ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা

৩ নভেম্বর ২০১৮, ১১:১১

সংবিধান কোন বাধা নয়

8353_Cons.jpg
অবাধ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দল সহ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহল থেকে বিভিন্ন প্রস্তাবনা ও সুপারিশ থাকলেও সরকার তা আমলে নিচ্ছে না। সদ্য গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য যে সাত দফা দিয়েছে তাতে ক্ষমতাসীনরা নেতিবাচক অবস্থানই গ্রহণ করেছে। তাদের পক্ষে সাফ জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, তারা ঐক্যফ্রন্টের  কোন দফায় মানবেন না। ক্ষমতাসীনরা এসব দাবিকে অসাংবিধানিক বলে আখ্যা দিয়ে চলেছেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারাও যেকোন মূল্যে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আদায় করার প্রত্যয় ঘোষণা করেছে। ফলে দেশে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে উভয় পক্ষ এখন মুখোমুখি অবস্থানে। যা জনমনে উদ্বেগ-উৎকন্ঠার সৃষ্টি করেছে। যদিও বহু প্রত্যাসিত সংলাপ নিয়ে জনমনে অনেকটা আশাবাদের সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু স্বার্থবাদী রাজনীতির কারণে আমরা পরাস্ত হয়েছি বলেই মনে হচেছ। সংলাপ নিয়ে অনেক খনার বচন শোনা গেলেও তার বাস্তব প্রতিফলনটা আমাদের কাছে প্রায়ই অধরা।
অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের বিষয়ে যে অংশীজনের মধ্যে বড় ধরনের আস্থার সংকট রয়েছে তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। খুব সঙ্গত কারণেই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহল থেকে গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের তাগিদ দেয়া হলেও সরকার নাকের ডগায় মূলা আর পিঠে কুলা ঝুলিয়েছে। ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে সরকার সংবিধান রক্ষা করতে গিয়ে প্রয়োজনে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে নামতেও প্রস্তুত। ক্ষমতাসীনদের ভাবনায় একথায় বোধহয় স্থান পেয়েছে যে, মানুষের জন্য সংবিধান নয় বরং সংবিধানের জন্যই মানুষ। তাই সংবিধান রক্ষার জন্য যদি রাম-রাবনের যুদ্ধ শুরু হয় তাতেও সমস্যা নেই। সংবিধান রক্ষার গরজ বলে কথা।
মহাভারতে বর্ণিত কুরুক্ষেত্র মহাসমর সংঘঠিত হয়েছিল কৌরব ও পান্ডব পক্ষের মধ্যে। কাহিনী পৌরাণিক হলেও এই লড়াই শুরু হয়েছিল রাজশক্তি অর্জনকে কেন্দ্র করে ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র দুর্যধন ও পঞ্চপান্ডবের মধ্যে। কিন্তু তা কারো জন্যই ইতিবাচক হয়নি। পৌরানিক বর্ণনায় ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ছিল কুরুক্ষেত্র মহাসমর। যুদ্ধের ফলাফল এতোটাই ভয়াবহ হয়েছিল যে, যুদ্ধ সমাপ্তিতে একমাত্র জীবিত ব্যক্তি ছিলেন পঞ্চ পান্ডবের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির। যে রাজদন্ডের  জন্য এই প্রাণঘাতি মহাসমর যুদ্ধশেষে সে রাজদন্ড প্রয়োগের কোন উপযোগীতা অবশিষ্ট থাকেনি। একমাত্র জীবিত ব্যক্তি ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির এই মর্তলোকে থাকার কোন যৌক্তিকতা খুঁজে পাননি।
অনেকটা অনুতাপ নিয়েই ধর্মরাজ হিমালয় শীর্ষ হয়ে জীবতাবস্থায় স্বর্গারোহন করেছেন বলে কাশিরাম দাসের মহাভারতের বর্ণনায় পাওয়া যায়। স্বর্গলোকই যখন ধর্মরাজের গন্তব্য তখন মর্তলোকের ক্ষমতার জন্য এই প্রাণঘাতি লড়াইয়ের যৌক্তিকতা প্রশ্নবিদ্ধ। কিন্তু আমরা এই পৌরাণিক কাহিনী থেকেও মোটেই শিক্ষা গ্রহণ করিনি। চলমান রাজনৈতিক সংকটের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর যে অবস্থান তাতে আমরাও বোধহয় আত্মঘাতি যুদ্ধের দিকেই অগ্রসর হচ্ছি। আমাদের দেশের একশ্রেণির রাজনীতিকরা একেবারে পুঁজারী ব্রাহ্মণে পরিণত হয়েছেন। তারা মরে গেলেও টিকি দিতে রাজি নন। মূল সমস্যাটা সেখানেই।
অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য যেসব প্রস্তাবনা দেয়া হচেছ সেসব অসাংধানিক তকমা লাগিয়ে সরকার দায়মুক্ত থাকতে চাইছে। কিন্তু একথা বিস্মৃত হলে চলবে না যে, আমাদের দেশে যতবারই রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে তার কোনটিই সাংবিধানিক পদ্ধতি বা কাঠামোতে সমাধান সম্ভব হয়নি। ১৯৯০ সালে গণআন্দোলনের সফলতার পর তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ি যে সরকার গঠিত হয়েছিল তাও ছিল সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে। উপ-রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ ও কর্মরত প্রধান বিচারপতিকে উপ-রাষ্ট্রপতি নিয়োগ, পরক্ষণেই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ, রাষ্ট্রপতি হিসেবে উপ-রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ এবং শেষ পর্যন্ত তার স্বপদে ফিরে যাওয়া কোনটাই সংবিধান সম্মত ছিল না। তাই পরবর্তী সংসদের এসব রেটিফাই করে নিতে হয়েছিল।
এতে প্রমাণ হয় যে, সংবিধান কোন স্বর্গীয় প্রত্যাদেশ নয় যে পরিবর্তন করা যাবে না। বরং যা জনগণের জন্য কল্যাণকর সে আদলেই সংবিধান সংশোধন একটি চলমান প্রক্রিয়া হওয়ায় কাঙ্খিত।  আর এই প্রক্রিয়াকে রূদ্ধ করা উন্নয়ন, অগ্রগতি, প্রগতি ও গণতন্ত্রের জন্য সহায়ক হতে পারে না। আর সংবিধান অনুযায়ি জনগণই রাষ্ট্রের মালিক। তাই সংবিধান প্রণীত হতে হবে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আবেগ-অনুভূতি, বোধ-বিশ^াস, তাহজীব-তামদ্দুনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে। সংবিধানে সে কথারই স্বীকৃতি রয়েছে। সংবিধানের ৭ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘অষষ ঢ়ড়বিৎং রহ ঃযব জবঢ়ঁনষরপ নবষড়হম ঃড় ঃযব ঢ়বড়ঢ়ষবৃ.’ অর্থাৎ প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। তাই গণস্বার্থকে জিম্মি করে সংবিধান রক্ষার মাতম কোন ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
১৯৯৬ সালে রাজনৈতিক সংকটের যেভাবে সমাধান চাওয়া হয়েছিল তাও সংবিধান সম্মত ছিল না। তাই সে সংকটের সমাধানের জন্য ১২ ফেব্রুয়ারি একতরফা নির্বাচন ও  নির্বাচনের পর নির্দলীয় সরকারের অনুকুলে সংবিধান সংশোধন করে সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে নতুন নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তদানীন্তন ক্ষমতাসীনরা সে নির্বাচনকে নিয়মরক্ষার নির্বাচন বলে আখ্যা দিয়েছিলে। বর্তমান ক্ষমতাসীনরা দশম সংসদ নির্বাচন নিয়ে অনুরূপ প্রতিশ্রুতি দিলেও সে প্রতিশ্রুতি তারা রক্ষা করেন নি বরং একটি বিতর্কিত নির্বাচনকে ভিত্তি ধরেই তারা এখন মেয়াদপূর্তির দ্বারপ্রান্তে। যা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক।
২০০৬ সালে ৪ দলীয় জোট সরকার মেয়াদপূর্তির পর যে রাজনৈতিক  সংকট সৃষ্টি হয়েছিল তারও সমাধান হয়েছিল সংবিধান লঙ্ঘন করেই। সংবিধান অনুযায়ি রাষ্ট্রপতি কেয়ারটেকার সরকার প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করলেও সে সরকার টিকে থাকেনি বরং একটি সংবিধান বহির্ভূত জরুরি সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে দীর্ঘ দুই বছর ক্ষমতায় থেকেছে। আজ যারা সংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কথা বলে দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূলবোধকে খাদের কিনারে নিয়ে গেছেন তারাও কিন্তু সে অসাংবিধানিক সরকারের সরাসরি সুবিধাভোগী। এবিষয়ে তাদের আত্মস্বীকৃতিও রয়েছে। ফলে সরকারের সংবিধান রক্ষার আকুতি কেউই ভাল চোখে দেখছেন না।
সরকারের মুখে সংবিধান রক্ষার প্রত্যয় শোনা গেলেও এ সরকারের আমলে প্রতিনিয়ত সংবিধান লঙ্ঘন ঘটছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে। দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। সে মতে রাজনৈতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও রাজপথে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার হলেও দেশের মানুষ সে অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে জোড়ালো অভিযোগ আছে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব সরকারের হলেও সরকার সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছে। আইন ও সংবিধান অনুযায়ি প্রত্যেক নাগরিকের আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার থাকলেও দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের বিষয়টি এখন প্রায় অপ্রতিরোধ্য।  ক্ষমতাসীন দলের সংবিধান রক্ষার ধারণা ইতিবাচকই কিন্তু তা তখনই সফল ও সার্থক হয়ে উঠবে যখন সরকার জনগণের সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা দিতে পারবে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতা রীতিমত চোখে পড়ার মত।
সংবিধান অনুযায়ি জাতীয় পার্টি (জাপা) একইসঙ্গে সরকার ও বিরোধী দলে থেকে সংসদে দায়িত্ব পালন করতে পারে কি না তা নিয়েও তো দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে গুরতর প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি  এ নিয়ে একজন নির্বাচন কমিশনারও জোড়ালো আপত্তি তুলেছেন। একইসঙ্গে সংসদ বহাল রেখে নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি কতটুকু সম্ভব তা নিয়েও প্রশ্নটা সর্বমহলেই। শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বাধা ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গায়েবি মামলা দায়ের করার সাংবিধানিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্নটা কেউই অযৌক্তিক মনে করছেন না।
মূলত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের আমাদের দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ একটা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে এতে কোন সন্দেহ করা চলে না। এর পর থেকে দেশে যত নির্বাচন হয়েছে কোন নির্বাচনই জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারেনি। এমনকি আন্তর্জাতিক মহলও বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে গুরতর অভিযোগ তুলছে এবং তারা অবাধ, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক জোর তাগিদ দিয়ে আসছেন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অত্যাসন্ন হওয়ায় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহল তাদের তৎপরতা বাড়িয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতকে নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভিন্ন কথা থাকলেও তারা এখন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ওপরই গুরুত্ব দিচেছন।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা এমন একটি অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে চায়, যেখানে জনগণের ইচ্ছের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটবে। গণচীনও অনুরূপ প্রত্যাশায় ব্যক্ত  করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পক্ষে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে ইসির সক্ষমতা আছে কিনা বা বর্তমান ইসি নির্বাচন নিরপেক্ষ করার বিষয়ে অঙ্গীকারাবদ্ধ কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে সর্বমহলে। কারণ, বর্তমান ইসি এখন পর্যন্ত নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করতে পারেনি।
সংসদ বহাল রেখে নির্বাচনকে কেউই ভাল চোখে দেখছেন না বরং সংসদ ভেঙ্গে বা মেয়াদান্তে নতুন নির্বাচনের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকার সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার কথা উল্লেখ করলেও একথাও সর্বাংশে সঠিক নয়। সংবিধান অনুযায়ি সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে নির্বাচন করার সুযোগ রয়েছে। সংবিধানের ১২৩ (খ) অনুচ্ছেদে বিষয়টি খুবই স্পষ্ট। এ বিষয়ে সংবিধানে দু’টি বিকল্প রয়েছে। সংবিধানে ১২৩ (ক) অনুচ্ছেদে বলা আছে, সংসদ রেখে নির্বাচন করা যাবে । ১২৩ (খ) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে সংসদ ভেঙে নির্বাচন করা যাবে। তাই সংসদ ভেঙে নির্বাচন অসাংবিধানিক একথাটাই অসাংবিধানিক ও সত্যের অপলাপ ছাড়া কিছু নয়। অন্যান্য সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশে সংসদ ভেঙে দেয়ার রেওয়াজ রয়েছে। কিন্তু নেতিবাচক রাজনীতির কারণেই আমরা সাংবিধানিক উদারতাগুলো থেকে উপকৃত হতে পারছি না।
সরকার ও বিরোধী পক্ষগুলো আসন্ন নির্বাচন নিয়ে স্ব স্ব অবস্থানে অপোষহীন থাকায় মূলত রাজনৈতিক সংকটের মূল কারণ। তাই উভয় পক্ষের দুরত্ব কমানোর জন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহল আসন্ন নির্বাচন তিন মাস পিছিয়ে দেয়ার প্রস্তাব করেছে। মার্কিন উপসহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এলিস ওয়েলস বাংলাদেশ সফলকালে বিভিন্ন মহলে এরকম একটি প্রস্তাব নিয়ে কথা বলেছেন বলে জানা গেছে। সংবিধানের ১২৩(৩) (ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মেয়াদ অবসানের আগের নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে। আবার (খ)-তে সংসদ ভেঙে যাবার পরের নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে। ২৮ জানুয়ারি বর্তমান সংসদের মেয়াদ শেষ হবে। ওই সময়ের মধ্যে নির্বাচন না হলে, সংসদ ২৯ জানুয়ারি আপনা আপনি ভেঙে যাবে।
সংসদ ভেঙে গেলে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তত্ত্বাভিজ্ঞ মহল মনে করে নির্বাচন ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত পেছালে, বিরোধী দলগুলোর বেশ কিছু দাবী স্বয়ংক্রিয় ভাবে পুরণ হয়ে। সম্প্রতি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যে ৭ দফা দাবী দিয়েছে তাঁর প্রথম দাবীই হলো বর্তমান সংসদ তফসীল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে দিতে হবে। চলমান রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে এই সুযোগটাকে কাজে লাগানো যেতে পারে বলে অনেকেই মনে করছেন। এ বিষয়ে বিরোধী পক্ষকে ইতিবাচক মনে হলেও সরকারের অবস্থানটা বেশ নেতিবাচক।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেকোনো নির্বাচন অনুষ্ঠানের পূর্বশর্ত হলো অংশগ্রহণকারী সব পক্ষের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল যে সুবিধা ভোগ করছে, বিরোধী দল সংবিধান প্রদত্ত অধিকার তুলনামূলকভাবে তেমন ভোগ করতে পারছে না বলে অভিযোগটা বেশ জোড়ালো। শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও তাদের বাধা দেওয়া হচ্ছে। বিরোধী দলের কমিটি ধরে ধরে মামলা দায়ের কিংবা গায়েবি মামলা দায়ের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে।
এমতাবস্থায় নির্বাচনকালীন জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ইসির অধীনে ন্যস্ত করার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।  কেউ কেউ অর্থ, তথ্য ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কেও নির্বাচন কমিশনের আওতায় আনার সুপারিশ করেছেন। নির্বাচন কমিশনের কাছে জনপ্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব অর্পিত হলে জাতীয় নির্বাচনে জনগণের আস্থা বেড়ে যাবে এবং নির্বাচন সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করতে সহায়ক হবে।
মূলত নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার ও সংসদ বিলুপ্ত করে নির্বাচন করা সহ যেকোন সমস্যার সমাধানে সংবিধান কোন ভাবেই বাধা বা প্রতিবন্ধক নয় বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছায় এজন্য যথেষ্ট হবে। অতীতে আমাদের দেশে এমন নজীর রয়েছে। এজন্য চাই সমস্যা সমাধানে আন্তরিকতা ও রাজনৈতিক দুদর্শিতা। তবে উভয় ক্ষেত্রেই আমাদের দুর্বলতা বেশ প্রকট। তাই দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থেই আমাদেরকে সেই দুর্বলতা থেকে অবশ্যই বেড়িয়ে আসতে হবে।
লেখকঃ কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক।