ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG

সিটি করপোরেশন নির্বাচন

১৬ এপ্রিল ২০১৮, ১২:০৪

খুলনায় ‘অনিচ্ছুক’ প্রার্থীরা শক্ত লড়াইয়ে

46_1.jpg
শাসক দল আওয়ামী লীগের হয়ে খুলনায় লড়বেন তালুকদার আবদুল খালেক। দলের মনোনয়ন পাওয়ার আগে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছিলেন তিনি। জানিয়ে ছিলেন নির্বাচনে লড়তে অনিচ্ছার কথাও। বলেছিলেন, ‘এখন আমি এমপি। সিটিতে দলের নতুন নেতৃত্ব আসুক।’

গত সোমবার রাতে দলের বর্ধিত সভায় খালেককে মেয়র পদে মনোনয়নের জন্য সর্বসম্মতিক্রমে সুপারিশ করে খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগ। দলের একাধিক সূত্র জানায়, এ মুহূর্তে খালেকের কোনো বিকল্প ছিল না। দল তাঁকে শক্ত প্রার্থী বলে মনে করে। গত মঙ্গলবার প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘দলের মনোনয়ন বোর্ডের কাছে খুলনা আওয়ামী লীগের সবাই আমার পক্ষে কাজ করতে চেয়েছেন। সবার ইচ্ছেতেই দাঁড়াতে হলো।’
মনোনয়ন পাওয়ার আগে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জুর সঙ্গেও প্রথম আলোর কথা হয়। আলোচনার বিষয় ছিল, খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন। দলটির মনোনয়ন তখনো ঠিক হয়নি। দলের নির্বাচনসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক শেষ হয়েছে সন্ধ্যায়। কে পাচ্ছেন দলের টিকিট?

সরাসরি উত্তর না দিয়ে মঞ্জু জানান, দলীয় মহাসচিব তাঁকে আসতে বলেছেন। এতে স্পষ্ট না হওয়ায় আবার মনোনয়ন প্রশ্নে জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেন, ‘এটি এ বছরের প্রথম নির্বাচন। দল কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না। চায় শক্ত প্রার্থী দিতে।’
খুলনা সিটির নির্বাচনে বিএনপির বিবেচনায় এই ‘শক্ত প্রার্থী’ নজরুল ইসলাম মঞ্জু। গত সোমবার তাঁকে দল মনোনয়ন দিয়েছে। তিনি এর আগে বলেছেন, দলের নির্বাচিত মেয়র আছেন। সিটিতে তিনি যেতে চান না। তবে দলের নির্দেশ তিনি মেনে নেবেন। শেষতক নিলেনও তা-ই।
তালুকদার খালেক এখন সংসদ সদস্য, তাঁর আসন মোংলা-রামপাল। মঞ্জু সাবেক সংসদ সদস্য, খুলনা-২ আসনের। দুজনই সংসদ সদস্য হওয়াটাকেই বেশি গ্রাহ্য বলে মনে করেছিলেন? খুলনা সিটির আগের নির্বাচনগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ চরিত্রই কি মেয়র পদে নির্বাচনে তাদের অনীহার কারণ?

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) খুলনা ইউনিটের সভাপতি অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির মনে করেন, দুই দল তাদের সবচেয়ে পছন্দের প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে। এখানে দুই দলেই সব সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারেন না, তিনি বিজয়ী হবেন। অধ্যাপক কাদির বলেন, এ সিটির আগের ইতিহাসও কিন্তু বলছে, এ জায়গা কারও জন্য নিরাপদ নয়।
জাতীয় সংসদের খুলনা-২ ও খুলনা-৩ নিয়ে খুলনা সিটি করপোরেশন। বিগত চার সংসদ নির্বাচনে (১৯৯১ থেকে ২০০৮) খুলনা-৩-এ দুবার বিএনপি এবং দুবার আওয়ামী লীগ নির্বাচিত হয়েছে। খুলনা-২-এ চার নির্বাচনে একবারও আওয়ামী লীগ নির্বাচিত হতে পারেনি। তবে এ আসনে তারা ভোটের ব্যবধান কমিয়েছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে মাত্র ১ হাজার ৫৭০ ভোটের ব্যবধানে নজরুল ইসলাম মঞ্জু হারান আওয়ামী লীগের মিজানুর রহমান মিজানকে।

খুলনা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের তালুকদার আবদুল খালেক বিএনপির মনিরুজ্জামানকে হারান ২৬ হাজারের বেশি ভোটে। আবার ২০১৩ সালের নির্বাচনে মনিরুজ্জামান ৬১ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারান খালেককে।
এ তো গেল ভোটের জটিল হিসাব-নিকাশ। বাইরে দুই নেতারই কিছু সুবিধা-অসুবিধা আছে, যা নির্বাচনকে উভয়ের জন্য কঠিন করে তুলবে।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও খুলনা কমিটির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে আবদুল খালেককে মনোনয়নের ব্যাপারে কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। খালেকের বাইরে আর দুজনের প্রার্থীর কথা শোনা যাচ্ছিল। এঁদের একজন হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাই শেখ নাসেরের ছেলে শেখ সালাউদ্দিন জুয়েল এবং সৈয়দ আলী। শেষ পর্যন্ত সালাউদ্দিন নির্বাচনে আগ্রহ দেখাননি। সৈয়দ আলীর প্রভাব দৌলতপুর ও খালিশপুর অঞ্চলে বেশি। সিটির মূল অংশে তিনি কিন্তু ততটা পরিচিত নন।

তালুকদার আবদুল খালেক সিটি মেয়র থাকার সময় চোখে পড়ার মতো উন্নয়নকাজ করেছেন। এর ধারাবাহিকতা বিএনপির মেয়র মনিরুজ্জামানের সময় রক্ষিত হয়নি। আওয়ামী লীগের বিবেচনা, ভোটাররা উন্নয়নের বিষয় বিবেচনায় নেবেন। দুই সপ্তাহ আগে হয়ে যাওয়া স্থানীয় সরকার পরিষদের নির্বাচনে দলের অপেক্ষাকৃত ভালো ফল আওয়ামী লীগকে এ ধারণা দিয়েছে যে সরকারে থাকলেও তাদের জনপ্রিয়তায় খুব ভাটা পড়েনি। উন্নয়ন প্রশ্নটি মানুষ বিবেচনায় নিচ্ছে।
ক্ষমতাসীনদের প্রতি ভোটারদের সহজাত অনীহা থাকে। এ প্রভাব কি নির্বাচনে পড়বে না? তালুকদার আবদুল খালেক বলেন, ‘আমি তো খুলনায় ক্ষমতায় ছিলাম না। আর জাতীয় পর্যায়ের কথা বিবেচনা করলে বলব, বর্তমান সরকারের উন্নয়নকাজের প্রতি মানুষের সমর্থন আছে। সে ক্ষেত্রে আমি কোনো সমস্যা দেখি না।’

তবে বিএনপির নজরুল ইসলাম মঞ্জু কিন্তু মনে করেন, বর্তমান সরকারের প্রতি মানুষ এতটাই ক্ষুব্ধ যে তারা বিএনপিকেই ভোট দেবে। তিনি বলছিলেন, ‘শুধু আমি না, যে-কেউ দাঁড়ালেই ভালো করবে।’
তা যদি হতো, তবে মঞ্জু কেন? দলীয় সূত্র জানায়, গত কয়েক বছরে খুলনা সিটিতে সেই অর্থে কোনো উন্নয়নকাজ করতে দেয়নি সরকার। সরকারি অনুদান প্রায় বন্ধ ছিল। মেয়র মনিরকে মামলায় জড়ানো হয়েছে। বিএনপি মনে করে, সাধারণ মানুষের সমর্থন থাকলেও উন্নয়ন প্রশ্নে মনিরের অবস্থান নাজুক।
মনিরুজ্জামানের পর বিএনপির বিবেচনায় ছিল জেলা সভাপতি শফিকুল আলম। তাঁর মনোনয়নের বিষয়ে স্থানীয় একাধিক নেতা বাদ সাধেন। অগত্যা মঞ্জুতেই আস্থা বিএনপির। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিবেচনা ছিল দলের। এর একটি হলো দলের বাইরে ব্যক্তি মঞ্জুর জনপ্রিয়তা। ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে তরুণসমাজে মধ্যে তিনি বেশ জনপ্রিয়। মানুষের সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশতে পারেন তিনি। আর ব্যক্তি মঞ্জু ছাড়া প্রতীক ধানের শীষকে বড় বিবেচ্য বিষয় বলে মনে করে বিএনপি।

নজরুল ইসলাম মঞ্জুর জনপ্রিয়তা আসলে কতটা? রাজনৈতিক জীবনে বড় নির্বাচন বলতে মঞ্জু ২০০৮ সালের নির্বাচন করে বিজয়ী হয়েছেন। এর ব্যবধান অবশ্য দেড় হাজারের বেশি না। তবে এ কথাও ঠিক, সে সময় সারা দেশে ভূমিধস বিজয় পেয়েছিল আওয়ামী লীগ। আর সরকারে না থাকাতে সেই অর্থে তেমন কোনো কাজ করতে পারেননি মঞ্জু।
নজরুল ইসলাম মঞ্জু মূল শহরে যতটা পরিচিত, দৌলতপুর বা খালিশপুরে ততটা নন। করপোরেশনের এ জায়গায় আওয়ামী লীগের অবস্থান অনেক আগে থেকেই ভালো।
দুই দলের এসব বিবেচনার বাইরে দুটি দলেরই আছে উপদলীয় কোন্দল। গত মেয়র নির্বাচনে খালেকের পরাজয়ে হেফাজত ইস্যুর পাশাপাশি দলীয় কোন্দল একটি বড় বিষয় ছিল বলে দলের একাধিক নেতা মনে করেন। আবার খুলনা বিএনপিতে নজরুল ইসলামের একচ্ছত্র আধিপত্য মানতে নারাজ দলের একটি অংশ।
তবে খালেক ও মঞ্জু দুজনই দাবি করেছেন, দলে কোনো কোন্দল নেই।

দুই মেয়র প্রার্থীর ব্যক্তি ইমেজ, দলীয় ইমেজ, প্রতীক, দক্ষতা—এসব নানা বিবেচনায় দুজনেরই কিছু সুবিধা ও অসুবিধা আছে বলেই স্থানীয় লোকজনের ধারণা। আর এসব বিষয় ভোটারদের বিবেচনায় আসবে বলে ধারণা সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের খুলনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কুদরত-ই-খুদার। তিনি বলেন, ‘মানুষ দলের বাইরেও ব্যক্তিগত দক্ষতা এবং নগরীর উন্নয়নে মেয়রের সক্ষমতাকে বিবেচনা করবে। সরকারি দলের না হলে এ দেশে মেয়রদের ভালো করা কঠিন। তারপরও ব্যক্তির নিজস্ব দক্ষতা বলে একটি বিষয় আছে। সেটি কতটুকু মেয়র প্রার্থী দেখাতে পারবে, তাও বিবেচিত হবে।’
খুলনা সিটিতে যে দুজনকে দুই দল প্রার্থী করেছে, তাঁদের বিরুদ্ধে মানুষের তেমন কোনো অভিযোগ নেই। দুজনেরই এলাকার জনপ্রতিনিধি হিসেবে আগের অভিজ্ঞতা আছে। দল বা প্রতীকের পাশাপাশি এই দুই ব্যক্তির ভাবমূর্তি একটি বড় বিবেচ্য বিষয় হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করেন সনাকের খুলনা ইউনিটের সভাপতি অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির। তিনি বলেন, ‘তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু দুই ব্যক্তির মধ্যেই হবে না। ভোটারদেরও প্রার্থী বাছাইয়ে বেশ চিন্তাভাবনা করতে হবে।’