ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

স্টাফ রিপোর্টার

২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৭:০৯

ডলার সঙ্কট তীব্র হচ্ছে বাজারে

7152_352033_173.jpg
চাহিদা ও জোগানের মধ্যে বিস্তর ব্যবধানে তীব্র ডলার সঙ্কট সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এখন অব্যাহতভাবে কমে যাচ্ছে রেমিট্যান্স প্রবাহ। একই সাথে কমছে রফতানি আয়। এতে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ কমে যাচ্ছে। কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা না কমে বরং বেড়ে চলেছে। এতেই বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অস্থিরতা বাড়ছে। বাজার স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ডলার লেনদেনের ব্যাপারে সীমা বেঁধে দিলেও সেটা কার্যকর হচ্ছে না। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় নীতিমালার ফাঁকফোঁকর দিয়ে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দরে ডলার লেনদেন করছে ব্যাংকগুলো।

বাজার বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়বে না বরং চলমান ধারায় আরো কমে যেতে পারে। এর বিপরীতে আমদানি বিল মেটাতে ডলারের চাহিদা বেড়ে যাবে। চাহিদা ও জোগানের মধ্যে বিস্তর ফাঁরাক দেখা দেবে। এতে সামনে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অস্থিতিশীলতা আরো বেড়ে যাবে বলে তাদের আশঙ্কা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ব্যাংকগুলোর আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ের কারণে বছরের শুরুতেই বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। ডলারের সংস্থান না করেই পণ্য আমদানির জন্য অতিমাত্রায় এলসি খোলে কিছু কিছু ব্যাংক। কিন্তু পণ্যের আমদানি ব্যয় পরিশোধের সময় এলে বাধে বিপত্তি। এক সাথেই চাহিদা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। বিপরীতে সরবরাহ ওই হারে বাড়েনি। এ কারণে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অস্থিতিশীলতা বাড়ছে।

বাজার স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক এক দিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে সঙ্কটে পড়া ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করতে থাকে, অপর দিকে ব্যাংকগুলোর ওপর তদারকি কার্যক্রম জোরদার করা হয়। একই সাথে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের সীমা বেঁধে দেয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলারের জন্য মূল্য বেঁধে দেয়া হয় ৮৩ টাকা ৭৫ পয়সা। এ দর প্রায় তিন মাস ধরে চলছে।

কিন্তু বাজারে ডলারের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক বেঁধে দেয়া ডলারের এ দর কার্যকর হচ্ছে না। দেশের তৃতীয় প্রজন্মের একটি ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, কিছু কিছু ব্যাংকের ডলারের সঙ্কট রুটিনে পরিণত হয়েছে। কারণ, বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ছে না। কাক্সিক্ষত হারে রেমিট্যান্স সংগ্রহ করতে পারছে না। আবার রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহও কমে গেছে।

এদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকও আর আগের মতো ব্যাংকগুলোর কাছে ডলার বিক্রি করছে না। ফলে পণ্য আমদানির দায় পরিশোধ করতে বাজার থেকে হয় তাদের ডলার কিনতে হচ্ছে, অথবা একটি নির্ধারিত কমিশনের বিপরীতে ধার নিতে হচ্ছে। আর এ সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছে কিছু কিছু ব্যাংক। তারা ইচ্ছেমাফিক ডলারের মূল্য আদায় করছে। তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের তেমন কিছু করার থাকছে না। তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেয়া মূল্য ধরেই ফরওয়ার্ড ডিলিং করছে। ফরওয়ার্ড ডিলিং হলো বর্তমান দর থেকে বাড়তি দামে লেনদেন। একটি ব্যাংকের পণ্যের আমদানি দায় মেটাতে ১০ কোটি ডলারের প্রয়োজন। চাহিদার দিনের ৪ থেকে ৫ দিন আগেই বাংলাদেশ ব্যাংক বেঁধে দেয়া মূল্য ধরে ডলার কেনা হয় এর সাথে বিনিময় ঝুঁকি বা অতিরিক্ত প্রিমিয়াম যুক্ত করে।

যেমন চার দিন আগে ৮৩ টাকা ৭৫ পয়সা দরে ১০ কোটি ডলার কেনা হলো। লেনদেনের দিন ২ শতাংশ অতিরিক্ত ধরে অর্থাৎ ৮৫ টাকায় ডলার লেনদেন করছে। এভাবেই বাজারে বাংলাদেশ ব্যাংক বেঁধে দেয়া দর অকার্যকর হয়ে পড়ছে।এ বিষয়ে অন্য একটি ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তাদের করার কিছুই নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিমালা দিয়ে ব্যাংকগুলোকে আটতে না পারলেও তাদেরকে ডেকে এনে এ বিষয়ে সতর্ক করতে পারে। কিন্তু তাও করা হচ্ছে না। ফলে এক শ্রেণীর ব্যাংক চুটিয়ে ব্যবসায় করছে। সাধারণ ব্যাংকগুলো জিম্মি হয়ে পড়ছে ওই সব ব্যাংকের কাছে।

অপর একটি ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ডলার সরবরাহ করলে বাজার পরিস্থিতিতে অনেকটাই ঠিক হয়ে যেত। কিন্তু তা করা হচ্ছে না। বরং এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বলতে গেলে উল্টো কথা বলা হচ্ছে। ধমক দেয়া হচ্ছে ডলারের ব্যবস্থা না করে পণ্য আমদানির জন্য এলসি খোলার প্রয়োজন কী।

বাজার বিশ্লেষকেরা জানিয়েছেন, আমদানি ব্যয় যেভাবে বাড়ছে সেই অনুযায়ী ডলারের সরবরাহ বাড়ছে না। গত আগস্ট মাসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আগস্টে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হয়েছে শূন্য দশমিক ৫৩ শতাংশ। আর রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ঋণাত্মক ১১ দশমিক ৭৪ শতাংশ। কিন্তু সেই অনুযায়ী আমদানি ব্যয় কমছে না। বরং সামনে এ দায় আরো বেড়ে যাবে। বিশেষ করে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জ্বালানি তেল সরবরাহ করতে তেল আমদানিতে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। অপর দিকে নভেম্বর ও ডিসেম্বর পণ্য আমদানি বেড়ে যাওয়ার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার বিভিন্ন দায় পরিশোধের চাপ বেড়ে যাবে। একই সাথে জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে এক ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হবে। ফলে ডলারের সরবরাহ কাক্সিক্ষত হারে বাড়বে না।

এদিকে ডলার সঙ্কট সৃষ্টির সাথে সাথে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও কমতে শুরু করেছে। গত ৩০ এপ্রিল রিজার্ভ ছিল ৩ হাজার ৩০৯ কোটি ৬৩ লাখ ডলার, এর পর থেকে বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ কমতে শুরু করেছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর এসে তা কমে নেমেছে ৩ হাজার ১৮৮ কোটি ৮৭ লাখ ডলার। এ অবস্থায় সরবরাহের উন্নতি না হলে সামনে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের অস্থিতিশীলতা আরো বেড়ে যাবে।

ডলার সঙ্কটের প্রভাব দেশের মূল্যস্ফীতির ওপরও পড়তে পারে। ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানিকৃত পণ্যের খরচ বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর।