ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

প্রভাষ আমিন

৪ এপ্রিল ২০১৮, ১৩:০৪

মুক্তিযোদ্ধা কোটা প্রত্যাহার করুন

25_17.jpg
গত ২১ মার্চ পরিবর্তনডটকম এ ‘বৈষম্য সৃষ্টি করতে নয়, দূর করতেই কোটা’ শিরোনামে আমার একটি লেখা ছাপা হয়। লেখাটিতে আমি কোটা পদ্ধতির পক্ষে বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধা কোটা থাকার পক্ষে আমি আমার নৈতিক অবস্থান ব্যক্ত করি। সেদিন বিকেলেই পটিয়ার জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল রাখার পক্ষে মত ব্যক্ত করেন। এটা নিছকই কাকতালীয়। তবে ফেসবুকে আমার লেখাটির নিচে অনেকে মন্তব্য করেছেন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শুনেই আমি তাঁর আনুকূল্য পাওয়ার জন্য এ লেখা লিখেছি।
প্রধানমন্ত্রীর অবস্থানের সঙ্গে আমার অবস্থান মিলে গেছে বটে, তবে তার বক্তব্য শুনে লেখাটি তৈরি হয়নি। কারণ লেখাটি ২১ মার্চ ছাপা হলেও লিখেছি ১৮ মার্চ। তারচেয়ে বড় কথা ২০১৩ সালে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনের সময়ও আমি একটি লেখা লিখেছিলাম। সে লেখায়ও আমার অবস্থান ছিল অভিন্ন।

কোটা পদ্ধতির যৌক্তিক সংস্কার চাইলেও আমি বরাবরই কোটার পক্ষে। সংস্কারের সবচেয়ে বড় যে দাবি, কোটায় লোক পাওয়া না গেলে আসন শূন্য না রেখে সাধারণ প্রার্থীদের মধ্য থেকে তা পুরণ করার, সেটা মেনে নিয়েছে সরকার। এরপর আর চলমান আন্দোলনকে আমার কাছে যৌক্তিক মনে হয়নি।

যারা কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করছে, তাদেরকে আমি স্বাধীনতা বিরোধী মনে করি না। বরং আমি জানি, পড়াশোনা শেষ করেও যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি না পাওয়া অনেক ছাত্রলীগারও এই আন্দোলনের সাথে আছেন। তাদের বেদনাটা আমি অন্তর দিয়ে অনুভব করি।

বাংলাদেশের সব নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবা-মা তাদের সন্তানকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠান; পড়াশোনা শেষ করে একটা ভালো চাকরি পাবে, সংসারের হাল ধরবে; এই আশায়। কিন্তু বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে পড়াশোনা শেষ করে যথেষ্ট যোগ্যতা থাকার পরও সবাই প্রাপ্য চাকরিটি পান না। তখন হতাশা ভর করে তাদের মনে, তৈরি হয় ক্ষোভ।

বাবা-মা সন্তানের চাকরির আশায় পথ চেয়ে বসে থাকে, প্রেমিকার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, একটি মেয়ে হয়তো বিয়ের আগেই ক্যারিয়ার গড়তে চাইছে। কিন্তু তাদের সব আশাই হতাশায় পরিণত হয় চাকরির বাজারে এসে। এই হতাশাই তাদের রাস্তায় নামিয়ে আনে। উন্নয়নের ধারায় এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশে শিক্ষার হার বেড়েছে। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও।

তাই কোটা সংস্কারের আন্দোলনে উপস্থিতিও বাড়ছে। ২০১৩ সালে যে কোটা সংস্কারের বিরুদ্ধে ছিল, এখন পড়াশোনা শেষ করে চাকরি না পেয়ে এখন সেও আন্দোলনের সামনের কাতারে।

কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন নিয়ে আমার কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু আন্দোলনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রায়ই ধন্দে পড়ে যাই। যখন দেখি হতাশ কিন্তু যোগ্য তারুণ্যকে কৌশলে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে ঠেলে দেয়া হচ্ছে, মন খারাপ হয়ে যায়। আন্দোলনরতদের জন্য যতটা মমতা, ততটাই বেদনা তাদের কারো কারো মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থান দেখে। পরিবর্তনডটকম’এ আমার লেখাটি ৬ হাজার ২শ জন শেয়ার করেছেন।

ফেসবুকে আমার শেয়ার করা পোস্টের নিচে ৫৭৩ জন মন্তব্য করেছেন। মন্তব্য আরো বেশি ছিল। চরম মুক্তিযুদ্ধবিদ্বেষ এবং শ্লীলতার সীমা অতিক্রম করায় কিছু মন্তব্য আমি মুছে ফেলেছি। যে মন্তব্যগুলো আছে, তাতেও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে যে বিদ্বেষ, তা দেখে আমি চমকে গেছি। গভীর বেদনায় আর্দ্র হয়েছে আমার হৃদয়।

কোটা সংস্কারের আন্দোলন নিয়ে আমার দ্বিমত নেই। কিন্তু যখন দেখি অন্য কোটা নয়, আন্দোলনের মূল লক্ষ্য মুক্তিযুদ্ধ, তখন ক্ষুব্ধ হই। মেধাবী এবং অমেধাবী- এমন একটা লাইন টেনে কৌশলে আন্দোলন নিয়ে ভুল বোঝানো হয়েছে। আন্দোলনের পক্ষের লোকজন বলছেন, কোটায় নিয়োগের ফলে দেশ মেধাশূন্য হয়ে যাচ্ছে। প্রশাসন অযোগ্যদের হাতে জিম্মি হয়ে যাচ্ছে।

এ ধরনের সস্তা কথা বলে আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ বাড়িয়ে দেয়া হচ্ছে, আন্দোলনের পক্ষে যুক্তি তৈরি করা হচ্ছে। আগেও বলেছি, আবারও বলছি, কোটায় যারা নিয়োগ পায় তারা অযোগ্য বা অমেধাবী, এমন প্রচারণা তাদের প্রতি নিষ্ঠুর এক অন্যায়। কোটা সুবিধা পেতে হলেও সবাইকে মৌখিক পরীক্ষা পর্যন্ত সবগুলো ধাপ সবার সাথে পাল্লা দিয়ে উতরে যেতে হয়। তাই কোটা পদ্ধতি থাকলেই দেশ মেধাশূন্য হয়ে যাবে, এমন প্রচারণা বড় একটা ভুল।

ফেসবুকে অনেকে আমাকে অভিশাপ দিয়েছেন। বলেছেন, আমার সন্তান যখন বড় হয়ে কোটার জন্য চাকরি পাবে না, তখন সেও আমাকে অভিশাপ দেবে। তার অভিশাপ আমি মাথা পেতে নিয়েছি। আমি লিখেছি এবং বিশ্বাস করি, অবশ্যই এই দেশে আমার সন্তানের চেয়ে একজন মুক্তিযোদ্ধার অধিকার বেশি। অনেকে এই লেখায় আমার হীন স্বার্থ খুঁজে পেয়েছেন।

তবে আমি ঘোষণা করছি, কোটার সাথে আমার কোনো স্বার্থ নেই। আমি কখনোই কোনো ধরনের কোটা পাওয়ার যোগ্য নই। আমার একমাত্র সন্তান ছেলে। সে নারী কোটা পাবে না, আদিবাসী কোটা পাবে না, প্রতিবন্ধী কোটা পাবে না, মুক্তিযোদ্ধা কোটাও পাবে না।

সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তায় আমার বরং কোটা বাতিলের আন্দোলনে শামিল হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু ব্যক্তিগত স্বার্থ নয়, আমি ন্যায্যতার পক্ষে দাঁড়াতে চেয়েছি। আমার বিবেক বলছে, বৈষম্যপ্রবণ এই সমাজে কোটাই পারে কিছুটা বৈষম্য ঘুচিয়ে অনগ্রসর সমাজের স্বার্থরক্ষা করতে।

কোটা সংস্কারের আন্দোলন নিয়ে আমার মূল আপত্তিটা হলো, আন্দোলনের ধরণ দেখে মনে হচ্ছে, আন্দোলনের মূল লক্ষ্য মুক্তিযুদ্ধ। যোগ্যতা থাকার পরও চাকরি না পাওয়া তরুণরা তাদের বঞ্চনার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের দায়ী ভাবছেন। এই ভাবনাটায় বড় একটা গলদ আছে।

এটা ঠিক, একাত্তরে জীবনের মায়া না করে যারা যুদ্ধ করেছেন, তারা পরে রাষ্ট্রের কাছ থেকে কিছু পাবেন, এমন কিছু আশা করে করেননি। বেঁচে ফিরবেন, এমন গ্যারান্টিও ছিল না। আজ রাষ্ট্র যদি তাদের কিছু ফিরিয়ে দিতে চায়, আমরা সেখানে আপত্তি করবো কেন? মুক্তিযুদ্ধের সন্তান হলেই তো অযোগ্য কাউকে চাকরি দিয়ে দেয়া হচ্ছে না। কোটা সংস্কারপন্থীদের কথা শুনে মনে হচ্ছে, মুক্তিযোদ্ধারা ভিন গ্রহ থেকে এসেছেন। তাদের সন্তান বা নাতিরা উড়ে এসে চাকরি পেয়ে যাচ্ছেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা না থাকলেই তো আর সব বেকার চাকরি পেয়ে যাবে না। কোটা থাকলেও যত জন বেকার চাকরি পাবেন, কোটা না থাকলেও তো ততজনই পাবেন। কোটা সুবিধা নিয়ে যারা চাকরি পাচ্ছেন, তারাও তো এই বাংলাদেশেরই নাগরিক এবং তারা চাকরি পাওয়ার মত যোগ্যও। অবশ্যই এই দেশের ওপর মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের উত্তরসুরীদের অধিকার বেশি।

তারচেয়ে বড় কথা হলো, এই দেশে ২১ বছর মুক্তিযোদ্ধা এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা বঞ্চিত ছিলেন। কোনো বাড়তি সুবিধা পাননি। এখন তাদের সেই বঞ্চনা অবশ্যই পুষিয়ে দিতে হবে। কোনো সেফগার্ড ছিল না বলেই প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘাঁটি গেড়ে বসেছে স্বাধীনতা বিরোধীরা। আটকানো হয়নি বলেই গোলাম আযমের ছেলে সেনাবাহিনীর চৌকস অফিসার হতে পেরেছে।

কিন্তু আমি মনে করি, যত মেধাবীই হোক একজন যুদ্ধাপরাধী বা স্বাধীনতা বিরোধীর সন্তানের রাষ্ট্রের কোনো সুবিধা পাওয়া উচিত নয়। প্রশাসনকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় চালাতে অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষকে বেশি করে চাকরির সুযোগ দিতে হবে। এটা খুবই দুঃখজনক, স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও বাংলাদেশে স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ আছে।

কিন্তু আমরা চাই, রাজনীতির পক্ষ-বিপক্ষ থাকবে, কিন্তু সবাই হবে বাংলাদেশের পক্ষে। তেমন একটা দিন তো আমরা চাই। তবে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান না হলেই তিনি স্বাধীনতাবিরোধী বা বাংলাদেশ বিরোধী হবেন; এমন সরলীকরণও খুব বিপজ্জনক। শেষ পর্যন্ত সবাইকে ভালোবাসতে হবে এই বাংলাদেশকে।

সাম্প্রতিক আন্দোলন নিয়ে আমার শঙ্কাটা হলো, আন্দোলনকারীদের অযৌক্তিক মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিতা। ফেসকুকে আমার স্ট্যাটাসেই যে মুক্তিযুদ্ধবিদ্বেষের দেখা পেয়েছি, সেটাই শঙ্কিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট। কোটা সংস্কারের আন্দোলনে এমন সব স্লোগান শোনা যায়, আন্দোলনটি কোটার বিরুদ্ধে না মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে বোঝা দায়।

ফেসবুকেও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে নানান ট্রল করা হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ২১ বছর দেশকে স্বাধীনতার চেতনার বিপক্ষে চালানোর চেষ্টা হয়েছে। তারা যতটা সফল না হয়েছে, এক কোটা সংস্কার আন্দোলন তারচেয়ে বেশি করতে পেরেছে। তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপক্ষে নিয়ে যাওয়া দেশ ও জাতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হবে।

মুক্তিযোদ্ধা কোটা বিরোধী আন্দোলনের আরেকটা বড় যুক্তি হলো, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা। দুই নাম্বারি করে একটা সার্টিফিকেট জোগাড় করে চৌদ্দগোষ্ঠি চাকরি করে। অভিযোগ মিথ্যা নয়। কিন্তু সেটা তো মুক্তিযোদ্ধাদের সমস্যা নয়, সিস্টেমের সমস্যা।

কেউ যাতে ভুয়া সার্টিফিকেট জোগাড় করতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের গালি দিয়ে লাভ কী? তবে হ্যাঁ, এক পরিবারে একবারই কোটা সুবিধা দেয়াটাই শোভন।

যত যাই হোক, মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করা যাবে না, অবহেলা করা যাবে না, উপেক্ষা করা যাবে না। আপনি চাইলে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পাইলট, বিসিএস ক্যাডার অনেক কিছুই হতে পারবেন; কখনো মুক্তিযোদ্ধা হতে পারবেন না।

মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের গর্ব, আমাদের অহঙ্কার। তারা জীবনের মায়া তুচ্ছ করে দেশ স্বাধীন করেছিলেন বলেই আজ আমরা বিশ্বে মাথা উঁচু করে চলতে পারি।

২০১৩ সালে কোটা সংস্কারের আন্দোলনে সময় মুক্তিযোদ্ধা নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু ফেসবুকে স্ট্যাটাসে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের দাবি জানিয়ে বলেছিলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের যেন তরুণ প্রজন্মের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়া না হয়।

তাঁর বেদনাটা তখনও বুঝেছি, এখন আরো বেশি করে বুঝছি। এখন আমিও তাঁর সাথে একমত। আমিও দাবি করছি, মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল করা হোক। মুক্তিযোদ্ধাদের আমরা সম্মাান জানাতে না পারি, তাদের অপমান করার, তরুণ প্রজন্মের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়ার কোনো অধিকার আমাদের নেই।

প্রভাষ আমিন: সাংবাদিক, কলাম লেখক; বার্তা প্রধান : এটিএন নিউজ।
probhash2000@gmail.com