ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

শাহাদৎ স্বপন

২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ১৯:০২

সহসাই কমছে না গরুর মাংসের দাম

982_full_508238262_1445856741.jpg
ফাইল ছবি
গরুর চেয়ে হিমায়িত মাংস দিতে বেশি আগ্রহী ভারত। এ কারণে বর্ডারে গরুপ্রতি যে পরিমাণ চাঁদা নিতো ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ), তা এখন বেড়ে হয়েছে কয়েক গুণ। ফলে বাংলাদেশের বাজারে সহসাই কমার সম্ভাবনা নেই মাংসের দাম।বিগত সময়ে ভারত থেকে যে পরিমাণ গরু বর্ডার পার হয়ে বাংলাদেশে আসতো, বর্তমানে সে তুলনায় অনেক কম গরু আসছে। আগে প্রতি জোড়া গরু পার করতে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফ সে দেশের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিতো মাত্র দুই থেকে তিন হাজার টাকা।



বর্তমানে প্রতি জোড়া গরু সীমান্ত পার করতে নিচ্ছে ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা। ফলে বাংলাদেশের বাজারে গরুর মাংসের দাম কোনোভাবেই কমছে না।

হঠাৎ করে বর্ডার পার করতে বিএসএফ গরুপ্রতি বেশি টাকা নিচ্ছে কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. রবিউল ইসলাম পরিবর্তন ডটকমকে জানান, ভারত সরকার আমাদের কাছে গরুর মাংস বিক্রি করার পর গরুর চামড়া, হাড়, শিং, চর্বি ও ভুড়ি অনেক বেশি মূল্যে বিদেশে রফতানি করে। একদিকে তারা বাংলাদেশে হিমায়িত মাংস রফতানি করে অর্থ আয় করে অপরদিকে গরুর অন্যান্য উপাদান চড়া মূল্যে বিদেশে রফতানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে।

তিনি বলেন, আপনারা জানেন বাংলাদেশ এখন বিশ্বে চামড়া রফতানিতে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। কিছু দিনের মধ্যে প্রথম অবস্থান দখল করবে। এটা অন্যান্য রাষ্ট্র পজিটিভলি নিচ্ছে না। তারা চায় আমাদের এ অবস্থান নষ্ট হোক। হয়তো এজন্যই তারা এমনটি করে।

হিমায়িত মাংস বিদেশ থেকে আমদানি করা গেলে দেশের বাজারে মাংসের দাম কমে আসবে। সেক্ষেত্রে হিমায়িত মাংস এলে দোষ কিসের- এমন প্রশ্নের জবাবে মো. রবিউল ইসলাম বলেন, দেখুন আমাদের দেশের মানুষ ধর্মপ্রিয়। তারা অন্য দেশে জবাই করা গরুর মাংস খেতে চায় না। আর বিদেশ থেকে হিমায়িত মাংস শুধুমাত্র বিভিন্ন হোটেল ও রেস্টুরেন্টে বিক্রি করা হয়। এ খবর প্রচারের ফলে দেশের রেস্টুরেন্টগুলোতেও এর খারাপ প্রভাব পড়েছে। ফলে এখন তারাও আর এ মাংস নিতে চায় না।

বাংলাদেশ গরু ব্যাপারী সমিতির সভাপতি কাজী আনোয়ার হোসেন মন্ডল পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, মাত্র দুই বছর আগেও যেখানে এক জোড়া গরু ভারত সীমান্ত পার করতে মাত্র দুই থেকে তিন হাজার টাকা দিতে হতো, সেখানে এখন প্রতি জোড়া গরুতে দিতে হয় ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা। এমনকি এর আগে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে অবাদে গরু প্রবেশের অনুমতি ছিল কিন্তু বর্তমানে সবগুলো পথ বন্ধ রেখে মাত্র চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাট সীমান্ত এবং সাতক্ষীরার কোমড়পুর ও বাটশালা ক্যাম্প দিয়ে কিছু গরু আনতে পারছে বাংলাদেশি গরু ব্যবসায়ীরা। অন্য পথে গরু নিতে চাইলেই তা আটক করে ওয়াকশনে দেয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে পরিবর্তন ডটকমের সাতক্ষীরা প্রতিনিধির সাথে যোগাযোগ করে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ভারতীয় ব্যবসায়ীরা স্থানীয় বাজার থেকে গরু কিনে বাংলাদেশে বর্ডার পার করতে প্রথমে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কাছে যান। বিজিবি প্রতি জোড়া গরু বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পার করতে ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিচ্ছে। এক্ষেত্রে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে আব্দুল বারী নামের এক ভারতীয় নাগরিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন।

ভারত গরু দেয়ার চেয়ে হিমায়িত মাংস দিতে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে এবং বর্তমানে জোড়া গরু ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিচ্ছে, যা দুই বছর আগেও মাত্র দুই থেকে তিন হাজার টাকা ছিল। এ বিষয়ে সরকার অবহিত কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (প্রাণিসম্পদ-৩) কে এফ এম জেসমীন আখতার পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, আমরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিষয়টি জেনেছি। এটা মনিটরিংয়ের জন্য প্রাণিসম্পদ অধিদফতর কাজ করছে।

এদিকে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া এক প্রতিবেদনে ট্যারিফ কমিশন বলেছে, কয়েক বছর ধরে দেশে ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে হিমায়িত গরুর মাংস আমদানি হয়ে আসছে। আমদানিতে এসব মাংসের কেজি প্রতি দাম পড়ে ১০৮ থেকে ২২৫ টাকা। কিন্তু সম্প্রতি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী বিদেশ থেকে হিমায়িত মাংস আমদানি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ চলতি মাসের ১৭ তারিখে সাংবাদিকদের এক সম্মেলনেও বলেছেন, আমরা বাণিজ্যমন্ত্রীর সাথেও কথা বলেছি। তিনিও বিদেশ থেকে হিমায়িত মাংস আমদানির পক্ষে নন। ফলে বিদেশ থেকে সকল প্রকার হিমায়িত মাংস আমদানি বন্ধ থাকবে। সেক্ষেত্রে হিমায়িত মাংস আমদানি বন্ধ থাকলে হোটেল ও রেস্টুরেন্টগুলোতে হিমায়িত মাংস সরবরাহ বন্ধ থাকবে। এতে দেশের মাংসের বাজার আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে অনেকে।

হিমায়িত মাংস আমদানি বন্ধ রাখতে চাইলে আমদানি সংক্রান্ত প্রণীত বিধিমালার কোনো ব্যত্যয় ঘটবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ বলেন, প্রয়োজনে এ বিধিমালা সংশোধন করা হবে।

একদিকে হিমায়িত মাংস আমদানি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ সরকারের। অপরদিকে হিমায়িত মাংস আমদানিতে বেশি আগ্রহ ভারতের। এতে বাংলাদেশে সাধারণ মাংস ব্যবসায়ীদের জন্য তৈরি হয়েছে বড় ধরনের জটিলতা।

এ বিষয়ে মাংস ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. রবিউল ইসলাম পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, এ বিষয়টি সম্প্রতি আমরা সরকারের কাছে তুলে ধরেছি। সরকার ভারতের সাথে কথা বলে সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেবে বলে আমাদের জানিয়েছে।

এ বিষয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (প্রাণিসম্পদ-২) নিগার সুলতানা পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, দেশের মাংস ব্যবসায়ী ও কিছু ইসলামি সংগঠনের নেতাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা হিমায়িত মাংস আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এছাড়া আপনারা জানেন মন্ত্রী মহোদয় বলেছেন হিমায়িত মাংস এলে দেশের প্রায় ৫ লাখ খামারি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ফলে আমরা বিষয়টি সিরিয়াসলি মনিটরিং করবো যাতে হিমায়িত মাংস আমদানি বন্ধ থাকে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে প্রায় ২০ হাজার কেজি হিমায়িত গরুর মাংস আমদানি করা হয়েছে। আগের অর্থবছরে দেশে প্রায় ৫৫ হাজার কেজি গরুর মাংস আমদানি হয়েছিল। তার আগে অর্থাৎ ২০১৪-১৫ অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ১৮ হাজার কেজি গরুর মাংস। এসব মাংস এসেছে ভারত, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও অন্যান্য দেশ থেকে হিমায়িত অবস্থায়।

কোন কারণে হঠাৎ করেই বিদেশ থেকে হিমায়িত মাংস আমদানি বন্ধ করা হলো- এমন প্রশ্নের জবাবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ গণমাধ্যমকে বলেন, দেশের ৫ লাখ খামারিকে সাবলম্বী রাখতেই বিদেশ থেকে হিমায়িত মাংস আমদানি বন্ধ থাকবে।

মাত্র ৫ লাখ খামারিকে সাবলম্বী রাখতে ১৬ কোটি মানুষকে প্রতি কেজি গরুর মাংস ৫০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে, এটা কতটুকু যুক্তিসঙ্গত- এমন প্রশ্নের জবাবে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, দেখুন মাংসের দাম বর্তমান অবস্থানে (প্রতি কেজি ৫০০ টাকা) থাকবে না। আমরা দেশি গরু উৎপাদন খরচ কমানোর জন্য সব ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করছি। আমরা মনে করি অতি দ্রুত সময়ে মাংসের দাম কমে আসবে।

তিনি বলেন, রাস্তায় চাঁদাবাজির যে অভিযোগ গরু ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে করা হয়েছে, সে বিষয়ে আমরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে কথা বলেছি। দ্রুততম সময়ে এ বিষয়ে একটা সুরাহা হবে। তবে হঠাৎ করেই এ ধরনের সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়।

হিমায়িত মাংস আমদানি বন্ধ রেখে কোন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করলে দেশি মাংসের দাম কমে আসবে- এমন প্রশ্নের জবাবে মাংস ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. রবিউল ইসলাম বলেন, ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী কর্তৃক গরুপ্রতি উচ্চ হারে টাকা গ্রহণ বন্ধ করতে হবে। পথে পথে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। এর সাথে রাজধানীর গাবতলী হাটে অধিক পরিমাণ চাঁদাবাজি হয়। এটা বন্ধ করতে পারলে দেশের মানুষ মাত্র ৩০০ টাকা কেজিতে মাংস খেতে পারবেন।

মাংসের দাম কমাতে দেশি খামারিদের গরু উৎপাদন খরচ কমানের পাশাপাশি ভারত থেকে যেসব গরু আসছে, তার উপর চাঁদার পরিমাণ কমাতে সরকারি কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের পরিচালক ডা. মো. রেজাউল ইসলাম পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, এ ধরনের সমস্যার সমাধান দ্রুত সম্ভব নয়। আমরা এ বিষয়ে আলোচনার উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দিয়েছি। তবে দেশি খামারিদের সাবলম্বী করতে আমরা হিমায়িত মাংস বন্ধের পাশাপাশি ভারত থেকে গরু আমদানিতেও ব্যবসায়ীদের অনুৎসাহিত করছি।

সৌজন্যে- পরিবর্তন ডটকম।