ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

শহীদুল ইসলাম

২৮ নভেম্বর ২০১৮, ১৬:১১

ক্ষমতাসীনদের সাজানো প্রশাসনের অধিনে সাজানো ছকে নির্বাচন!

8971_2.jpg
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এখনো আওয়ামী লীগের সাজানো প্রশাসনই বহাল রয়েছে।মাঠপ্রশাসনে রদবদলের কোন উদ্যোগ ইসির আদৌ আছে বলে মনে হচ্ছেনা।ক্ষমতাসীনদের সাজানো প্রশাসনে এবং সাজানো ছকেই নির্বাচনের আয়োজন চলছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়েছে গত ৮ নবেম্বর। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর জন্য সমান সুযোগ তৈরি করা তো দুরের কথা প্রশাসনকে নিরপেক্ষ করার জন্য ঢেলে সাজানোর কোন লক্ষণই নেই।উপরন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশনার(সিইসি) প্রশাসনে রদবদল করা হবেনা বলে আশ^স্থ করেছেন কর্মকর্তাদের।
 
নির্বাচনে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব, জনপ্রশাসন ও পুলিশের ৯২ জন কর্মকর্তার অবিলম্বে প্রত্যাহার চেয়েছে বিরোধী রাজনৈতিক জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। তাদের দাবি, এসব কর্মকর্তা ক্ষমতাসীন দলের অনুগত ও বিতর্কিত।এদের সংশ্লিষ্ট পদে রেখে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।গত ২২ নবেম্বর দুপুরে ১৩টি চিঠিতে ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে বিএনপির নেতারা নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ জমা দেন। ওই সময় নির্বাচন ভবনের সম্মেলনকক্ষে পুলিশ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করছিল ইসি।মজার ব্যাপার হলো- ঐক্যফ্রন্ট যাঁদের প্রত্যাহার দাবি করেছে, তাঁদের অনেকেই ওই সভায় ছিলেন।

ঐদিনের সভায় জেলার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সুপারদের (এসপি) পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে বদলি বা প্রত্যাহার-আতঙ্ক কাজ করছে। এই আতঙ্ক নিয়ে সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাঁদের আশ্বস্ত করে ইসি বলেছে, আতঙ্কের কিছু নেই। বদলি করা হবে না। ইসির এই আশ্বাস নিয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা সভা শেষে কর্মস্থলে ফিরে গেছেন।

এর আগেও দুই দফা ঐক্যফ্রন্ট প্রশাসনের রদবদলের দাবি জানিয়েছিল। তখন ইসি বলেছিল, ঢালাওভাবে প্রস্তাব দিলে ইসি তা গ্রহণ করবে না। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সুনির্দিষ্টভাবে তা জানালে ইসি খতিয়ে দেখবে।

ঐদিন ঐক্যফ্রন্ট যেসব অভিযোগ করে, তাতে সুনির্দিষ্টভাবে ৯২ জন কর্মকর্তা সম্পর্কে বলা হয়েছে। এর মধ্যে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদসহ জনপ্রশাসনের আছেন ২২ জন কর্মকর্তা। যাঁদের ১৭ জন জেলা প্রশাসক (ডিসি)। আর পুলিশের আছেন ৭০ জন। তাঁদের মধ্যে পুলিশ সুপার (এসপি) রয়েছেন ৩১ জন। এই তালিকায় জনপ্রশাসন সচিব ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব, র‌্যাবের মহাপরিচালক, ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার, অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) এবং সব বিভাগের উপমহাপরিদর্শকদের (ডিআইজি) নাম রয়েছে। লিখিত অভিযোগে এসব কর্মকর্তাকে ‘দলবাজ’, কেউ কেউ মন্ত্রীদের একান্ত সচিব হিসেবে কাজ করেছেন এবং অনেককে ছাত্রলীগের সাবেক নেতা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব কর্মকর্তা মাঠে থাকলে নির্বাচন প্রভাবিত হবে।

ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়, তিনি ইসির কর্মকর্তাদের গোয়েন্দা প্রতিবেদন দেখিয়ে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। জনপ্রশাসন সচিব ফয়েজ আহমদ ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন উল্লেখ করে বলা হয়, তিনি মাঠ প্রশাসনকে সরকারের নীলনকশা অনুযায়ী সাজাচ্ছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব মোস্তফা কামাল ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

কর্মকর্তাদের তালিকা সংবলিত পৃথক ১৩টি অভিযোগে সই করেছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এসব অভিযোগ ইসি সচিবালয়ের সচিবের কাছে জমা দেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। এরপর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির জন্য পুলিশের দলবাজ ও রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী কর্মকর্তাদের নির্বাচনী দায়িত্ব না দেওয়ার জন্য বলেছি। যাঁরা সমতল মাঠকে অসমতল করার কাজে ব্যস্ত তাঁদের নাম, পদবি, কর্মস্থলসহ সকল তথ্য নির্বাচন কমিশনের কাছে দিয়েছি।’মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘আজকে লিখিতভাবে সব তথ্যপ্রমাণসহ দিয়ে গেলাম। গণহারে আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের নির্বাচন কর্মকর্তা নিয়োগ করা হচ্ছে। এঁদের সঙ্গে জনপ্রশাসনের দলবাজ কর্মকর্তাদেরও প্রত্যাহার চাওয়া হয়েছে।’

যাঁদের প্রত্যাহার চায় ঐক্যফ্রন্ট
ঐক্যফ্রন্টের তালিকায় থাকা জনপ্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা হলেন নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফয়েজ আহমদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দিন, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নান ও খুলনার বিভাগীয় কমিশনার লোকমান হোসেন মিয়া।

১৭ জেলা প্রশাসকদের মধ্যে আছেন, ভোলার মাসুদ আলম সিদ্দিকী, চট্টগ্রামের মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসাইন, ফেনীর মো. ওয়াহিদুজ্জামান, কুমিল্লার মো. আবুল ফজল মীর, লক্ষ্মীপুরের অঞ্জন চন্দ্র পাল, কিশোরগঞ্জের সারোয়ার মোরশেদ চৌধুরী, নরসিংদীর সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন, টাঙ্গাইলের মো. শহীদুল ইসলাম, ঝিনাইদহের সরোজ কুমার নাথ, খুলনার মো. হেলাল হোসাইন, কুষ্টিয়ার আছলাম হোসাইন, নড়াইলের আঞ্জুমান আরা, ময়মনসিংহের শুভাস চন্দ্র বিশ্বাস, নওগাঁর মিজানুর রহমান, জয়পুরহাটের জাকির হোসাইন, রাজশাহীর এস এম আবদুল কাদের ও সিলেটের এমদাদুল হক।

পুলিশ কর্মকর্তারা
ঐক্যফ্রন্টের তালিকায় যেসব পুলিশ কর্মকর্তার নাম আছে তাঁরা হলেন, র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, ডিএমপির কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া, অতিরিক্ত আইজিপি (টেলিকম) ইকবাল বাহার, নৌ পুলিশের ডিআইজি শেখ মারুফ হোসেন, সিলেটের ডিআইজি কামরুল আহসান, চট্টগ্রামের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক, খুলনার ডিআইজি দিদার আহম্মেদ, রাজশাহীর ডিআইজি এম খুরশীদ হোসেন, খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হুমায়ন কবির, ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ও কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার মাহবুবুর রহমান, ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মীর রেজাউল আলম, এসবির ডিআইজি মোহাম্মদ আলী মিয়া, রংপুরের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য, ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার কৃষ্ণপদ রায়, পুলিশ সদরের পুলিশ সদরের ডিআইজি (অপারেশনস) আনোয়ার হোসেন, রাজশাহী মেট্রোপলিটনের পুলিশ কমিশনার হাফিজ আক্তার, পুলিশ সদরের ডিআইজি (ট্রেনিং) খন্দকার মহিদ উদ্দিন, ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার আবদুল বাতেন, অতিরিক্ত ডিআইজি চৌধুরী মঞ্জুরুল কবীর, ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার শেখ নাজমুল আলম, খুলনার অতিরিক্ত ডিআইজি এ কে এম নাহিদুল ইসলাম, সিলেটের অতিরিক্ত ডিআইজি জয়দেব কুমার ভদ্র, ঢাকার অতিরিক্ত ডিআইজি মো. আসাদুজ্জামান, ডিএমপির উপকমিশনার হারুন অর রশিদ, মারুফ হোসেন সরদার, খন্দকার নুরুন নবী, এস এম মুরাদ আলী ও সহকারী কমিশনার শিবলী নোমান, সিএমপির উপকমিশনার এস এম মেহেদী হাসান ও ফারুকুল হক, কাউন্টার টেররিজম বিভাগের ডিসি প্রলয় কুমার জোয়ারদার প্রমুখ।

তালিকায় এসপিদের মধ্যে আছেন ঢাকার শাহ মিজান শফিউর রহমান, নারায়ণগঞ্জের আনিসুর রহমান, মুন্সিগঞ্জের যায়েদুল আলম, নরসিংদীর মো. মিরাজ, টাঙ্গাইলের সঞ্জিত কুমার রায়, মাদারীপুরের সুব্রত কুমার হাওলাদার, ময়মনসিংহের শাহ আবিদ হোসেন, শেরপুরের আশরাফুল আজিম, সিলেটের মো. মনিরুজ্জামান, বরিশালের সাইফুল ইসলাম, ভোলার মোক্তার হোসেন, খুলনার এস এম শফিউল্লাহ, সাতক্ষীরার মো. সাজ্জাদুর রহমান, বাগেরহাটের পঙ্কজ চন্দ্র রায়, যশোরের মঈনুল হক, ঝিনাইদহের মো. হাসানুজ্জামান, কুষ্টিয়ার আরাফাত তানভীর, চট্টগ্রামের নুরে আলম মিনা, নোয়াখালীর ইলিয়াস শরীফ, ফেনীর এস এম জাহাঙ্গীর আলম সরকার, কুমিল্লার সৈয়দ নুরুল ইসলাম, রংপুরের মিজানুর রহমান, দিনাজপুরের সৈয়দ আবু সায়েম, ঠাকুরগাঁওয়ের মনিরুজ্জামান, রাজশাহীর মো. শহিদুল্লাহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের মোজাহিদুল ইসলাম, নওগাঁর ইকবাল হোসেন, নাটোরের সাইফুল্লাহ, বগুড়ার আশরাফ আলী, সিরাগঞ্জের টুটুল চক্রবর্তী ও পাবনার রফিক ইসলাম।
সুনির্দিষ্ট কারণসহ অভিযুক্ত মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের তালিকা ইসিতে জমা দেয়ার পরেও ৬দিন অতিক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু সেই তালিকা অনুযায়ি কোন ব্যবস্থা আজও নেয়া হয়নি,লক্ষণও দেখা যাচ্ছেনা।উপরন্তু তালিকা হস্তান্তরের দিনই ইসির সম্মেলনকক্ষে পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইসির মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা, কমিশনার মাহবুব তালুকদার, শাহাদত হোসেন চৌধুরী, রফিকুল ইসলাম ও কবিতা খানম, পুলিশের মহাপরিদর্শক জাবেদ পাটোয়ারী এবং দুই প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।সভায় এসপিরা ভোটের আগে তাঁদের বদলি বা প্রত্যাহার করা হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। বিরোধী দল থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে, সেগুলোকে ঢালাও উল্লেখ করে একাধিক এসপি বলেন, বদলি বা প্রত্যাহার-আতঙ্ক মাথায় নিয়ে কাজ করা যায় না। এসব ঢালাও অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে ব্যবস্থা নেওয়া ঠিক হবে না।

সভায় উপস্থিত নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার নিকট অতীতের নির্বাচনে পুলিশের ভূমিকার সমালোচনা করেন। তিনি পুলিশ বাহিনীকে নিরপেক্ষ থেকে দায়িত্ব পালন করার পরামর্শ দেন।

তবে সিইসি ও অন্য তিন কমিশনার পুলিশ বাহিনীকে আশ্বস্ত করে বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া কোনো পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঢালাওভাবে অভিযোগ আমলে নেওয়া হবে না।কমিশনার রফিকুল ইসলাম পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘হতাশার কিছু নেই। আপনারা নির্ভয়ে কাজ করে যান।’

এর আগে ইসিতে ৪৭২ জন নেতাকর্মীর তালিকা জমা দেন বিএনপির কেন্দ্রীয় মামলা তথ্য সংগ্রহকারী কর্মকর্তা মো. সালাহউদ্দিন খান। তালিকার সঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্বাক্ষরিত একটি চিঠিও দেয়া হয়।

ইসিতে দেয়া চিঠিতে বলা হয়, ৮ নভেম্বর তফসিল ঘোষণার পর বিএনপির ৪৭২ নেতাকর্মীকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গ্রেফতার করেছে।তালিকা জমা দেয়ার পর সালাহউদ্দিন খান বলেন, তফসিল পরবর্তী সময়ে বিএনপির ৪৭২ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ইতিপূর্বে কমিশন থেকে বলা হয়, তফসিলপরবর্তী সময় কাউকে গ্রেফতার করা হবে না। কিন্তু গ্রেফতার করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বৈঠকে তফসিলের পর গ্রেফতার হওয়া নেতাকর্মীদের নাম-পদবিসহ তালিকা জমা দিতে বলে ইসি।তিনি বলেন, এরই পরিপ্রেক্ষিতে নেতাকর্মীদের পদবিসহ নামের তালিকা জমা দেয়া হল।

লক্ষণীয় বিষয়, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে বিরোধীদের দমনে সরকারের যে ভূমিকা ছিল, এখন তা আরও কঠোর রূপ নেওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে। নির্বাচন কমিশন যদিও সেসব বিষয়ে একধরনের নীরবতা পালনকেই যথাযথ বলে বিবেচনা করছে। কমিশনের ভূমিকায় মনে হচ্ছে, তারা যেনতেন প্রকারে নির্বাচন করতেই আগ্রহী। মুখে যা-ই বলুক না কেন, সুষ্ঠু নির্বাচন করতে কমিশন যে আগ্রহী, তাদের আচরণে সেটা মনে হচ্ছে না। বিরোধী দলের অংশগ্রহণে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো প্রস্তুতি বা আগ্রহ তাদের আদৌ ছিল কি না, তাদের আচরণে এমন প্রশ্নও ওঠে।

অন্যদিকে ক্ষমতাসীনদের প্রধান প্রতিদ্বন্দী বিএনপির নেতা-কর্মীদের একটি বড় অংশ মামলার আসামি হয়ে অনেকে কারাগারে, অনেকে ঘরে থাকতে পারছেন না। তফসিল ঘোষণার পরও বিএনপির নেতা-কর্মীদের নামে মামলা হচ্ছে। ১৮ নভেম্বর বিএনপি নির্বাচন কমিশনকে ২ হাজার ৪৭টি মামলার তালিকা দিয়েছে। দলটি বলেছে, ৮ নভেম্বর জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ৭৭৩ জন বিএনপির নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মামলা প্রত্যাহার ও গ্রেপ্তার বন্ধে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে বিএনপির পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হলেও তার কোনো ফল হয়নি।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার না থাকায় প্রশাসন কমিশনের মত করে সাজানোর দায়িত্ব বর্তেছে কমিশনের ওপর। এ অবস্থায় ৯ নভেম্বর ৬৪টি জেলার ডেপুটি কমিশনার এবং দুজন ডিভিশনাল কমিশনারকে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।তবে এরা সবাই আওয়ামী সরকার কর্তৃক নিযুক্ত। গত ৩১ জুলাই এবং ১৫ অক্টোবরের মধ্যে সরকার ৩৬টি জেলায় ডেপুটি কমিশনার নিয়োগ দিয়েছে; নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগের দিন ৭ নভেম্বর ২৩৫ জন অতিরিক্ত পুলিশ সুপারিনটেনডেন্টকে পদোন্নতি দিয়ে পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট করা হয়েছে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি পুলিশ–প্রশাসনে রদবদল আনার জন্য তিন দফায় কমিশনে দাবি জানিয়েছে। জবাবে কমিশন বলছে, ঢালাওভাবে বদলির প্রস্তাব করলে তা কমিশন গ্রহণ করবে না। কমিশনের এই অবস্থানে এই প্রশ্ন সামনে আসে যে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করার ক্ষেত্রে কমিশনের সদিচ্ছা আদৌ আছে কি না।অভিজ্ঞ মহল বলছেন,তাহলে কমিশনের কাজ কি শুধু দলীয় সরকারের ছকমত নির্বচনের আনুষ্ঠানিকতা পালন করা?

নির্বাচনে প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও পোলিং কর্মকর্তা হিসেবে যাঁরা দায়িত্ব পালন করবেন, তাঁদের প্যানেল তৈরি করা হয়েছে। তাঁদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। এর উদ্দেশ্য হতে পারে, নির্বাচন পরিচালনায় কেন্দ্র পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারাও যাতে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক হন এবং বিরোধী পক্ষের কেউ দায়িত্বে আসতে না পারেন, তা নিশ্চিত করা। আরেকটি উদ্দেশ্য হতে পারে, নির্বাচন কর্মকর্তাদের ভীতসন্ত্রস্ত রাখা।বর্তমান পুলিশ প্রশাসন নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। অঘোষিত অস্ত্রধারী এই রাষ্ট্রীয় বাহিনীই ক্ষমতাসীনদের টিকিয়ে রেখেছে। এখনও যদি তারাই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন তাহলে অবাধ,নিরপেক্ষ নির্বাচনের বাণী কাগজেই থেকে যাবে। বাস্তবে হবেনা।

পুলিশের এই তৎপরতা নিয়ে পুলিশ ও নির্বাচন কমিশন লুকোচুরি করছে। কমিশন দাবি করছে, তারা বিষয়টি জানে না। কিন্তু গণমাধ্যমে এ-সংক্রান্ত খবর প্রকাশিত হওয়ার পরও কমিশনকে পুলিশের এই তৎপরতার বিরুদ্ধে উদ্যোগী হতে দেখা যায়নি। কমিশন যদি বলতে চায়, তাদের অজ্ঞাতেই পুলিশ ও প্রশাসন এ ব্যবস্থা নিয়েছে; তাহলে তার অর্থ হচ্ছে তফসিল ঘোষণার পরে প্রশাসনের ওপরে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় তারা ব্যর্থ হয়েছে।

কমিশনের দায়িত্ব পালনের এসব ত্রুটি-বিচ্যুতি ও ব্যর্থতা তাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগকেই শক্তিশালী করছে। অবস্থাটি এ রকম যে মনোনয়নপ্রত্যাশী একজন সাবেক প্রতিমন্ত্রী তাঁর বিরুদ্ধে আনীত মামলার কারণে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে যেতে এ কারণে ভীত যে তাঁকে পথেই গুম করে ফেলা হতে পারে।

বিএনপির পক্ষ থেকে দেওয়া মামলার তালিকা ও মাঠ প্রশাসনে রদবদলের বিষয়ে রফিকুল ইসলাম বলেন, তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, সুনির্দিষ্ট কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে ইসি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেবে। এ ছাড়া মামলার তালিকায় এক নম্বরে আদালতের দন্ডপ্রাপ্ত আসামি এবং দুই নম্বরে খুনের মামলার আসামি থাকলে কমিশনের কিছুই করার নেই। তফসিলের পরে গায়েবি মামলার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তফসিলের পরে কেউ খুন হলে মামলা নেওয়া যাবে না- এমন তো কোনো কথা নেই।

স্মরণ করা যেতে পারে,এরশাদের পতনের পরে ১৯৯১ সালে যে নির্বাচন হয়েছিল তার আগে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ মাঠপ্রশাসন নিজের মত করে সাজিয়েছিলেন। কোন দলের মত করে তিনি করেননি। ১৯৯৬ সালে বিচারপতি হাবিবুর রহমান প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপত নিয়েই মাঠপশাসনে ব্যাপক রদবদল করেন।বিএনপির সাজানো প্রশাসন তছনছ করে দেন। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে আব্দুল মুয়িত চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি করা হয় শুধুমাত্র প্রশাসনে রদবদল করার জন্য। কমিটি সচিব থেকে শুরু করে টিএনও এবং তারও নীচে পর্যন্ত রদবদল করে নির্বাচনে নিরপেক্ষ প্রশাসন তৈরী করেন।২০০৮ সালেও তাই হয়েছে।

বর্তমানে তত্তাবধায়ক সরকার নেই। তবে তফসিল ঘোষণার পর নির্বাচন কমিশন ব্যাপক ক্ষমতার অধিকারি হয়েছে।তাদেরকেই তত্তাবধায়ক সরকারের মত সব ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে যে সরকার রয়েছে তাদের দায়িত্ব শুধুই রুটিন কাজ সম্পন্ন করা। প্রশাসনে রদবদল করে নিরপেক্ষতা আনা,পুলিশ বাহিনীকে নিজেদের নিয়ন্ত্রনে আনাসহ সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরী করার যথেষ্ট সুযোগ ইসির হাতে থাকলেও তারা অজানা কারণে তা করছেনা। শেখ হাসিনার সাজানো প্রশাসন বহাল রেখেই তারা যেন শুধুই একটা নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা পালন করার দিকে এগিয়ে চলেছে।
লেখক- সাংবাদিক
shahidjournalist67@gmail.com