ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

আবু কাওছার আহমেদ, টাঙ্গাইল

১ নভেম্বর ২০১৮, ১৪:১১

পলিথিনের তাঁবুটিই ওদের থাকার ঘর!

8329_25.jpg
বৃদ্ধা কুলসুম পলিথিনের খুপরিতে
ভিটে বাড়িতে পলিথিনের তাঁবু। দেখতে অনেকটা অস্থায়ী বিশ্রামাগার। অর্ধেকে শোবার জন্য চৌকি রাখা। পাশের অর্ধেকে একটি গরু রাখার জায়গা। বলা চলে সংযুক্ত গোয়াল ঘর। রোদের তাপ, শীতের উষ্ণতা আর বৃষ্টির ফোটা সহজেই ভেতরে ঢোকে। নিরাপত্তা নেই বলেই চলে। এমন একটি ঝুঁপড়িতে গত চব্বিশ দিন ধরে রয়েছেন রেহেনা বেগম (কুলসুম) নামের ৬২ বছর বয়সি এক বৃদ্ধা। পাশের আরেকটা চৌকিতে থাকছে ৩৫ বছরের ছেলে মোশারফ। ১০ বছর বয়সি নাতি আসলামও থাকে ওদের সাথে। শিশু আর নারিসহ তিনজনের থাকার জায়গা এই পলিথিনের একমাত্র ঝুঁপড়িটি।

টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার দেউলী ইউনিয়নের কড়াইল-স্বল্পবড়টিয়া গ্রামে নজরে পড়ল বৃদ্ধার এমন এক আশ্রয়স্থল । উন্নয়নশীল এই দেশে যেখানে সরকার ঘরহীন মানুষকে বিনামুল্যে ঘর দিচ্ছে সেই দেশে আজকের দিনে এমন অমানবিক দৃশ্য অনেকেরই নজর কেড়েছে। নানা শ্রেণীর মানুষ কুলসুমের ঘরটি দেখতে গেলেও কারও মানবিক নাড়া লক্ষ্য করা যায়নি।

কথা হয় কুলসুমের সাথে। গ্রামের সহজ সরল নারি রেহেনা বেগম। বছর হলো বিধাবা হয়েছেন। স্বামীর নাম স্ত্রীর মুখে আনা যাবেনা এমন বিশ^াস এযুগেও রেহেনার মধ্যে রয়েছে। অন্যকে দিয়ে স্বামীর নাম জানালেন ‘সোনা মিয়া’। গত বছরের এই দিনে মারা গেছেন সোনা মিয়া জানালেন কুলসুম । কথায় কথায় বেড়িয়ে এল কুলসুমের অনেক আক্ষেপের কথা।

দিনমুজুর আর মাটি কাটার কাজে উপার্জন করতেন সোনা মিয়া। তখন থেকেই কুলসুম আর সোনা মিয়ার পরিবারে অসচ্ছলতা। গত বছর অসুস্থ হয়ে বিনে চিকিৎসায় মারা যান তিনি। এরপর তাদের ছেলে মোশারফও মাটিকেটে সংসার চালাতো। জোড়া তালির ছোট একটি ঘর থাকলেও তার অল্প আয়ে সংসার না চলায় ঘরটি বিক্রি করে দেয়। পরে মা,ছেলে,নাতি সবাই চলে যায় টাঙ্গাইল সদরের কাকুয়া চরে মোশারফের শশুর বাড়ি। মোশারফের স্ত্রী আছমা পরিবারের একমাত্র সম্বল দুটি গরু রেখে মা-ছেলেকে তাড়িয়ে দেয়। কুলসুমের নাতনী মরিয়ম মায়ের কাছে থেকে গেলেও বাবার সাথে চলে আসে শিশু আসলাম। এরপর থেকেই ওই ঝুপড়িতে ওরা তিনজন থাকছেন।

এমন দৃশ্য দেখেও সরকারি বা বেসরকারি কোন প্রকার সহযোগিতা মেলেনি কুলসুমের ভাগ্যে। সরকার ঘরহীন মানুষকে ঘর তৈরি করে দিলেও কুলসুম পাইনি সরকারি ঘর। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে কোন প্রকার সহযোগিতা পায়নি কুলসুম। না বয়স্ক ভাতা। না পেয়েছে ন্যায্যমুল্যের চাউলের কার্ড। না ভাগ্যে জুটেছে ভিজিডি কার্ড। যদিও মঙ্গলবার প্রতিবেশি আরজু মিয়া ধার স্বরুপ একটি ৫সিট টিনের একচালা ঘরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবুও ছেলে নাতি আর নিজের জন্য ওটাও যথেষ্ট হবেনা।

কুলসুমের এই মহুর্তে একটি থাকার ঘরের প্রয়োজন। কিন্তু কে পাশে দাঁড়াবে কুলসুমের ? কে তৈরি করে দিবে কুলসুমের থাকার ঘরটি। এভাবেই খোলা আকাশের নিচেইবা কদিন কাটবে কুলসুম? এমন প্রশ্ন স্থানীয়দের।

কুলসুম জানান, ছেলের মাটিকাটার কাজ প্রতিদিন থাকেনা। তবুও যা পায় তা দিয়ে সংসার চলে যাবে। শিশু নাতির সুরক্ষার জন্য হলেও তার একটি ঘরের প্রয়োজন। তার থাকার ঘরের জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানান।

কুলসুমের পলিথিনের ঘরটি স্থানীদের নজরে আসলেও বিষয়টি জানা নেই স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের। দেউলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. কামরুল ইসলাম সাচ্চু জানান, এ বিষয়ে কেউ তাকে কিছু জানাননি। ইউপি ওয়ার্ড সদস্য আরিফুর রহমান বিষয়টি জানেন বললে ইউপি চেয়াম্যান মেম্বার আরিফের সাথে কথা বলে একটি ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন।

এক্ষেত্রে স্থানীয়রা বলছেন বিনামুল্যের ঘর পেতেও টাকা গুনতে হয়। টাকা দিতে না পারায় তার নাম বিনামুল্যের ঘরের তালিকায় না উঠতে পাওে এমন ধারণাও করছে সাধরণ মানুষ।

উপজেলা চেয়ারম্যান এসএম ফেরদৌস আহমেদ জানান, প্রধানমন্ত্রীর দেয়া বিনামুল্যে ঘর বিতরণের তালিকা মুলত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ও স্থানীয় চেয়ারম্যানের সমন্বয়ে হয়ে থাকে। দেলদুয়ারে প্রায় ৫শ ঘর বিনামুল্যে নির্মান হলেও এদের মতো মানুষ বাদ পড়াটা দু:খজনক। তবে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সাধ্যমতো সহযোগিতার আশ^াস দেন উপজেলা চেয়ারম্যান।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাদিরা আখতার জানান, যেখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন দেশের একটি মানুষও না খেয়ে থাকবে না, একটি মানুষ ঘরবিহীন থাকবেনা সেখান এমনটা কেন হবে অবশ্যই বিষয়টি দেখবো। তিনি আরও বলেন আমি নতুন এসেছি, আমি প্রথম দিনই বলেছি এমন মানবিক ঘটনা থাকলে আমাকে জানাবেন। আমি ব্যবস্থা নেব। এখন জানলাম দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছি। জানার পর তাৎক্ষণিক ওই বাড়িতে লোক পাঠিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ারও আশ^াস দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।