ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা

৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ১১:১২

অযোধ্যা আবারও অশান্ত হয়েছে উঠেছে

9213_Babri.jpg
ভারতে লোকসভা নির্বাচন এগিয়ে আসার প্রেক্ষাপটে দেশটিতে সাম্প্রদায়িক তৎপরতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এজন্য মুসলমান, মুসলিম স্থাপনা ও মুসলিম শাসনামলে দেয়া বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থানের নাম বিশেষভাবে টার্গেট করা হয়েছে। ভারতে মুসলিম নির্যাতনের ঘটনা নতুন কিছু নয়। সম্প্রতি তা আরও বেড়েছে। তারা আগ্রায় মোঘল স¤্রাট শাহজাহানের আমলে নির্মিত ঐতিহাসিক তাজমহল নিয়ে নানাবিধ ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যেই তাজমহলের অভ্যন্তরের মসজিদে নামাজ আদায় করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে এবং উগ্রবাদী দলের নেতাকর্মীরা সেখানে পুঁজা-অর্চনা শুরু করেছে বলে জানা গেছে। তারা মুসলিম আমলে দেয়া বিভিন্ন স্থানের নাম পরিবর্তনের দাবি জানাচ্ছে এবং ইতোমধ্যেই কয়েকটি ঐতিহাসিক শহরের নাম পরিবর্তনের ঘটনাও ঘটেছে। উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদের নাম ‘প্রয়াগরাজ’ ও ফৈজাবাদের নাম ‘অযোধ্যা’ করা হয়েছে। পাঠ্যপুস্তক থেকে বাদ দেয়া হয়েছে মোঘল আমলের ইতিহাস।
সে ধারাবাহকতায় তারা এবার অযোধ্যায় ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদের স্থানকে বিশেষভাবে টার্গেট করেছে। সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলো ধর্মীয় উম্মাদনা সৃষ্টির জন্যই অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের যায়গায় রামমন্দির নির্মাণের দাবিতে সম্প্রতি সেখানে একটি সমাবেশ করেছে। তাই ঐতিহাসিক অযোধ্যা নগরীতে নতুন করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে স্থানীয় মুসলমানদের মধ্যে উদ্বেগ, উৎকন্ঠা ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাপকভাবে।
বাবরি মসজিদ ভারতের উত্তর প্রদেশের, ফৈজাবাদ জেলার অযোধ্যা শহরের রামকোট হিলের উপর অবস্থিত একটি প্রাচীন মসজিদ। ১৯৯২ সালে একটি রাজনৈতিক সমাবেশের উদ্যোক্তারা, ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অনুযায়ি মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় একটি রাজনৈতিক সমাবেশ শুরু করে। যা একটি সম্মিলিত দাঙ্গার রূপ নেয় এবং ঐতিহাসিক এই মসজিদটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা হয়। ফলস্বরূপ ওই একই সালে ভারতের প্রধান শহরগুলোতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয়। ফলে মুম্বাই ও দিল্লী শহরে কয়েক হাজার মানুষের প্রাণহানীর ঘটনা ঘটে। মসজিদটি ১৫২৮ খ্রীষ্টাব্দে ভারতে মুঘল স¤্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট জহিরুদ্দীন বাবরের আদেশে নির্মিত এবং তাঁর নাম অনুসারে নামাঙ্কিতও করা হয়।
দিল্লির সুলতানি এবং তার উত্তরাধিকারী মুঘল সাম্রাজ্যের শাসকরা শিল্প এবং স্থাপত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং তাঁদের নির্মিত অনেক সমাধি, মসজিদ ও মাদ্রাসা সূক্ষ নির্মাণ কৌশলের নিদর্শন বহন করে। মুঘলদের স্থাপত্য তুঘলক রাজবংশের স্থাপত্যের প্রভাব বহন করে যার একটি স্বতন্ত্র গঠন শৈলী আছে। ভারতের সর্বত্র মসজিদগুলোর ভিন্ন ভিন্ন গঠনশৈলী আছে যা বিভিন্ন সময়ে নির্মিত হয়েছিল। এই নির্মাণগুলির মধ্যে আদিবাসী শিল্প ঐতিহ্য এবং স্থানীয় কারিগরদের মার্জিত শৈলী ও দক্ষতা উভয়ই প্রকাশ পায়। মসজিদের নির্মাণে আঞ্চলিক বা প্রাদেশিক জলবায়ু, ভূখন্ড, উপকরণ ইত্যাদি প্রভাব ফেলতো যার ফলে বঙ্গ, কাশ্মীর ও গুজরাটের মসজিদের মধ্যে বিরাট পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। বাবরী মসজিদ জানপুরের সুলতানি স্থাপত্যের পরিচয় বহন করে। বাবরী মসজিদ তার সংরক্ষিত স্থাপত্য ও স্বতন্ত্র গঠনশৈলীর জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
মূলত বাবরী মসজিদ ও কথিত রাম মন্দির বিষয়ক জটিলতা এখনও ভারতীয় উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। কিন্তু উগ্রবাদীরা আদালতের কোন তোয়াক্কা না করে রামের কথিত জন্মভূমিতে মন্দির নির্মাণের দাবিতে পুরো অযোধ্যাকেই অশান্ত করে তুলেছে। আদালতের রায়ের দিকে না তাকিয়ে সরকারকে নির্বাহী আদেশ জারি করার দাবি জানিয়েছে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। অন্যদিকে অযোধ্যাতে ক্ষমতাসীন বিজেপির শরিক ও মহারাষ্ট্রের হিন্দুত্ববাদী দল শিবসেনা নতুন  করে তৎপরতা শুরু করেছে। তারাও সম্প্রতি বিরোধপূর্ণ এলাকায় বৃহত পরিসরে সমাবেশ করে মসজিদের স্থলে রাম মন্দির নির্মাণের প্রত্যয় ঘোষণা করেছে। ফলে অযোধ্যা সহ পুরো ভারতেই মুসলমানরা এখন সীমাহীন নিরাপত্তাহীনতায় ভূগছেন এবং জানমালের নিরপত্তার জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
বিশ্ব হিন্দু পরিষদ অযোধ্যায় যেভাবে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে তাতে শহরের মুসলিমরা আতঙ্কিত ও উদ্বিগ্ন হওয়ায় স্বাভাবিক। উগ্রবাদীরা সেখানে বিভিন্ন উত্তেজনাকর স্লোগান দিয়ে প্রতিনিয়ত উস্কানী সৃষ্টি করে চলেছে। যেকোন মহুর্তে শান্তি ভঙ্গের আশঙ্ককায়  ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের রাখতে সেখানে কর্তৃপক্ষ সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে উস্কানী সৃষ্টি করে নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা জোরদার কেউই ভাল চোখে দেখছে না। একদিকে উগ্রবাদী মাতম, অন্যদিকে নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতায়  অযোধ্যায় সর্বত্রই নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তারা ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বরের পুনরাবৃত্তি হওয়ার আশঙ্কাও করছেন।
১৯৯২-এর সেই দিনের ভয়ঙ্কর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কেউ চোখের সামনে দেখেছিলেন, কেউ মুখে মুখে শুনেছেন। যে দিন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের পক্ষ থেকে ‘ধর্ম সংসদ’-এর ঘোষণা করা হয়েছিল সেদিন থেকেই সেই আতঙ্ক আবার তাড়া করে ফিরছে অযোধ্যার মুসলিমদের। সম্প্রতি রাম মন্দির নির্মাণের দাবিতে অযোধ্যায় জমায়েত হয়েছিল লক্ষাধিক হিন্দু কট্টরপন্থী। আতঙ্কে এই জমায়েতের অনেক আগেই আযোধ্যা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন মুসলিম সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ মানুষ। ফলে অযোধ্যার মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলী এখন বিরাণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে।
সম্প্রতি হাজার হাজার নিরাপত্তারক্ষীর বলয়ের মধ্যে বিভিন্ন উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বাবরি মসজিদ চত্বরে দ্রুত রামমন্দির নির্মাণের দাবিতে বিশাল সমাবেশ ক্ষমতাসীনদের দুরভীসন্ধি বলে মনে করা হচ্ছে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের ‘ধর্ম সংসদ’ নামের সমাবেশ থেকে তাদের নেতা ও সাধু-সন্যাসীরা দাবি তুলেছেন, আদালতের অপেক্ষায় না থেকে সরকারকে অর্ডিন্যান্স জারি করে হলেও মন্দির নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। অযোধ্যায় কাউকে ‘নামায’ পড়তে দেবেন না জানিয়ে তাদের নেতা চম্পত রায় বলেছেন, ‘আমরা এখানে জমির অংশ চাই না। আমরা পুরো জায়গাই চাই। সরকারকে অবশ্যই তাদের দেয়া কথা রাখতে হবে।’ অথচ ভারতীয় হাইকোর্টের রায়ে বিরোধপূর্ণ ভূমিকে ৩ ভাগে ভাগ করে এক ভাগে মসজিদ নির্মাণের নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু উগ্রবাদীরা এই রায়ের কোন তোয়াক্কাই করছে না।
এদিকে, চলমান রামমন্দির বিতর্ককে আরও উস্কে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। রাজস্থানের আলোয়াড়ে এক নির্বাচনী জনসভায় তিনি বলেছেন, ‘কংগ্রেস এই ইস্যুতে বিচার বিভাগকে পর্যন্ত ভয় দেখাতে চেয়েছে। অযোধ্যা শুনানি যাতে ২০১৯ নির্বাচন পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়, তারা সুপ্রিম কোর্টকে সেই দাবিও জানিয়েছে।’ ক্ষমতাসীন বিজেপির ইশতেহারেও বলা হয়েছে, তারা রামমন্দির-বাবরি মসজিদ মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায়ই মেনে নেবে। ভারতীয় সরকার মুখে এসব কথা বললে নেপথ্যে সাম্প্রদায়িক শক্তিকেই পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। তারা উগ্রবাদী কোন তৎপরতার বিরুদ্ধে কোন প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। ফলে সাম্প্রদায়িক শক্তি অতি উৎসাহ নিয়েই তাদের অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
বিতর্কিত রাম জন্মভূমি, বাবরী মসজিদ ও কথিত রাম মন্দিরকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু দিন ধরেই চরম অযোধ্যায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অযোধ্যায় মোতায়েন করা হয়েছে ৪২ কোম্পানি প্রভিন্সিয়াল আর্মড কনস্ট্যাবুলারি (পিএসি), ৫ কোম্পানি র‌্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (র‌্যাফ), ৭০০ কনস্টেবল ও ১৬০ জন পুলিশ ইনস্পেক্টর। সঙ্গে মোতায়েন করা হয়েছে অ্যান্টি-টেররিজম স্কোয়্যাড (এটিএস)-এর কম্যান্ডো বাহিনী। নজরদারির জন্য রাখা হয়েছে প্রচুর ড্রোন ক্যামেরাও। কিন্তু তার পরেও উগ্রবাদী তৎপরতা থামানো যাচ্ছে না। ফলে একথা প্রায় নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, দক্ষিণপন্থী ভারতীয় জনতা পার্টি এই শক্তির নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে কথিত রাম মন্দির নির্মাণ ইস্যুতে উগ্রবাদী তৎপরতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় আবারও ৯২’র মতো আতঙ্কের পরিবশে সৃষ্টি করেছে সেখানকার সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে। তাদের বেশিরভাগই ঘরবাড়ী ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। যারা নিজেরা যেতে পারননি, তারা অন্তত ছোটদের নিরাপদ আশ্রয়ে পাঠিয়ে দিয়েছেন। এ বিষয়ে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ডের পক্ষে বলা হয়েছে, ‘ভিএইচপি-এর ধর্ম সংসদ নিয়ে রীতিমতো আতঙ্কে ভুগছেন মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা। সে জন্যই মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন তাদের পরিবারের ছোটদের এবং বয়স্কদের অন্যত্র নিরাপদ আশ্রয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছেন।’ এতে আরও বলা হয়, ‘গোটা পরিস্থিতির দিকে আমরা নজর রাখছি। কোর্টের রায়ের পাশাপাশি এখানে কী ঘটে সে দিকে নজর রাখছি আমরা। আতঙ্কে আযোধ্যা ছেড়ে অনেকে লখনৌ চলে গেছেন।’ বিশ্লেষকরা বলছেন, লোকসভা নির্বাচনের আগে ধর্মের জিগির তুলে নিজেদের অবস্থান আরও পোক্ত করতেই এক হয়েছে শিবসেনা ও ভিএইচপি। এমনিতেই নানা বিষয়ে মতবিরোধ থাকলেও রামমন্দির নিয়ে তাদের এ ঐক্য বিজেপির ওপরও তুমুল চাপ সৃষ্টি করবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ১৯৯২ সনে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা ষোড়শ শতাব্দীতে মুসলিম শাসনামলে নির্মিত এই মসজিদটি ভেঙ্গে ফেলে। সে সময়ে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে অযোধ্যা এবং ভারতের অন্যান্য স্থানে হিন্দু-মুসলিম যে দাঙ্গা হয় তাতে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটনা ঘটে। এবারও বিপদের আশঙ্কায় অনেক মুসলিম ইতিমধ্যে অযোধ্যা থেকে অন্যত্র চলে গেছেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকার মুসলমানদের জানমালের নিরাপত্তা বিধানে কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
ভারত সরকারের নিষ্ক্রীয়তা ও পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণের দাবিতে আবারও সক্রিয় ও সহিংস হয়ে উঠেছে শিব সেনা ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ। তাদের দাবি একটি হিন্দু মন্দিরের জায়গায় মুসলিম শাসকরা এই মসজিদটি তৈরি করেছিল। তাই এখানে একটি রাম মন্দির নির্মাণ করতে হবে। দু’টি দলই পৃথক অনুষ্ঠান করবে এবং তাদের উদ্দেশ্য হলো রাম জন্মভূমি মন্দিরের সূচনা করা। যদিও উগ্র হিন্দুদের দাবি যৌক্তিক ও ইতিহাস সম্মত নয়।
যাহোক ধ্বংসপ্রাপ্ত বাবরী মসজিদের স্থলে রাম মন্দির নির্মাণের দাবিতে উগ্রবাদীরা সব সময়ই অনড় অবস্থানে। সম্প্রতি তারা এ বিষয়ে নিজেদের তৎপরতা বাড়িয়েছেন। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে যে, তারা একটি ”ধর্ম সংসদ” প্রতিষ্ঠা ও সে সংসদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ি তাদের ভবিষ্যত কর্মপন্থা নির্ধারণ করবেন। আর সে উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই তারা সম্প্রতি রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে বাইসাইকেল র‌্যালির আয়োজন করেছে এবং সে তৎপরতা এখন অব্যাহত আছে। তারা এ বিষয়ে অযোধ্যায় একটি বৃহত্তর সমাবেশও করেছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সে সমাবেশে ব্যাপক লোক সমাগম এবং সে সমাবেশ থেকেই তাদের পরবর্তী কর্মসূচিও ঘোষণা দেয়া হয়েছে। গৃহীত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে রাম জন্মভূমিতে পূজা করা এবং সরযু নদীর তীরে সস্ত্রীক আরতি করা। ফলে অযোধ্যা নগরীতে নতুন করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও ব্যাপক প্রাণহানীর আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ ১৯৯২ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তিও আশঙ্কা করছেন।
অযোধ্যা পরিস্থিতির পর এবার গুজরাট পরিস্থিতিকে অশান্ত করার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে নতুন করে। সম্প্রতি রাজ্যটিতে মুসলিম ছাত্রছাত্রীদের চিহ্নিত করতে গোপন জরিপ শুরু করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নিজের রাজ্য গুজরাটে এই জরিপের পরিপ্রেক্ষিতে মুসলিম সংখ্যালঘুদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিজেপি সরকারের এ উদ্যোগের কথা সম্প্রতি ভারতের একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। যা সকল মহলেই সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে।
মুসলিম শিক্ষার্থী চিহ্নিতকরণ সম্পর্কে সংবাদপত্রটি জানিয়েছে, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের বোর্ড পরীক্ষার ফরম পূরণের সময় পরীক্ষার্থী মুসলিম কি-না জানতে চাওয়া হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুজরাটে আরও অন্তত চার ধর্মীয় সংখ্যালঘু- খ্রিস্টান, শিখ, বৌদ্ধ ও জৈনরা থাকেন। কিন্তু গুজরাট সরকার শুধু মুসলিম ছাত্রছাত্রীদের কাছেই তাদের পরিচয় জানতে চাইছে।
মুসলিম শিক্ষার্থীদের অবিভাবকরা বিষয়টি নিয়ে গুরতর প্রশ্নও তুলেছেন। এসব তথ্যের অপব্যবহার করা হবে বলেও তারা আশঙ্কা করছেন। আসলে বিষয়টি রীতিমত অবাক করার মতো। অনলাইন ফরমের তথ্য যদি অন্য কাজে লাগানো হয় এ বিষয়ে সকলেই আতঙ্কিত। এদিকে, এই ধরনের কাজ ‘সংবিধানবিরোধী’ বলে সরব হয়েছেন গুজরাট রাজ্যের বিরোধী দলীয় নেতারা।
সামনেই ভারতে লোকসভা নির্বাচন। দক্ষিণপন্থী ভারতীয় জনতা পার্টি পূর্ণ মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার পরও তারা সাম্প্রদায়িক উম্মাদনা ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনায় তেমন কোন সাফল্য দেখাতে পারেনি। তাই আসন্ন নির্বাচনে ভরাডুবির আশঙ্কা তাদেরকে রীতিমত পেয়ে বসেছে। আর সে অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য মুসলিম বিদ্বেষকে নতুন করে পুঁজি বানানো হয়েছে। সে ধারাবাহিকতায় আগ্রার ঐতিহাসিক তাজমহল, মুসলিম ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সহ অযোধ্যায় কথিত রাম জন্মভূমিকে নতুন করে ইস্যু বানানো হয়েছে। পরিকল্পিতভাবে গুজরাট পরিস্থিতিতে আশান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। যা ভারতে সাম্প্রতিক শক্তির উত্থানের দিকেই অঙ্গলী নির্দেশ করে। যদিও ভারতীয় সংবিধান সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ।
লেখকঃ কথাসাহিত্যিক ও কলামিষ্ট