ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

আবু কাওছার আহমেদ, টাঙ্গাইল থেকে:

১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৪:০২

সরকারি সা’দত কলেজ

সমস্যায় জড়জড়িত ছাত্রী হোস্টেল

974_Tangail pic3.jpg
 শিক্ষার জগতে আলীগড় নামে খ্যাত টাঙ্গাইলের সরকারি সা’দত কলেজ। এখানে শিক্ষার মান ভাল হলেও ভাল অবস্থা নেই ছাত্রী হোস্টেলের। ১০ জনে ছাত্রীর জায়গায় থাকতে হচ্ছে ১৮ থেকে ২০ জন ছাত্রীর। শুধু গাদাগাদি করে থাকা কষ্ট নয় ওই ছাত্রী হোস্টেলের দেয়াল ও ছাদ থেকে খসে পড়ছে বালু সিমেন্টের পলেস্তর। যখন তখন দুঘর্টনা ঘটতে পারে। এতে ঝুঁকি নিয়ে লেখা পড়া করছে ছাত্রীরা। অনেকেরই অভিযোগ, শিক্ষার মান ভাল হলেও ভাল অবস্থা নেই ছাত্রী হোস্টেলের।

জানা যায়, ১৯২৬ সালে টাঙ্গাইলের জমিদার ওয়াজেদ আলী খান পন্নী তাঁর পিতামহ সা’দত আলী খান পন্নীর নামে টাঙ্গাইল জেলা শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে করটিয়ায় প্রতিষ্ঠা করেন সা’দত কলেজ। প্রায় ৩৮ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত এই কলেজ। ১৯৭৯ সালে কলেজটি সরকারিকরণ করা হয়। বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার ফলাফলে এই কলেজটির অবস্থান প্রথম সারিতে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, সরকারী সা’দত কলেজের মাঠ সংলগ্ন ছাত্রী হোস্টেলটি। নিরিবিলি পরিবেশ ও নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই মূলত কলেজ ক্যাম্পাসের সাথেই ছাত্রী হোস্টেলটি করা হয়েছিল। এ হোস্টেলে তিনটি ভবন ও একটি অধাপাকা টিনসেট ঘর রয়েছে। হোস্টেলের ভিতরে ঢুকেই মনে হয়েছে এ যেন কোন ঘনবসতির মধ্যে একেকটি বাড়ি-ঘর। ভবনের চারপাশে বারান্দায় ও রেলিং দিয়ে ছাত্রীদের কাপড় একাকার। ভবনের ছাদ থেকে দেয়াল খসে পড়ে ছাত্রীরা যেন আহত না হয় তার জন্য কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। ভবনটির নিচ তলার একপাশে ফাটল ধরেছে। অনেক জায়গায় দেয়াল খসে পড়ছে। যে জায়গায় ছাত্রীদের জন্য ডাইনিং ছিল তা এখন বিনোদন রুমে পরিণত হয়েছে। এছাড়াও ছাত্রী হোস্টেলের ভিতরে আরো যে দুটি ভবন রয়েছে তার অবস্থা আরো খারাপ। ভবনের অনেক জায়গায় ছোট বড় ফাটল রয়েছে। ছোট রুমগুলোতে ৭ থেকে ৮জন থাকার কথা থাকলেও কোন রুমে ১০ আবার কোন রুমে ১২ জন করে উঠেছে। আর হোস্টেলের গণরুমগুলোতে ১২ জন থাকার কথা থাকলেও স্থান হয়েছে ২০ জনের। অনেককে দেখা গেছে রুমের বাইরে বারান্দায় এসে পড়ালেখা করছে। আবার অনেকে সিড়ির একপাশে চুলা বসিয়ে রান্না করছে। পর্যাপ্ত পরিমানে বাথরুম থাকার কথা থাকলেও তার কোন ব্যবস্থা নেই। এজন্য এক সঙ্গে কয়েকজনকে বাথরুম ব্যবহার করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন ছাত্রীরা।

ছাত্রী হোস্টেলের অনেক ছাত্রী বলেন, এভাবে পড়াশোনার কোন পরিবেশ থাকে না। অনেক সময় বাইরে বারান্দায় গিয়ে পড়াশোনা করতে হয়। প্রতিনিয়ত ভয়ের মধ্যে থাকতে হয় কখন দেয়াল খসে গায়ে এসে পড়ে। এ হোস্টেলে তেমন কোন সুযোগ সুবিধাও পাচ্ছি না। আবার বাইরে গিয়েও থাকতে পারছিনা। সরকার যদি আমাদের জন্য আরো ছাত্রী হোস্টেল তৈরি করে দিতো তাহলে আমরা এবং পরবর্তীতে যারাই এখানে পড়ালেখার জন্য আসবে সবাই ভালো পরিবেশে পড়ালেখা করতে পারতো। আর আমাদের অনেকেই ছাত্রী হোস্টেলে জায়গা না পেয়ে আশপাশের  মেসে থাকেন। এতে খরচ যেমন বেশি হয়, তেমনি নিরাপত্তার অভাবও কাজ করে।

অর্নাস ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী রিনা আক্তার বলেন, আমি অনেক দুর থেকে এখানে লেখাপড়ার জন্য এসেছি। এখানকার লেখাপড়ার মান ভালো। কিন্তু আমাদের থাকার পরিবেশ ভালো না। আর আগে কখনো এভাবে এতোজন মিলে একসাথে  থাকিনি। তাই খুব কষ্ট হচ্ছে। আর ব্যক্তিগত অনেক কিছুই আছে যা ব্যক্তিগত থাকছে না। বাথরুম এর সমস্যা তো আছেই।

সরকারি সা’দত কলেজের অর্নাস ২য় বর্ষের ছাত্রী নায়না আফরিন বলেন, সরকারি সা’দত কলেজে শিক্ষার মান ভালো। তাই এখানে ভর্তি হয়েছি। আমার বাড়ি এ কলেজ থেকে অনেক দুরে। তাই বাধ্য হয়ে হোস্টেলে উঠতে হয়েছে। কিন্তু সা’দত কলেজে যে ছাত্রী হোস্টেল রয়েছে তা খুব একটা ভালো না। এতে অনেক সমস্যা রয়েছে। আমাদের থাকার জন্য যে সকল রুম রয়েছে সেখানে ১০ থেকে ১২ জন থাকার কথা। অথচ ছাত্রী থাকছে ২০জন। আবার ছোট রুমে প্রায় ১০জন করে থাকে। এভাবে থাকতে আমাদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। আমরা ঠিকমত পড়ালেখা করতে পারছি না। আর ছাত্রী হোস্টেলের ছাদ দিয়ে পানি পড়ে। দেয়াল খসে পড়ছে। আমরা অনেক ভয়ের মধ্যেও রয়েছি। শিক্ষকদের পাঠদান এবং বিশেষ কিছু পরীক্ষা নেয়ার কারণে ঝুঁকি নিয়েও হোস্টেলে থাকছি। তা না হলে হোস্টেল থেকে চলে যেতাম।

ছাত্রী হোস্টেল সহকারী ও মাস্টার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী রতœা আক্তার বলেন, আমাদের ছাত্রীদের অনেক সমস্যাই হচ্ছে। কিন্তু দেখার মত কেউ নেই। আমাদের থাকার সমস্যা, বিনোদন সমস্যা, বাথরুম নেই, ভবন গুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। যদিও নতুন একটি ভবন নির্মাণ হচ্ছে তবুও আরো একটি ভবন হলে আমাদের জন্য ভালো হতো। এভাবে তো আর পড়ালেখা বা থাকার পরিবেশ থাকে না। আর যদি ভালো পরিবেশ না পাই তাহলে পড়ালেখা করতে পারবো না। আমাদের রেজাল্ট খারাপ হবে। আমরা তো অনেক আশা নিয়ে এখানে এসেছি।

সরকারি সা’দত কলেজ ছাত্রী হোস্টেলের দায়িত্বরত বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, আমাদের এ কলেজের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ছাত্রীদের জন্য থাকার আবাসন ব্যবস্থা। এখানে যে কয়েককটি ভবন রয়েছে তা খুবই জরার্জীণ। এ হোস্টেলের প্রতিটি কক্ষে যে পরিমাণ ছাত্রীদের থাকার কথা তার চেয়ে দ্বিগুন সংখ্যক ছাত্রী থাকছে। এখানে পর্যাপ্ত বাথরুম নেই। ভবনগুলোর অনেক জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছে। অনেক জায়গায় দেওয়াল খসে পড়ছে। এরআগে কয়েকবার সংষ্কার করা হয়েছে কিন্তু তাতেও কোন লাভ হচ্ছে না। আর আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য পাশেই  আরেকটি ছাত্রী হোস্টেল নির্মাণ করা হচ্ছে। কিন্তু তাতেও আবাসন সংকটের মধ্যে থাকতে হবে। সরকারিভাবে যদি এ কলেজের কিছু উন্নয়ন করা হতো তাহলে আমাদের জন্য অনেক ভালো হতো।

সরকারি সা’দত কলেজের উপাধ্যক্ষ প্রফেসর আলীম মাহমুদ বলেন, এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সকল সুযোগ সুবিধা থাকার পরেও সরকারীভাবে আমরা তেমন কোন অনুদান পাই না। বর্তমানে আমাদের ছাত্রীরা যেখানে থাকছে তার অবস্থা বেশি ভালো না। আমরা সব সময় শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা ভাবনা করে তাদের ভালোর জন্য সবকিছু করে থাকি। কিন্তু ছাত্রী হোস্টেলটিতে নানা সমস্যা রয়েছে। এ বিষয়ে আমরা স্থায়ী সমাধান করার জন্য আরেকটি ছাত্রী হোস্টেল তৈরি করছি।

সরকারি সা’দত কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. রেজাউল করিম বলেন, সরকারি সা’দত কলেজকে বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে আদর্শ ও উন্নত কলেজে রূপান্তরিত করতে চাই। সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু আমাদের অনেক কাজ আমরা চাইলেও করতে পারি না। আমাদের কলেজটি অবকাঠামোগত দিক থেকে এখনো অনেকটা পিছিয়ে। আমাদের ছাত্রী হোস্টেলের যে সমস্যা গুলো রয়েছে তা সমাধান করার চেষ্টা করছি। তাদের জন্য আরেকটি নতুন ভবন নির্মাণ হচ্ছে। তবে আরো কয়েকটি ভবন প্রয়োজন। যা আস্তে আস্তে বাস্তবায়ন হবে বলে আমি মনে করি। তবে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় এসব সমস্যা থেকে আমরা বের হতে পারছি না। আর মন্ত্রনালয়ে আমরা কিছু প্রস্তাব দিয়েছি তা বাস্তবায়ন হলে আমাদের আর কোন সমস্যা থাকবে না। তারপরও কলেজ ফান্ডে যা আছে তা দিয়ে আমরা কলেজের অনেক সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করছি।