ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

এনএনবিডি ডেস্ক

২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৩:০৯

টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদন

মোংলা বন্দরে ঘুষ লাগে প্রতি আমদানিতে ৩৫৭০০ টাকা

7071_7.jpg
বাংলাদেশে ব্যাবসা বাণিজ্যে মধ্যসত্ত্বভোগীদের সিন্ডিকেট সকল আমদানি-রপন্তানী কেন্দ্রগুলোতে। নৌপথ কিংবা সড়কপথ কোন জায়গায় বাদ যাচ্ছে না ব্যবসায়ীদের হয়রানি ও অতিরিক্ত খরচ। একটি শক্ত সিন্ডিকেটের পকেটে চলে যাচ্ছে ব্যবসায়ীদের অর্থের একটি বড় অংশ আর তা এসে পরছে সাধারন মানুষের কাধে। সম্প্রতি টিআইবির প্রকাশিত  একটি গবেষাণাপত্রে এ তথ্য উঠে এসেছে। সেখানে তারা মোংলা বন্দরের একটি করুন চিত্র তুলে ধরেছেন। আমদানির সব কাগজপত্র ও পণ্য ঠিক থাকলেও মোংলা বন্দরে শুল্কায়নের প্রতি আমদানি চালানে ন্যূনতম ৩৫ হাজার ৭০০ টাকা বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়মবহির্ভূতভাবে ঘুষ দিতে হয়। এ ছাড়া একটি গাড়ির শুল্কায়নে বিভিন্ন ধাপে ন্যূনতম চার হাজার টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে দিতে হয় বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল-বাংলাদেশ (টিআইবি)।

‘মোংলা বন্দর ও কাস্টম হাউস এবং বুড়িমারী স্থলবন্দর ও শুল্ক স্টেশন : আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়ায় সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদনে গতকাল বন্দর দুটির নানা অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে টিআইবি। রাজধানীর ধানমণ্ডিতে টিআইবি কার্যালয়েএ গবেষণা তথ্য উপস্থাপন করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। গবেষণা পরিচালনা ও প্রতিবেদন প্রণয়ন করেন গবেষক খোরশেদ আলম, মাহমুদ হাসান তালুকদার এবং মনজুর ই খোদা। এ সময় টিআইবির অন্যান্য কর্মকর্তাও উপস্থিত ছিলেন। ২০১৭ সালের জুলাই থেকে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর সময়কালে তথ্য সংগ্রহ করে এ গবেষণা পরিচালনা করা হয়।

টিআইবি জানায়, বুড়িমারী স্থলবন্দর ও শুল্ক স্টেশন এবং মোংলা বন্দর ও কাস্টমস হাউসে পণ্য ছাড় ও শুল্কায়নের প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রেই নিয়মবহির্ভূত আর্থিক লেনদেন হয়। পণ্য ছাড় ও শুল্কায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া; সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একাংশ এবং শ্রমিক, দালাল ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের একাংশের যোগসাজশে গড়ে ওঠা অসত্চক্র হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি টাকা। এসব দুর্নীতির বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ঘাটতি এবং পুরোপুরি ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় সেবা প্রদান ব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে এখানে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ঘটছে এবং এসব অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি রয়েছে বলে জানিয়েছে টিআইবি।

টিআইবি বলেছে, সমুদ্রগামী জাহাজের আগমন-বহির্গমন অনুমোদন ও প্রযোজ্য মাসুল প্রদানে মোংলা কাস্টম হাউসে অন্তত আটটি ধাপে দীর্ঘসূত্রতা, হয়রানি এবং দুর্নীতির শিকার হতে হয়। এখানে সামগ্রিক কার্যক্রম সম্পাদন করতে শিপিং এজেন্টকে কাস্টম অফিসের বিভিন্ন ধাপে ন্যূনতম আট হাজার ৩৫০ টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে দিতে হয়। এই হিসাবে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মোংলা বন্দরে মোট ৬২০টি জাহাজের ব্যবস্থাপনায় মোংলা কাস্টম হাউস কর্তৃক আদায়কৃত নিয়মবহির্ভূত অর্থের মোট পরিমাণ প্রায় ৫১.৭৭ লাখ টাকা।

এখানে প্রতি কনসাইনমেন্ট বাণিজ্যিক পণ্য খালাস করতে বন্দরে বিভিন্ন ধাপে মোট পাঁচ হাজার ৭০০ টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যয় করতে হয়। আর বিকেল ৫টার পর কিংবা ছুটির দিনে এ খরচ দাঁড়ায় সাত হাজার ২০০ টাকায়। এ বন্দরে প্রতিটি সমুদ্রগামী জাহাজ ব্যবস্থাপনায় সেবাগ্রহীতাদের ন্যূনতম ২১ হাজার টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যয় করতে হয়। এই হিসেবে ২০১৬-১৭ সালে মোংলা বন্দরে মোট ৬২০টি জাহাজের ব্যবস্থাপনায় মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক আদায়কৃত ন্যূনতম নিয়মবহির্ভূত অর্থের মোট পরিমাণ প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ টাকা। টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বুড়িমারী স্থলবন্দরের মাধ্যমে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধাপে বিল অব এন্ট্রি প্রতি গড়ে ন্যূনতম দুই হাজার ৫০ টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে বা ঘুষ হিসেবে দিতে হয়। একইভাবে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধাপে বিল অব এক্সপোর্টে প্রতি গড়ে ন্যূনতম এক হাজার ৭০০ টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে দিতে হয়। বর্তমান গবেষণার প্রাক্কলন অনুযায়ী বুড়িমারী শুল্ক স্টেশনে আমদানি-রপ্তানি পণ্যের শুল্কায়ন ও পণ্য ছাড়ের ক্ষেত্রে ২০১৬-১৭ সালে নিয়মবহির্ভূতভাবে ন্যূনতম প্রায় ২.৮৫ কোটি টাকা জোরপূর্বক আদায় করা হয়েছে।

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘যাঁরা এসব শুল্ক স্টেশন ও স্থলবন্দরের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছেন তাঁদের একাংশ দুর্নীতির বিষয় জানলেও দুর্নীতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেন না। কারণ নিয়মবর্হিভূতভাবে তাঁরা বড় অঙ্কের অর্থ আয় করেন।’

অনেক স্থলবন্ধর, কাস্টম হাউস বা শুল্ক স্টেশনে এখনো সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব হয়নি। এতে দুর্নীতি কমছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

গবেষণা প্রতিবেদন উল্লেখ করা হয়, মোংলা কাস্টম হাউসের জনবল কাঠামোতে অনুমোদিত জনবলের বিপরীতে প্রায় ৪০ শতাংশ জনবল ঘাটতি রয়েছে। জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রভাব বিস্তারের অভিয়োগ রয়েছে। সেবাগ্রহীতাদের কাস্টম হাউসে টেবিল থেকে টেবিলে ঘুরতে হয়। কনটেইনারে আমদানি করা একটি বাণিজ্যিক চালানের শুল্কায়নে অন্তত ১৬টি ধাপ অতিক্রম করতে হয়, আর রপ্তানির ক্ষেত্রে অন্তত ১২টি ধাপে নথিপত্র যাচাই-বাছাই ও অনুমোদন করাতে হয়। এতে বিভিন্ন মাত্রায় দুর্নীতি হচ্ছে।

অন্যদিকে বুড়িমারী স্থলবন্দর ও শুল্ক স্টেশনে বিভিন্ন উদ্ভিদজাত পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্র হতে অনাপত্তিপত্র বা ছাড়পত্র সংগ্রহ করতে হয়। এ ক্ষেত্রেও ঘুষ হিসেবে ফলের ট্রাকপ্রতি অতিরিক্ত ২০০ টাকা এবং বীজের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৫০০ টাকা আদায় করা হয়। বুড়িমারী উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্র থেকে অনাপত্তি পত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে ২০১৬-১৭ সালে ন্যূনতম মোট ১৭.১০ লাখ টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে আদায় করা হয়েছে। বুড়িমারী স্থলবন্দরে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ফাঁকির উদ্দেশ্যে ওজন কম দেখানোর অভিযোগ রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ওজন ফাঁকি দেওয়া হয় ফল এবং মসলা (এলাচ/জিরা) আমদানির ক্ষেত্রে। এ ছাড়া পাথরের ক্ষেত্রেও ট্রাকপ্রতি দুই-চার টন ওজন কম দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।

টিআইবি জানায়, বুড়িমারী স্থলবন্দর মাধ্যমে পণ্য আমদানি রপ্তানির ক্ষেত্রে ট্রাকে পণ্য লোডিং ও আনলোডিং করার জন্য ব্যবসায়ীদের বন্দর নির্ধারিত ফি জমা দিতে হয়, যা টনপ্রতি ৯৯ টাকা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে পণ্য লোড-আনলোড করার সময় শ্রমিকদের ট্রাকপ্রতি ২০০-৫০০ টাকা অতিরিক্ত অর্থ বকশিশ হিসেবে দিতে হয়। ট্রাক ভাড়া করার ক্ষেত্রে বুড়িমারী ট্রাক টার্মিনালে মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন ট্রাকপ্রতি প্রায় ৯০০ টাকা চাঁদা হিসেবে আদায় করে থাকে। এ ক্ষেত্রে দালালকে ট্রাকপ্রতি ৪০০ হতে ৫০০ টাকা বকশিশ দিতে হয়।

গবেষণায় পাওয়া তথ্য মতে, শুক্রবার বাদে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০০টি হিসেবে বছরে গড়ে প্রায় ৬০ হাজারটি পণ্যবাহী ট্রাক এই টার্মিনাল হতে দেশের বিভিন্ন স্থানে পণ্য পরিবহন করে। এই হিসেবে দেখা যায়, প্রতিবছর এই টার্মিনাল হতে ন্যূনতম প্রায় ৫.৪ কোটি টাকা নিয়মবহির্ভূতভাবে আদায় করা হয়।