ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG

এনএনবিডি ডেস্ক

৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৮:০৯

নবী-পরিবারের বন্দিদের এই দিনে দামেস্কের দিকে পাঠানো হয়

7257_উট.jpg
আজ থেকে ১৩৭৯ চন্দ্রবছর আগের কথা। ৬১ হিজরির এই দিনে কারবালার বন্দিদেরকে তড়িঘড়ি করে দামেস্কের দিকে পাঠানো হয়। বন্দিদের বেশিরভাগই ছিলেন নারী ও শিশুসহ নবী-পরিবারের সদস্য।

নবী-পরিবারের বন্দিদের মধ্যে ছিলেন হযরত ইমাম হুসাইনের (আ) বোন হযরত জাইনাব (সা.আ) ও পুত্র ইমাম জাইনুল আবেদিন (আ)। ইয়াজিদের নিযুক্ত ইরাকের গভর্নর উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদের নির্দেশে এই পদক্ষেপ নেয় ইয়াজিদ-বাহিনী। দামেস্কে ইয়াজিদের দরবারে নেয়ার জন্য বন্দিদেরকে একটি অভিন্ন দড়িতে বাঁধা হয়।

ঐতিহাসিক বর্ণনায় এসেছে: ইমাম হুসাইন (আ.)-এর ছিন্ন-মাথা পাঠিয়ে দেওয়ার পর উবায়দুল্লাহ শিশুদের এবং নারীদের প্রস্তুত করলো এবং ইমাম আলী বিন হুসাইন (আ.) এর গলায় একটি লোহার বেষ্টনি পরালো এবং তাদেরকে মাথার পিছনে রওয়ানা করিয়ে দিলো মাখফার বিন সা’লাবাহ আ’য়েযী এবং শিমর বিন যিলজাওশানকে দিয়ে এবং তারা একসময়ে মাথাগুলো বহনকারী কাফেলার সাথে যুক্ত হলো। ইমাম জাইনুল আবেদীন (আ.) পথে তাদের সাথে কোন কথা বললেন না সিরিয়া পৌঁছা পর্যন্ত।

কুফায় নবী-পরিবারের উপস্থিতিকে ভয় পাচ্ছিল ইবনে জিয়াদ। কারবালার ঘটনার প্রেক্ষাপটে ইবনে জিয়াদ ও তার দলবল উমাইয়া শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিক্রিয়া ও বিদ্রোহের আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। তাই তারা জনগণের সম্ভাব্য প্রতিরোধ ও ক্ষোভ এড়ানোর জন্য নবী-পরিবারসহ কারবালার সব বন্দীদেরকে দামেস্কে পাঠানোর জন্য জনমানবহীন অচেনা পথগুলো ব্যবহার করতে সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেয়।

কুফায় ইবনে জিয়াদের দরবারসহ নানা স্থানে এবং দামেস্কে ইয়াজিদের দরবারে বন্দী অবস্থায় ইমাম হুসাইন (আ.)’র বোন হযরত জাইনাব (সা.) যেসব সাহসী বক্তব্য রেখেছিলেন তা ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।

কুফায় তাঁর ভাষণ শ্রবণকারী একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেছিল, আল্লাহর শপথ, "এমন আর কোনো লজ্জাশীলা নারীকে কখনও এমন ভাষণ দিতে শুনিনি।" তার ভাষণে ছিল পিতা হযরত আলী (আ.)'র বীরত্ব, বাগ্মিতা ও নারীসুলভ লজ্জাশীলতা।

কুফা নগরীর প্রবেশ দ্বারের কাছে মাত্র দশ-বারোটি বাক্যে তিনি তাঁর ভাষণ শেষ করেছিলেন। কুফাবাসীরা জাইনাব(সা.)'র যৌক্তিক ও মর্মস্পর্শী তিরস্কার শুনে অনুশোচনা ও বিবেকের দংশনের তীব্রতায় নিজেদের আঙুলগুলো মুখে ঢুকিয়ে কামড়াচ্ছিল। এখানে নারীসুলভ মর্যাদা বজায় রেখে সাহসী বীর নারী ইমাম হুসাইন (আ.)'র কন্যা ফাতিমা (সা. আ.) একটি সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিয়েছিলেন। সে সময়ও সবাই অশ্রু-সজল হয়ে পড়ে।

হযরত জাইনাব (সা.) কুফাবাসিকে তিরস্কার করে বলেছিলেন, " তোমরা নিজেদের জন্য চিরন্তন অপরাধ ও লজ্জা রেখে এসেছ এবং চিরন্তন লাঞ্ছনা খরিদ করেছ। তোমরা কোনোদিনই এ লাঞ্ছনা দূর করতে সক্ষম হবে না। আর কোনো পানি দিয়েই তা ধুয়ে ফেলতে পারবে না। কারণ, তোমরা হত্যা করেছ হুসাইনকে যিনি হচ্ছেন খাতামুন্নাবিয়্যিনের(সা.)'র কলিজার টুকরা, বেহেশতে যুবকদের নেতা।"

জাইনাব (সালামুল্লাহি আলাইহা)সহ নবী পরিবারের বন্দীদেরকে কুফায় ইবনে জিয়াদের দরবারে নিয়ে আনা হলে জিয়াদ তাঁকে বিদ্রূপ করে বলেছিল: সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি তোমাদের লাঞ্ছিত করেছেন, তোমাদের পুরুষদের হত্যা করেছেন এবং তোমাদের বাগাড়ম্বরকে মিথ্যা প্রমাণ করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে জাইনাব (সা.) জবাব দিয়েছিলেন: "সব প্রশংসা আল্লাহর যিনি নবী মুহাম্মাদ(সা.)'র বদৌলতে আমাদেরকে সম্মানিত করেছেন এবং আমাদেরকে সব অপবিত্রতা থেকে মুক্ত করেছেন। অবশ্যই ফাসেক লাঞ্ছিত হবে এবং ফাজের বা পাপাচারী মিথ্যা বলছে, (যার বাগাড়ম্বরের কথা সে বলছে) সে ব্যক্তি আমরা ছাড়া অন্য কেউ। তাই সব প্রশংসা আল্লাহর।"

ইবনে জিয়াদ এবার বিদ্রূপ করে বলল: আল্লাহ তোমার ভাইয়ের সাথে যে আচরণ করলেন তা কেমন দেখলে? সে খলিফা ইয়াজিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল ও প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, তাই আল্লাহ তাকে হতাশ করলেন এবং ইয়াজিদকে সাহায্য করলেন।

জবাবে জাইনাব (সা.) বলেছিলেন, " আমরা এতে উত্তম ছাড়া অন্য কিছু দেখিনি। আল্লাহ আমার ভাইকে শাহাদতের মর্যাদা দিয়ে সম্মানিত করেছেন, এটা তথা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হওয়া সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য।...আল্লাহ তোমাকে এবং তুমি যাদের হত্যা করেছ তাঁদের সবাইকে খুব শিগগিরই বিচারের জন্য নিজ দরবারে হাজির করবেন, সেদিনের জন্য প্রস্তুত হও তুমি, সেদিন কী জবাব দিবে তুমি, সেদিনের জন্য উদ্বিগ্ন হও। কে সেদিন বিজয়ী ও সফল হবে, হে যেনাকারিণীর পুত্র?"

এরপর নেকড়ের মত ক্ষিপ্ত হয়েও নির্লজ্জের মত জিয়াদ বলে, " আমি খুশি হয়েছি, কারণ, যা চেয়েছি তা পেয়েছি। "

জবাবে জাইনাব (সা.) বলেছিলেন," তুমি দুনিয়ার মাধ্যমে নেশাগ্রস্ত, প্রতারিত ও ফিতনাগ্রস্ত। তুমি কি মনে করেছ হুসাইনের পরে তুমি আনন্দের সঙ্গে পৃথিবীতে চিরদিন টিকে থাকবে? স্বস্তিতে থাকবে? কখনও না, তুমি স্বস্তির মুখ দেখবে না। তুমি কখনও তোমার অভীষ্ট লক্ষ্যে উপনীত হতে পারবে না। হে ইবনে জিয়াদ! তুমি নিজের হাতে নিজের ওপর যে কলঙ্ক লেপন করেছ তা অনন্তকাল পর্যন্ত থেকে যাবে।"

এতে দিশেহারা, অস্থির ও ক্ষিপ্ত হয়ে ইবনে জিয়াদ চিৎকার করে বলে: " আমাকে এ নারীর হাত থেকে মুক্তি দাও; ওদেরকে কারাগারে নিয়ে যাও।"

শেইখ সাদূক্ব তার ‘আমালি’ গ্রন্থে এবং ফাত্তাল নিশাপুরি তার ‘রাওযাতুল ওয়ায়েযীন’ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন উবায়দুল্লাহর এক খাদেমের কাছ থেকে যে, সে বলেছে, যখন ইমাম হুসাইন (আ.)-এর মাথাটি উবায়দুল্লাহ বিন যিয়াদের কাছে আনা হলো সে এটিকে একটি সোনালী ট্রে-তে রাখতে আদেশ দিলো। এরপর সে তার বেত দিয়ে এর সামনের দাঁতগুলোতে আঘাত করতে লাগলো এবং বললো, হে আবা আবদিল্লাহ, তুমি খুব তাড়াতাড়িই বৃদ্ধ হয়ে গেছো। উপস্থিতদের মধ্যে একজন বললো, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে দেখেছি সেখানে চুমু দিতে যেখানে তুমি তোমার বেত দিয়ে আঘাত করছো। সে বললো, এ দিনটি হলো বদরের দিনের বদলা। এরপর সে আদেশ দিলো আলী বিন হুসাইন (আ.)-কে শেকলে বাঁধতে এবং তাঁর পরিবারের নারী ও অন্যান্য বন্দীদের সাথে কারাগারে পাঠাতে। আমি তাঁদের সাথে ছিলাম এবং দেখলাম সবগুলো রাস্তা পুরুষ ও নারীতে পূর্ণ ছিলো এবং তারা নিজেদের চেহারায় আঘাত করছিল এবং কাঁদছিলো। তারা তাদেরকে কারাগারে ঢুকালো এবং দরজায় তালা মেরে দিলো। এরপরে সে আলী বিন হুসাইন (আ.) এবং নারীদের সাথে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর মাথা আনতে বললো, তাদের সাথে সাইয়েদা জাইনাব (আ.)ও ছিলেন। ইবনে যিয়াদ বললো, “সব প্রশংসা আল্লাহর যে তিনি তোমাদেরকে অপমান করেছেন এবং হত্যা করেছেন।” এরপর উবায়দুল্লাহ তাদেরকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ করলো এবং সব জায়গায় ইমাম হুসাইন (আ.)-এর মৃত্যুর সংবাদ পাঠালো ও ইমাম হুসাাইন (আ.)-এর মাথাসহ বন্দিদেরকে সিরিয়ার উদ্দেশ্যে পাঠালো। সূত্র : পার্সটুডে