ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG
সর্বশেষ:

রাজু আহমেদ

১০ এপ্রিল ২০১৮, ১০:০৪

কোটাবিরোধী আন্দোলন সফল হবে

27_5.jpg
কোটা বিরোধী আন্দোলনকারীদের বিক্ষোভ
শিক্ষার্থীরা একবারও দাবি করেনি, কোটা প্রথা বাতিল করতে হবে। শুধু দাবি জানিয়েছে, এ প্রথা সংস্কার করতে হবে। বাতিল আর সংস্কারকে যেন গুলিয়ে ফেলা না হয়। বাংলাদেশের বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু ক্ষেত্রে কোটা আরো কিছু দিন বহাল রাখতে হবে। শিক্ষার্থীদের দাবি, কোটা সংস্কার করে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে

কোটার বিরুদ্ধে আন্দোলন চাকরিতে কোটা প্রথা চালুর দিন থেকে নীরবে-নিভৃতে চলছে। ধীরে ধীরে এ আন্দোলন সুসংগঠিত হয়ে ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাত্রা পেয়ে বর্তমান অবস্থায় পৌঁছেছে। রাষ্ট্রের নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েও কোটা সংস্কারের দাবিতে যারা আন্দোলনরত, তারা দমে যাননি। গ্রেফতার, হয়রানি, লাঠিচার্জ কিংবা কাঁদানে গ্যাস শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। ইতিহাস সাক্ষী, অন্তত বাংলাদেশের পূর্বাপর ইতিহাসে ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে এমন নজির বিরল। আশার কথা, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করেছে দেশপ্রেমিক সম্প্রদায়। আমরা আশা করি, রাষ্ট্র বিষয়টির গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা অনুধাবন করে অচিরেই কোটা সংস্কারের যৌক্তিক দাবিকে সুবিবেচনা করবে।
সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা লাখের নিচে নয়। কাজেই লাখ লাখ চাকরিপ্রার্থীর স্বপ্ন যখন কোটার ফাঁদে আটকে যায়, তখন বিস্ফোরণ অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়ায়। শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক শিক্ষার্থীদের কোটাবিরোধী আন্দোলনে ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান কিংবা ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকারীদের সংখ্যার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি শিক্ষার্থীর উপস্থিতি হচ্ছে। রাষ্ট্র যদি সমাধানের পথে না হাঁটে, তবে দিন দিন এ আন্দোলন দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। শিক্ষার্থীরা কখনো দাবি আদায়ের প্রশ্নে সংহিসতার পথে হাঁটে না। তবে অতীত ইতিহাস কখনো কখনো তেমন পথে হাঁটতেও বাধ্য করেছে। শিক্ষার্থীরা শিক্ষাঙ্গনের পাঠকেন্দ্রিক তাদের রুটিন সাজায়, চাকরিপ্রার্থীরা তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী রাষ্ট্রের সেবা করার স্বপ্ন বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমাজে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার স্বপ্ন দেখে।

ইতিহাসের পাঠে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সোনালি সাফল্যে কিছু ব্যক্তি, সম্প্রদায় ও সংগঠন ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। চারদিকের অবক্ষয়ের যুগে কোটাবিরোধী আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা সেসবের অবস্থান নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশার মধ্যে। আজ না হোক কাল, কয়েক ফোঁটা রক্তে না হোক, অনেক বেশি রক্তের বিনিময়ে কোটার বেড়াজাল থেকে শিক্ষার্থীরা মুক্তি পাবেই, মেধাবীরা তাদের যোগ্যতম স্থানে আসীন হবেই আশা করা যায়।

’৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কোনো এক অজানা কারণে সব শ্রেণীর শিক্ষার্থীর সম্মিলিত কোটাবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রলীগের ভূমিকা গৌরবোজ্জ্বল ধারায় অগ্রসর হয়নি। মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে বরং বলা চলে, বর্তমান আন্দোলনে ছাত্রলীগের ভূমিকা নিন্দনীয় বটে। স্থানীয় পর্যায়ের অনেক ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর আচরণ ও কথাবার্তায় মনে হচ্ছে, তারা কোটাবিরোধী আন্দোলনের সমর্থন করেন। কিন্তু উপরের নির্দেশনার অভাব কিংবা বারণ পালনে তারা কোটাবিরোধী আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কাতারবদ্ধ হতে পারছে না। এই ওপর মহল যে কত ওপরে তার নাগাল পাওয়া মুশকিল।

গণমাধ্যমের ভূমিকা : আমরা কিছুটা হতাশ। কোটাবিরোধী আন্দোলনের সংবাদ প্রচার ও এ বিষয়ে জনমত গঠনে গণমাধ্যম কেন যেন কিছুটা কার্পণ্য করছে। অন্যান্য সংবাদের মতো দায়সারাভাবে কোটাবিরোধী আন্দোলনকারীদের কিছু চিত্র প্রকাশ করেই যেন তারা দায়িত্ব থেকে মুক্তি পেতে চান। গণমাধ্যম বিশেষ করে সংবাদপত্রের কাছে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশ বিশাল। শিক্ষার্থীদের সব আন্দোলনে সংবাদপত্র সহযাত্রীর ভূমিকা নিয়েছে। আমরা আশা করি, সংবাদপত্রগুলো কোটাবিরোধী আন্দোলনে মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করবে। জনমত গঠন, কোটাবিরোধিতার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের ইতিবাচক চিন্তা ও লেখা প্রকাশের আহ্বান সম্পাদক সমীপে থাকল। চিরাচরিত নিয়মে সংবাদপত্র সত্যের সাথে ছিল এবং ভবিষ্যতেও তাদের এ যাত্রা অব্যাহত থাকবে বলে বিশ্বাস করি।

শিরোনামে বলেছি, কোটাবিরোধী আন্দোলন সফল হতে বাধ্য। এভাবে বলার শক্তি পেলাম কোথায়? শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের অতীত ইতিহাসের সাফল্যগাথা অধ্যায় এ আন্দোলনের সাফল্য আগাম বলতে প্রেরণা দিয়েছে। রাষ্ট্রের সামনে সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীরা একবারও দাবি করেনি, কোটা প্রথা বাতিল করতে হবে। শুধু দাবি জানিয়েছে, এ প্রথা সংস্কার করতে হবে। বাতিল আর সংস্কারকে যেন গুলিয়ে ফেলা না হয়। বাংলাদেশের বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু ক্ষেত্রে কোটা আরো কিছু দিন বহাল রাখতে হবে। শিক্ষার্থীদের দাবি, কোটা সংস্কার করে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে তা ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বহাল রাখার দাবি এখনো যৌক্তিক; কিন্তু কোটাবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছে বলে আগের নীতি ‘কোটাধারী না পাওয়া গেলে মেধাবী থেকে কোটা পূরণ করা হবে’ বাতিল করে নির্দিষ্ট কোটাধারী না পাওয়া গেলে কোটা দিয়ে কোটা পূরণ করার নীতি চালু করা আদৌ কি সমাধানের পথ? আমরা কেন ভুলে যাই, যারা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক তাদের সন্তান-নাতিতুল্যরাই তো কোটাবিরোধী আন্দোলন করছে। জেদের প্রশ্নে কে কাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে! এ মাটির সন্তানদের রক্তের বৈশিষ্ট্য তো প্রায় কাছাকাছি গুণাগুণ ধারণ করছে। সব যুগের শিক্ষার্থীরাই সরল কথাগুলো সহজে শুনতে ও মানতে অভ্যস্ত। দমন-পীড়নের ভয়ে এরা দমার নয়- অন্তত ইতিহাস সে কথাই বলে!
লেখক : কোটাবিরোধী আন্দোলনকারী, বরিশাল
raju69alive@gmail.com