ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা

২৫ অক্টোবর ২০১৮, ১১:১০

গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় ভুটান

8133_Bhu.jpg
রাজার ইচ্ছাতে রাজতন্ত্রের পরিবর্তে গণতন্ত্র এসেছে এমন উদাহরণ বিশ্বে কালেভদ্রেও দেখা যায় না। কারণ, রাজতন্ত্রীরা সবসময় ক্ষমতাকে যক্ষের ধন ও দেশকে নিজেদের তালুক-সম্পত্তি মনে করে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্ষুদ্র রাষ্ট্র ভুটান। ২০০৮ সালে দেশটি পুরো বিশ^কে তাক তালিয়ে দিয়ে এমনই এক উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। যা গণতান্ত্রিক বিশে^ বেশ প্রশংসিত হয়েছে এবং অন্যদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবেও মনে করা হচ্ছে। ফলে দেশটিতে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা শুরু হয়েছে এবং রাজতন্ত্র হয়ে উঠেছে শুধুই আনুষ্ঠানিকতা ও নিয়ম রক্ষার অনুসঙ্গ।
মূলত ভুটানের অধিবাসীরা ভুটানি নামে পরিচিত। ২০০৫ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী ভুটানে ৬,৭২,৪২৫ জনের বাস। প্রতি বছর জনসংখ্যা ২% হারে বাড়ছে। জনঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৪৫ জন। ভুটানে দ্রুপকা জাতির লোক প্রায় ৫০%। এর পরেই আছে নেপালি (৩৫%) এবং অন্যান্য আদিবাসী বা অভিবাসী জাতি। দেশের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ লোক লামাবাদী বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাসী। বাকীরা ভারত ও নেপালি ধারার হিন্দু ধর্ম পালন করে। জোংখা ভুটানের সরকারী ভাষা। এছাড়াও বুমথাং-খা, শারচোপ-খা ও নেপালি ভাষা প্রচলিত। দেশটিতে ইংরেজি ভাষা বেশ গুরুত্বের সাথে শিক্ষা দেওয়া হয়। ভুটানের সাক্ষরতার হার প্রায় ৬০%। জনগণের প্রায় ৯৪% শতাংশ কৃষিকাজে নিয়োজিত। বেকারত্বের হার ৩.১%। জংখা ভাষা বা ভুটানি ভাষা ভুটানের সরকারী ভাষা। এছাড়াও এখানে আরও প্রায় ১০টি ভাষা প্রচলিত। আন্তর্জাতিক ব্যবসা বাণিজ্য ও পর্যটন শিল্পে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা হয়।
ভুটানের রাজতন্ত্রের ইতিহাস বেশ পুরনো। কিন্তু আধুনিক গণতান্ত্রিক বিশে^র সাথে তাল মিলিয়ে সে অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। আর এ পরিবর্তনটা ঘটেছে একেবারে নিরবে-নিভৃতে। পৃথিবীর একমাত্র কার্বন নেগেটিভ দেশটিতে গণতন্ত্র আনতে কোন বিক্ষোভ, আন্দোলন, কোন ভাঙচুর হয়নি। এমনকি একফোটা  রক্তও ঝড়েনি । দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক রাজনীতিতে যেখানে গণতন্ত্রের সংকটটা বেশ প্রবল সেখানে ইতিহাস সৃষ্টি করে ২০০৬ সালে রাজা জিগমে সিগমে ওয়াংচুক দর্জি স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দেন। ক্ষমতায় আসেন তার অক্সফোর্ড পড়–য়া ছেলে জিগমে খেসার নামগেয়োল ওয়াংচুক।
ক্ষমতায় বসেই খেসার ঘোষণা দিলেন পূর্ণাঙ্গ রাজতন্ত্র বিলোপ করে আনুষ্ঠানিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার। প্রসঙ্গত বলতে হয় যে,  প্রতিবেশি দেশ নেপালে রাজতন্ত্রের পরিবর্তে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ঝড়েছে অনেক রক্ত। এমনকি গোটা রাজ পরিবারকেই এজন্য প্রাণ দিতে হয়েছে। তারপরও নেপালে কোন গণতান্ত্রিক সরকারই স্থায়ী হতে পারে নি। কিন্তু ভুটান এ ক্ষেত্রে একটি অন্যন্য নজীরই স্থাপন করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা শুরু হওয়ার পর দেশটিতে ৩ বার সাধারণ নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচনে প্রতিবারই  ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। ক্ষমতায় এসেছে ৩টি আলাদা দল। এটিও আঞ্চলিক রাজনীতিতে একটি মাইল ফলক হিসেবেই মনে করেন আন্তর্জাতিক বোদ্ধামহল।
ভুটানের সাধারণ নির্বাচনের পদ্ধতি বেশ আধুনিক। দেশটিতে ১ মাসের ব্যবধানে দু’দফায় অনুষ্ঠিত হয় সাধারণ নির্বাচন। প্রথম দফায় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া দুই দল অংশ নেয় পার্লামেন্টের আসন নির্ধারণী ২য় দফার নির্বাচনে। অর্থাৎ পার্লামেন্টে থাকে শুধুমাত্র ২টি দলের প্রতিনিধিত্ব। সর্বসাম্প্রতিক নির্বাচনে প্রথম দফাতেই ধরাশায়ি হয় ক্ষমতাসীন পিপলস ডেমোক্রেটিক পাটি (পিডিপি)। দলটি পায় ২৭.৪৪ শতাংশ ভোট। যথাক্রমে ৩১.৮৪ শতাংশ এবং ৩০.৯২ শতাংশ ভোট পেয়ে ২য় দফার জন্য উত্তীর্ণ হয় দ্রুক নিয়ামরুম সংপা এবং ভুটান পিস অ্যান্ড প্রসপারিটি পার্টি। মাত্র পাঁচ বছর আগে গড়া একটি দল ভুটানের সাধারণ নির্বাচনে বিস্ময়করভাবে জয়লাভ করেছে। প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, ২০১৩ সালে গড়া মধ্য-ডানপন্থী দ্রুক নিয়ামরুপ সোগপা (ডিএনটি) দলটি সাম্প্রতিক নির্বাচনে স্পষ্টভাবেই জয়লাভ করেছে। যা দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় আঞ্চলিক রাজনীতির অলোচনার কেন্দ্র বিন্দতে পরিণত হয়।
২০০৮ সালে ভুটান থেকে পুরোদমে রাজতন্ত্রের বিলুপ্তির পর এটি দেশটিতে তৃতীয় সাধারণ নির্বাচন। চীন ও ভারতের মাঝে অবস্থিত আট লাখ জনসংখ্যার দেশটি জাতীয় সুখী সূচকের জন্য সুপরিচিত। দশ বছর আগে দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর তিন নির্বাচনে তিনটি ভিন্ন দল জয়ী হলো। যা দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক রাজনীতিতে এক অনন্য নজীর।
ভুটানের নির্বাচন কমিশনের তথ্যানুযায়ী, ২০১৩ সালে গড়া ডিএনটি দল সাম্প্রতিক নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের ৪৭ আসনের মধ্যে ৩০টিতে জয়ী হয়েছে। আর বাকি ১৭টি আসন পেয়েছে দ্রুক ফুয়েনসাম সোগপা (ডিপিটি) দল। প্রাপ্ততথ্যে জানা গেছে, গেল সেপ্টেম্বরে প্রথম দফার ভোটাভুটিতে এগিয়েছিল ডিপিটি। গতবারের ক্ষমতাসীন দল এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেনি। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে কোন পক্ষ কোন অনিয়মের অভিযোগও তোলেনি। যা ভুটানের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় ইতিবাচক ও প্রশংসারযোগ্য।
ডিএনটি দলটির নেতা ৫০ বছর বয়সী লোতে শেরিং পেশায় একজন ইউরোলজি সার্জন। তিনি বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ায় প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। মূলত ভারতের কাছে ঋণের ভারে জর্জরিত দেশটিকে টেনে তুলতে কাজ করতে চান লোতে। লোতে এছাড়া বেকারত্ব, দরিদ্রতা এবং অপরাধ কমানোর বিষয়েও নজর দিতে চান। আন্তর্জাতিক মহল তার সফলতা নিয় সতর্ক আশাবাদই ব্যক্ত করছেন।
মূলত প্রকৃতির এক নৈস্বর্গীক লীলাভূমি এই ক্ষুদ্র রাষ্ট্র ভুটান। পাহাড়-পর্বত পরিবেষ্ঠিত এই দেশকে প্রকৃতি কন্যাও বলা হয়। ভারত ও চীনের মাঝে থাকার কারণে হাই প্রোফাইল কিছু পর্যটকের পা পড়ে ভুটানে। ভারতে আসার পর ডিউক এবং ডাচেস অব ক্যামব্রিজ ভুটানে ঘুরতে যান। হিমালয়ের এই ছোট রাজ্যটি সম্পর্কে বিশ্ববাসীর কৌতুহলের কোন শেষ নেই। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত তথ্যে যা জানা গেছে তা বেশ চমকপ্রদই বলতে হবে-
১. ভুটান বহির্বিশ্ব থেকে অন্যদের তুলনায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের লালনে এরা বহির্বিশ্ব থেকে আলাদা রাখতেই পছন্দ করে। ১৯৯৯ সালে প্রথম দেশটিতে ইন্টারনেট ও টেলিভিশনের অনুমতি দেওয়া হয়। ১৯৭০-এর দশকে প্রথমবার বিদেশ পর্যটকদের প্রবেশে অনুমতি দেওয়া হয়।
২. দেশটির রাজধানী থিম্পুতে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত  বাড়ছে। তরুণ প্রজন্ম এবং জনসংখ্যার অধিকাংশ সোশাল মিডিয়া ব্যাপকভাবে গ্রহণ করেছেন। বিছিন্ন মনোভাব থাকলেও কিছু আন্তর্জাতিক ইস্যুতে তারা যথেষ্ট এগিয়ে। যেমন- ১৯৯৯ সাল থেকে পলিথিন নিষিদ্ধ করা হয়। তা ছাড়া তামাক সেখানে পুরোপুরি অবৈধ। দেশটির ৬০ শতাংশজুড়ে বনভূমি।
৩. দারুণ সুন্দর পর্যটন অঞ্চল এবং মনোমুগ্ধকর সংস্কৃতিতে পূর্ণ দেশটিতে এখনও পর্যটকদের জন্য উম্মুক্ত নয়। দক্ষিণ এশিয়ার বাইরের নাগরিকদের দেশটিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে নানা নিয়ম রয়েছে। এর জন্যে ২৫০ ডলার ফি গুনতে হবে। নিজস্ব সংস্কৃতি ও সৌন্দর্য ধরে রাখতে এবং বাইরের মানুষের প্রবেশ ব্যাপক হারে বন্ধ করতে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যা দেশটিকে আলাদা স্বতন্ত্র দিয়েছে।
৪. ভুটানে জীবনযাপনের মান বিচার করা হয় গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস (জিএনএইচ)-এর মাধ্যমে। দেশটির সরকার জনগণের বস্তুগত ও মানসিক শান্তির কথা বলেন। এ বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হয় দেশটির 'গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস সেন্টার' থেকে। এ সংস্থা একজন মানুষ পরিচালনা করেন। অধিকাংশ ভুটানবাসী তার জীবন নিয়ে সুখী।
ভুটানের জনসংখ্যা সাড়ে সাত লাখ। ভূখন্ড ৩৮ হাজার ৩৬৪ বর্গ কিলোমিটার। প্রধান ভাষা জঙ্ঘা। রাষ্ট্রধর্ম বৌদ্ধ। এ ছাড়া হিন্দু ধর্মও রয়েছে। গড় আয়ু পুরুষের ৬৬ বছর এবং নারীর ৭০ বছর। রপ্তানিযোগ্য পণ্য হলো হাইড্রোলিক পাওয়ারের মাধ্যমে ভারতে বিদ্যুৎ সরবরাহ, কাঠ, সিমেন্ট, কৃষিপণ্য এবং হস্তশিল্প।
৫. তবে সবাই সুখী নন। ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত দাসপ্রথা প্রচলিত ছিল। তিব্বতীয় সংস্কৃতির সংখ্যগরিষ্ঠ ভুটানিদের সঙ্গে সংখ্যালঘু নেপালিদের সংঘর্ষ ঘটে ১৯৯০ সালের দিকে। নেপালিদের হাজার হাজার মানুষ নেপালের রিফুজি ক্যাম্পে ছুটে যান।
৬. জনগণ দেশের রাজাকে দারুণ ভালোবাসে। ২০০৬ সালে ক্ষমতায় আসেন রাজা জিগমে খেসার ওয়াংচুক। তার সময় থেকে রাজনীতিতে নাটকীয় পরিবর্তনা আসতে থাকে। এ পরিবর্তন তার বাবার সময় থেকে শুরু হয়। বর্তমানে সরকারের সব অংশে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২০০৮ সালে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দুটো দল অংশ নেয়। রাজ পরিবার সংশ্লিষ্ট ভুটান পিস অ্যান্ড প্রোসপারিটি পার্টি (ডিপিটি) এতে জয়লাভ করে। ২০১৩ সালের দ্বিতীয় নির্বাচনে জয় পায় বিরোধী দল পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি (পিডিপি)।
৭. ভুটানবাসী প্রচুর গাছ লাগাতে পছন্দ করেন। রাজা-রানির প্রথম সন্তানের জন্ম জনগণ পালন করে ১ লাখ ৮ হাজার গাছ লাগিয়ে। গাছ তাদের কাছে দীর্ঘ জীবন, সৌন্দর্য এবং সহমর্মিতার প্রতীক। ২০১৫ সালে মাত্র ১ ঘণ্টায় ৫০ হাজার গাছের চারা লাগিয়ে ভুটান গিনেস রেকর্ড বুকে স্থান করে নেয়।
মূলত ভূটান দক্ষিণ এশিয়ার একটি রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। দেশটি ভারতীয় উপমহাদেশে হিমালয় পর্বতমালার পূর্বাংশে অবস্থিত। ভুটানের উত্তরে চীনের তিব্বত অঞ্চল, এবং দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমে ভারত। ভূটান শব্দটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ “ভূ-উত্থান” থেকে যার অর্থ “উঁচু ভূমি”। ভূটান সার্কের (ঝঅজজঈ) একটি সদস্য রাষ্ট্র। ভুটানের রাজধানীর নাম থিম্পু।
ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, ভুটান পাহাড়ের উপত্যকায় অবস্থিত অনেকগুলি আলাদা আলাদা রাজ্য ছিল। ১৬শ শতকে একটি ধর্মীয় রাষ্ট্র হিসেবে এর আবির্ভাব ঘটে। ১৯০৭ সাল থেকে ওয়াংচুক বংশ দেশটি শাসন করে আসছেন। ১৯৫০-এর দশক পর্যন্ত ভূটান একটি বিচ্ছিন্ন দেশ ছিল। ১৯৬০-এর দশকে ভারতের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সাহায্য নিয়ে দেশটি একটি আধুনিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হতে শুরু করে। তবে এখনও এটি বিশ্বের সবচেয়ে অনুন্নত দেশগুলির একটি।
১৬১৬ সালে নগাওয়ানা নামগিয়াল নামের এক তিব্বতি লামা তিনবার ভুটানের উপর তিব্বতের আক্রমণ প্রতিহত করলে ভুটান এলাকাটি একটি সংঘবদ্ধ দেশে পরিণত হতে শুরু করে। নামগিয়াল বিরোধী ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলিকে পদানত করেন, একটি ব্যাপক ও সুক্ষ্ম বিবরণসমৃদ্ধ আইন ব্যবস্থা প্রচলন করেন এবং একটি ধর্মীয় ও সিভিল প্রশাসনের উপর নিজেকে একনায়ক বা শাবদ্রুং হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর মৃত্যুর পর অন্তর্কোন্দল ও গৃহযুদ্ধের কারণে পরবর্তী ২০০ বছর শাবদ্রুঙের ক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ে। ১৮৮৫ সালে উগিয়েন ওয়াংচুক শক্ত হাতে ক্ষমতা প্রয়োগে সক্ষম হন এবং ভারতের ব্রিটিশ প্রশাসনের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন।
১৯০৭ সালে উগিয়েন ওয়াংচুক ভুটানের রাজা নির্বাচিত হন এবং ঐ বছর ডিসেম্বরের ১৭ তারিখ সিংহাসনে আরোহণ করেন। তার উপাধি ছিল দ্রুক গিয়ালপো বা ড্রাগন রাজা। ১৯১০ সালে রাজা উগিয়েন ও ব্রিটিশ শক্তি পুনাখার চুক্তি স্বাক্ষর করে যেখানে ব্রিটিশ ভারত ভুটানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক না গলানোর প্রতিশ্রুতি দেয়ে। উগিয়েন ওয়াংচুক ১৯২৬ সালে মারা গেলে তার পুত্র জিগমে ওয়াংচুক পরবর্তী শাসক হন। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা লাভের পর ভুটানকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে গণ্য করে।
১৯৪৯ সালে ভুটান ও ভারত একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে যেখানে ভুটান ভারতের কাছ থেকে বৈদেশিক সম্পর্কের ব্যাপারে পথনির্দেশনা নেবার ব্যাপারে সম্মত হয় এবং পরিবর্তে ভারত ভুটানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দেয়। ১৯৫২ সালে জিগমে ওয়াংচুকের ছেলে জিগমে দর্জি ওয়াংচুক ক্ষমতায় আসেন। তাঁর আমলে ভুটান পরিকল্পিত উন্নয়নের পথে এগোতে থাকে এবং ১৯৭১ সালে জাতিসংঘের একটি সদস্য রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তাঁর সময়েই ভুটানে একটি জাতীয় সংসদ, নতুন আইন ব্যবস্থা, রাজকীয় ভুটানি সেনাবাহিনী এবং একটি উচ্চ আদালত প্রতিষ্ঠা করা হয়।
১৯৭২ সালে ১৬ বছর বয়সে জিগমে সিংগে ওয়াংচুক ক্ষমতায় আসেন। তিনি আধুনিক শিক্ষা, সরকারের বিকেন্দ্রীকরণ, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন, পর্যটন এবং পল্লী উন্নয়নের মত ব্যাপারগুলির উপর জোর দেন। তিনি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি জনগণের সামগ্রিক সুখের একজন প্রবক্তা; উন্নয়ন সম্পর্কে তাঁর দর্শন কিছুটা ভিন্ন এবং এই ভিন্নতার কারণে তিনি আন্তর্জাতিক পরিচিত পেয়েছেন। তার আমলে ধীরে ধীরে ভুটান গণতন্ত্রায়নের পথে এগোতে থাকে। ২০০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি রাজার পদ ছেড়ে দেন এবং তাঁর ছেলে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুক ভুটানের রাজা হন। ২০০৮ সালের ১৮ই জুলাই ভুটানের সংসদ একটি নতুন সংবিধান গ্রহণ করে। এই ঐতিহাসিক দিন থেকে ভুটানে পরম রাজতন্ত্রের সমাপ্তি ঘটে এবং ভুটান একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র ও সংসদীয় গণতন্ত্রে পরিণত হয়।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্ষুদ্র ও অনুন্নত রাষ্ট্র ভুটানে দীর্ঘদিন রাজতান্ত্রিক শাসন চালু থাকলেও বর্তমান গণতান্ত্রিক বিশে^র সাথে তাল মিলিয়ে দেশটি গণতন্ত্রায়নের ক্ষেত্রে অনেকখানি এগিয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে। দেশটিতে বিতর্কহীন নির্বাচন সে ইঙ্গিত বহন করে। বিশে^র অপরাপর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যখন গণতন্ত্রের সংকট চলছে, তখন ভুটানে রাজতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণ বেশ প্রশংসারই দাবি রাখে। মূলত নব্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভুটান এখন গণতন্ত্রের মডেল রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে এবং এখন অন্যদেরকে গণতন্ত্রের দীক্ষা দিতেও শুরু করেছে। তাই তাদের কাছে অনেক কিছুই শেখার আছে। বিশেষ করে আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে।
লেখকঃ কথাসাহিত্যিক ও কলামিষ্ট।