ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

আসিফ নজরুল

২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৬:০৯

৫৭ ধারার পরের পর্ব

6991_10.jpg
গত বছর আমার বিরুদ্ধে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা হয়। মামলাটি করা হয় ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একজন মন্ত্রী সম্পর্কে মন্তব্যের কারণে। আমার নাম অসত্ভাবে ব্যবহার করে উক্ত ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছিল। এটি আমি আমার নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে মামলার অনেক আগে থেকে নিয়মিতভাবে জানিয়ে আসছিলাম। এমনকি ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে আমি থানায় গিয়ে জিডিও করে আসি একসময়।

তারপরও মামলাটি করেন উক্ত মন্ত্রীর ভাইয়ের ছেলে। তিনি মন্ত্রীর এলাকার একজন স্থানীয় নেতাও। মামলা দায়েরের কয়েক দিন আগে মন্ত্রী নিজে আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন টেলিভিশন টক শোতে। মামলা দায়েরের আগে–পরে উক্ত টক শোর উপস্থাপক মুহিউদ্দিন খালেদ এবং তৃতীয় মাত্রার উপস্থাপক জিল্লুর রহমান মন্ত্রীকে জানান যে ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি আমার নয়। আমি নিজে পরিচিত এই মন্ত্রীকে মোবাইল ফোনে বিস্তারিত মেসেজ পাঠিয়ে বিষয়টি জানাই। তারপরও সম্পূর্ণ হয়রানিমূলকভাবে প্রথমে মানহানি এবং পরে ৫৭ ধারায় মামলাটি করা হয়।

৫৭ ধারায় মামলা হওয়ামাত্র পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারে। মামলার খবর শুনে তাই দুশ্চিন্তায় পড়ি আমার ছোট সন্তানদের নিয়ে। আমার চার সন্তানকে নিয়মিতভাবে স্কুলে দেওয়া-নেওয়ার কাজটি করি আমি। আমি গ্রেপ্তার হলে তাদের স্কুলের কী হবে? বাসার অন্য কাজগুলো কে করবে? আমার স্ত্রী কনসালটেন্সির কাজ সেরে বাসায় ফেরে সন্ধ্যায়। আমি গ্রেপ্তার হলে সে একা কীভাবে সামলাবে সবকিছু? গ্রেপ্তার হলে আমার ছাত্রছাত্রীদের কী হবে?
মামলার খবর আমার পরিবারকেও বিপর্যস্ত করে ফেলে। এটি শোনামাত্র আমার স্ত্রী সব ফেলে বাসায় ছুটে আসে। উদ্বিগ্ন হয়ে ছোটাছুটি শুরু করে আইনজীবীর কাছে, উচ্চ আদালতে। আমার ১১ বছরের মেয়ে জানতে চায়, ‘তুমি কী করেছ?’ আমি বললাম, ‘কিছু করিনি মা।’ সে অবাক হয়ে বলে: ‘তাহলে গ্রেপ্তার করবে কেন?’

আমি মুষড়ে পড়ি। একজন বালিকাকে কী উত্তর দেওয়া যেত এর?
২.
আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক, আইনের শাসন নিয়ে দেশ–বিদেশে লেকচার দিয়ে বেড়াই প্রায় দুই যুগ ধরে। আমার জন্য বিনা টাকায় মামলা লড়ে দেন দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজীবীরা। আমারই এই অবস্থা, আর ৫৭ ধারায় মামলা খেলে কী ভয়াবহ অবস্থা হয় সুবিধাবঞ্চিত সাধারণ মানুষের? গ্রেপ্তার হয়ে জেলে থাকলে কী বিপর্যয় নেমে আসে তাদের সংসারে?

৫৭ ধারায় এ দেশে প্রায় ৭০০ মামলা হয়েছে। জনপ্রতিনিধির দেওয়া ছাগল পরদিন মরে গেছে, এই ছবি ছাপানোর জন্য গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মন্ত্রীর লোকদের হাতে হেনস্তা হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করার জন্য একজন অসুস্থ সাংবাদিককে টেনেহিঁচড়ে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, অনিয়ম হয়েছে এটা জানানোর পর একজন বৃদ্ধকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এমন আরও বহু উদাহরণ রয়েছে। অতি ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে ফেসবুকে করা মন্তব্য আঁতিপাঁতি করে খুঁজে পুলিশ নিজে ৫৭ ধারায় মামলা করেছে। আবার অতি ক্ষমতাবানের মানহানি হয়েছে, এটা তাঁদের কোনো চেলাচামুণ্ডার মনে হওয়ামাত্র তার দেওয়া মামলায় অন্যরা গ্রেপ্তার হয়েছে। জননেত্রী পরিষদ নামের একটি সংগঠনের নেতা নিজে পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীর চোখে পড়ার জন্য এবং একটি চাকরির আশায় খালেদা জিয়াসহ বিরোধী দলের নেতাদের বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় মানহানি মামলা করেন। ফলাও করে এসব খবর প্রকাশিত হওয়ার পরও তাঁর দায়েরকৃত ৫৭ ধারার মামলা আদালতে গৃহীত হয়েছে।

লক্ষণীয় বিষয়, এত মামলা হলো ৫৭ ধারায়, অথচ সরকারের যেসব লোকের মানহানিকর আর উসকানিমূলক মন্তব্য প্রকাশিত হয় ইলেকট্রনিক মাধ্যমে, তাঁদের বিরুদ্ধে একটি মামলা করার সাহস হলো না কারও। ৫৭ ধারার প্রায় সব মামলা অন্যদের বিরুদ্ধে, অনেক মামলা শুধু হেনস্তা করার জন্য বা অন্যদের আতঙ্কিত করে রাখার জন্য।

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২০১৫ সালে ৫৭ ধারার মতো একটি বিধানকে অসাংবিধানিক বলে বাতিল করে দিয়েছেন। আমাদের উচ্চ আদালতে আইসিটি আইনের ৫৭ ধারার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। আদালতে সরকারপক্ষ অচিরেই এটি বাতিল হচ্ছে—এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে মামলাটি থামিয়ে রাখে। এরপরও বছরের পর বছর ৫৭ ধারা অব্যাহত রাখা হয়, এই মামলায় একের পর এক ব্যক্তিকে হয়রানি করা হয়। উচ্চ আদালত কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য এই কুৎসিত আইনটিতে মামলার শিকার ব্যক্তিদের আগাম জামিন দিয়ে তাঁদের রক্ষা করেন। কিন্তু হয়তো ৫৭ ধারা সরকারই বাতিল করবে, এই আশ্বাসের কারণে আদালত কর্তৃক এটি বাতিল করার উদ্যোগ থেমে থাকে।
৩.
৫৭ ধারা তাই বলে বাতিল হয়নি। অবশেষে এটি শক্তভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ৫৭ ধারাকে গত বুধবার সংসদে পাসকৃত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কয়েকটি (২৫,২৮, ২৯,৩১) ধারায় ভাগ করে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। আইনটির খসড়ায় প্রথম যখন এটি করা হয়েছিল, তখন এই জাজ্বল্যমান প্রতারণার বিরুদ্ধে সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, বিদেশি কূটনীতিকেরা উদ্বেগ জানিয়েছেন। সরকার তাঁদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছে, তাঁদের আপত্তি বিবেচনায় নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অবশেষে ৫৭ ধারা ভেঙে ভেঙে, কিছুটা নতুন শব্দচয়ন করে, ক্ষেত্রবিশেষে কিছুটা শাস্তি কমিয়ে, প্রায় অবিকলভাবে নতুন ডিজিটাল আইনের বিভিন্ন ধারায় রেখে দেওয়া হয়েছে।

৫৭ ধারার মতো একে ধারণকারী নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেও অপরাধগুলো অস্পষ্ট রাখা হয়েছে। যেমন নতুন আইনে ইলেকট্রনিক মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী কোনো বক্তব্য প্রদান করা গুরুতর অপরাধ। অথচ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার (মুক্তিযুদ্ধের মহান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য–সম্পর্কিত) যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে আইনটিতে, সে অনুসারে বরং এই আইনই সেই চেতনার ঘোর বিরোধী। এই আইনে বাক্স্বাধীনতা রোধ করা হয়েছে, যা মুক্তিযুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল না।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ইলেকট্রনিক মাধ্যমে কোনো বক্তব্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো আরেকটি অপরাধ। ধরা যাক, আগামী নির্বাচনে সরকারপক্ষের কোনো নেতা সশস্ত্র ক্যাডার দিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করার পর তাঁর বিরুদ্ধে জনগণকে প্রতিবাদ করার জন্য ফেসবুকে আহ্বান জানাল রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। ভোট ডাকাতি আর সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, কিন্তু এই চেতনা দেখাতে গেলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে পুলিশ তা গণ্য করতে পারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নামক অপরাধ হিসেবেও।

পুলিশের হাতে শুধু সন্দেহের বশে ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেপ্তার আর তল্লাশির ক্ষমতাও রয়েছে ডিজিটাল আইনে। সাম্প্রতিক বহু ঘটনায় আমরা পুলিশকে চোখের সামনে ছাত্রলীগকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করতে দেখেও গ্রেপ্তার না করে বরং আক্রান্তদের আটক করার ঘটনা দেখেছি। এই পুলিশ, বিশেষ করে নির্বাচনকালে যদি এমন ক্ষমতাগুলো পেয়ে যায়, তাহলে কী করতে পারে? পুলিশ সদস্যদের মধ্যে যাঁরা দুর্নীতিবাজ আছেন, তাঁরা নিজের স্বার্থে এই আইনের অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে কত রকম হেনস্তা করতে পারেন?

নতুন ডিজিটাল আইনের আরেকটি দিক, অনুসন্ধানমূলক সাংবাদিকতাকে রুদ্ধ করা। আইনটির ৩২ ধারায় ইলেকট্রনিক মাধ্যমে অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের অধীনে অপরাধগুলো করলে শাস্তির বিধান করা হয়েছে। অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের বিভিন্ন ধারা অনুসারে, যেকোনো সরকারি অফিসকে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার আওতায় আনা যায়। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমনকি অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের চেয়েও কঠোর। যেমন শেষোক্ত আইনে ৩এ ধারায় অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি ৩ বছরের কারাদণ্ড, কিন্তু ডিজিটাল আইনে এর সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে ১৪ বছরের কারাদণ্ড এবং/অথবা ২৫ লাখ টাকা জরিমানা।

৪.
সব জেনেবুঝে আমার সন্দেহ নেই যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে সরকারের অন্যায়ের সমালোচনাকারীদের আর ভিন্নমত পোষণকারীদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা করা বা এর আতঙ্কে রাখা। এবং এভাবে দেশকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাওয়া।

এই আইনের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতসহ বিভিন্ন ফোরামে অধিকারসচেতন মানুষকে অবিলম্বে রুখে দাঁড়াতে হবে।

আসিফ নজরুল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক