ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

শহীদুল ইসলাম

৪ নভেম্বর ২০১৮, ১৯:১১

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংলাপের একাল-সেকাল

8377_ুুুুুুু.jpg
ক্ষমতাসীন আওয়ামী মহাজোটের সাথে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে যে সংলাপ শুরু হয়েছে তার উপর নির্ভর করছে আগামী দিনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।দেশে একটি অবাধ,নিরপেক্ষ নির্বাচন হোক। দেশে গণতন্ত্র ফিরে আসুক। জনগণ তাদের পছন্দের লোকদেরকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আনুক। এটা দেশবাসির কাম্য।অন্যথায় দেশ আবারো সংঘাতের দিকে চলে যেতে পারে যা কারোই কাম্য নয়।সবাই মিলে রাজনৈতিক সংকট মোকাবেলা করব,দেশকে বিশে^র বুকে একটি মর্যাদার আসনে নিয়ে যাব। সেই প্রত্যাশা সকলের। তাই চলমান সংলাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।তবে আমাদের দেশের রাজনীতিতে সংলাপের ইতিহাস সুখকর নয়। নিজেরা তো নয়ই বিদেশিদের মধ্যস্থতায়ও আমরা সংলাপ করে ঐক্যমতে পৌছতে পারিনি। ফলে সংকটের সমাধান সংলাপে না হয়ে অন্য পথে হয়েছে।

সংলাপ ১৯৭১:

আমরা জানি, পাকিস্তান আমলের শেষপ্রান্তে এসে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করায় সৃষ্টি হয় রাজনৈতিক সংকট।এই সংকট নিরসনের জন্য প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সাথে আলোচনার জন্য। ১৯৭১ সালের ১৬ মার্চ থেকে শুরু হয়ে সংলাপ চলে ২৩ মার্চ পর্যন্ত।তখন প্রতিদিনই উভয় পক্ষে বলা হচ্ছিল যে,আলোচনায় অগ্রগতি হচ্ছে।কিন্তু বাস্তবে হয়েছে উল্টো। আলোচনার নামে সময় ক্ষেপন করা হয়েছে। আর এই সময়ের মধ্যে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী ভারী অস্ত্র ও গোলাবারুদ আনতে থাকে।সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে সম্মত না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত মুজিব-ইয়াহিয়া সংলাপ চুড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়।পরে ২৫ মার্চের কালো রাতে ঘুমন্ত বাঙ্গালীর উপর চালানো হয় বর্বরোচিত হামলা। তারপর শুরু হয় প্রতিরোধ এবং ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধ। আর তার মাধ্যমে অর্জিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ।

১৯৯১ সালে বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র পুন:প্রতিষ্ঠার পর একমাত্র ২০০১ সালের নির্বাচন ব্যতীত অন্য সব নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং নির্বাচন নিয়ে মতপার্থক্য দেখা গেছে। এর আগ অন্তত তিনবার দুই প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে আলোচনা বা সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে, যার মধ্যে দুবার হয়েছে বিদেশীদের মধ্যস্থতায়।কিন্তু সেসব আলোচনায় রাজনৈতিক সংকটের কোন সুরাহা হয়নি।

সংলাাপ ১৯৯৪ :

১৯৯৪ সালে মাগুরার একটি সংসদীয় উপ-নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ আনে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ।অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি সামনে আনে আওয়ামী লীগ।তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে তারা জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলে।তাদের সাথে তখন যোগ দিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী এবং সদ্য বিদায়ী জাতীয় পার্টি।টানা হরতাল এবং সহিংসতায় জনজীবন তখন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।তখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং গণতন্ত্র সংহত করতে কমনওয়েলথ-এর তরফ থেকে আলোচনার উদ্যোগ নেয়া হয়।

কমনওয়েলথ মহাসচিবের বিশেষ দূত হিসেবে ঢাকায় আসেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক গভর্ণর জেনারেল স্যার স্টিফেন নিনিয়ান।টানা কয়েকদিন সংলাপ চলেছিল। কিন্তু সে আলোচনাও সফল হয়নি।স্টিফেন নিনিয়ান তখন ঢাকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সাথে দফায়-দফায় বৈঠক করেন।এক পর্যায়ে তিনি সর্বদলীয় একটি সরকার গঠনের প্রস্তাব করেন।তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সে সরকারে সরকার এবং বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি মন্ত্রীসভা গঠনের প্রস্তাব করা হয়।এছাড়া একজন টেকনোক্রেট মন্ত্রী অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন কমনওয়েলথ মহাসচিবের দূত। কিন্তু আওয়ামী লীগ সে ফর্মুলা মানেনি।উল্টো তারা স্যার নিনিয়ানের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগও তুলেছিল।কোন রকম সমাধানে না আসার কারণে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যান মি: নিনিয়ান ।

সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার পর আওয়ামী লীগ তাদের আন্দোলন আরো জোরদার করে এবং বিএনপি নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিতে থাকে।শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি একটি একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।সেই নির্বাচনের পর গঠিত সংসদ সংবিধান সংশোধনের করে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়।এর পর পরই সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে কয়েক মাসের মধ্যেই আবারো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

সংলাপ ২০০৬ :

২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে তৎকালীন বিএনপি মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভুঁইয়া এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল সংসদ ভবনে সংলাপে বসেন।তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং নির্বাচন কমিশন সংস্কারের প্রশ্নে আওয়ামী লীগ একটি প্রস্তাব তুলে ধরে।প্রথম দিনের আলোচনা শেষে বিএনপি মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভুঁইয়া বলেন, "১৪ দলের পক্ষ থেকে, আওয়ামী লীগ তাদের যে দাবিগুলো আছে সেগুলো আমার কাছে হস্তান্তর করেছেন। আমি তাদের প্রত্যেকটি দাবি সম্পর্কে ব্যাখ্যা চেয়েছি। তিনি ব্যাখ্যা করেছেন। আমি এ ব্যাখ্যাগুলো নিয়ে আমার দলের কাছে ফেরত যাব এবং দলের সাথে আলোচনা করবো।"

এ সময় আব্দুল মান্নান ভুঁইয়ার বিপরিতে ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল।মি: জলিলও একই কথা বলেছেন। প্রথম বৈঠকের পর তারা জানিয়েছিলেন যে আলোচনা আরো চলবে। আওয়ামী লীগের তরফ থেকে দুটি দাবিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়।

প্রথমত; তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে সাবেক প্রধান বিচারপতি কেএম হাসানের না থাকা এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদ থেকে এমএ আজিজের পদত্যাগ।কিন্তু এ দুটি বিষয়ে বিএনপির দিক থেকে কোন ইতিবাচক সাড়া আসেনি।একদিকে আওয়ামী লীগ রাস্তায় আন্দোলন করতে থাকে এবং অন্যদিকে ক্ষমতাসীন বিএনপি ২০০৭ সালের ২২শে জানুয়ারি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে থাকে।

আওয়ামী লীগের আন্দোলনের মুখ বিচারপতি কেএম হাসান প্রধান উপদেষ্টার পদ নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন।ফলে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদ নিজেই প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহন করেন।এক পর্যায়ে বিরোধী রাজনৈতিক জোট নির্বাচন থেকে সরে যায়।শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে সে নির্বাচন স্থগিত হয়ে যায়। ফলে ওয়ান ইলেভেনের সেনা সমর্থিত সরকার ক্ষমতা গ্রহন করে এবং প্রায় দুই বছর সেনা-সমর্থিত সরকার দেশ পরিচালনা করে।

সংলাপ ২০১৩:

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে।এরপর থেকে সে ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য বিএনপির দিক থেকে আন্দোলনের হুমকি দেয়া হয়।২০১৩ সালের শুরুতে সে আন্দোলন জোরালো রূপ নেয়। বিরোধী দলে থাকা বিএনপির ডাকা হরতাল অবরোধের কারণে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে।দেশজুড়ে এ সময় সহিংসতাও হয়েছে।এমন প্রেক্ষাপটে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসের প্রথমদিকে বাংলাদেশ সফরে আসেন জাতিসংঘের রাজনীতি বিষয়ক সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো।ততদিনে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হয়েছে।শেখ হাসিনাকে সরকার প্রধান রেখেই নির্বাচনের একটি ফর্মুলা বের করার চেষ্টা করেছিলেন জাতিসংঘের প্রতিনিধি। কিন্তু বিএনপি সে বিষয়ে কোন আগ্রহ দেখায়নি।

মি: তারানকো তার সফরের সময় বিরোধী নেত্রী খালেদা জিয়া এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বৈঠক করেছেন।এর পাশাপাশি বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের সাথেও তিনি বৈঠক করেন।আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে সাথে নিয়ে বৈঠক করেন।

কিন্তু উভয়পক্ষ তাদের দাবিতে অনড় থাকায় শেষ পর্যন্ত কোন সমাধান ছাড়াই ফিরে যান মি: তারানকো।যাবার আগে সোনারগাঁও হোটেলে এক সংক্ষিপ্ত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, উভয়পক্ষ আলোচনা চালিয়ে যেতে রাজী হয়েছে।কিন্তু মি: তারানকোর কথায় পরিষ্কার আভাস মিলেছিল যে রাজনৈতিক অচলাবস্থার কোন সমাধান সূত্র বের হয়নি।যার ফলশ্রুতিতে আসে ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির বিতর্কিত একতরফা নির্বাচন।
সংলাপ ২০১৮ :

৭ দফা দাবি নিয়ে গত ১ নবেম্বর গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সংলাপে বসেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা।পরের দিন বিকল্প ধারার সাথে সংলাপ হয় প্রধানমন্ত্রীর। আরো সংলাপ হবে।আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংলাপে ঐক্যফ্রন্টের সংলাপ সম্পর্কে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ বলেছেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারা যে দুইটি বিষয়কে প্রাপ্তি মনে করছেন, তা আসলে কোনো প্রাপ্তিই না। সংলাপে সমাধান দেয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়নি। তার মতে, সংলাপের পূর্ব থেকে সরকারের মনোভাব খুবই পরিস্কার ছিল। সংলাপ আপত দৃষ্টিতে শেষ। এখন সবাই গণভবনের চা চক্রে আমন্ত্রিত। ফলাফল আসলে শূণ্য। গত শুক্রবার মহাখালীতে তার নিজ বাসায় সংলাপ পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় এসব কথা বলেন।

ড. কর্নেল অলি আহমেদ এর সুরেই কথা বলছেন বিএনপিসহ দেশের বিশিষ্টজনা। তারাও বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের সংলাপ কার্যত ব্যর্থ। ৭ দফার একটি দফাও মানেনি ক্ষমতাসীনরা। বিশেষ করে নির্বাচনকালীন সরকার, সংসদ ভেঙে নির্বাচন কিংবা খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে কোনো আশ্বাস মেলেনি। এ জন্য আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করার তাগিদ বিশ্লেষকদের।

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও বিশিষ্ট রাজনীতিক বিশ্লে¬ষক এমাজউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে দেশের প্রধান বিরোধী জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাথে যে সংলাপ অনুষ্ঠিত হলো সেটির দিকেই তাকিয়ে ছিল সবাই।  অনেকেই ভেবেছিলেন হয়ত সংলাপের মাধ্যমে এর একটা সমাধান হবে। কিন্তু বৃহস্পতিবার সংলাপ শেষে সরকার ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের বক্তব্য আমিসহ দেশবাসীকে হতাশ করেছে। বিরোধী পক্ষ বলেছে, সরকার কোনো দাবিই মেনে নেয়নি। সরকার বলেছে, তারা সংবিধানের বাইরে যাবেনা। তিনি বলেন, যদি সরকার তার অবস্থানের কোনো পরিবর্তনই না ঘটায় তাহলে সংলাপের কি প্রয়োজন ছিল। তিনি বলেন, বিরোধী জোটকেই এখন তাদের দাবি আদায়ের মাধ্যম ঠিক করতে হবে। এ সময় তিনি আন্দোলনের মাধ্যমেই দাবি অদায় সম্ভব বলে মত দেন।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল¬ুর রহমান বলেন, সংসদ ভেঙে নির্বাচন দেয়াটা কয়েকটি কারনে গুরুত্বপূর্ণ। যদিও এ বিষয়ে সংবিধান সংশোধন করে একটি আইন পাস করা হয়েছে। কিন্তু আমি বলবো সেটি প্রচলিত রীতিনীতির এক ধরনের ব্যত্যয়। সংসদ ভেঙে নির্বাচন দেয়াটা বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার দৃষ্টিকোণ থেকে এ বিষয়টি সাইকোলজিক্যাল বা মনস্তাত্ত্বিক একটি পদক্ষেপ বলে মনে করি। কেননা ২০১৪ সালের নির্বাচন যেহেতু অংশগ্রহণমূলক হয়নি, সেহেতু ওই নির্বাচন নিয়ে জনগণের মাঝে একটি আস্থাহীনতার আবহ তৈরি হয়েছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে এর অনেকটা প্রভাব পড়বে। এ আস্থাহীনতার বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে হলে একটি অন্যতম পদক্ষেপ হচ্ছে সংসদ ভেঙে দেয়া। এটা নির্বাচনের নানা ধরনের অনিশ্চয়তার বিষয়গুলোকে অনেকটা কমিয়ে আনবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন,৭ দফার মধ্যেই বিএনপির প্রধান দাবি হচ্ছে, নির্বাচনকালীন সরকার, সংসদ ভেঙে নির্বাচন ও খালেদা জিয়ার মুক্তি। এই তিনটি বিষয়ে সুরাহার কোনো লক্ষণও দেখা যায়নি সংলাপে। নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়ে সংবিধানসম্মতভাবেই ঐক্যফ্রন্ট শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন বর্তমান সংকট নিরসনে একাধিক বিকল্প তুলে ধরেন। নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়ারও একটি রূপরেখা দেন। জবাবে সংবিধানের দোহাই দিয়েই নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে জানানো হয়। ১/১১ প্রসঙ্গ টেনে এদেশে নিরপেক্ষ কে তা জানতে চেয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেয়া হয় ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে। এ সময় বিএনপি নেতারা ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথাও বলেন। জবাবে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে বলা হয়, সে সময়ের প্রেক্ষপট ভিন্ন ছিল। এখন ঐ ধরনের কোন পরিস্থিতি নেই। যদি পরিস্থিতি থাকতো তাহলে জনগণ আন্দোলন করতো। এখনও প্রয়োজন হলে জনগণ আন্দোলন করবে। পারলে আন্দোলন করেই এই দাবি আদায় করে নেয়ার চ্যালেঞ্জও ছুড়ে দেয়া হয় ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে। খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে বিএনপির নেতারা প্রশ্ন করলে জবাবে ক্ষমতাসীনরা জানায় এটি পুরোপুরি আদালতের বিষয়। তবে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে করা গায়েবি রাজনৈতিক মামলার বিষয়ে তদন্ত করে বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছে ক্ষমতাসীনরা।

ঐক্যফ্রন্টের সাত দফার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী কিছু বলেননি শুধু তার ওপর আস্থা রাখার কথা বলেছেন। নিরপেক্ষ সরকার, সংসদ ভেঙে দেয়া ও খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়েই কোনো সুরাহা না হলে প্রধানমন্ত্রীর ওপর কি জন্য আস্থা রাখতে হবে তা এখন বিএনপি নেতাকর্মীদের প্রশ্ন। সঙ্গত কারণে আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

এদিকে সংলাপের পর থেকে গতকাল দিনব্যাপী উচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে একেবারে তৃণমূলের কর্মীরাও সংলাপের প্রকৃত বিষবস্তু জানতে আগ্রহী ছিল। ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি নেতাদের কার কি ভূমিকা ছিল তাও নীতি নির্ধারনী পর্যায়ের নেতাদের কাছে জানতে চেয়েছে অনেকে। তারা জানতে পেরেছে, ৭টির একটি দাবিও মানেনি ক্ষমতাসীনরা। এরপরেও কেন ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা সংলাপ ভাল হয়েছে বলে মন্তব্য করা এবং বিএনপির শীর্ষ নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শুধু সন্তুষ্ট হতে পারেননি মন্তব্যের মধ্যে কেন সীমাবদ্ধ ছিলেন এনিয়ে অনেকে ক্ষুব্ধ। নেতাকর্মীদের ক্ষোভ কমাতে সিনিয়র নেতারা জানিয়েছেন, তাৎক্ষণিক ভাবে ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির শীর্ষ নেতা যে মন্তব্য করেছেন তা কৌশলগত কারণে। সংঘাত নয় সমঝোতার মাধ্যমে বিএনপি শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেছে এবং করবে। তবে সমঝোতার কোনো সম্ভাবনা না দেখে আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত হওয়ারও নির্দেশনা দিয়েছেন নেতারা।

আন্দোলনের বিষয়ে ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শীর্ষ নেতা নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না জানান, ৭ দফার কোনোটিই তো মানা হয়নি। বরং নেতিবাচক মন্তব্য করেছে সরকার দলীয় লোকজন। দাবি আদায়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া হবে। সংলাপে না থাকলেও এর প্রাপ্তির বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, সংলাপের ফলাফল শূন্যের কোঠায়। কোনো দাবি তারা মানবে না।

 সিনিয়র সাংবাদিক নাঈমুল ইসলাম খান বলেন, সংলাপ থেকে তাৎক্ষণিক সকল বিষয়ের সমাধান পাওয়াটা খুবই কঠিন। কঠিন হওয়ার কারণ হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী তো আরো অনেক দলের সাথে বৈঠক করবেন। আরো অনেক দলের কথাও তাকে শুনতে হবে। তবে যে যাই বলুক না কেন আওয়ামী লীগ তো তার স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে কোনো ছাড় দেবে না।

সংলাপের বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সরকারি জোটের সংলাপে সরকারের একগুঁয়েমি মনোভাব গণতন্ত্র ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বড় ধরনের অশনিসংকেত। সংলাপে মানুষের মনে যে আশাবাদ জেগে উঠেছিল, সংলাপ শেষে সেই আশার মুকুল ঝরে যেতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, সংলাপে ৭ দফায় আওয়ামীলীগ সাড়া না দেওয়ায় এবং দলটির অনঢ় অবস্থানের কারণে সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে অগ্রগতি তিমিরাচ্ছন্ন হলো। তিনি বলেন, সরকার অনমনীয় মনোভাব দেখাতে থাকলে মাথা উঁচু করে সাত দফা দাবি রাজপথেই আদায় করতে হবে। দুর্জয় সাহস নিয়ে মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে রাজপথে নামবে।

রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের এসব মন্তব্যই আভাস দিয়েছে যে,এবারের সংলাপও চুড়ান্তভাবে ব্যর্থ হতে চলেছে। আলোচনায় কোন সমাধান বের হচ্ছেনা। রাজপথেই হয়তো সংকটের সমাধান নিহিত রয়েছে। আর সে পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়।