ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

৭ নভেম্বর ২০১৮, ১৯:১১

তফসিল ঘোষণা আজ, ঐক্যফ্রন্টের রাজনৈতিক কৌশল?

8462_5.jpg
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের উদ্যোগে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামীলীগের সভাপতি শেখ হাসিনার সাথে সংলাপ শেষ পর্যন্ত ফলপ্রসূ হয়নি বলে জানিয়েছেন ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দ্বিতীয় দফা সংলাপের পর তার এই মন্তব্য রাজনৈতিক অনিশ্চয়তকে স্পষ্ট বাড়িয়ে দিয়েছে জনমনে। গেল ১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর সরকারী বাসভবন গণভবনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ২১ সদস্যের সাথে আওয়ামীলীগ ও চৌদ্দ দলের প্রতিনিধিরা আলোচনায় প্রথম দফায় বসেছিল। এসময় ঐক্যফ্রন্ট যে দাবিদাওয়া তুলেছিল তা সবগুলোর ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী ইতিবাচক ইঙ্গিত না দিয়ে আলোচনা ভবিষ্যতে চলবে বলে জানান।

সরকারের বিপরীতে গড়ে উঠা বৃহৎ এই রাজনৈতিক জোটের সাথে সরকারের সংলাপের পর যুক্তফ্রন্টসহ আরো কিছু দল সংলাপ চেয়ে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দেয় এবং সংলাপে তারা বসেন। এরই ধারাবাহিকতায় সরকারের ক্ষমতার অংশীদার জাতীয় পার্টিও সংলাপে বসে। সংলাপের পর জাতীয় পার্টি যে মতামত ব্যক্ত করেন তা ৫ জানুয়ারীর মত একটি নির্বাচনে তাদের আপত্তি না থাকার মতই আভাস দেন। এমনকি তারা শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন এবং কোন দল নির্বাচনে না আসলে ৩০০ আসনে প্রার্থী দেয়ার কথা বলেন। আর যদি বিএনপি নির্বাচনে আসে তাহলে তারা আওয়ামীলীগের সাথে জোট করেই নির্বাচন করবে বলে জানায়।

সাবেক রাষ্ট্রপতি বি. চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর সাথে সংলাপ করে বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে তাদের কোন আপত্তি থাকবে না বলেও সংলাপ পরবর্তী তাদের মন্তব্যে ফুটে ‍উঠেছে।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপের পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচন কমিশনের সাথে মতবিনিময় করেও তফসিল পেছানো ও সকল দলের অংশগ্রহণ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য ইভিএম ব্যবহার না করাসহ অনেকগুলো সুপারিশ ও দাবিদাওয়া তুলে ধরেছেন। তাদের সাথে ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের যে আলোচনা হয়েছে সেখানেও সরকারের সিদ্ধান্তের সাথে নির্বাচন কমিশনের সাদৃশ্য রয়েছে ও অনড় অবস্থানের ইঙ্গিত দেন নির্বাচন কমিশন। আলোচনার একপর্যায়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নূরুল হুদার সাথে ঐক্যফ্রন্ট নেতার সাথে কড়া বাক্য বিনিময় হয়। ঐক্যফ্রন্ট নেতারা তফসিল ঘোষনা করতে অপেক্ষা করতে বললে নির্বাচন কমিশন এক পর্যায়ে গণমাধ্যমে বলেছিলেন সব রাজনৈতিক দল চাইলে তফসিল পেছানো যাবে। এক্ষেত্রে সংবিধানের বাধ্যবাধকতার মধ্যে ইসি নির্বাচন সম্পন্ন করবেন বলে জানান।

নির্বাচন কমিশনের এরুপ মন্তব্যের পর গতকাল  জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদের নেতৃত্বে ১৫ জন প্রতিনিধি ইসিতে মতবিনিময় করে বের হয়ে  ৮ নভেম্বরই তফসিল ঘোষনার জন্য ইসিকে অনুরোধের কথা গণমাধ্যম কর্মীদের জানান। এরপরই ইসি আজ ৮ নভেম্বর তফসিল ঘোষণার কথা সাফ জানিয়ে দিলেন। ইসির তফসিল ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্যাপারে যে সকল দলের মতামতের মূল্যায়নের কথা বলেছিলেন তা কি মিথ্যাচার না বায়বীয় ছিল? যদি তা না হয় তাহলে দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ রাজনৈতিক জোটের মতামতকে উপেক্ষা করে তফসিল ঘোষণায় অগ্রসর হচ্ছে ইসি। মানুষের মনে সন্দেহ জেগেই উঠতে পারে যে ইসির এই সিদ্ধান্ত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়াীর নির্বাচনের পূনরাবৃত্তির আরেকটি কুটকৌশলের নীল নকশা? কেননা সেসময় যারা সমর্থন দিয়েছিলেন আওয়ামীলীগের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় তারা এখনো সেসময়ের সুর ও ভূমিকায় তৎপর রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপে।

এদিকে ইসি ও সরকারের অনমনীয় অবস্থানের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নানা কর্মসূচী ঘোষণা করেছে। তাতে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা সংকট বরং ঘনীভূত হচ্ছে, এর দায় কি সরকার ও ইসি নিবে? ইসি যেহেতু সাংবিধানিক স্বাধীন একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, সেক্ষেত্রে কেন একটি বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তিকে বাইরে রেখে নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে?  ইসি কি তাহলে সরকারের আজ্ঞাবহ একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে? আর যদি তা না হয় তা হলে সকল দলের যৌক্তিক কথা ও পরামর্শকে মূল্যায়ন করে জাতির বৃহত্তর শান্তির স্বার্থে নৈতিক অবস্থান বিবেচনায় রেখে নির্বাচনী পদক্ষেপ জনগণ প্রত্যাশা করে।

পাশাপাশি আওয়ামীলীগের বিগত সময়ের শাসনামলের মূল্যায়ন করার জন্য যেমন জনগনের মতামত যাচাইয়ের জন্য সকল রাজনৈতিক দলকে সুষ্ঠু ভোটাধিরার প্রয়োগ করার একটি প্লাটফরম তৈরির নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। কিন্তু সরকারী দল আওয়ামীলীগ সেই জায়গায় নৈতিকভাবে পরাজিত হয়েছে বলেই এখন দৃশ্যমান। অন্যদিকে বিগত সময়ের রাজনৈতিক কর্মকান্ড ও সরকার গঠরের অভিজ্ঞতার বিবেচনায় দেশের জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল বিএনপি সহ ছোট-বড় দলগুলো যে তৎপরতা চালাচ্ছে তা প্রশংসনীয় হলেও সরকার মূল্যায়ন করতে চরম অনীহা প্রদর্শন করছে।

শান্তিপূর্ণ সকল পন্থার অগ্রাধিকার দিয়ে সংলাপের আয়োজনে উদ্যোগী হওয়া তারই বড় নজির। এর বিপরীতে সরকারী দল তা প্রত্যাখান করলে ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনকালীন ঘটনা প্রবাহ ও নির্বাচন উত্তর পরিস্থিতির পূনরাবৃত্তি হলে এর দায় সরকার এড়াতে পারবে না। কারণ তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকারের সংবিধানের দোহাই দিয়ে একগুয়েমী নীতির জন্য দেশ চরম সংকটে নিপতিত হয়েছিলো। সংকট মোকাবেলায় জাতিসংঘ মহাসচিবের তৎকালীন সহকারী তারানকো ফার্নান্দেজ সমঝোতায় হস্তক্ষেপ করেছিলেন। জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় আওয়ামীলীগ সরকারের সাথে যে সকল বিষয়ে ঐক্যমতের ভিত্তিতে সমঝোতা হয়েছিলো তা সংকট কেটে যাবার পর আওয়ামীলীগ পূনঃনির্বাচন আয়োাজনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করে নি। যা দেশের জনগণের সাথে একধরনের প্রতারণার হিসেবে মানুষ মনে রেখেছে।

এখন পর্যন্ত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট শান্তিপূর্ণ কর্মসূচীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে। তারা যেকোন পরিস্থিতিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করতে চায়। সংঘাতকে এড়িয়ে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানকে অধিক মূল্যায়ন করছে দলটি। নির্বাচন কমিশনের আগামীকালের তফসিল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসি অভিমুখে লংমার্চের হুমকি দিয়েছেন, যা রাজনৈতিক ময়দানকে উত্তপ্ত করবে। তবে তাদের কর্মসূচীর মূল্যায়ন করতে দেশের নাগরিকরা যথাযথ গুরত্বের সাথে মূল্যায়ন করতে ভুল করবে না। তফসিল ঘোষণাকে ঘিরে ইসির সিদ্ধান্ত ও ঐক্যফ্রন্টের কর্মসূচীর মধ্যদিয়ে সারাদেশে একটি পরিবর্তিত রাজনৈতিক আবহাওয়া বয়ে আনতে পারে। সেক্ষেত্রে নিপীড়িত জনগণ সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। সরকার ও প্রশাসনের নৈতিক ভূমিকাও এখানে মুখ্য হয়ে দেখা দিয়েছে। যা কিনা শান্তির পথকে প্রশস্থ করবে বাংলাদেশের সকল নাগরিক জীবনে। সর্বোপরি শান্তির জয় হোক, সত্যের বিকাশ হোক, কল্যাণময় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হোক এটিই আপামর জনতার প্রত্যাশা, যা কোন রাজনৈতিক ব্যক্তি স্বার্থের কারণে খর্ব করা যাবে না।