ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

অধ্যাপক মো: মসিউল আযম

২৫ ডিসেম্বর ২০১৭, ১১:১২

স্বাধীনতা যুদ্ধে নারীর অবদান

11_5.jpg

মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ফেলে আসা সেই ভয়াল দিনগুলো নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বহু বছর পরে হলেও নিজেকে হালকাবোধ করছি। আত্মসমালোচনা করতে পারছি। এ প্রজন্ম কিছুটা জানতে পারবে এই লেখনীর মাধ্যমে। মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে জোর গলায় বলতে পারি মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ভূমিকা খাটো করে দেখার অবকাশ নেই।

১৯৭১ সালে আমার বয়স ছিল ২৮ বছর। ১৯৬৯ সালে এমএ পাস করে কলেজে ঢুকেছি। ১৯৭০ সালে বিয়ে করেছি। সাংবাদিকতা করি। ফলে যুক্তিযুদ্ধকালীন ঘটনাগুলো নানাভাবে দেখার সুযোগ হয়েছে।

যশোর সেনানিবাস সংলগ্ন আমার গ্রাম ছাতিয়ানতলা। দেশের থমথমে অবস্থা দেখে বুঝতে পারছিলাম দেশে কিছু একটা ঘটবে। ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ যশোর সেনানিবাসে বাঙালি সৈন্যরা পাক-হানাদারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এর দু’দিন আগে বসতবাড়ি ত্যাগ করে পার্শ্ববর্তী সৈয়দপুর গ্রামে সপরিবারে আশ্রয় গ্রহণ করি। ঘরবাড়ি ছাড়া, চাকরি ছাড়া অবশেষে ঠাঁই হলো ঝিনাইদহে মামাবাড়ি ও শৈলকুপায় শ্বশুরালয়ে।

বহু নারী মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানতুল্য মনে করে নিজ ঘরে আশ্রয় দিয়েছেন। পরম মমতা দিয়ে নিজ হাতে রান্না করা খাবার খাইয়েছেন। অসুস্থ আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা, শীত মৌসুমে নিজেরা শীতের কষ্ট সহ্য করে মুক্তিযোদ্ধাদের লেপকাঁথা দেয়া, নিজে অভুক্ত থেকে খাবার তুলে দেন মুক্তিযোদ্ধাদের পাতে। গোপনে চাল-ডাল অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে। দা, কাঁচি, খুন্তি, বঁটি দিয়ে যুদ্ধ করেছেন বাড়ির আঙিনায়। অনেক মা-বোন স্ত্রী স্বজনদের হত্যার প্রতিশোধ নিতে, নিজ সন্তান বা স্বামী কিংবা ভাইকে চোখের পানি আড়াল করে বুকের মাঝে কান্না চেপে বাসিমুখে বিদায় দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য। এসব ত্যাগের তুলনা কোথায় পাওয়া যাবে?
স্বাধীনতা যুদ্ধকালের কয়েকটি বাস্তব ঘটনা চিত্র তুলে ধরব। সেখানে নারীদের সাহসী ভূমিকা, তাদের বুদ্ধিমত্তা, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি মায়া মমতার প্রতিফলন ঘটেছে। গ্রামের এক মহিলা এক মুক্তিযোদ্ধাকে বাড়িতে রাতে আশ্রয় দিয়েছেন। এ খবর পৌঁছে যায় রাজাকারদের ক্যাম্পে। তারা বাড়ি ঘেরাও করে ফেলে। তিনি নিজ বিছানায় এনে লেপ দিয়ে ঢেকে দেন।

নিজ বাড়িতে আশ্রয় দেয়া আরেক মুক্তিযোদ্ধাকে রক্ষা করতে তার অস্ত্র এলএমজি জায়নামাজের নিচে রেখে নামাজে রত হন সেই বুদ্ধিমতি মহিলা। রাজাকাররা ঘর তন্নতন্ন করেও সেই অস্ত্রের খোঁজ পায়নি।

ঝিনাইদহের মামাবাড়ির পাশে চাপড়ি গ্রামের সন্তানহারা হিন্দু মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ এখনো আমার বুকে বাজে। হানাদাররা সেই মায়ের চোখের সামনে তার একমাত্র সন্তানকে গুলি করে মারে। সেই মহিলা খুব অল্প বয়সেই বিধবা হন। অনেক কষ্ট করে সেই সন্তানকে বড় করে তুলেছিলেন।
আমার মামাদের প্রতিবেশী গোলাপী তখন সন্তানসম্ভবা। হানাদারদের ভয়ে পালাতে দিয়ে বিলের পাড়ে আমগাছের নিচে সন্তান প্রসব করেন। আমার দুই ফুফাতো ভাইও শহীদ হন। বিধবা দুই বউয়ের বয়স তখন মাত্র ২০-২২ বছর। তারা সন্তানদের মুখের দিকে চেয়ে আর বিয়ে করেননি।
যশোর শহরতলির বকচরের শঙ্কর। আমার কলেজজীবনের সহপাঠী। ১৯৬৯ সালে তার বিয়ের বরযাত্রী হয়ে গিয়েছিলাম ফরিদপুরের কানাইপুরে। তার স্ত্রীর নাম পুতুল। আর পুতুলের মতো ছিল তার চেহারা। ১৯৭১ সালে শঙ্করকে হানাদাররা গুলি করে হত্যা করে। আমাদের আশপাশে এমন অসংখ্য কাহিনী রয়েছে। আমরা এসব বিধবা স্ত্রী, মা- বোনদের ত্যাগ কিভাবে মূল্যায়ন করব?

স্বাধীনতার জীবন্ত ইতিহাস পুলিশ কনস্টেবল শহর আলী। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। ১৯৭১ সালে পিরোজপুর ট্রেজারিতে ছিলেন কর্মরত। স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হলে মেজর জিয়াউদ্দীন সেখানে তাদের আত্মসমর্পণ করান। বাড়ি এসে ভারতে ট্রেনিংয়ে যাওয়ার কথা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে। যশোর শহরে এসে ধরাপড়ে যান। বিহারিদের হাত থেকে উদ্ধার করে চোখ বেঁধে পাক হানদাররা নিয়ে যায় যশোর সেনানিবাসের ছাউনীতে। তাকে কাজে লাগায় বন্দীদের একে একে হত্যার পর কবর খোঁড়া, মাটি চাপা দিতে। স্বাধীনতার যুদ্ধে শেষ মুহূর্তে মিত্র বাহিনী যশোর সেনানিবাসে ঢুকে পড়লে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন তিনি।

পুরুষ বন্দীদের একটু দূরেই ছিল মহিলাদের বন্দিশিবির। তাদের সেখানে রাখা হতো সৈন্যদের মনোরঞ্জনের জন্য। দৈহিক নির্যাতনে যারা অসুস্থ হয়ে পড়তেন তাদের মেরে ফেলা হতো।
বাংলাদেশ স্বাধীনতার পর তাদের মাথার খুলি, হাড়গোড় কঙ্কালসহ ছেঁড়া শাড়ি, ব্লাউজ, ব্রা, চুড়ি, স্যান্ডেল ইত্যাদি পাওয়া যেত মাঠে। তাদের সংখ্যা কতছিল? তারা কারা? এসব অজানা, অস্পষ্ট রয়ে গেছে সবার কাছে। যারা জীবিত ছিলেন সেসব বীরাঙ্গনার পাশে কি আমরা সত্যিকারভাবে দাঁড়াতে পেরেছি? পুনর্বাসন করতে পেরেছি কতজনকে?

সবশেষে দু’জন বীরাঙ্গনার কাহিনী শোনাবো। এদের একজন কুলসুম ও তার বোন। ১৯৭১ সালে বয়স ছিল ১৪-১৫ বছর। পাকিস্তানি হানাদারদের ভয়ে বাড়ির মধ্যে গর্ত খুঁড়ে লুকিয়ে রেখেছিল ওদের বাবা। কিন্তু রাজাকাররা গোপনে টের পেয়ে যায়। হানাদার ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যায় দু’বোনকে। চার মাস সেখানে থাকার পর নির্যাতনের ফলে দু’জনই গর্ভবতী হয়ে পড়ে। এই দু’বোনসহ আরো পাঁচজন গর্ভবতী কিশোরীকে নিয়ে যাওয়া হয় পার্শ্ববর্তী ব্রিজের কাছে। গুলি খেয়ে পড়ে গেলেও বেঁচে যান কুলসুম। পরে একজন বিলের পানি থেকে উদ্ধার করে তার বাড়িতে নিয়ে যান। গর্ভবতী দেখে মা মুখ ফিরিয়ে নেন। কারণ সমাজে মুখ দেখাতে পারবেন না। এক পুত্র সন্তানের জন্ম হলেও অসুস্থ হয়ে শিশুটি মারা যায় মাত্র চার দিনের মাথায়।

বীরাঙ্গনা হালিমার জীবনযুদ্ধের কাহিনী আরো করুণ। যুদ্ধের সময় তাকে সুরক্ষিত রাখার প্রয়াসে বাবা-মা তড়িঘড়ি করে বিয়ে দিয়ে শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়ে দেন। শ্বশুরবাড়িতে যখন হানাদার বাহিনীর ছোবল লাগে, হালিমা হারিয়ে যান জঙ্গলের মাঝে। তাকে আশ্রয় দেয়ার কথা বলে একটি লোক নিয়ে যায় পাকিস্তানি ক্যাম্পে। কয়েক মাস নির্যাতনের পর হালিমা সেখান থেকে পালাতে সক্ষম হন। আবারও প্রতারণার শিকার। এক ব্যক্তি তাকে আটকে রেখে পতিতালয়ে বিক্রি করে দেয়।

এমন ধরনের অনেক হৃদয়বিদারক ঘটনা ও কাহিনী অজানা রয়ে গেছে। আমরা যারা পুরুষ, লাভ করছি বীরশ্রেষ্ঠ, বীর উত্তম, বীর বিক্রম খেতাব। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধে নির্যাতিত ইজ্জতহারা আমাদের মা-বোনদের কপালে জুটেছে একমাত্র ‘বীরাঙ্গনা’ খেতাব। এই দিয়ে তাদের তুষ্ট রাখা হয়েছে। অথচ তাদের এতবড় ত্যাগ পুরুষের চেয়ে কোনোভাবে ছোট করে দেখতে পারি না।

অসংখ্য তারামন বিবি আমাদের লোকচক্ষুর অন্তরালে নীরবে নিভৃতে রয়ে গেছেন। অনেকেই না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। এখন কিভাবে তাদের যোগ্য সম্মান-মর্যাদা দেবো? কিভাবে আমরা এই দায় এড়াব? এর বিচারের ভার আপনাদের ওপর ছেড়ে দিলাম।

লেখক : প্রবীণ সাংবাদিক ও সমাজ উন্নয়ন কর্মী