরকে উন্মুক্ত করার প্রস্তাবে বাংলাদেশের মন্ত্রিসভা সম্মতি দিয়েছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ধন্যবাদ জানাচ্ছে বাংলাদেশ সরকাকে।

ভারতের পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বাকি দেশের সঙ্গে এক কাতারে নিয়ে আসতে এই সিদ্ধান্ত খুবই সাহায্য করবে।

ত্রিপুরা রাজ্যের সরকারের ভাষ্য, বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্তের ফলে তাদের রাজ্যে জিনিসপত্র আনার খরচ প্রায় ৮০ শতাংশ কমবে। সেই সঙ্গে ভারতের বিশেষজ্ঞরা এও বলছেন, কথিত অবৈধ বাংলাদেশি শনাক্তকরণের বিষয়ে আসামসহ উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক যেকোনো সময় উত্তেজক পরিস্থিতিতে পৌঁছে যেতে পারে, সেটাকেও দ্রুত ‘অ্যাড্রেস করা দরকার’।

আসলে ভারতের সাড়ে সাত হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ সমুদ্রতট থাকলেও উত্তর-পূর্ব ভারতের সাতটি রাজ্য পুরোপুরি ‘ল্যান্ডলকড’ বা স্থলবেষ্টিত—কোনো সমুদ্রবন্দরেই তাদের সরাসরি প্রবেশাধিকার নেই।

এখন ভারতীয় পণ্যের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের দরজা খুলে গেলে ওই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের একটি অভাব মিটবে, অনেক কম খরচে ও কম সময়ে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও রসদ সেখানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।

ত্রিপুরার পরিবহনমন্ত্রী প্রাণজিৎ সিংহরায় বলেন, ‘আমাদের রাজ্যে এখন একমাত্র লাইফলাইন হলো শিলিগুড়ি করিডোর। দেশলাই বাক্স থেকে চালের বস্তা, যা-ই আমরা আনি না কেন—সেটা আনতে হয় শিলিগুড়ি-গুয়াহাটি-শিলংয়ের রাস্তা দিয়ে, সড়কপথে যেটা প্রায় পৌনে পাঁচশ থেকে পাঁচশ কিলোমিটার পড়ে যায়।’

সিংহরায় বলেন, ‘এখন চট্টগ্রাম খুলে গেলে যেটা হবে, চট্টগ্রাম থেকে ফেনীর দূরত্ব মাত্র ৭২ কিলোমিটার। আর তারপরই সেই মালপত্র সীমান্ত পেরিয়ে ত্রিপুরায় ঢুকে পড়তে পারবে। কোথায় পাঁচশ কিলোমিটার আর চট্টগ্রাম থেকে আগরতলা একশ কিলোমিটারেরও কম!’

‘কাজেই আমাদের পরিবহন খরচ কমবে, সময় কম লাগবে—জিনিসপত্রেরও দাম অবশ্যই অনেক কমবে। তা ছাড়া রাজ্যে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। ত্রিপুরা এই অঞ্চলের একটি পরিবহন “হাব” হয়ে উঠবে।’

ফলে ত্রিপুরা সরকার মনে করছে, চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্যবাহী জাহাজ ভারতের জন্য মাল খালাস করতে পারলে ত্রিপুরা উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য একটি প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে উঠবে।

চট্টগ্রামের পাশাপাশি ভারত মিয়ানমারের সিট্টুওয়ে বন্দর দিয়েও উত্তর-পূর্ব ভারতের দরজা খুলতে চাইছে বহুদিন ধরে, কালাদান মাল্টিমোডাল রুট নামে সে পথটি খুললে উত্তর-পূর্ব ভারতের আরও একটি গেটওয়ে হয়ে উঠতে পারে মিজোরাম।

এ বিষয়ে শিলংয়ে নর্থ-ইস্টার্ন হিল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির বিশেষজ্ঞ মুনমুন মজুমদার বলেন, ‘নানা কারণে কালাদান প্রোজেক্ট শেষ হতে যা সময় লাগবে বলে ভাবা হয়েছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি লাগছে। রাখাইন প্রদেশের পরিস্থিতিও এই দেরির একটা কারণ।’

‘এই পটভূমিতে ভারত অনেক দিন ধরেই চট্টগ্রাম দিয়ে ঢোকার চেষ্টা করছিল, সেই অনুরোধই বাংলাদেশ এখন রাখছে। সুতরাং উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য এটা এক দারুণ সিদ্ধান্ত, কারণ একটা বিকল্প রুট খুলে যাচ্ছে—এই গোটা অঞ্চলটা যেন নতুনভাবে উন্মুক্ত হচ্ছে।’

অধ্যাপক মজুমদার সেই সঙ্গে সতর্ক করে দিচ্ছেন, গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতেই বহিরাগত বা বিশেষ করে বাংলাদেশি নাগরিকদের সম্পর্কে একধরনের সংবেদনশীলতা আছে। আর তাই নতুন বন্দরে প্রবেশাধিকার মানে যে নতুন করে ঢোকার পথ নয়, সে দিকটাতেও খেয়াল রাখা দরকার।

উত্তর-পূর্ব ভারতবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চের অধ্যাপক সঞ্জয় হাজারিকাও এই প্রসঙ্গে বলেন, ‘বাংলাদেশ নির্বাচনের মাস তিনেক আগে ও ভারতে সাধারণ নির্বাচনের কয়েক মাস আগে যেভাবে এই সিদ্ধান্তটা এলো, সেটাকে আমি ভারতের প্রতি রিচ আউট করার চেষ্টা হিসেবেই দেখছি।’

‘বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি ভারতের সমর্থন যাতে অক্ষুণ্ন থাকে, সম্ভবত সেই চেষ্টাও আছে এর মধ্যে। কিন্তু এর মধ্যে যে প্রশ্নটার উত্তর নেই তা হলো, আসামের এনআরসি ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশ কী ভাবছে, কিংবা ভারতের নানা জায়গায় অবৈধ বিদেশি তাড়ানোর নামে যা বলা হচ্ছে, সেগুলো নিয়েই বা তাদের বক্তব্য কী!’

উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অস্বস্তির উপাদান যে কম নেই, বিশেষজ্ঞরা তা প্রায় সবাই মানেন। কিন্তু ভারত ভাগ হওয়ার সাত দশকেরও বেশি সময় পর ভারতের ‘সেভেন সিস্টার্স’ যে এই প্রথম চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে জিনিসপত্র আনা-নেওয়া করতে পারবে, সেটা আগের অনেক হিসেব বদলে দিতে পারে বলেও তাদের ধারণা।