ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

হামিদ মীর

২৫ ডিসেম্বর ২০১৭, ১১:১২

প্রসঙ্গ : খতমে নবুওয়াত

খতমে নবুওওয়াতের শপথ গ্রহণে পরিবর্তনের বিষয় নিয়ে গোপন রহস্যের ছায়া নড়তে শুরু করেছে। আইনমন্ত্রী জাহিদ হামিদের ইস্তফাসত্ত্বেও এ বিষয়টি সহজে মিটমাট হতে দেখা গেল না। জাহিদ হামিদসহ মুসলিম লীগ (এন)-এর সংশ্লিষ্ট কয়েকজন মন্ত্রীর প্রথম থেকেই এ বক্তব্য ছিল যে, খতমে নবুওওয়াতের শপথে পরিবর্তন একটি ক্ল্যারিকাল ভুল ছিল। এরপর অবস্থান পরিবর্তন করে বলা হলো, পার্লামেন্টের নির্বাচনী সংস্কার কমিটিতে থাকা সরকার ও বিরোধী দলের সব সদস্যেরই খতমে নবুওওয়াতের শপথের পরিবর্তনের বিষয়টি জানা ছিল, ওই সময় কেউই আপত্তি তোলেনি। ওই কমিটিতে যুক্ত বিরোধী দলের সদস্য ছাড়া মুসলিম লীগ (এন)-এর জোটভুক্ত জেইউআই (এফ)-এর সদস্যদের বক্তব্য, কমিটির কোনো বৈঠকেই খতমে নবুওওয়াতের বিষয়টি কখনোই আলোচনাতে আসেনি। জেইউআই (এফ)-এর জাতীয় অ্যাসেম্বলির সদস্য নাঈমা কিশওয়ার তাদের জোটভুক্ত দলের পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গিতে বিস্ময় ও হতাশা প্রকাশ করে এ বিষয়ের বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি করেছেন।

মনে হচ্ছে কয়েকজন ব্যক্তির ভুল দ্বারা একটি নন-ইস্যু বিষয়কে এমন ইস্যু বানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, যাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে সমাবেশ, ঘেরাও, জ্বালাও শুরু হয়ে গেছে। নির্বাচনী সংস্কার কমিটিতে যুক্ত সরকার ও বিরোধী দলের কয়েকজন সদস্যকে জিজ্ঞাসা করে জানা গেছে, তাদের সবার সবচেয়ে বেশি মনোযোগ নির্বাচনী সংস্কারের দীর্ঘ বিলের ওই একটি দফার ওপর নিবদ্ধ ছিল, যার আওতায় অযোগ্য ব্যক্তিকে দ্বিতীয়বার দলের প্রধান বানানো হয়ে থাকে। এ রাজনৈতিক টানাপড়েন অবস্থার মাঝেই নিবন্ধন ফরমে থাকা খতমে নবুওওয়াতের শপথের শব্দ বদলে দেয়া হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর সাহেবজাদা তারিকুল্লাহ জাতীয় অ্যাসেম্বলিতে এ পয়েন্ট উত্থাপন করলে হট্টগোলের মধ্যে কেউ মনোযোগ দেয়নি। এরপর সিনেটে জেইউআই (এফ)-এর হাফেজ হামদুল্লাহ এ বিষয়টি উত্থাপন করলে পার্লামেন্টের সদস্যরা জানতে পারেন, খতমে নবুওওয়াতের শপথ পরিবর্তন করে দেয়া হয়েছে। যদি এটা একটি ক্ল্যারিকাল ভুল হয়ে থাকে, তাহলে এ ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল।

কিন্তু সরকার যখন এ বিষয়ের দায়ভার পার্লামেন্টের ৩৬ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটির ওপর চাপিয়ে দিয়েছে, তখন বিষয়টি জটিল আকার ধারণ করেছে। এখন আরো তদন্তের দাবি কঠিন রূপ নিচ্ছে। এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, বর্তমান পার্লামেন্টে সরকার ও বিরোধী দলের বেশির ভাগ সদস্য খতমে নবুওওয়াতের বিষয়ের স্পর্শকাতরতা সম্বন্ধে অবগত ছিলেন না। ওই সদস্যরা ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানে নির্বাচিত জাতীয় অ্যাসেম্বলিতে খতমে নবুওওয়াতের ওপর আলোচনাগুলো বিস্তারিত পড়লে তারা এটা জানতে পারতেন যে, এ বিষয়টি শুধু কয়েকজন আলেমই উত্থাপন করেননি, বরং জাতীয় অ্যাসেম্বলিতে সরকার ও বিরোধী দলের সব সদস্য আলোচনায় নিয়ে আসেন এবং ঐকমত্য রায় দ্বারা সংবিধানের ২৬০ ধারা সংশোধন করে আহমদিয়া (কাদিয়ানি) ও বাহায়িদের অমুসলিম ঘোষণা করা হয়।

৩০ জুন, ১৯৭৪ জাতীয় অ্যাসেম্বলির যে সদস্যরা খতমে নবুওওয়াতের সমস্যার সমাধানের প্রস্তাব পেশ করেছিলেন, তাদের সংখ্যাও ছিল ৩৬। আন্দোলনকারীদের মধ্যে ছিলেন মাওলানা মুফতি মাহমুদ, মাওলানা শাহ আহমদ নুরানী, চৌধুরী জহুর ইলাহী, সরদার শওকত হায়াত, প্রফেসর গফুর আহমদ, মাওলানা আব্দুল হক, সরদার শেরবাজ মাজারী, আব্দুল হামীদ জাতুয়ী, মাওলানা বাখশ সুমরু, আলী আহমদ তালপুর, রঈস আতা মুহাম্মদ মুরী, সাহেবজাদা সফিউল্লাহ, খাজা জামাল কোরীজা, মুহাম্মদ ইবরাহীম বারক ও সাহেবজাদা নজীর সুলতানসহ আরো অনেকে। সাহেবজাদা নজীর সুলতান বর্তমান জাতীয় অ্যাসেম্বলিরও সদস্য। জাতীয় অ্যাসেম্বলির রুদ্ধদ্বার বৈঠকে কয়েকদিন পর্যন্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ইয়াহইয়া বখতিয়ার আহমাদিয়া (কাদিয়ানি) জামায়াতের নেতা মির্জা নাসির আহমদের কথা পর্যালোচনা করেন এবং শেষ পর্যন্ত আইনমন্ত্রী আবদুল হাফিজ পীরজাদা সংশোধনী বিল পেশ করেন, যা পাস হয়ে যায়।

বর্তমানের পিপলস পার্টির বেশির ভাগ নেতার এটা জানা নেই যে, খতমে নবুওওয়াতের ওপর আলোচনায় পিপলস পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং সংস্কৃতি ও বিজ্ঞান মন্ত্রী মালেক মুহাম্মদ জাফর পুরোপুরি অংশগ্রহণ করেন। মালেক মুহাম্মদ জাফর খতমে নবুওওয়াতের সমস্যার ওপর ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ জাতীয় অ্যাসেম্বলিতে বিস্তারিত বক্তব্য প্রদান করেন, যা জাতীয় অ্যাসেম্বলির মুদ্রিত কার্যাবলির পঞ্চম খণ্ডে বিদ্যমান রয়েছে। মালেক মুহাম্মদ জাফর বংশীয়ভাবে আহমদিয়া জামাতের সাথে সম্পর্ক ছিল। তিনি কাদিয়ান থেকে মেট্রিক পাস করেন। তবে পরে তিনি কাদিয়ানি মতবাদ ছেড়ে দেন। যার কারণে মেজর জেনারেল আব্দুল উলাসহ কয়েকজন কাদিয়ানি আত্মীয়স্বজন মালেক মুহাম্মদ জাফরের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে দেয়। মালেক একজন সমাজবাদী ছিলেন, তবে তিনি আহমদিয়া আন্দোলনের ওপর একটি গ্রন্থ লিখেছেন। যেখানে তিনি আহমদিয়াদের বিদ্রুপ না করেই দলিলসহ তাদের আকিদার ওপর আলোচনা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফ্ফুজে খতমে নবুওওয়াত বারবার ওই গ্রন্থ প্রকাশ করেছে। ওই গ্রন্থের কথা আমি মালেক মুহাম্মদ জাফর সম্পর্কে রচিত গ্রন্থ ‘জিন রোযুঁ দরবেশ হুয়ে হাম ...’-এ পড়েছি, যা মালেক মুহাম্মদ জাফরের কন্যা সাজেদা জাফর সংকলন করেছেন। ওই গ্রন্থে আই এ রহমান মালেক মুহাম্মদ জাফর সম্পর্কে লিখেছেন, মালেক সাহেবের যে কথা আমাকে বেশ প্রভাবিত করেছে, তা হচ্ছে, তিনি তার মুক্তচিন্তার কারণে নিজ মতবাদ ছেড়ে দিয়েছেন। আমি এ তর্কে জড়াতে চাচ্ছি না যে, তিনি সঠিক না ভুল। তবে যে ব্যক্তির মাঝে এতটা দুঃসাহস রয়েছে, তিনি তার পৈতৃক মতবাদ ছেড়ে দিয়েছেন, আমি তাকে খুব শ্রদ্ধা করি। মালেক সাহেব আই এ রহমান ও গনী জাফরের সাথে মিলে কায়েদে আজমের অ্যাসেম্বলিতে দেয়া ঐতিহাসিক বক্তৃতাসংবলিত একটি গ্রন্থ ‘জিন্নাহ অ্যাজ এ পার্লামেন্টারিয়ান’ সংকলন করেন।

ফয়েজ আহমদ ফয়েজের সাথে মালেক জাফরের বেশ বন্ধুত্ব ছিল। সাজেদা জাফরের গ্রন্থে মালেক জাফর সম্পর্কে সালিমা হাশেমীরও একটি প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সালিমা হাশেমী এ প্রবন্ধে লিখেছেন, আব্বা ও জাফর আংকেল একই রকমের মানুষ ছিলেন। উভয়ের রাজনৈতিক তত্ত্ব একই ছিল। উভয়ের গাম্ভীর্যতা একই রকম ছিল। উভয়ের মননে ছিল প্রশস্ততা ও সহিষ্ণুতা। ফয়েজের রাজনৈতিক তত্ত্বে বিশ্বাসী মালেক মুহাম্মদ জাফর জাতীয় অ্যাসেম্বলিতে বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন, আহমদিয়া জামায়াত ও ইসরাইলের মাঝে সম্পর্কের কথা এ কক্ষে প্রকাশ হয়েছে। এ সম্পর্কের তদন্ত করা হোক। প্রকাশ থাকে যে, ২০ আগস্ট ১৯৭৪ সালে এটর্নি জেনারেল ইয়াহইয়া বখতিয়ার জাতীয় অ্যাসেম্বলিতে মির্জা নাসির আহমদকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ইসরাইলে কি আপনার মিশন বিদ্যমান রয়েছে? মির্জা নাসির আহমদ জবাবে বলেন, ওখানে আমাদের জামায়াত রয়েছে। কেননা ইসরাইলেও তো মুসলমান বসবাস করে। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ইসরাইল ফিলিস্তিনি মুসলমানদের পছন্দ করে না। ফিলিস্তিনি মুসলমান ইসরাইলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছে। কিন্তু ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর সাথে আপনাদের প্রতিনিধির সাক্ষাৎ হচ্ছে। ইসরাইল ফিলিস্তিনি মুসলমানদের ওপর জুলুম করে, আপনাদের ওপর এত অনুরাগ কেন? মির্জা নাসির আহমদ বলেন, ইসরাইলের সাথে আমাদের সুসম্পর্ক রয়েছে।

যারা এ মন্তব্য করে যে, ১৯৭৪ সালে জুলফিকার আলী ভুট্টো ধর্মীয় দলগুলোর চাপে পড়ে আহমদিয়াদের অমুসলিম ঘোষণা করেছেন, তারা যেন জাতীয় অ্যাসেম্বলিতে খতমে নবুওওয়াতের পদক্ষেপ ছাড়াও মালেক মুহাম্মদ জাফরের গ্রন্থ ‘আহমদিয়া তাহরীক’ গ্রন্থটি একটু কষ্ট করে পড়ে নেয়।

এ গ্রন্থে মালেক মুহাম্মদ জাফর আহমদিয়াদের সাথে জুলুম নির্যাতনের পরিবর্তে নরম মনোভাব অবলম্বনের প্রস্তাব দেন। জাতীয় অ্যাসেম্বলিতে তার বক্তব্যের শেষে মালেক মুহাম্মদ জাফর প্রস্তাব করেছিলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য একটি বিশেষ শপথ হওয়া উচিত। যেখানে তারা শপথ করবেন, তারা কোনো ধর্মীয়, সাম্প্রদায়িক, আধ্যাত্মিক গোষ্ঠী, সংস্থা বা মতাদর্শী ইত্যাদির স্বার্থকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ওপর প্রাধান্য দেবে না। তিনি তার বক্তৃতায় এ কথাও বলেন, সরকার ইসলাম প্রচারের জন্য একটি দফতর প্রতিষ্ঠা করবে, যা ইসলামের মৌলিক আকিদা এবং বিশেষ করে খতমে নবুওওয়াতের আকিদার প্রচার ও প্রসার করবে।

পিপলস পার্টির সদস্যদের প্রতি আবেদন, সম্প্রতি তারা পার্টির পঞ্চাশ বছর পূর্তি উৎসব পালন করছে, নিজ পার্টির একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্যের গ্রন্থ ও জাতীয় অ্যাসেম্বলিতে খতমে নবুওয়াতের ওপর ওই বক্তৃতাগুলো একবার পড়ে নিন এবং অন্য দলগুলোর সদস্যদেরও পড়ান। এতে সবারই উপকার হবে। খতমে নবুওওয়াতের সমস্যা সংবিধানে মিটিয়ে দেয়া হয়েছে। আহমদিয়াদের অমুসলিম ঘোষণা করা হয়েছে। তবে সংবিধানের আওতায় তারা পাকিস্তানের নাগরিক। তাদের জানমাল রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সাধারণ মুসলমানদের প্রচুর পরিমাণ ইসলামকে অধ্যয়ন করা উচিত। এ অধ্যয়ন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের অনিষ্টতা থেকে রক্ষা করবে।