ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

প্রধান ইভেন্ট

২৫ ডিসেম্বর ২০১৭, ১০:১২

বড়দিন : মহামিলনের দিবস

8_3.jpg

খ্রিষ্টজন্মোৎসব (খ্রিষ্টমাস) বা বড়দিন পালিত হয় একটি শিশুর জন্মকে কেন্দ্র করে। তার জন্মের বহু আগে থেকেই প্রবক্তাগণ ভাববাণী করেছিলেন : ‘একটি ছেলে আমাদের জন্য জন্মগ্রহণ করবেন, একটি পুত্র আমাদের দেওয়া হবে। শাসন করবার ভার তার কাঁধের উপর থাকবে, আর তার নাম হবে আশ্চর্য পরামর্শদাতা, শক্তিশালী ঈশ্বর, চিরস্থায়ী পিতা, শান্তির রাজা’ (যিশা ৯:৬)। খ্রিষ্টভক্তদের বিশ্বাস : (২৫ ডিসেম্বর) বেথলেহেমের গোশালায় মানুষ বেশে যিনি শিশু হয়ে জন্মেছিলেন, তিনি স্বয়ং ঈশ্বরপুত্র। সেদিনের মহা-উপাসনায় শাস্ত্রপাঠে আছে : ‘আদিতে ছিলেন বাণী : বাণী ছিলেন ঈশ্বরের সঙ্গে, বাণী ছিলেন ঈশ্বর। ... তার মধ্যে ছিল জীবন; সেই জীবন ছিল মানুষের আলো’ (যোহন ১:১-৪)। বাণী বলতে স্বয়ং ঈশ্বরপুত্রকেই বোঝায়।

শাস্ত্রে লেখা আছে : ‘সময় যখন পূর্ণ হলো, তখন ঈশ্বর এই পৃথিবীতে পাঠালেন তার আপন পুত্রকে; তিনি জন্ম নিলেন নারীগর্ভে, জন্ম নিলেন মোশীর বিধানের অধীন হয়ে। এমনটি ঘটেছিল, যাতে তিনি বিধানের অধীনে-পড়ে-থাকা যত মানুষের মুক্তিমূল্য দিতে পারেন যাতে আমরা হয়ে উঠতে পারি (ঈশ্বরের) দত্তক-পুত্র’ (গালা ৪:৪-৫)। ‘তোমরা যে সত্যিই পুত্র, তার প্রমাণ এই যে, ঈশ্বর আমাদের হৃদয়ে পাঠিয়েছেন তার পুত্রের সেই পরম আত্মাকে, যিনি ডাকতে থাকেন: ‘আব্বা! পিতা!’ তাই এখন তুমি আর দাস হয়ে নেই, তুমি পুত্র, আর পুত্রই যদি হও, তবে পুত্রের একদিন যা-কিছু পাওয়ার কথা, ঈশ্বরের অনুগ্রহে তা পাওয়ার অধিকার তোমার আছেই’ (গালা ৪:৬-৭)।

দীক্ষাস্নানের গুণে আমরা নবজন্ম লাভ করি এবং ঈশ্বরের সেই আত্মাকে লাভ করি বলেই আত্মিক জ্ঞানের প্রভাবে নিজেদের ঈশ্বরের সন্তান বলে জানতে ও বুঝতে পারি। কাদামাটি দিয়ে তৈরি আদমের সন্তান হয়েও আমরা অনাদি, অনন্ত, অসীম ও সর্বশক্তিমান ঈশ্বরকে আপন ‘পিতা’ বলে উপলব্ধি করতে পারি। তখন বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে ঈশ্বরের উপস্থিতি ‘তুমি আছ’Ñ কেবলমাত্র এই তাত্ত্বিক সত্য নয় (যা এমনকি শয়তানও জানে), বরং ‘তুমি আমাতে আছ’ এই উপলব্ধিতে বিশ্বপ্রভুকে জানা, অন্তরের আত্মিক অনুভূতিতে স্রষ্টাকে জানা।

ঈশ্বরে-মানুষে ও মানুষে-মানুষে মহামিলনের ডাক আমরা সাধু পলের কথা দিয়ে বুঝতে পারি : ‘তোমাদের মনোভাব তেমনটি হওয়া উচিত, যেমনটি খ্রিষ্টযিশুর নিজেরই ছিল। তিনি নিজেকে তিনি রিক্ত করলেন; দাসের স্বরূপ গ্রহণ করে তিনি মানুষের মতো হয়েই জন্ম নিলেন। মানুষের মতো হয়ে তিনি নিজেকে আরো নমিত করলেন। চরম আনুগত্য দেখিয়ে, এমনকি ক্রুশেই মৃত্যু মেনে নিলেন। তাই ঈশ্বর তাকে সব কিছুর ওপরে উন্নীত করলেন, তাকে দিলেন সেই নাম, সকল নামের শ্রেষ্ঠ, যেন শিশুর নামে আনত হয় প্রতিটি জানুÑ স্বর্গে, মর্ত্যে ও পাতালেÑ প্রতিটি জিহ্বা যেন এই সত্য ঘোষণা করে : যিশুখ্রিষ্ট স্বয়ং প্রভু, আর এতেই যেন প্রকাশিত হয় পিতা ঈশ্বরের মহিমা’ (ফিলি ২:৫-১১)। ঈশ্বর দূর থেকে আরাধ্য নন, তিনি ভক্তি-ভালোবাসায়, প্রেম-প্রীতি ও মিলনে আরাধ্য।

বর্তমান বাস্তবতা : এক ও অভিন্ন সৃষ্টিকর্তা বিশ্বপ্রভুর সৃষ্ট বিশ্ব ও মানব-পরিবার আজ শতধা বিভক্ত : ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু, শোষক-শোষিত, পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ; প্রথম বিশ্ব-তৃতীয় বিশ্ব; পরাশক্তি- ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ ইত্যাদি। ফলে বিশ্বে বিরাজ করছে দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত, যুদ্ধ-বিগ্রহ, মারামারি, হানাহানি। যিনি ভালোবেসে নিজ প্রতিমূর্তিতে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি এরূপ বিভাজন সমর্থন করতে পারেন? নেতিবাচক এসব বাস্তবতার মূলে কি সেই ভালোবাসার অভাব নয়?

মানুষের মর্যাদা : ঈশ্বর তো মানুষকে অনেক মর্যাদা দিয়ে নিজের প্রতিমূর্তিতে গড়েছেন। মানুষের প্রতি ঈশ্বরের মহানুভবতার কথা ধ্যান করে বিস্ময়াভিভূত হয়ে তাই সামরচয়িতা বলেন : তুমি মানুষকে স্বর্গদূতের চেয়ে সামান্য নিচু করেছ; রাজমুকুট হিসেবে তুমি তাকে দান করেছ গৌরব ও সম্মান। তোমার হাতে সৃষ্টির শাসনভার তুমি তারই হাতে দিয়েছ’ (সাম ৮:৪-৬)। মানুষকে ঈশ্বর অসীম মর্যাদা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। এ হচ্ছে তার নিকট স্রষ্টার দান। এ জন্য তাকে সব সময় ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হয়, অহঙ্কার বা আত্মশ্লাঘার কোনো সুযোগই তার নেই।
ঈশ্বরের বিশেষ অনুগ্রহধন্য যিশুর মা কুমারী মারিয়া যিশুর দেহধারণের মর্মসত্য উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই ঐশ্বরিক ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে বলতে পেরেছিলেন : ‘প্রাণ আমার পরমেশ্বরের মহিমা গায়, নাচে হৃদয় ত্রাতা প্রভুর প্রেরণায়। ... যাদের মন অহঙ্কারে ভরা, তাদের তিনি চার দিকে দূর করে দিয়েছেন। সিংহাসন থেকে রাজাদের তিনি নামিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু সাধারণ লোকদের তুলে ধরেছেন’ (লুক ১:৫১-৫২)।

শাস্ত্রে আরো বলা হয়েছে ; ‘ঈশ্বর উদ্ধত মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়ান, কিন্তু বিনম্রকে তার অনুগ্রহে ধন্য করেন’ (প্রবচন ৩:৩৪)। তাই তোমরা এখন পরাক্রান্ত-বাহু ঈশ্বরের অধীনে নিজেদের নমিত রাখ, যাতে সময় এলেই তিনি তোমাদের উচ্চ আসনে উন্নীত করেন’ (১ পিতর ৫:৫-৬)।
বড়দিন হচ্ছে স্বর্গীয় সম্পদে, মনুষ্যত্বের মহিমায়, মিলন ও ভ্রাতৃত্বের সুষমায়, হৃদয়বৃত্তিতে সিক্ত হয়ে অনন্য বিশ্বপ্রভুর সাথে, তার সৃষ্টির সাথে, শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষের সাথে মহামিলনের দিন, নিজেকে সবার মধ্যে এবং সবাইকে নিজের মধ্যে উপলব্ধি করে সচ্চিদানন্দকে আস্বাদন করার দিন। সবার প্রতি আনন্দময় বড়দিন ও খ্রিষ্টীয় নববর্ষের শুভেচ্ছা।