ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

সিটি করপোরেশন নির্বাচন

১০ মে ২০১৮, ১১:০৫

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি খুলনায় জয় পেতে মরিয়া

65_2.jpg
  • খুলনায় ভোট পণ্ড হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
  • দুই প্রধান দলেরই মনোযোগ এখন খুলনায়।
  • জয় পেতে মরিয়া আওয়ামী লীগ ও বিএনপি।
  • খুলনায় ছড়াচ্ছে উত্তাপ।
আইনি লড়াইয়ের সর্বশেষ অবস্থা ও বাস্তবতা-সব দিক বিবেচনায় গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সম্ভাবনা আপাতত শেষ। খুলনা সিটির নির্বাচন নিয়েও নানা আশঙ্কার কথা আলোচনা হচ্ছে। তবে সরকার ও রাজনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, খুলনায় ভোট পণ্ড হওয়ার মতো আইনি জটিলতা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। বরং প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি খুলনায় জয় পেতে মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছে। ফলে এই নির্বাচন এখন জাতীয় রাজনীতির প্রধান দুই শক্তির অনেকটা ‘যুদ্ধক্ষেত্রে’ পরিণত হয়েছে।

ভোট স্থগিত হওয়ার পর গতকাল বুধবার গাজীপুর জেলা প্রশাসন ও নির্বাচন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা। সেখানে তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, নির্বাচন স্থগিতের আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের রায় যদি নির্বাচন কমিশনের পক্ষেও যায়, তারপরও তফসিল অনুযায়ী ১৫ মে ওই ভোটের আয়োজন করা সম্ভব হবে না।

গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন স্থগিত করে হাইকোর্টের দেওয়া আদেশের বিরুদ্ধে গতকাল আবেদন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ নিয়ে হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে ইসি এবং নির্বাচনে দুই প্রার্থীর আবেদনসহ তিনটি আবেদন দায়ের হলো। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের বেঞ্চে আজ বৃহস্পতিবার তিনটি আবেদন একসঙ্গে শুনানির জন্য কার্যতালিকার ৭ নম্বর ক্রমিকে রয়েছে।

গাজীপুরের ভোট স্থগিত হওয়ার কারণে খুলনার ভোট প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কাছে মর্যাদার লড়াই হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুই দলই কেন্দ্রীয় নেতা ও জোটের শরিকদের মাঠে নামিয়েছে। পাশাপাশি দুই দল একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের খেলায় মেতেছে।

গতকাল আওয়ামী লীগের জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল নির্বাচন কমিশনে যায়। তারা খুলনা সিটি নিয়ে নির্বাচন কমিশনে লিখিত ১২টি অভিযোগ করেছে। এর মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তার বিষয়েও অভিযোগ দিয়েছে। আর এরপরই ইসি থেকে একজন যুগ্ম সচিবকে খুলনায় পাঠানো হয়েছে। অবশ্য ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেছেন, রিটার্নিং কর্মকর্তাকে সহযোগিতা করার জন্যই একজন কর্মকর্তা পাঠানো হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে আর ভুলভ্রান্তি না হয়।

আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায়ের সূত্র বলছে, নির্বাচন আচরণবিধি অনুসারে মন্ত্রী-সাংসদেরা প্রচারে যেতে পারছেন না। কিন্তু বিএনপি ও জোটের বড় নেতারা খুলনায় প্রচার চালাচ্ছেন। তাঁদের মানসিক ও প্রশাসনিক চাপে ফেলে প্রচার থেকে কিছুটা বিরত রাখাই আওয়ামী লীগের মূল লক্ষ্য। এ ছাড়া রিটার্নিং কর্মকর্তা ছাত্রজীবনে বিএনপির একটি অঙ্গসংগঠনের নেতা ছিলেন। আবার তাঁর শ্বশুর আওয়ামী লীগের সাংসদ। মূলত কমিশনকে চাপে রাখার কৌশল থেকেই রিটার্নিং কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনেছে সরকারি দল।

এদিকে গতকাল রাতে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে খুলনার ডিআইজি ও পুলিশ কমিশনারকে অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, খুলনায় যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তাতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ নেই।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন এসব নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, এখন সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলোতে স্থানীয় বিষয়কে ছাপিয়ে জাতীয় রাজনীতি মুখ্য হয়ে উঠছে। গাজীপুরে নির্বাচন স্থগিত হওয়ার পর সব মনোযোগ এখন খুলনায় পড়েছে। এর ভালো দিক হচ্ছে, এতে করে নির্বাচনে প্রতিযোগিতা বাড়বে। খারাপ দিক হচ্ছে, উত্তেজনা বাড়বে। তবে এখন পর্যন্ত নির্বাচনের পরিবেশ ঠিকই আছে। পুলিশের বিরুদ্ধে যে অভিযান বা গ্রেপ্তারের অভিযোগ আসছে, এটায় নির্বাচন কমিশনের নজর দেওয়া দরকার।

আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিদলের সাক্ষাতের পর একজন কর্মকর্তাকে খুলনায় নিয়োগের ব্যাপারে সাখাওয়াত হোসেন বলেন, রিটার্নিং কর্মকর্তার ওপরে কাউকে নিয়োগ দেওয়া যায় না। পর্যবেক্ষক পাঠানো যায়। খুলনায় যাঁকে পাঠানো হচ্ছে তাঁর কাজ কী হবে-এটা দেখার বিষয়। রিটার্নিং কর্মকর্তার কাজে যদি হস্তক্ষেপ হয় কিংবা কাজে ব্যাঘাত ঘটলে চিন্তার বিষয় আছে। নির্বাচনে রাজনৈতিক দল সব সময়ই অভিযোগ করে। কখনো তা সত্য হয়। কখনো মানসিক চাপ প্রয়োগের জন্য করে থাকে। এখন নির্বাচন কমিশনেরই ঠিক করতে হবে, কোনটা সঠিক আর কোনটা চাপ দেওয়ার জন্য করা।

খুলনায় জিততে মরিয়া আওয়ামী লীগ
আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, গাজীপুরে তাদের দলীয় প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলমের অবস্থান ভালো ছিল না। ফলে ভোট স্থগিত হয়ে যাওয়ায় স্বস্তিতে আছে দলটি। এখন সব মনোযোগ খুলনায়। সেখানে দলীয় প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেকের অবস্থানও ভালো বলে আওয়ামী লীগ মনে করে। দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফের নেতৃত্বে একটি দল খুলনার ভোট দেখভাল করছে। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) একাংশের সভাপতি শরীফ নূরুল আম্বিয়ার নেতৃত্বে ১৪ দলের একটি প্রতিনিধিদলও খুলনায় আছে।

আওয়ামী লীগের একজন উচ্চপর্যায়ের নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, তালুকদার আবদুল খালেককে সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করিয়ে খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রার্থী করা হয়েছে। খুলনায় জয়ের বিকল্প কিছু ভাবছে না আওয়ামী লীগ। কারণ, হারলে তালুকদার খালেক রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। গাজীপুরে হারের ভয়ে ভোট বাতিল করা হয়েছে-এই অভিযোগ অনেকটাই প্রতিষ্ঠা পাবে। আর জাতীয় নির্বাচনের আগে সরকারি দলের জনসমর্থন নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।

জানতে চাইলে মাহবুব উল আলম হানিফ প্রথম আলোকে বলেন, তালুকদার খালেক পাঁচ বছর মেয়রের দায়িত্ব পালন করার পর বিএনপির একজন পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করেন। খালেকের যে উন্নয়ন, এর ধারেকাছেও যেতে পারেননি বিএনপির মেয়র। ফলে দলীয় ভোট, ভাসমান ভোটার, এমনকি বিএনপিরও অনেকে উন্নয়নের স্বার্থে তালুকদার খালেককেই বেছে নেবেন।

বিএনপির ভয় শেষ তিন দিন
ভোটার নন-এমন কেন্দ্রীয় ও অন্য নেতাদের ভোটের ৪৮ ঘণ্টা আগেই নির্বাচনী এলাকা ত্যাগ করার নিয়ম। বিএনপি নেতাদের ১২ মের মধ্যেই খুলনা ত্যাগ করতে হবে।
বিএনপির সূত্র বলছে, এই সময়টা নিয়েই তাদের ভয়। কেন্দ্রীয় নেতাদের অনুপস্থিতিতে প্রশাসন সরকারি দলের পক্ষে অবস্থান নিতে পারে। ভোটে জবরদস্তি করতে পারে। বিএনপির নেতারা বলছেন, খুলনায় বাছাই করা নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি ওয়ার্ডভিত্তিক সক্রিয় নেতাদের বাসাবাড়িতে পুলিশ তল্লাশি করছে। অনেককে ইতিমধ্যে এলাকা ছেড়ে যেতে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।
এরপরও বিএনপি খুলনাকে তাদের শক্ত দুর্গ মনে করে। সাংগঠনিক অবস্থাও অন্য জায়গার চেয়ে ভালো। আবার জাতীয় রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নির্ণয়েও এই নির্বাচন তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে দলটি।
নির্বাচনের শুরু থেকেই বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতারা পর্যায়ক্রমে খুলনায় জনসংযোগ করছেন। বর্তমানে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্যা, আবদুল আউয়াল মিন্টু, মো. শাহজাহান, মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, কেন্দ্রীয় নেতা শহীদ উদ্দীন চৌধুরীসহ এক ডজনেরও বেশি নেতা সেখানে আছেন।
শহীদ উদ্দীন চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ঢাকা থেকে বিএনপির নেতারা যেসব হোটেলে উঠছেন, পুলিশ সেখানে তল্লাশি করছে। গতকালও কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে বিএনপির নেতাদের ভাড়া না দিতে বলা হয়েছে।
১৫ মে গাজীপুরে ভোট করা সম্ভব নয়
আমাদের প্রতিনিধি (গাজীপুর) জানান, গতকাল প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা গাজীপুরে জেলা প্রশাসন ও নির্বাচনী কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের বলেন, কর্মকর্তারা প্রত্যেকেই মনে করেন, আদালতের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার হলেও এ সময়ের মধ্যে নির্বাচন করা সম্ভব হবে না। তারপরও যদি আদালত ১৫ মে ভোট নেওয়ার নির্দেশ দেন, তাহলে ইসিকে তা পালন করতে হবে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, ‘আমরা উকিল নিয়োগ করেছি, আজকে (বুধবার) আপিল করার কথা। হয়তো আগামীকাল (আজ বৃহস্পতিবার) শুনানি হবে। আদালত সময় বেঁধে না দিয়ে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করলে নির্বাচনের তারিখ পিছিয়ে দেওয়া হবে। তবে এর জন্য পুনঃ তফসিল ঘোষণার প্রয়োজন হবে না, শুধু ভোট গ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করলেই হবে।’
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন এ ধরনের কোনো আইনি জটিলতায় পড়ার আশঙ্কা আছে কি না-এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, সংসদ নির্বাচন নির্ধারিত ৯০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে, তাই সে নির্বাচন নিয়ে কোনো জটিলতা হবে না।
সৌজন্যে: প্রথম আলো