ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG

সিটি করপোরেশন নির্বাচন

১০ এপ্রিল ২০১৮, ১০:০৪

গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন

জাহাঙ্গীর আলমকে মনোনয়ন দেয়ায় আ’লীগে হতাশা

43_3.jpg
গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বহু প্রতীক্ষার পর অবশেষে নৌকার মাঝি নির্ধারণ হলেও থামছে না আওয়ামী লীগের কোন্দল। দলের মনোনয়ন পাওয়া অথবা না পাওয়াকে অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে নিয়ে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক টঙ্গী পৌর মেয়র অ্যাডভোকেট আজমত উল্লা খান ও সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম। এখন জাহাঙ্গীরকে মনোনয়ন দেয়ায় শুধু আজমত উল্লা খানই নন; বরং স্থানীয় আওয়ামী লীগের জ্যৈষ্ঠ নেতাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে বলেও মনে করছেন দলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা। এমনিতেই এত অল্প সময়ে কম বয়সী জাহাঙ্গীর আলমের উত্থানকে কোনো অবস্থায়ই মেনে নিতে পারছিলেন না দলের সিনিয়র থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের ত্যাগী নেতাকর্মীরা। তাদের মতে, জাহাঙ্গীর সিনিয়র নেতাদের যেভাবে অবমূল্যায়ন করে চলেছেন তিনি মেয়র নির্বাচিত হলে আজমত উল্লা খান ও স্থানীয় দু’জন সংসদ সদস্যসহ দীর্ঘ দিনের অনেক ত্যাগী সিনিয়র নেতার ধারাবাহিক রাজনৈতিক পদ-পদবির অপমৃত্যু হবে বলে তাদের আশঙ্কা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সরাসরি একাধিক নেতাকর্মীর সাথে আলাপকালে তারা আরো জানান, নেতৃত্ব দেয়ার জন্য জাহাঙ্গীরের এখনো অনেক সময় ছিল। আজমত উল্লা খানকে তার ছাড় দেয়া উচিত ছিল। কিন্তু তিনি সেই সৌজন্যবোধ না দেখিয়ে শুধু টাকার জোরে বহু আগে থেকেই সিনিয়র নেতাদের সাথে অসম রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হন। তার এই ক্ষমতালিপ্সু মনোভাব দলের ভেতর বিভাজন সৃষ্টি করে।

জাহাঙ্গীর আলমকে দলের মনোনয়ন দেয়ায় এস এম রকিব উদ্দিন রনি নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেন, ‘সালাম পৃথিবী তোমাকে সালাম, দুনিয়াকে করেছে টাকার গোলাম’। সাইফুল ইসলাম সিসির মুখের ওপর ১০০ টাকার নোট সাঁটিয়ে শিকল ও তালা এঁটে লিখেন, ‘সততা যখন টাকার কাছে বিক্রি হয়ে যায়; মুখের ভাষা তখন শেকলবন্দী হয়’। এতে মেহেদী হাসান মন্তব্য করে বলেন, ‘প্রিয় নেত্রী, আমার ব্যর্থতা আমি সৎ, আমার কালো টাকার পাহাড় নেই। তাই আমি আজ কালো টাকার কাছে হেরে গেলাম।’

ইঞ্জিনিয়ার হাবীব খান নিজের ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘আমিও ভাবছি আজ থেকে টাকা কামাবো। নেতার আদর্শ বুকে নিয়ে সততা দেখিয়ে পকেট ফাঁকা নিয়ে কী লাভ, প্রয়োজনে গুণ্ডা হবো।’ পৃথক স্ট্যাটাসে তিনি বলেন, “ছোটবেলায় একটা গান শুনেছিলাম- ‘টাকা ধর্ম, টাকা কর্ম, টাকা হি পরোয়া মন্দির’ আজ সব খানেই টাকা কথা বলে।”
হাজী বাবলু লিখেছেন, ‘কাউকে হারিয়ে দেয়াটা খুব সহজ, কিন্তু কঠিন হলো কারোর মন জয় করা।’ পৃথক অপর স্ট্যাটাসে তিনি বলেন, ‘রাজনীতির মাঠে উল্টা খাইলে অনেক কিছু শেখা যায়।’

রফিকুল ইসলাম ফিরোজ সরদার আজমত উল্লা খানকে উদ্দেশ করে লিখেছেন, ‘নীতি, আদর্শ ও আপনার দিক নির্দেশনায় থাকব আজীবন। রাজনীতিতে শেষ বলতে কিছু নেই, সবে খেলা শুরু।’ নাহিদ হাসান ওসমান লিখেছেন, ‘গাজীপুর সিটি নির্বাচনের মনোনয়ন বাছাইয়ে সততা ও জনপ্রিয়তাকে গলা টিপে হত্যা করল টাকা।’ এইচ এম আজিজুর রহমান লিখেছেন, ‘তারাই প্রকৃত রাজনীতিবিদ যারা নিজের পকেটের টাকা খরচ করে রাজনীতি করে।’ ইমতিয়াজ শুভ লিখেছেন, ‘জীবন থেমে থাকবে না। কিন্তু টাকা ছাড়া রাজনীতিতে ভাত নেই। সাত মাস পর দেখবা ভুলের মাসুল হাড়ে হাড়ে টের পাবে।’ রাশেদুল ইসলাম লিখেছেন, ‘রাজনীতির কোনো ধর্ম নেই, রাজনীতির একটাই ধর্ম টাকা।’ অ্যাডভোকেট জি এম ইব্রাহীম লিখেছেন, ‘সততাই হচ্ছে ব্যর্থতা।’ আলী আসগর খান মন্তব্য করেন, ‘রাজনীতির ধর্ম আছে। কিন্তু রাজনীতিকদের স্বকীয়তা হারিয়েছে।’ এ রহিম মিয়া লিখেছেন, ‘এই টাই ডিজিটাল বাংলাদেশ, যোগ্য মানুষের মূল্যায়ন নেই’। এইচ এম আজম লিখেছেন, ‘এ রকম রাজনীতি না করাই ভালো।’

এমডি ফরহাদ লিখেছেন, ‘কেয়ামতের বড় আলামতের মধ্যে একটা হলো অযোগ্য লোক নেতা হবে; আমার মনে হয়, সেই সময় এখন চলছে বাংলাদেশে।’ সাদিম হায়দার লিখেছেন, ‘রাজনীতি আজ রাজনীতিবিদদের থেকে অনেক দূরে চলে গেছে... প্রিয় নেত্রী।’ আজাদ ট্রান্সপোর্ট লিখেছে, ‘জনাব আজমত উল্লা খান নৌকা, জনাব জাহাঙ্গীর আলমও নৌকা, আমরা যারা আজমত উল্লা খানের সাপোর্ট করলাম, আমরা কি সবাই খারাপ হয়ে গেলাম।’ মিজানুর রহমান লিখেছেন, ‘আগে শুনেছিলাম একজন ছাড়া সবাই বিক্রি হয়। গতকাল দেখলাম টাকার কাছে সবাই অসহায়।’ আরমান খান লিখেছেন, ‘সৎ পথে চললে নাকি সব কিছু পাওয়া যায়? এটাই কি সেই পাওয়া? যদি তাই হয় তাহলে সৎ হয়ে কোনো লাভ নেই।’ মনির হোসাইন রাজু লিখেছেন, ‘টাকার কাছে হেরে গেলেন আজমত উল্লা’। মিজানুর রহমান লিখেছেন, ‘একজন গ্রেটকে জিন্দালাশ হয়ে বেঁচে থাকতে হবে।’ অ্যাডভোকেট জি এম ইব্রাহীম লিখেছেন, ‘আজমত উল্লা খান স্যার আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। এটিই আমার গর্ব।’ রাজিব যায়যায়দিন লিখেছেন, ‘আওয়ামী লীগের রাজনীতি আজ রাজনীতি নেই।’ কামাল হোসেন লিখেছেন, ‘অনেক হয়েছে মেয়র প্রার্থী নিয়ে, এখন আসেন সবাই মিলে নৌকার জয় নিশ্চিত করি।’

এ দিকে জাহাঙ্গীর আলমকে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন দেয়ায় নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ করে গোটা টঙ্গী শহরের দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। থমকে গেছে নির্বাচনী আমেজ। টঙ্গীতে যেন শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সর্বত্রই নীরব নিস্তব্ধতা। চায়ের স্টল, টঙ দোকানসহ বিভিন্ন আড্ডাস্থলে শুধু আপসোস ও ধিক্কার। টঙ্গী ট্রাক টার্মিনালের এক শ্রমিক নেতা আক্ষেপ করে বলেন, ‘জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি গাজীপুরবাসীর যে আস্থা ও শ্রদ্ধাবোধ ছিল, তা আর নেই। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এখন আর আওয়ামী লীগে নেই। এই দলই আর করমু না। আওয়ামী লীগের গোষ্ঠী মারি।’

এ দিকে গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট আজমত উল্লা খান মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে এক প্রতিক্রিয়ায় নয়া দিগন্তকে বলেন, দলের সিদ্ধান্তে মানুষের মাঝে হতাশা আছে। এর পরও আমি যেহেতু সভাপতি সেহেতু দলকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতে হবে।

৫৭টি সাধারণ ও ১৯টি সংরক্ষিত ওয়ার্ড নিয়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশন গঠিত। এখানে মোট ভোটার ১১ লাখ ৩৮ হাজার ২০৪ জন। গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৩ সালের ৬ জুলাই। সে নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী এম এ মান্নান টেলিভিশন প্রতীক নিয়ে তিন লাখ ৬৫ হাজার ৪৪৪ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের আজমত উল্লা খান দোয়াত-কলম প্রতীক নিয়ে পেয়েছিলেন দুই লাখ ৫৮ হাজার ৮৬৭ ভোট। এক লাখ ছয় হাজার ৫৭৭ ভোটের বিশাল ব্যবধানে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীর কাছে হারতে হয় আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীকে। আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর বিরুদ্ধে আনারস প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন জাহাঙ্গীর আলম। সে সময় নির্বাচন কমিশনে তার প্রার্থিতা বাতিল হলে উচ্চ আদালতে রিট করে প্রার্থিতা ফিরে পান তিনি। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রের হস্তক্ষেপে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হলেও ব্যালটে আনারস প্রতীকে মাত্র পাঁচ হাজার ভোট পান জাহাঙ্গীর। সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আজমত উল্লা খান হারার পেছনে জাহাঙ্গীরের নিষ্ক্রিয়তা, স্থানীয় দলীয় এমপিদের নীরব ভূমিকা ছিল অন্যতম কারণ।