ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG

শহীদুল ইসলাম

২২ অক্টোবর ২০১৮, ১৫:১০

গণতন্ত্রের অন্তরায় বটগাছটি আগে সরাতে চায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট

8039_mmmm.jpg
আবারো একটি ৫ জানুয়ারি মার্কা একতরফা ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতাকে আগামী ৫ বছরের জন্য নবায়ন করে নিতে চায় ক্ষমতাসীনরা। এজন্যই সংবিধানের দোহাই দিয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধিনেই আগামী ১১শ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তারা।জনগনকে হয়তো আস্থায় নিতে পারছেনা বলেই নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে তারা নারাজ। এর নাম গণতন্ত্র নয়।সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক বোদ্ধার মনে করছে জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা তথা জনগণকে ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে বর্তমানে একমাত্র অন্তরায় হলো আওয়ামী লীগ।তাই তাদেরকেই আগে সরাতে হবে।

গত ১৩ অক্টোবর যখন বিএনপি, ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম, আ স ম রবের জেএসডি ও মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ে নতুন রাজনৈতিক জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে।অনেক বাধা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত ন্যূনতম শর্তে এবং বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দিয়ে ঐক্যফ্রন্টের যাত্রা শুরু হয়েছে।অনেক মত ও পথের সমন্বয় ঘটেছে এই ফ্রন্টে।উদ্দেশ্য একটাই আগে গণতন্ত্রের পথের কাঁটা সরাতে হবে।ধরুন ঢাকার গাবতলি বাসটার্মিনাল থেকে উত্তরবঙ্গ এবং দক্ষিণবঙ্গের গাড়িগুলো ছেড়ে গেল। নবীনগর পর্যন্ত দুই বঙ্গের গাড়ির জন্যই রাস্তা এক এবং অভিন্ন। তার আগেই সাভারে গিয়ে দেখা গেল রাস্তার মধ্যে পড়ে আছে বিশাল একটি বটগাছ। এ অবস্থায় দুই বঙ্গের লোকেরা যদি ঝগড়া করে অথবা মনে করে ওরা বটগাছ সরিয়ে ফেলুক তারপর আমরা যাব সেই চিন্তা সঠিক নয়। বরং দুই বঙ্গের লোকেরা মিলে যদি চেষ্টা করে সম্মিলিত শক্তির মাধ্যমে রাস্তা আটকে রাখা বটগাছটি সরাতে, তাহলে সেটা সম্ভব। কারণ আমরা জানি দশের লাঠি একের বোঝা।বটগাছটা সরাতে পারলে দুইবঙ্গের লোকেরাই স্ব স্ব গন্তব্যে যেতে সক্ষম হবেন।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এখন সকল সংকীর্ণতা ভুলে গিয়ে পথের বটগাছটি সরিয়ে ফেলতেই ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। ২৪ অক্টোবর সিলেটে হযরত শাহজালালের মাজার জিয়ারতের পর সিলেটে জনসভার মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম শুরু করবে। তাদের প্রথম লক্ষ্য হলো গণতন্ত্রের অন্তরায় বটগাছটিকে সরিয়ে ফেলা।তারপর জনগনের ভোটের পরিবেশ তৈরি হলে আসন বন্টনের বিষয়টি তখন দেখা যাবে। প্রথম টার্গেট বটগাছ সরানো।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করার প্রক্রিয়ায় বাদ পড়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্প ধারা। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে বি. চৌধুরীর দল কেন বাদ পড়ল তা নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে নানা কৌতুহল। তবে, এটা ঠিক যে,বিগত ২ বছর ধরে এ ধরনের একটি ঐক্যের ব্যাপারে অত্যন্ত তৎপর ছিলেন সাবেক এই রাষ্ট্রপতি।আবার বাদ পড়ার পর তার ক্ষুদ্র দলটিতেও দেখা দিয়েছে বড় ভাঙ্গন।বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে তাই বি. চৌধুরীর জন্য একটি বড় ধরনের আছাড় খাওয়ার মত ঘটনা বটে।

প্রথমে দ্বিধাদ্বন্দ থাকলেও কয়েক মাস আগে ড. কামালের গণফোরামের সঙ্গে মিলে বি. চৌধুরী বৃহত্তর ঐক্যের আহবানে বিএনপি ভালোভাবেই সাড়া দেয়। আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক জোট গড়ে তোলার চেষ্টা বিএনপিও বেশ কিছুদিন ধরে করে আসছিল। পরবর্তিতে অগ্রনী ভুমিকাও নিতে হয়েছে বিএনপি নেতৃবৃন্দকেই। এ লক্ষ্যে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সিনিয়র নেতৃবৃন্দ বেশ কয়েকটি বৈঠকও করেছেন ঐক্য প্রক্রিয়ার উদ্যোক্তা দুই প্রবীণ নেতার সাথে। জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং আগামী নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে অংশ নিতে বিএনপি সর্বোচ্চ ছাড় দিতেও রাজি হয়।

বাদ সাজে বি. চৌধুরীপুত্র মাহী চৌধুরীর কিছু অনাকাঙ্খিত ও বিতর্কিত তৎপরতা।বটগাছ সরানোর প্রথম ও প্রধান এজেন্ডার পরিবর্তে আসন ভাগাভাগিকে গুরুত্ব দেন তিনি। বি. চৌধুরীর বাসায় বিএনপি মহাসচিব ও বি. চৌধুরীর অনানুষ্ঠানিক বৈঠক চলাকালে মাহী ঐক্যের শর্ত হিসেবে যুক্তফ্রন্টকে দেড় শ’ আসন দিতে হবে-এমন মামাবাড়ির আবদার করে বসেন। রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক শক্তির বিবেচনায় যুক্তফ্রন্টভ‚ক্ত দলগুলোর দেড় শ’ আসন দাবির ন্যুনতম যৌক্তিকতা নেই। পরবর্তীতে মাহী চৌধুরী আরো দাবি তোলেন যে, বিএনপিকে যদি বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়ায় আসতে হয়, তাহলে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সব ধরণের সম্পর্ক ছিন্ন করে আসতে হবে।এ দাবির পেছনে পিতা বি. চৌধুরীরও সমর্থন ছিল। এসব কারণে এক পর্যায়ে জাতীয় ঐক্য গঠন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল।

অভিজ্ঞ মহল বলছেন, মাহীর এসব দাবি-দাওয়া মূলত বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়াকে নস্যাৎ করারশামিল। তার পিতা বি. চৌধুরী এক সময় জামায়াতের সমর্থনে গঠিত বিএনপির মন্ত্রী পরিষদের সদস্য ছিলেন, এমন কি জামায়াতের সমর্থন নিয়ে তিনি দেশের রাষ্ট্রপতিও হয়েছিলেন। এসবের মাধ্যমে আসলে বিকল্প ধারা এবং তারা বাপ বেটা কোন দিকে গোল দেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন তা বিশ্লেষণ সাপেক্ষ।

প্রাপ্ত তথ্যমতে,গত ২২ সেপ্টেম্বর ঐক্য প্রক্রিয়ার যে সমাবেশ মহানগর নাট্য মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় তার আগের দিন বিএনপি মহাসচিবসহ কয়েকজন সিনিয়র নেতা যান বি. চৌধুরীর বাসায় তার মান ভাঙাতে। শোনা যায়, বি. চৌধুরী নাকি শর্ত দিয়েছিলেন বিএনপিকে যদি নাট্য মঞ্চের সমাবেশে অংশ নিতে হয়, তাহলে অতীতে তার সাথে দলটি যে আচরণ করেছে, তার জন্য দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা চাইতে হবে। বিএনপি নেতৃবৃন্দ বি. চৌধুরীর কাছে দু:খ প্রকাশ করেন বলেও পত্রিকায় খবর এসেছে। তারপরও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন প্রক্রিয়ায় বি.চৌধুরীর দল চুড়ান্তভাবে বাদ পড়লো।নানান দিকে খেলতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত ধরা খেয়ে গেলেন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষক মহল।

কোনো দল রাষ্ট্র ক্ষমতায় গিয়ে যাতে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে না পারে সেজন্য সংসদীয় আসন বন্টনের ক্ষেত্রে সাম্যনীতি অনুসরণ করতে হবে এমনটি ভেবেছিলেন বি.চৌধুরী। এজন্যই তারা দেড় শ’ আসন দাবি করেছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, যদি নির্বাচনে বৃহত্তর ঐক্যজোট জয়লাভ করে, তাহলে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিএনপি যেন ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে না পারে। বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব হয়তো বিষয়টি বুঝতে পেরেই তাদের জালে ধরা দেয়নি।বিকল্প ধারার নেতারা তা মানতে চাননি।

নেতৃত্বের দ্বন্দও হয়তো বি.চৌধুরী দুরে নিয়ে যেতে পারে।বৃহত্তর ঐক্যজোট হলে এর প্রধান নেতা কে হবেন তা নিয়ে ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে বি. চৌধুরীর স্নায়ূযুদ্ধ লেগেই ছিল। এক পর্যায়ে এসে তারা সিদ্ধান্ত নেন যে, প্রয়োজনে বিকল্প ধারাকে বাদ দিয়েই জাতীয় ঐক্য গঠন করা হবে। তাই হয়েছে ১৩ অক্টোবর।ঐদিন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হবার পর বি. চৌধুরী নিজ বাসায় সংবাদ সম্মেলন করে যে বক্তব্য রেখেছেন, তাতে থলির বিড়াল বেরিয়ে আসে।

তিনি বলেন, জাতীয় ঐক্যের নামে এককভাবে বিএনপিকে ক্ষমতায় বসানোর ‘চক্রান্তের সঙ্গে নেই বিকল্প ধারা। তাহলে কাদের ক্ষমতায় বসানোর জন্য বিকল্পধারা জাতীয় ঐক্যের ফাঁদে ফেলতে চেয়েছিলেন বিএনপিকে।ঐক্যের নামে তারা আওয়ামীলীগের স্বার্থ সিদ্ধি করতে চেয়েছিলেন বলে অনেকেই মনে করছেন। বিএনপির কাছ থেকে উরেøখযোগ্য সংখ্যক আসন বাগিয়ে নিয়ে সরকার গঠনের সময় হয়তো তারা ডিগবাজি দিয়ে আ’লীগকে সমর্থন দিতেও কসুর করতেননা।

সব বাধা পেরিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এখন বাস্তবে রুপ নিয়েছে।২৪ অক্টোর থেকে রাজপথে তাদের কর্মসূচী আসছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে পারে ৭ নবেম্বর। তার আগেই নির্দলীয় সরকারের অধিনে নির্বাচন অনুষ্ঠান,খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ ৭ দফা দাবি আদায়ে তারা কতটা সক্ষম হবে তা নিয়ে অবশ্য প্রশ্ন আছে।দাবি না মানলে ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে যাবে কিনা তা এখনও স্পষ্ট করে বলা হয়নি। তবে তাদের তৎপরতা যে নির্বাচনী শো ডাউনে রুপ নেবে তা বোঝা যায়।আন্দোলন অথবা নির্বাচন যেকোন প্রক্রিয়ায়ই হোক জনগনের ভোটাধিকার পূণ:প্রতিষ্ঠার জন্য অন্তরায় বটগাছটি সরাতে হবে-এ বিষয়ে কোন দ্বিমত নেই। তবে সময় বলে দেবে তা কোন প্রক্রিয়ায় হবে। রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই তা জানা। তাই ফ্রন্টের শুরু হয়েছে মাত্র। এখন বলা সম্ভব নয় যে,কোন প্রক্রিয়ায় বটগাছ সরানো যাবে এবং জনগণ তাদের পছন্দমত নেতৃত্ব নির্বাচন করতে পারবে।