ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

জুনাইদ কবির, ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি

২৪ অক্টোবর ২০১৮, ১৮:১০

আন্তনগর ট্রেনের অপেক্ষায় ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষ

8114_nnnnnnnnnnnnnn.jpg
সরকারের সদিচ্ছার কোন কমতি ছিলনা, প্রয়োজনীয় বরাদ্ধ ছিল। রেললাইন প্ল্যাটফরম আধুনিকায়ন করা হল। মানুষের প্রতিক্ষা ছিল পঞ্চগড়- ঠাকুরগাঁও সরাসরি আন্তনগর ট্রেন চলবে, কিন্তু সেটা আর হলোনা। ঠাকুরগাঁও পঞ্চগড়ের সাধারণ মানুষকে হতাশ করে ২০১৭ সালের জুলাই মাসের ১৭ তারিখে পঞ্চগড় রেলস্টেশন চত্বরে এক অনুষ্ঠানে শাটল ট্রেন চলাচল উদ্বোধন করেন রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক। এ সময় পঞ্চগড় থেকে ঢাকা সরাসরি আন্তনগর ট্রেন চালুরও ঘোষণা দেন তিনি। এরপরেও একাধিক সাংসদ উক্ত লাইনে সরাসরি আন্তনগর ট্রেন চলাচলের আশ্বাস দিলেও কার্যত এর কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছেনা। উপরন্তু দিনাজপুর-পঞ্চগড় রেলপথ ও ঠাকুরগাঁও রেল স্টেশনটি নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়ে।

৯শ’৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের আওতায় ২০১০ সালের অক্টোবরে দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর থেকে ঠাকুরগাঁও হয়ে পঞ্চগড় পর্যন্ত ১৫০ কিলোমিটারের মিটার গেজ রেলপথকে আধুনিকায়ন, সম্প্রসারণ ও ডুয়েল গেজে রূপান্তর করার কাজ শুরু হয়। ২০১৩ সালের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তারা ২ বার নির্মাণ কাজের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে কাজ শেষ করার অঙ্গিকার করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা ও ম্যাক্র কনস্ট্রাকশন। সর্বশেষ মেয়াদ ছিল ২০১৬ সালের জুলাই পর্যন্ত। কিন্তু ওই সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠান দুটি প্রকল্পের ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ করতে পারে। এই প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ৯০ কিঃ মিঃ রেলপথের মধ্যে ১৩১টি ছোট ব্রিজ ও ৩টি বড় ব্রিজ পুণঃনির্মাণ ও রেলস্টেশন পুণঃনির্মাণ কাজ। পরবর্তীতে শতভাগ কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর রেলমন্ত্রী পঞ্চগড়ে এসে প্রত্যাশার আন্তঃনগর ট্রেনের পরিবর্তে শাটল ট্রেন উদ্বোধন করেন। এসময় উপস্থিত নেতৃবৃন্দ এবং সাধারণ মানুষ সরাসরি আন্তঃনগর ট্রেন চালুর দাবি করলে মন্ত্রী বলেন “আওয়ামী লীগ জনগণের দাবির প্রতি সবসময়ই শ্রদ্ধাশীল। জনগণের দাবি মেনে দ্রুত আন্তঃনগর ট্রেন চালু করা হবে।

আগামী ২০ জুন ইন্দোনেশিয়া থেকে ৫০টি উন্নতমানের ব্রডগেজ রেল কোচ আমদানির জন্য চুক্তি স্বাক্ষরের কথা রয়েছে। সেই কোচ এলেই পঞ্চগড় থেকে সরাসরি আন্তঃনগর ট্রেন চালু করা হবে।” এর পরেও অজ্ঞাত কারণে চালু হয়নি ঢাকা- ঠাকুরগাঁও- পঞ্চগড় সরাসরি আন্ত:নগর ট্রেন। সে সময় সরাসরি আন্তঃনগর ট্রেন চালুর দাবিতে ফুসে উঠে দুই জেলার মানুষ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রেন চালু না হওয়ায় সমালোচনার ঝড় ওঠে। বিক্ষোভ, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করেছেন সাধারণ মানুষ। এরপরও একাধিক বার দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ সরাসরি ট্রেন চালু করার কথা বললেও এখন পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি। নেতারা আগামী ঈদের আগেই আন্তঃনগর ট্রেন চালু হতে পারে বললেও ৪টি ঈদ গত হয়েছে, ট্রেন আর চালু হয়নি। নতুন বছরে শুরুর কথা বলা হলেও নতুন বছরটিও শেষ হচ্ছে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী গত ২৯ মার্চ আন্তনগর ট্রেন চালু করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই মতে সাম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে রেল মন্ত্রণালয়ে এব্যাপারে চিঠিও যায়। রেলের পশ্চিমাঞ্চলের (রাজশাহী) এক কর্মকর্তা জানান, “বললেইতো আর নতুন ট্রেন হচ্ছেনা। রেল ইঞ্জিন, রেল কোচ কোথায়? কোথায় পাওয়ার কোচ, খাওয়ার গাড়ি। চালক, গার্ড ও অন্যান্য আরো অনেক লোকবল প্রয়োজন। লোকবলের অভাব এমন পর্যায়ে গেছে যে প্রায়ই ছোট ছোট স্টেশন বন্ধ হচ্ছে।”

এদিকে রেলপথ আর রেল স্টেশন আধুনিকায়ন হলেও লোকবলের অভাবে আখানগর, রুহিয়া, কিসমত, নয়নবুরুজ, শীবগঞ্জ, ভোমরাদহ ও বাজনাহার স্টেশনের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। শাটল ট্রেন উদ্বোধনের পর ঠাকুরগাঁও রেল স্টেশনে প্রতিদিন ২০টি শোভন চেয়ার টিকিট বিক্রি করা হলেও এখন এ সংখ্যা বাড়িয়ে ৩২টি করা হয়েছে। এর মধ্যে শোভন চেয়ার ৩০টি ও প্রথম শ্রেণি এসি ২টি।

এছাড়াও পঞ্চগড়ে ৩৫টি, রুহিয়ায় ১০টি ও পীরগঞ্জে ২৬টি শোভন শ্রেণির টিকিট বিক্রি করা হয়। রুহিয়া রেল স্টেশনের জন্য ১০টি টিকিট বরাদ্ধ থাকলেও রুহিয়া ও পঞ্চগড়ের স্টেশন মাস্টার হিসেবে একই ব্যক্তি দায়িত্ব পালন করায় জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। উক্ত স্টেশন মাস্টার পঞ্চগড়ে দায়িত্ব পালন করায় রুহিয়ার টিকিটগুলো যাত্রীরা যথাসময়ে পান না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেন রাতে স্টেশন মাস্টার রুহিয়ার বাসায় এলে সেখান থেকে উক্ত টিকিট কেনেন যাত্রীরা। উলে­খ্য ঠাকুরগাঁও রেল স্টেশনে প্রতিদিন গড়ে একশ টিকিট প্রয়োজন হয়। চাহিদার তুলনায় টিকিটের জোগান কম থাকায় প্রায়ই যাত্রীদের সাথে বচসা হয় বলে স্টেশন মাস্টার জানালেন। ঈদের সময় পালিয়ে বেড়াতে হয় তাঁকে।

এদিকে ঠাকুরগাঁও রেল স্টেশনের স্টেশন মাস্টার আখতারুল ইসলাম জানান, নয়দিন আগেই আগাম টিকিট ছাড়া হয়। নির্দিষ্ট তারিখের তিন/চারদিন আগেই সকল টিকিট বিক্রি হয়ে যায়। রেল স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি হয় এমন অভিযোগের ব্যাপারে তিনি জানান, কেউ যদি যাত্রী সেজে আগাম টিকিট কেটে রেখে পরে সেটা বেশি দামে বিক্রি করে তবে আমরা সেটা কীভাবে ঠেকাবো? এব্যাপারে রেল স্টেশনের কেউ জড়িত আছে কি-না এমন এক প্রশ্নের জবাবে তিনি ব্যাপারটি অস্বীকার করেন।

রেল স্টেশন অপরিষ্কার থাকার বিষয়ে স্টেশন মাস্টারের দৃষ্টি আকর্ষন করলে তিনি জানান, এখানে রেলওয়ের কোন পরিচ্ছন্নতা কর্মী (সুইপার) নেই। এ পদের জন্য কোন বরাদ্ধও নেই। পকেটের পয়সা খরচ করে কাউকে দিয়ে শুধু ঝাড়– দেয়া হয়। পাশে বসা অবসরপ্রাপ্ত স্টেশন মাস্টার শামসুল আলম বলেন “আগে প্রতিমাসে সুইপার বাবদ ১৫শ টাকা দেয়া হতো, এখন সেটাও বন্ধ”। এ লাইনে সরাসরি আন্তনগর ট্রেন চালুর ব্যাপারে কোন তথ্য তাদের কাছে আছে কি না জানতে চাইলে স্টেশন মাস্টার বলেন “হাতে এব্যাপারে কাগজ না পেলে কিছুই বলতে পারছিনা।

তাছাড়া সারা দেশে রেল ইঞ্জিন, রেল কোচ কম। চালক (লোকোমোটিভ মাস্টার) নেই। এমন কি ঢাকা রেল স্টেশন নতুন কোন ট্রেন রিসিভ করতেও অক্ষম। সেখানে আরো রেল লাইন না হলে জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে।” তবে একটি অসর্থিত সূত্র মতে আগামী নির্বাচনের আগেই দিনাজপুর থেকে ছেড়ে যাওয়া আন্তঃনগর ট্রেন একতা ও দ্রুতযান দিনাজপুরের পরিবর্তে পঞ্চগড় থেকে ঠাকুরগাঁও-দিনাজপুর হয়ে ঢাকা যাতায়াত করতে পারে। ঠাকুরগাঁও রেল স্টেশনে কথা হয় যাত্রী এহসানুল কবিরের সাথে তিনি খবরটি জানতে পেরে বলেন “আপাততঃ এটা হলেও এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা আংশিক পূরণ হবে বলে আশা করছি। এর মধ্যদিয়ে যাত্রীদের নিরাপদে চলাচলের পাশাপাশি এ অঞ্চলের কৃষিপণ্য পরিবহনেও অগ্রগতি হবে।