ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

শহীদুল ইসলাম

১৩ নভেম্বর ২০১৮, ১৩:১১

রাজনীতিতে ভোটের হাওয়া

8583_8.jpg
প্রতিকী ছবি
হঠাৎ করেই পাল্টে গেছে দেশের রাজনৈতিক চালচিত্র।কঠিন আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন আওয়ামী মহাজোটের সরকারকে হটানোর যে আভাস পাওয়া গিয়েছিল তা পরিবর্তন হয়েছে। এখন দেশে বইছে ভোটের হাওয়া। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এবং তাদের বর্তমান জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তাদের ৭ দফা দাবী থেকে সরে না এলেও কৌশল পরিবর্তন করে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে। আর তাতেই পাল্টে গেছে দৃশ্যপট।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ৭ দফা দাবির মধ্যে প্রধান তিনটি দাবি ছিল বেগম খালেদা জিয়ার নি:শর্ত মুক্তি,নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্বাবধায়ক সরকার গঠন এবং সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান।এই তিনটি দাবিসহ ৭ দফা দাবি নিয়ে ঐক্যফ্রন্টের সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ক্ষমতাসীন জোটের সাথে দুই দফা সংলাপ হয়েছে।কিন্তু সরকার পক্ষ এসব দাবির কোনটাই মানেনি।এমতাবস্থায় কঠিন আন্দোলনের কর্মসূচী আসছে।এমনটিই আশঙ্কা করা হচ্ছিল।কারন রাজনৈতিক অভিজ্ঞ মহল বলছিলেন যে,শেখ হাসিনার অধিণে নির্বাচনে যাওয়া মানেই হলো আরো ৫ বছরের জন্য আওয়ামীলীগকে ক্ষমতার বৈধতা দেয়া।

আন্দোলন করে শেখ হাসিনার সরকারকে হটানো যাবে কিনা তা নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করেছে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোট। বৈঠক করেছে তাদের নয়া শরীক জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।এসব বৈঠকের পর নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফ্রন্ট।বিএনপি মনোনয়নপত্র বিক্রিও শুরু করেছে।কঠিন আন্দোলনের সম্ভাবনা রুপ নিয়েছে ভোটের রাজনীতিতে।সারাদেশে বইতে শুরু করেছে ভোটের হাওয়া।

দাবি না মানলে ৭দফা সরকার পতনের একদফার কঠিন আন্দোলনে রুপ নেয়ার ঘোষণা দেয়ার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যে কেন শেখ হাসিনার অধিণেই নির্বাচনে যাওযার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলো বিএনপি ও তার সহযোগিরা তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন কৌতুহলের সৃষ্টি হয়েছে তেমনি বিষ্ময়েরও জন্ম দিয়েছে। সাধারণ মানুষ জানতে চাইছেন সাংবাদিকদের কাছে যে,এর রহস্যটা কি।বিএনপি নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণাকালে উল্লেখ করেছে যে,আন্দোলনের অংশ হিসেবেই তারা নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

গত ১১ নবেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সম্মেলন কক্ষে দুপুরে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব ও ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন স্বাক্ষরিত লিখিত বক্তব্য পড়ে শুনান।তিনি বলেন, আন্দোলনের অংশ হিসেবে একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। ঐদিন পৃথক দুটি সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনে যাওয়ার এই ঘোষণা দিয়ে তফসিল এক মাস পিছিয়ে দেয়ার দাবি জানানো হয়।

ড. কামাল হোসেন বলেন, ভীষণ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনের অংশ হিসেবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তিনি বলেন, একটি অংশগ্রহণমূলক গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য যে ৭ দফা দাবি আমরা এরই মধ্যে দিয়েছি, সেই দাবি থেকে আমরা সরে আসছি না। এর সাথে যুক্ত হয়েছে নির্বাচনের তফসিল পিছিয়ে দেয়ার দাবি। আমরা নির্বাচনের বর্তমান তফসিল বাতিল করে এক মাস পিছিয়ে দিয়ে নতুন তফসিল ঘোষণার দাবি করছি। সেই ক্ষেত্রেও বর্তমান সংসদের মেয়াদকালেই নির্বাচন করা সম্ভব হবে।

২০০৮ সালের নির্বাচনে তৎকালীন চারদলীয় জোটের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার স্বার্থে নির্বাচনের তফসিল ২ দফা পিছিয়ে দেয়া হয়েছিল বলে এ সময় উল্লে¬খ করা হয়।

ড. কামাল বলেন, এসব দাবি আদায়ের সংগ্রাম জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট অব্যাহত রাখবে। সেই আন্দোলন সংগ্রামের পথে নির্বাচনে অংশগ্রহণকেও আন্দোলনের অংশ হিসেবেই বিবেচনা করবে ফ্রন্ট।
ড. কামাল তার লিখিত বক্তব্যে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, একটা অংশগ্রহণমূলক এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের যাবতীয় দায়িত্ব সরকার ও নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রস্তুতির পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কড়া নজর রাখবে সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের আচরণের প্রতি। আমরা বলে দিতে চাই, জনগণের দাবি মানা না হলে উদ্ভূত পরিস্থিতির দায়দায়িত্ব সরকার ও নির্বাচন কমিশনকেই নিতে হবে।

তিনি বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির তথাকথিত নির্বাচন মানুষের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার, স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার হরণ করেছে। নিশ্চিতভাবে আগামী নির্বাচনটি দেশের মানুষের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের নির্বাচন হবে। সেই লক্ষ্যে মানুষ তার নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার জন্য ভোটের ময়দানে থাকবে। আমরা বিশ্বাস করি দশম সংসদ নির্বাচনের পর দেশে গণতন্ত্রের যে গভীর সঙ্কট তৈরি হয়েছে, সেই সঙ্কট দূর করে আমাদের ঘোষিত ১১ দফা লক্ষ্যের ভিত্তিতে একটি সুখী, সুন্দর, আগামীর বাংলাদেশ গড়ে তোলার সংগ্রামে দেশের জনগণ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পাশে থাকবে।

লিখিত বক্তব্যে ড. কামাল বলেন, সরকারি দলের আমন্ত্রণে ১ নভেম্বর ও ৭ নভেম্বর গণভবনে ঐক্যফ্রন্টের সাথে সংলাপ হয়েছে, দুঃখজনকভাবে এই সংলাপে সরকারি দলের পক্ষ থেকে বর্তমানের গভীর সঙ্কট থেকে উত্তরণের পথে ন্যূনতম সমঝোতা করার মানসিকতা আমরা দেখতে পাইনি। সভা-সমাবেশ বাধা না দেয়া এবং গ্রেফতার করা হবে না বলে প্রধানমন্ত্রী সংলাপে যে আশ্বাস দিয়েছিলেন সেগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও অবিশ্বাস্যরকম বৈপরীত্য দেখা যায়।

নির্বাচন কমিশনের সরকারের পক্ষে আজ্ঞাবহ কর্মকান্ডের সমালোচনা করে কামাল হোসেন বলেন, নির্বাচন কমিশন তড়িঘড়ি করে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করলো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার নির্ধারিত ৯০ দিনের ৩৫ দিন বাকি থাকতেই। তফসিল ঘোষণা করার পর দেশের নানা স্থানে সরকারি দলের আনন্দ মিছিল প্রমাণ করে এই কমিশন আসলে সরকারের চাহিদা মতোই তফসিল ঘোষণা করেছে।
নির্বাচনে ইভিএম বাতিল না করারও সমালোচনা করেন ফ্রন্টের এই শীর্ষ নেতা।

নির্বাচনী পরিবেশ ঠিক করতে আন্দোলন চলবে বলে জানান ড. কামাল হোসেন। তিনি বলেন, দাবি আদায়ের আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। নির্বাচনের অংশগ্রহণ করার জন্য ও নির্বাচনে পরিবেশ ঠিক করার জন্য আন্দোলন চলবে। যখনই প্রয়োজন হবে সব কিছু করা হবে।

ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনের প্রতীক কী হবে প্রশ্ন করা হলে ড. কামাল হোসেন বলেন, প্রতীক সম্পর্কে পরে জানানো হবে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কি একক প্রতীকে নির্বাচন করবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ সিদ্ধান্ত পরে জানানো হবে।

ওদিকে বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে একই দিন দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে জোটগতভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত জানান জোটের অন্যতম নেতা এলডিপির সভাপতি কর্নেল অব: অলি আহমদ।

তিনি বলেন, জনগণের প্রতি আস্থা আছে বলে আমরা ২০ দলীয় জোট প্রতিকূলতার মধ্যেও আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটগতভাবে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার দৃঢ় সঙ্কল্প ব্যক্ত করছি। সরকারের দুর্নীতি, অনাচারসহ তিস্তার পানি আনতে ব্যর্থতা ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থরক্ষায় সীমাহীন ব্যর্থতার বিরুদ্ধে রায় দেয়ার সুযোগ দেয়া উচিত বলে আমরা মনে করি। সেই কারণে আমরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব।

ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নিতে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাথেও ২০ দলের সমঝোতা হবে বলে প্রত্যাশা করেছেন অলি আহমেদ। একই সঙ্গে নির্বাচনের তফসিল এক মাস পেছানোর দাবিও জানান তিনি।

২০ দলীয় জোটের এই শীর্ষ নেতা বলেন, আমরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ, কাজেই অর্থ কিংবা পেশিশক্তি আমাদের হারাতে পারবে না। বজ্রকঠিন ঐক্য এবং সাহসী প্রতিরোধ দিয়ে আমরা বারবার বিজয়ী হয়েছি, এবারও হবো।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল বলছেন,ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিশাল এক মারদাঙ্গা কর্মীবাহিনী রয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ,তাদের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগি সংগঠন এবং তাদের শরিকদের।নির্বাচনে না গিয়ে তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে খুব একটা সুবিধে করা সম্ভব নয়। সেজন্য হেকমত এবং কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে ঐক্যফ্রন্ট। তাদের মতে অতিতে যেমন ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঠেকাতে গিয়ে যেসব হরতাল, অবরোধ বা অন্যান্য কর্মসূচী নেয়া হয়েছে তাতে কোন লাভ হয়নি। তাদের মতে,এসব কর্মসূচী চলাকালে বাস্তবে বিএনপি ও তার শরিকরা মাঠেই থাকতে পারেনি। মাঠে ছিল আওয়ামীলীগ। আর তারাই গাড়িতে আগুনসহ নাশকতা করে তার দায়ভার চাপিয়েছে বিএনপি-জামায়াতের উপর।বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচনে না গিয়ে একই ধরনের কর্মসূচীতে গেলে অতিতের মতই অবস্থা তৈরি হতো।মামলায় জর্জরিত নেতা-কর্মীরা আরো মামলায় জড়িয়ে পড়তো। তাছাড়াও দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকলে দলের নেতা কর্মীদের ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়বে। তাই নির্বাচনে যাওয়ার বিকল্প ছিলনা তাদের হাতে।

পর্যবেক্ষক মহল আরো বলছেন, ক্ষমতায় টিকে থাকতে আওয়ামীলীগ তাদের সব ক্ষমতা,কৌশল,কুটকৌশল ব্যবহার করবে। তবে শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত ভোটের ময়দানে টিকে থাকলে বিজয় ঐক্যজোটের পক্ষেই আসবে এবং আওয়ামী মহাজোটের ভরাডুবি হবে।দরকার হলো ইস্পাত কঠিন শপথ নিয়ে ময়দানে টিকে থাকা।নির্বাচনে কারচুপি করা এবং তাদের বশংবদ নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করার আশংকা থাকলেও ময়দানের দৃঢ়তা এবং ঐক্যের কাছে সবকিছু ভেস্তে যেতে যাবে। নেতাদের মতে দেশের জনগণ এখন বিএনপির পক্ষে।তারপরেও যদি ক্ষমতা হস্তান্তর করতে গড়িমসি করে তখন আন্দোলন করা যাবে। তখন প্রশাসন তথা পুলিশ তাদেরকে সহযোগিতা করবেনা। আর নির্বাচনে বিজয়ী হলে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মিথ্যা মামলা এমনিতেই প্রত্যাহৃত হবে এবং তিনি মুক্ত হয়ে আবার রাজনীতিতে আসবেন।

লেখক-সাংবাদিক
shahidjournalist67@gmail.com