ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা

১৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ১১:১২

স্বপ্নের বিজয়ে ছন্দপতন

9478_16.jpg
১৯৪৭ সালে উপমহাদেশে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর ভারত ও পাকিস্তান নামে পৃথক দু’টি জাতিস্বত্ত্বার উম্মেষ ঘটে। ভৌগলিকভাবে বিচিছন্ন হলেও পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান একই রাষ্ট্রের অন্তর্ভূক্ত হয়। কিন্তু শাসকগোষ্ঠীর ব্যর্থতা ও হীন্যমনতার কারণেই পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রে স্বাধীনতা পুরোপুরি অর্থবহ হয়ে ওঠেনি। ফলে সীমাহীন বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হয়েছে পূর্ব পাকিস্তান। এই বঞ্চনার আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে। পঞ্চাশের দশক থেকে ষাটের দশক পর্যন্ত অবিরাম আন্দোলনে পূর্ব বাংলার মানুষের মনে স্বাধীকারের আকাঙ্খা জাগ্রত হয়। তার বাস্তব প্রতিফলনই হচ্ছে ১৯৭১ সালের মুক্তি সংগ্রাম ও  স্বাধীনতা।
আমাদের মতো অধিক মূল্য দিয়ে কোনো জাতি স্বাধীনতা অর্জনের লাভের ঘটনা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। ১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্রকাননে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ও শাহাদাতের মাধ্যমে আমরা স্বাধীনতা হারিয়েছিলাম। এরপর প্রায় দু’শ বছর পর্যন্ত আমাদেরকে ঔপনিবেশিক শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হতে হয়েছে। কিন্তু ১৯৪৭ সালে আমরা স্বাধীনতা লাভ করে পেয়েছিলাম পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র। কিন্তু আমাদের ভাগ্য মোটেই সুপ্রসন্ন ছিল না। তাই পাকিস্তানী শাসনের প্রায় পুরোটা জুড়েই আমাদেরকে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম করতে হয়েছে। স্বাধীনতা বলতে যা বোঝায় তা পাকিস্তান রাষ্ট্রে প্রায় ক্ষেত্রেই ছিল অনুপস্থিত। অধ্যাপক লাস্কি ( Laski) স্বাধীনতা সংজ্ঞা দিয়ে বলেন, ÔBy liberty I  mean the eager maintenance  of the atmosphere in which men have the opportunity to be their best selves,’  অর্থাৎ ‘স্বাধীনতা বলতে আমি সে পরিবেশের সাগ্রহ সংরক্ষণ বুঝি, যা দ্বারা মানুষ তার শ্রেষ্ঠ সত্ত্বা উপলব্দি করার সুযোগ পায়’। তিনি সদ্য স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রে এসবের তেমন কোন প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়নি।
এ বিষয়ে ১৯৭০ সালের নির্বাচনী ফলাফল বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী  সে নির্বাচনে বিজয়ী দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি। তাই  গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় জন্য আমাদেরকে মুক্তিসংগ্রামে অবতীর্ণ হতে হয়েছে। মূলত মুক্তিযুদ্ধের জন্য এই নির্বাচনী বিজয়ই আমাদের দিয়েছিল এক অনন্য সাধারণ যৌক্তিক ও নৈতিক ভিত্তি। আর সে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই রচিত হয়েছে স্বাধীনতা ও বিজয়ের সৌধ।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্ন থেকেই  উভয় অংশের মধ্যে নানাবিধ বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এই বৈষম্য ছিল আকাশ-পাতাল ব্যবধানে। রপ্তানিতে এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও দেশের পূর্ব অংশে বিনিয়োগ ছিল বেশ বৈষম্যমূলক। বড় ও ভারী শিল্পকারখানা প্রায় সবই গড়ে তোলা হলো পশ্চিম অংশে। সরকারি চাকরি ও সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের ক্ষেত্রেও ছিল ব্যাপক বৈষম্য। এর রাজনৈতিক প্রতিফলন দেখা দেয় শেখ মুজিবের ছয় দফায়। ছাত্রদের ১১ দফা দাবিতে এই বৈষম্য ঘোচানোর দাবি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে স্বাধীকারের দাবি জোড়ালো ভিত্তি পায়। এক সময় তা মুক্তি সংগ্রামে রূপ নেয়।
আমাদের স্বাধীনতা ও বিজয় যেমন ছিল রক্তপিচ্ছিল, ঠিক তেমনিভাবে গৌরবেরও। ভিয়েতনামে মুক্তি সংগ্রাম ১৯৫৬ সাল থেকে শুরু হয়ে ১৯৭৫ সালে ৩০ এপ্রিল সায়গনের আত্মসমর্পণের মাধ্যমে শেষ হয়েছিল। দীর্ঘ পরিসরের যুদ্ধে সকল পক্ষের সৈন্যসহ প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে প্রায় ২৮ লক্ষ্য মানুষের। আলজেরিয়ায় মুক্তিযুদ্ধ ১৮৩০ থেকে শুরু হয়ে ১৯৬২ সালের মার্চ মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলেছে। ১৯৬২ সালের ২ জুলাই আলজিরিয়া স্বাধীনতা লাভ করে। আলজেরিয়ার যুদ্ধের শেষের ৭/৮ বছরে ১০ লাখ আলজিরীয় প্রাণ হারান। কম্বোডিয়ায় গৃহযুদ্ধে প্রাণহানীর ঘটনা ঘটেছে ২১ লাখ। আফগানিস্তানে সোভিয়েত দখলদার বাহিনীর পরাজয় পর্যন্ত ১৪ বছরের যুদ্ধে ২০ লাখ লোকের প্রাণহানি ঘটেছে।
ইরাক-ইরান যুদ্ধ চলেছিল ১৯৮০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর হতে ১৯৮৮ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত। কিন্তু প্রাণহানির সংখ্যা ১০ লাখ অতিক্রম করেনি। এঙ্গোলায় ১৬ বছরের গৃহযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে ৩ লাখ অঙ্গোলাবাসী। ১৯৮১ সাল থেকে শ্রীলংকায় যুদ্ধ শুরু হয়ে তা চলে দু’যুগেরও অধিককাল ধরে। প্রাণহানির সংখ্যা ১ লাখের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বসনিয়া-হারজেগোভেনিয়ার ভয়াবহ যুদ্ধেও প্রাণহানির সংখ্যা দেড়লাখ অতিক্রম করেনি। কিন্তু আমাদের দেশে মাত্র ৯ মাসেই প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে ত্রিশ লাখ। সম্ভ্রম হারিয়েছেন অগণিত মা-বোন। বস্তুত বাংলাদেশের সমসাময়িক কালের মুক্তিসংগ্রাম ও বিভিন্ন যুদ্ধে ইতিহাসে এতো চড়ামূল্য আর কোনো জাতিকে দিতে হয়নি। এটিই আমাদের স্বাধীনতার বিশেষত্ব।
সাম্য, গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, সামাজিক ন্যায়-বিচার, অর্থনৈতিক শোষণ ও সাংস্কৃতিক গোলামী থেকে মুক্তি লাভের জন্যই এদেশের আপামর জনসাধারণ ৯ মাসের মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে বিশ্বমানচিত্রে বাংলাদেশ নামের একটি নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটেয়েছিল। কিন্তু যে প্রত্যাশা নিয়ে পিন্ডির গোলামীর শৃঙ্খল থেকে বেড়িয়ে এসেছিলাম সে স্বপ্ন এখনো অধরাই রয়ে গেছে। উদার গণতন্ত্র, সাম্য, আইনের শাসন ও সামাজিক ন্যায়বিচার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হলেও দেশে প্রচলিত নেতিবাচক রাজনীতির কারণেই সে ফসলগুলো ঘরে তুলতে পারিনি বরং বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর উচ্চাভিলাষকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বানানো হয়েছে।
একটি গণতান্ত্রিক, সুখী, সমৃদ্ধ, শোষণ ও বঞ্চনামুক্ত সমাজ বিনির্মাণের প্রত্যয় নিয়েই আমরা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রিয় মাতৃভূমিকে স্বাধীন করেছিলাম। কিন্তু রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ক্ষমতালিপ্সা, অপরাজনীতি ও অহমিকার কারণে আমাদের স্বাধীনতার প্রায় পাঁচ দশক অতিক্রান্ত হলেও সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বরং অর্জন যৎসমান্যই বলতে হবে। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে যখন পুনর্গঠনে মনোনিবেশ করা উচিত ছিল তখন ক্ষমতাসীনরা নিজেদের ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত বা চিরস্থায়ী করার জন্য যা যা করা দরকার তাই করেছে। পরিকল্পিতভাবে সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার পরিবর্তে বহুধাবিভক্ত করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করা হয়েছে। যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কথা বলে দেশের মানুষকে মরণপণ যুদ্ধে ঠেলে দেয়া হয়েছিল সে গণতন্ত্রই তাদের কাছে আর নিরাপদ থাকেনি বরং স্বাধীনতার পর আমাদের দেশে যতবারই রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে সকল ক্ষেত্রেই তা ছিল গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে  কেন্দ্র করেই।
স্বাধীনতার পর দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে অক্ষুন্ন রাখা সম্ভব হয়নি রাজনৈতিক ব্যর্থতা ও নেতিবাচক রাজনীতির  কারণেই। স্বাধীনতা পরবর্তী সরকার নিজেদের ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতেই সংবিধানের ৪র্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ঘোষণা করে একদলীয় শাসন কায়েম করেছিল। The Newspaper (Announcment Of declaration) Act-1975  মাত্র ৪টি রাষ্ট্রায়ত্ব পত্রিকা রেখে সকল সংবাদপত্র বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। এই এক্ট পাসের আগেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতার উপরও নগ্ন হস্তক্ষেপ করা হয়েছিল। ১৯৭৩ সালের ২৯ মার্চ জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে দৈনিক গণকণ্ঠ সম্পাদক আল মাহমুদ অভিযোগ করেছিলেন, ‘গণকন্ঠ অত্যন্ত বেআইনিভাবে বন্ধ করিয়া দেওয়ার ফলে তথাকার পৌনে তিনশ’ সাংবাদিক ও কর্মচারী বেকার হইয়া পড়িয়াছেন। সাংবাদিক ও কর্মচারীদের মুহূর্ত মাত্র সময় না দিয়া অফিস হইতে কাজ অসমাপ্ত রাখা অবস্থায় বাহির করিয়া দেয়া হইয়াছে’। (ইত্তেফাক-৩০ মার্চ, ১৯৭৩)
জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে ব্যর্থতার কারণেই আমাদের মুক্তিসংগ্রামের সূত্রপাত ঘটে। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী সরকারের অগণতান্ত্রিক মানসিকতার কারণেই সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক ধারা বাধাগ্রস্থ হয়েছে। দীর্ঘ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পর ১৯৯৬ সালে দেশের নির্বাচন পদ্ধতির বিষয়ে একটি সমঝোতায় আসলেও ক্ষমতাসীনদের অবৈধ ক্ষমতালিপ্সার কারণই সে অর্জনও আমরা ধরে রাখতে পারিনি। রাজনীতিকদের ধারাবাহিক ব্যর্থতার কারণে আমরা কাঙ্খিত উন্নয়ন, জীবনমান, সুশাসন ও নিরাপত্তা লাভে সমর্থ হইনি। গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাও বারবার বাধাগ্রস্থ হয়েছে। ২০০৮ সালে বর্তমান ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতায় এসে সম্পূর্ণ অযাচিতভাবে গণতন্ত্র, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের রক্ষাকবজ কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতি বাতিল করে দেশে রাজনৈতিক সংকটকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। যা ক্ষমতাসীনদের  আদর্শিক দেউলিয়াত্বই প্রমাণ  করে।
নির্বাচনকালীন কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতি করতে সংবিধান সংশোধন করা হলেও এ বিষয়ে বিরোধী দলগুলোর কোন মতামত গ্রহণ করা হয়নি। ফলে ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের মত অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটেছে এবং একটি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীনরা আবারও ক্ষমতাসীন হয়েছে। আর সে নির্বাচনকে ভিত্তি ধরেই এখন মেয়াদপূর্তির দ্বারপ্রান্তে এবং চলতি মাসের ৩০ তারিখ নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের অতিমাত্রায় ক্ষমতালিপ্সার কারণে সে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে কি না তা নিয়ে রীতিমত প্রশ্নে সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধী দলগুলো নির্বচনে অংশ নেয়ায় দৃশ্যত নির্বাচন অংশগ্রহণমূলকই হচ্ছে। কিন্তু নির্বাচন অবাধ ও গ্রহণযোগ্য হবে কি না সে সন্দেহটা নিরসন করতে পারেনি সরকার ও নির্বাচন কমিশন।
সরকার ও নির্বাচন কমিশন প্রতিনিয়ত গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের নিশ্চয়তা দিলেও এখন পর্যন্ত অংশীজনদের জন্য সমতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। বন্ধ হয়নি গায়েবী মামলা ও গণগ্রেফতার। বিরোধী দলের প্রার্থীরাও এই গ্রেফতার থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। তুচ্ছ কারণে বিরোধী দলীয় ও সরকারি দলের বিদ্রোহী প্রার্থীদের প্রার্থীতা বাতিল হওয়ায় বর্তমান প্রশাসনের অধীনে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের সম্ভবনা ক্রমেই তিরোহিত হচ্ছে। সরকারি দল নির্বিঘেœ নির্বাচনী প্রচারণার সুযোগ পেলেও সে সুযোগ পাচ্ছেন না বিরোধী দলীয় প্রার্থীরা। এমনকি অসংখ্য মামলার বোঝা মাথায় নিয়ে তারা এখন নির্বাচনী ময়দানে। রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক উপরের নির্দেশের অজুহাত দিয়ে প্রার্থীর মনোনয় গ্রহণে অস্বীকৃতি, আবার আদালতের নির্দেশে গহণ করার পর আবার তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাতিল করায় জনমনে অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ-সংশয়টা আরও জোরালো ভিত্তি পেয়েছে।
সঙ্গত কারণেই দেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এখন খাদের কিনারে। আর  এজন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহল ক্ষমতাসীনদেরই দায়ী করছেন। পরমত সহনশীলতা গণতন্ত্রের মূল উপাদান। মূলত প্রতিটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিক ৩ ধরনের অধিকার ভোগের নিশ্চয়তা পায় : ১. সামাজিক অধিকার, ২. রাজনৈতিক অধিকার এবং ৩. অর্থনৈতিক অধিকার।
সামাজিক অধিকার : জীবন ধারনের অধিকার. ২. ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার, ৩. মতপ্রকাশের অধিকার, ৪ সভা-সমিতি করার অধিকার, ৫. সম্পত্তি ভোগের অধিকার, ৬. ধর্মীয় অধিকার, ৭. আইনের অধিকার, ৮. চুক্তির অধিকার, ৯. ভাষার অধিকার, ১০. পরিবার গঠনের অধিকার ও ১১. শিক্ষা লাভের অধিকার।
রাজনৈতিক অধিকার : ভোটাধিকার, ২. প্রার্থী হওয়ার অধিকার, ৩. অভিযোগ পেশ করার অধিকার, ৪. সমালোচনার অধিকার, ৫. চাকরি লাভের অধিকার ও ৬. বসবাসের অধিকার।
অর্থনৈতিক অধিকার : কাজের অধিকার, ২ উপযুক্ত পারিশ্রমিক লাভের অধিকার, ৩. অবকাশ যাপনের অধিকার, ৪. সংঘ গঠনের অধিকার ও ৫. রাষ্ট্র প্রদত্ত প্রতিপালনের অধিকার ইত্যাদি।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিকে যেসব অধিকারের স্বীকৃত সরকার সে নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। অথচ এসব অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রেরই সাংবিধানিক দায়িত্ব। গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র জনগণের শাসন, শাসক গোষ্ঠীর জবাবদিহিতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও স্বাধীন গণমাধ্যমকে সরকার মোটেই গুরুত্ব না দিয়ে তাদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার জন্যই গণতান্ত্রিক সকল রীতিনীতি উপেক্ষা করছে যা আমাদের জন্য রীতিমতো অশনি সংকেত। মূলত শাসনকার্যে জনগণের সম্পৃক্ততা উপেক্ষা করে দেশকে এগিয়ে নেয়া মোটেই সম্ভব নয়। আমাদের দেশের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শাসনকার্যে জনগণের অংশগ্রহণ শুধু কাগজে-কলমেই রয়েছে। ফলে জনগণ অনেকটাই রাজনীতি বিমূখ হতে শুরু করেছেন। আর রাজনীতি সম্পর্কে উদাসীন কোন জাতিকে নিয়ে একবিংশ শতাব্দির বৈশি^ক চ্যালেঞ্জ তো দূরের কথা অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জও মোকাবেলা করা সম্ভব নয়।
অধ্যাপক লাস্কির (Laski) ’র মতে, Ô Liberty is the organization of resistance to abuse. অর্থাৎ ‘কদাচারের প্রতিরোধের সংগঠনই স্বাধীনতা’। কিন্তু স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও আমরা এখনও কদাকার মুক্ত হতে পারিনি। মূলত নেতিবাচক ও বিভেদের রাজনীতির কারণে আমরা অনেক পিছিয়েছি। বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্র যখন সামনের দিকে এগিয়ে চলছে, তখন আমরা নিজেরাই আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছি। আমরা যে প্রত্যাশা নিয়ে পিন্ডির গোলামী থেকে মুক্তি লাভের জন্য মরণপণ যুদ্ধ ও বিজয় অর্জন করেছিলাম প্রতিহিংসা ও অপরাজনীতির কারণে এর সুফল আমরা ঘরে তুলতে পারিনি।
দেশে আজও গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বিকশিত হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সুস্থধারার রাজনীতি চর্চার সংস্কৃতি এখনও গড়ে ওঠেনি। এ অবস্থায় কোন গণতান্ত্রিক ও সভ্য সমাজ চলতে পারে না। যে প্রত্যাশা ও স্বপ্ন নিয়ে আমরা মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম তা প্রায় ক্ষেত্রেই আমাদের কাছে অধরায় রয়ে গেছে। তাই আমাদের স্বাধীনতা ও মহান বিজয় পুরোপুরি অর্থবহ হয়ে ওঠেনি বরং মহান বিজয়ের স্বপ্নে ছন্দপতন ঘটেছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
লেখকঃ কথাসাহিত্যিক ও কলামিষ্ট