ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

গোলাম মাওলা রনি

১৫ নভেম্বর ২০১৮, ২২:১১

বিএনপির নির্বাচনী ট্রাম্পকার্ড

8622_12.jpg
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শীর্ষ ব্যক্তিদের সাথে প্রায়ই আমার কথাবার্তা হয়। তাদের মধ্যে অনেকে আমার লেখার নিয়মিত পাঠক। তারা প্রায় প্রতি সপ্তাহে ফোন করে দেশের রাজনীতি নিয়ে আমার সাথে আলোচনা করেন এবং নতুন বিষয়ে নিবন্ধ লেখার জন্য বুদ্ধি পরামর্শ দেন। মানুষ হিসেবে আমি তাদের চাইতে বয়সে নবীন এবং রাজনৈতিক পদ-পদবিতে আমার অবস্থান তাদের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। কাজেই তারা কেন আমাকে ফোন করেন, সেই কারণ খুঁজতে গিয়ে আমি গলদঘর্ম না হয়ে বরং তাদের কথাবার্তা থেকে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে আমার লেখাকে আকর্ষণীয় এবং গ্রহণযোগ্য করার সর্বোত চেষ্টা করে থাকি। গত সপ্তাহে নয়া দিগন্ত এবং বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত নিবন্ধ দু’টি পড়ে ক্ষমতাসীন মহাজোটের একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এবং সরকারের প্রধানতম মিত্র একাদশ সংসদ নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির অংশগ্রহণ এবং তাদের সফলতা ও ব্যর্থতা নিয়ে আমার মতামত জানতে চান। আমি তাকে বলি, বিএনপি যদি তাদের হাতে থাকা জাদুকরী দু’টি ট্রাম্পকার্ড ব্যবহার করে, তবে ভোটের মাঠের সব হিসাব-নিকাশ ওলট-পালট হয়ে যাবে।

আমার কথা শুনে ভদ্রলোক বেশ আশ্চর্য হলেন এবং আগ্রহ নিয়ে বিস্তারিতভাবে বিএনপির জাদুকরী ট্রাম্পকার্ডের নাম-ধাম, প্রকৃতি ও প্রয়োগপদ্ধতি সম্পর্কে শুনলেন। তারপর বেশ হতাশার সুরে বললেনÑ ঘটনা যদি সত্যিই বাস্তবে ঘটে তবে শেষমেশ নির্বাচন হয় কি না, তা নিয়ে আমার সন্দেহ হচ্ছে। উত্তরে আমি বললাম- ভোটের মাঠে একবার যদি ভোটের জোয়ার চলে আসে, তবে তা রুখে দেয়ার শক্তি থাকে না। আজকের নিবন্ধে আমি ভদ্রলোকের সাথে সে দিনের টেলিফোন আলাপের চুম্বক অংশ নিয়ে আলোচনা শুরু করার আগে গণস্বাস্থ্যখ্যাত ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী এবং ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন সম্পর্কে সংক্ষেপে দু-চারটি কথা বলে মূল প্রসঙ্গে চলে যাবো। সারা দেশের মানুষ খুব ভালো করেই জানেন, ডা: জাফরুল্লাহ এবং ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের বিরুদ্ধে মামলা-মোকদ্দমার নেপথ্যে প্রধানত দুটো কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, তারা উভয়েই কথাবার্তায় নিদারুণ চৌকস এবং তাদের অতীত অভিজ্ঞতা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা তাদের সমপর্যায়ের লোকজনের চাইতে অনেক গুণ বেশি হওয়ার কারণে তাদের আত্মবিশ্বাস ক্ষমতাসীনদের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে যাচ্ছিল।

উপরিউক্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে ক্ষুরধার যুক্তি এবং প্রতিপক্ষের আঁতে ঘা দেয়ার মতো তথ্য-উপাত্ত যখন তারা সভা-সমিতি, সেমিনার ও টেলিভিশনের টকশোতে উপস্থাপন করতেন, তখন তা প্রতিহত করা কিংবা সেগুলোর সদুত্তর দেয়ার মতো কেউ থাকত না। অধিকন্তু, তারা যখন অন্যতম উদ্যোক্তা রূপে ঐক্যফ্রন্ট গড়ে তুললেন; তখন সরকার বিষয়টিকে একদম পাত্তা না দিলেও পরে যখন তাদের হুঁশ হয়, তখন তারা তাদের গত ১০ বছরের অব্যর্থ সফল পদ্ধতি যা দিয়ে অনায়াশে রাজপথ, মাঠ-ঘাট ও জনপদগুলো প্রতিপক্ষমুক্ত রাখতে সফল হয়েছেন- তা প্রয়োগ করতে থাকেন। এ ব্যাপারে ক্ষমতাসীনরা যতটুকু সফল হয়েছেন বা তাদের আত্মতৃপ্তির মাত্রা তখন কোন ডিগ্রিতে রয়েছে, তা না দেখা গেলেও ওই দৃশ্য দেশবাসী স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন যে, ঐক্যফ্রন্টের কেউ ভয় পাননি বা তারা হতোদ্যম হননি। বরং নিজেদের কর্মকৌশল দ্বারা তারা বারবার সরকারকে একবার সামনে আনছেন, তো আবার পেছনে ঠেলে দিচ্ছেন।

তারা একবার সরকারকে নরম ও মানবিক বানিয়ে ফেলেছেন- আবার পরক্ষণেই শক্ত ও রূঢ় হতে বাধ্য করছেন। তারা সরকারকে কখনো আশাহত, আবার কখনো আশার আলোতে উদ্ভাসিত করার পাশাপাশি নিজেদের ইচ্ছেমতো কৌশল প্রয়োগ করে সরকারকে আগ-পিছ করে একেক সময় একেক ধরনের বক্তব্য দেয়ানোর মতো পরিস্থিতিতে ফেলে দিচ্ছেন।

সরকারি দলের যেসব মিত্র এতদিন বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এবং সদ্যগঠিত ঐক্যফ্রন্ট সম্পর্কে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতেন- তারা এখন ভাবতে শুরু করেছেন, আগামী দিনের সব কিছু তাদের পরিকল্পনা মতো না-ও হতে পারে। কারণ তারা সংলাপের নামে গণভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মহাজোটের নেতাদের সাথে যে বৈঠক করেছেন এবং তারপর নির্বাচন কমিশনের সাথে বৈঠকে যেসব কথাবার্তা বলেছেন, তা গত পাঁচ বছরের ইতিহাসে বিরল এবং অকল্পনীয় ছিল। সরকারি চাটুকারেরা প্রধানমন্ত্রীর মেজাজ-মর্জি বুঝে সংলাপকে তার ব্যক্তিগত মহাসফলতা, উদারতা, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় যুগান্তকারী পদক্ষেপ ইত্যাদি বলে আখ্যায়িত করলেও- তলে তলে বলছেন অন্য কথা। সরকারি নীতি-নির্ধারকদের অনেকের মতে- এ ধরনের সংলাপে বসারই দরকার ছিল না। কারণ ক্ষমতাসীনদের একমাত্র অব্যর্থ মহৌষধ হলো বিরোধী দলকে ভয় দেখানোর প্রমাণিত যোগ্যতা এবং নিজেদের একতরফা সিদ্ধান্ত প্রতিপক্ষের ওপর চাপিয়ে দেয়ার দুরন্ত ক্ষমতা। সংলাপের সুযোগ দিয়ে সরকার তার সেই নিরঙ্কুশ ক্ষমতা সম্পর্কে বিরোধীদের মনের ভয়-শঙ্কা, সঙ্কোচ-অবিশ্বাস ইত্যাদি দূর করে দিয়েছে, যা আগামী দিনে ভোটের মাঠে সরকারের জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়াবে।

বিএনপি এবং তাদের মিত্রদের দীর্ঘদিনের দাবি এবং ভেতরে প্রচেষ্টা ছিল একাদশ সংসদ নির্বাচনকে দ্রুত এবং নির্ধারিত সময়সীমায় শেষ হওয়ার যত আগে সম্ভব তত আগে অনুষ্ঠিত করানোর জন্য সরকারকে ফাঁদে ফেলা। অন্য দিকে, সরকার চেষ্টা করে যাচ্ছিল একেবারে শেষদিন অর্থাৎ ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচন প্রলম্বিত করা। কারণ তাদের ধারণা ছিল, দিন যত প্রলম্বিত হবে বিএনপি এবং তাদের মিত্ররা ততই বিপর্যস্ত হবে এবং রাষ্ট্রীয় মেশিনারি দ্বারা ছলাকলা প্রয়োগ করে বিরোধী জোট ভাঙা-গড়ার কর্মটি সহজতর হবে। কিন্তু ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর পরিস্থিতি উল্টো হচ্ছে দেখে সরকার ও নির্বাচন কমিশন তড়িঘড়ি করে সংক্ষিপ্ততম সময় হাতে রেখে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। বিএনপি সব রকম পূর্বপ্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও তারা এখন সরকারের সাথে নতুনভাবে খেলা শুরুর জন্য নিজেদের মনের খুশি গোপন রেখে শিডিউল পেছানর দাবি জানায় এবং কোনো আগামাথা চিন্তা না করেই দাবি মেনে নেয়। ফলে সরকারকে বারবার বিরোধী দলের কথামতো অবস্থান পরিবর্তন করিয়ে সরকারবিরোধীরা কিভাবে নির্বাচনী যুদ্ধের মাঠ নিজেদের দখলে নিয়ে নিচ্ছে, তা যখন সরকার বুঝতে পারছে- তখন তাদেরকে নতুন কৌশলে নতুন করে এগোতে হচ্ছে।

নির্বাচনী রাজনীতির বিশ্বব্যাপী সাধারণ নিয়ম হলো- যদি নির্বাচনী উৎসব শুরু হয়ে যায় এবং ভোটাররা মাঠে নেমে আসেন, তবে কোনো শক্তিই তা প্রতিহত করতে পারে না। দ্বিতীয়ত: ভোটারদের মন-মানসিকতা সাধারণত স্টাবলিস্টমেন্ট বিরোধী থাকে। এবং তৃতীয়ত: ভোটের মাঠে যারা সহানুভূতি পায় তারাই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকে। অতীতকালে আমাদের দেশে অনেক নেতা জেল থেকে নির্বাচিত হয়েছেন- অথচ সাধারণভাবে তিনি যদি ভোটের মাঠে থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন তাহলে হয়তো নিশ্চিতভাবে পরাজিত হতেন। নির্বাচনী মাঠের জয়-পরাজয়ের এতসব সমীকরণ বিএনপি যেন সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে না পারে, সেজন্য এযাবৎকালে সরকার যেসব পরিকল্পনা করেছিল তা ঐক্যফ্রন্ট প্রতিষ্ঠার পর ওলট-পালট হয়ে গেছে। আমাদের দেশে ভোটের মাঠ অনুকূলে নেয়ার সবচেয়ে মোক্ষম হাতিয়ার হলো- অনলবর্ষী বক্তার মোহময় রাজনৈতিক বক্তব্য। এ দেশের মানুষ যেকোনো নাটক, সিনেমা, যাত্রাপালা অথবা জারি-সারি-ভাটিয়ালি-পপ-রক বা ব্যান্ড সঙ্গীতের চেয়ে বহুগুণ বেশি পছন্দ করেন রাজনৈতিক বক্তব্য। বঙ্গবন্ধুর যুগান্তকারী বক্তব্যের কথা না হয় বাদই দিলাম- আওয়ামী লীগের প্রয়াত মেয়র মোহাম্মদ হানিফের বক্তব্যের কারণে বা একটি মাত্র বক্তৃতার কারণে তার জনসভায় উপস্থিত লাখ লাখ জনতা মুহূর্তের মধ্যে আবেগে উদ্বেলিত হয়ে নিজেদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ফেলতেন।

ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হওয়ার পর তাদের রাজনৈতিক মঞ্চে যে রসায়ন হবে, তা কি সরকারি দলের সভামঞ্চে ঘটানো সম্ভব। ঐক্যফ্রন্টে যোগদানকারী বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, মাহমুদুর রহমান মান্না এবং আ স ম আব্দুর রব মাইকে যে আগুন ছড়াবেন তা সামাল দেয়ার মতো লোক সরকারি দলে কে কে আছেন। বিএনপি নেতাদের মধ্যে সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি কিশোরগঞ্জের ফজলুর রহমান, বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থ, বিএনপি নেত্রী পাপিয়া প্রমুখ যেভাবে সভামঞ্চে দাঁড়িয়ে উপস্থিত জনতাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোহমুগ্ধ রেখে তাদের বিরোধীপক্ষকে তুলাধুনা করতে সক্ষম- তা সামাল দেয়ার মতো সরকারি দলে যে একজনও নেই, তা আমরা গত ১০ বছরে সংসদের ভেতরে ও বাইরে বহুবার দেখেছি। অন্য দিকে, ড. কামাল, ব্যারিস্টার মওদুদ আহম্মেদ, মোস্তফা মহসিন মন্টু, ড. খোন্দকার মোশারফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, অ্যাডভোকেট খোন্দকার মাহবুবউদ্দিন প্রমুখের মতো হেভিওয়েট লোকজনের সাথে জুড়ি মিলিয়ে নির্বাচনের মাঠ সামলে দিতে গিয়ে ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে জনমত, প্রশাসন এবং দেশী-বিদেশী মিত্রদের মন মানসিকতা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা এই মুহূর্তে সঠিকভাবে কেউ বলতে পারছেন না। কাজেই বিএনপির ট্রাম্পকার্ড মাঠে আসার আগেই অনেক কিছু হিসেবের বাইরে চলে যেতে পারে।

আলোচনার এ পর্যায়ে আমরা শিরোনাম প্রসঙ্গে কিছু বলবো। বিএনপির যে দুটো গুরুত্বপূর্ণ ট্রাম্পকার্ড রয়েছে, যা নির্বাচনী মাঠে প্রয়োগ করা হলে রীতিমতো ঝড় শুরু হবে- সে কথা বিএনপির কেউ বলেননি। সরকার সমর্থক কিছু গোঁফ খেজুরে অনলাইন পোর্টাল এবং ফেসবুক সেলিব্রেটি নিজ উদ্যোগে বিএনপির ট্রাম কার্ড নিয়ে এবার প্রপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা হয়তো বিএনপি নেতৃত্ব থেকে তারেক রহমান অথবা বেগম জিয়াকে মাইনাস করার স্বপ্নে বিভোর হয়ে প্রচারণা চালাতে গিয়ে একবারও ভাবছেন না যে, তারেক জিয়া এবং খালেদা জিয়া মাইনাস হয়ে গেলে তাদের দলের সভানেত্রী এবং তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা ও জনমানসে তাদের সম্পর্কে আকর্ষণ কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকবে। তারা প্রচার চালাচ্ছেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপিকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য তারেক রহমানের বিদুষী সহধর্মিণী জোবায়দা রহমান শিগগিরই বাংলাদেশে আসছেন। কেউ কেউ আগ বাড়িয়ে আরো প্রচারণা চালাচ্ছেন যে, তিনি সিলেট-১ সংসদীয় আসনে নির্বাচন করবেন।

উপরিউক্ত গুজবের সত্য-মিথ্যা সম্পর্কে আমি জানি না। তবে আমি এ কথা জানি যে, আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব বেগম জিয়া এবং তারেক রহমান সম্পর্কে বিরূপ ধারণা পোষণ করলেও জোবায়দা রহমান সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের একান্ত ঘরোয়া বৈঠকে একথাও আলোচনা হয়েছে যে, জোবায়দা যদি বিএনপির নেতৃত্বে আসেন, তবে তারা দলটির ব্যাপারে যথাসাধ্য নমনীয় হবেন। আমি নিজে এসব কথাবার্তা শুনেছি, তিন-চার বছর আগে। তবে বর্তমান সময়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বে জোবায়দা রহমান সম্পর্কে আগের মতো ইতিবাচক মনোভাব ধারণ করে কি না, তা স্পষ্ট নয়। যদি তারা সেটা এখনো অব্যাহত রাখেন এবং জোবায়দা রহমান তার মেয়েকে নিয়ে এই মুহূর্তে বাংলাদেশে আসেন, তবে তা সমকালীন বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদের জন্য কেমন হতে পারে- তা ভাবতে গিয়ে আমি বহুবার গলদঘর্ম হয়েছি।
ধরুন ডা: জোবায়দা রহমান তার মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে ডিসেম্বর মাসের চার কিংবা পাঁচ তারিখে বাংলাদেশে এলেন। আমি নিশ্চিত- সেদিন বিএনপি, জামায়াত এবং সাধারণ মানুষের বিপুল সমাবেশে পুরো ঢাকা বিশেষ করে টঙ্গী ব্রিজ থেকে বিমানবন্দর সড়ক, গুলশান, মহাখালী, বিজয়সরণী, ফার্মগেট হয়ে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল-শাহবাগ-মৎস্যভবন এবং কাকরাইল থেকে বিএনপির পল্টন অফিস হয়ে মতিঝিল শাপলা চত্বর লোকে-লোকারণ্য হয়ে পড়বে। সরকার শত চেষ্টা করেও জনস্রোত ফেরাতে পারবে না। এ বিশাল জনারণ্যে সরকারের জন্য সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবং দুঃখের কারণ হবে হেফাজতের নেতাকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি এবং অন্যান্য ইসলামপন্থী দল, মত এবং সম্প্রদায়ের উপস্থিতি। তারা সমাজ বিজ্ঞানের চিরায়ত সূত্র মোতাবেক সরকার থেকে সুযোগ নিয়েছেন কিন্তু নিজেদের সমর্থন তারা সব সময় তাদের বিশ্বাস-বোধ এবং অভ্যাসের দ্বারা প্রভাবিত হয়েই দেবেন।

আমি নিজে অনেকবার ভেবেছি- কেন সরকার বিএনপির নেতৃত্বে বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক জিয়ার পরিবর্তে জোবাইদা রহমানকে নিরাপদ মনে করছে। আমার মতে- জোবাইদাকে নিয়ে আওয়ামী ভাবনা যে কত বড় ভুল, তা তারা হাড়ে হাড়ে টের পাবেন যদি তিনি সত্যিই বিএনপির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ নেতা হিসেবে যে কোনো নর-নারীর মধ্যে যে ব্যতিক্রমী গুণাবলি, অভিব্যক্তি ও বংশ-মর্যাদা খুঁজে বেড়ান তার প্রায় সবগুলোই জোবায়দা রহমান এবং তার মেয়ে জাইমা রহমানের মধ্যে রয়েছে। তারা বাঙালি রীতি অনুযায়ী শালীন পোশাক পরেন, কম কথা বলেন এবং হাঁটা চলায় যথেষ্ট ভাবগাম্ভীর্য বজায় রাখেন। বিশেষ করে কিশোরী জাইমা যখন ঐতিহ্যবাহী অভিজাত আরব কিংবা পারস্য দুহিতার মতো শারীরিক গঠন এবং হিজাবের মতো ইসলামি পোশাক পরে তার মায়ের সাথে নির্বাচনী মাঠে নামবেন তখন ধর্মপ্রাণ নিরীহ মানুষ তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ উপেক্ষা করে মা-মেয়ের প্রতি সহানুভূতি দেখাবেন।

ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে নির্বাচনের দিন পর্যন্ত সারা দেশে নির্বাচনী আমেজ থাকবে তুঙ্গে। গত পাঁচ বছরের সরকারি দাপট অর্থাৎ মামলা-হামলা-গ্রেফতার, ইত্যাদি কার্যত বন্ধ থাকবে। কোনো বাহিনী চেষ্টা করলেও ওমনটি করতে পারবে না। থানা, পুলিশ, র‌্যাব এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে। বাহিনীগুলোর সদস্যরা নিজেদের রাজনৈতিক বিশ্বাস অনুযায়ী পছন্দের দলের প্রার্থীদের সর্বাত্মক সহযোগিতা দেয়ার চেষ্টা করবেন। ঘুষখোর কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঘুষের টাকা আদায়ের জন্য হন্যে হয়ে টাকাওয়ালা প্রার্থীদের তাঁবেদারি করবেন। এ অবস্থায় সবকিছুই দু-তিনভাবে বিভক্ত হয়ে পড়বে, যা কি না সরকারি এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথে বিরাট প্রতিবন্ধকতা রূপে দেখা দেবে। প্রতিটি উপজেলা-জেলা থেকে শুরু করে শহর-বন্দর-জনপদে লাখ লাখ মানুষ সকাল থেকে গভীর রাত-অবধি মাঠে থাকবে। ফলে প্রতিটি ঘটনা জনমত, জনপ্রিয়তা এবং স্থানীয় শক্তিমত্তা দ্বারা পরিচালিত হবে। ঊর্ধ্বতন মহলের নির্দেশ এবং চিরচেন হুন্ডা-গুণ্ডা ও চাকু-ক্ষুর পার্টি এ সময়ে নিজেদের কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলবে।

মানুষের অবদমিত রাজনৈতিক ইচ্ছা-অভিলাষ গত পাঁচ বছর ধরে যেভাবে সিন্ধুকে ভরা ছিল তা শত উদ্যোম নিয়ে আলাদিনের দৈত্যের মতো মাঠে নেমে এসে স্লোগানে মুখরিত করে তুলবে। ফলে ২০০৯ সালের নির্বাচনের চাইতেও এবারের নির্বাচনের প্রতিটি জনসভা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকে থাকবে কানায় কানায় পূর্ণ। আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান বলছে- এবারের নির্বাচনে চিরাচরিত নির্বাচনী সহিংসতা হবে স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে কম। প্রতিটি ভোটার, কর্মী-সমর্থক, নেতা এবং প্রার্থী অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অধিক ধৈর্য-সহ্য, কৌশল এবং পরিশ্রম দ্বারা ভোটের মাঠে টিকে থাকার লড়াই সংগ্রাম করবেন। এ অবস্থায় জোবাইদা রহমান ও জাইমা রহমান যদি ঢাকা মহানগরীসহ অন্যান্য বিভাগীয় শহরে গিয়ে বিএনপির জনসভায় অশ্রুসিক্ত নয়নে ভোট প্রার্থনা করেন, তবে পরিস্থিতি কোন অবস্থায় দাঁড়াবে তা সহজে অনুমেয়। বিশেষ করে, কিশোরী জাইমা যদি তার দাদীর মুক্তির জন্য কান্না জুড়ে দেন, তবে পুরো পরিস্থিতি সরকারের জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়াবে।

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য