ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG

আসাদ পারভেজ

২৪ জুলাই ২০১৮, ১৭:০৭

মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও করণীয়

33_16.jpg
একত্ববাদী সব ধর্মই আদম আ:কে পৃথিবীর বুকে আগত সর্বপ্রথম মানব হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে থাকে। স্রষ্টার সৃষ্টি, মহাজগৎ নামক অফুরন্ত সাম্রাজ্যের অতি ক্ষুদ্র গ্রহ পৃথিবীর অতীত ও ভবিষ্যৎ নিয়ে মানবমস্তিষ্ক সব সময় দিশেহারা। পৃথিবীর বুকে বসবাসকারীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো মানবজাতি।

পৃথিবীর প্রকৃত বয়স ও তার সৃষ্টি রহস্য আমাদের অজানাই রয়ে গেল। তবে বিজ্ঞান এমন বহু আবিষ্কার করে যাচ্ছে, যা মানবজাতির বসবাসকে যেমন করেছে আনন্দময়, তেমনি করেছে প্রশ্নবিদ্ধ। এক স্রষ্টায় বিশ্বাসী প্রতিটি ধর্মই পৃথিবীতে এসেছে বিশৃঙ্খল সময়ে মানবসমাজে শৃঙ্খলা আনয়নকল্পে। নূহ আ:, ইব্রাহিম আ:, মুসা আ:, ঈসা আ: থেকে সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ সা: পর্যন্ত প্রত্যেকেই এসেছেন মানবজীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করার প্রয়াসে। মুসা আ: ও ঈসা আ: এবং অন্যরা নির্দিষ্ট সময় ও এলাকার জন্য এলেও একমাত্র নবী মুহাম্মদ সা: এসেছেন সর্বজনীনভাবে সর্বযুগ এবং সমগ্র মহাবিশ্বের জন্য।

সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মদ সা: ৫৭০ সালে পৃথিবীতে আগমন করেন। ৬১০ সালে তিনি আল্লাহর দ্বীন ইসলাম ধর্ম প্রচার শুরু করেন এবং ৬৩৩ সালে ইহজগৎ থেকে বিদায় নেন। বিদায়ের কিছু আগে মানবজাতির উদ্দেশে একটি ঐতিহাসিক ভাষণ দেন, যাকে আমরা ‘বিদায় হজের ভাষণ’ বলি। এটি যে মানবকল্যাণের সর্বশ্রেষ্ঠ দিকনির্দেশনা, তা অকপটে স্বীকার করেন প্রত্যেক বিবেকবান মানুষ। বিদায় হজে নবী মুহাম্মদ সা: স্পষ্টভাষায় বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা আজ মানবজাতির জন্য দ্বীন ইসলামকে ধর্ম হিসেবে পূর্ণতা দিয়েছেন। তিনি আরো বলেন, ‘তোমাদের মাঝে যারা কুরআন ও হাদিসকে আঁকড়ে থাকবে, তারাই সফল হবে।’

বাপ-দাদার রেখে যাওয়া অন্তঃসারশূন্য পৌত্তলিকতা আঁকড়ে থাকতে চেয়েছিল বলেই মক্কার লোকেরা নবীজীর ধর্ম প্রচারকে বাধাগ্রস্ত করেছিল। তবুও তারা কখনো নবীজীকে সৎ মানুষ হিসেবে অবিশ্বাস করেনি। মক্কার কাফেররা নবীজীকে সব সময় আল আমিন বা বিশ্বাসী বলে অভিহিত করত। নবী করিম সা:-এর জাগতিক জীবন সমগ্র বিশ্বের কাছে মানবজীবনের এক অতুলনীয় মডেল। সমগ্র মানবজাতির জন্য এর চেয়ে বড় আর কোনো অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বের দৃষ্টান্ত নেই।

পৃথিবীতে আজ মুসলমানের সংখ্যা প্রায় ১৮০ কোটি। প্রত্যেক মুসলমানই পবিত্র কুরআন ও হাদিসের আলোকে জীবন পরিচালিত করার কথা। একই পথে হাঁটা, একই সুরে কথা বলা উচিত তাদের; কিন্তু আমরা আজ কী দেখছি? অনেক দেশে মুসলমানেরা আজ শিয়া-সুন্নি-কুর্দিতে বিভক্ত। সুন্নিরা আবার চার মাজহাবে বিভক্ত। একই মাজহাবের লোকেরা নানান পীর-মুরশিদের মাজারকে কেন্দ্র করে বিভক্ত। পৃথিবীর মুসলমানের এই বিভাজিত জীবনের দৃশ্য বাংলাদেশেও দৃশ্যমান। অসংখ্য পথে বিভক্ত হয়ে একজন আরেকজনকে কাফের পর্যন্ত বলতে দ্বিধা করে না। অথচ ইসলামে স্পষ্ট নির্দেশ আছে, কোনো মুসলমান অন্য মুসলমানকে ‘কাফের’ বলতে পারবে না।

ইসলামি সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পর থেকে ক্রুসেডসহ (১০৯৬ থেকে ১২৯২ খ্রি.) অসংখ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে পৃথিবীর বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে ন্যায় ও সত্যের দিশারী ইসলাম। সাড়ে ১২ শ’ বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাসে বিজয়ের স্তম্ভ করেছে উঁচু থেকে আরো উঁচু। সব ধর্মের অনুসারীদের নিরাপত্তার চাদরে জীবনযাপনের দিয়েছে অবারিত সুযোগ। অবশেষে এই মুসলিম জাতি হারিয়েছে তার গতিশীল জীবনের পথ। ক্ষমতার শীর্ষে ফিরে এলো খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠী। মূলত এই সময়ে ঐতিহ্য হারানো মুসলমানেরা প্রতিপক্ষের কৌশলের ফাঁদে পা দিয়ে অস্তিত্ব হারাতে বসে। ফলে একবিংশ শতকের আজকের দিনে একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়েছে ইসলামের অনুসারীরা।

খ্রিষ্টবাদী ও ইহুদিবাদী সমাজব্যবস্থার অসংখ্য কৌশলের দু’টি কৌশলকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছি। তাদের এ দু’টি অপকৌশল হলো- মুসলিম জাহানকে বিভক্ত করা এবং মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধির পথে বাধা সৃষ্টি করা। তাদের চূড়ান্ত ভিশন ও মিশন হলো- মুসলিম সমাজকে দ্বিধাবিভক্ত করা। অতীতে শিয়া-সুন্নি নিয়ে কিংবা মাজহাব নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে তেমন কোনো বিরোধ ছিল না। দুর্ভাগ্য আজ মহান ঐতিহ্যের অধিকারী জাতি মুসলমানদের। তারা বিভক্ত নানা নামে। অনাকাক্সিক্ষত বিভক্তির কারণে অনেক সময় দেখা যায়, একই মসজিদে নামাজ পড়া নিয়ে মারামারির ঘটনা পর্যন্ত ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে তুচ্ছ ঘটনা যেমন নামাজে দাঁড়িয়ে হাত বাঁধার পদ্ধতি নিয়ে মসজিদে তুমুল বাগি¦তণ্ডা দেখা দেয়। ফেরকার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে মসজিদে আসতে নিরুৎসাহিত করা, নাকি যিনি নামাজ পড়েন না তাকে মসজিদে আসতে উদ্বুদ্ধ করা প্রকৃত মুসলমানের কাজ?

২০০১ সালে আফগানিস্তানে আক্রমণের মাধ্যমে তদানীন্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশ যে নব্য ক্রুসেডের সূচনা করেছেন, তা প্রমাণিত; কিন্তু সেই সময় আমাদের অনেক নেতা এটা বুঝতে পারেননি। এ কারণে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া ও মিসরের পর সিরিয়ায় মুসলিমদের রক্ত ঝরছে। মুসলমানদের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পবিত্র আল-আকসাকে কেড়ে নেয়ার সর্বশেষ ধাপে ইহুদিরা। অন্য দিকে আরাকান ও কাশ্মিরে চলছে অব্যাহত মুসলিম হত্যা, আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছে মুসলমানদের হাহাকার। আজো যদি মুসলিম বিশ্বের সরকারগুলো ও নেতাদের ঘুম না ভাঙে, তাহলে হয়তো দীর্ঘ সময় মুসলমানদের থাকতে হবে অন্য কারো গোলাম হয়ে।

মুসলিম বিশ্বের এক হওয়ার সময় এসেছে। আর কোনোভাবেই বিভক্ত হওয়ার সময় নেই। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান ডাক দিয়েছেন মুসলিম বিশ্বকে এক হতে। তিনি বলেছেন ৫৭টি দেশ নিয়ে ওআইসির অধীনে একটি সেনাবাহিনী গঠনের কথা, যাদের কাজ হবে এই বিশ্বকে নিরাপদ করা। গত ২৬ এপ্রিল ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি মুসলিম বিশ্বকে যুক্তরাষ্ট্র তথা অপশক্তির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এ দিকে ২৪ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন- যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এক সপ্তাহও টিকবে না।

এর জবাবে খামেনি বলেছেন, ‘এ ধরনের মন্তব্য মুসলিমদের জন্য অবমাননাকর। আমাদের অঞ্চলে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে যুদ্ধ চলছে, এটি দুঃখজনক। কিছু অনগ্রসর মুসলিম দেশের সরকার অন্যান্য দেশের সাথে লড়াইয়ে লিপ্ত। আমাদের উচিত যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য শত্রুদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো।’ ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যেসব সমস্যা মোকাবেলা করছে তা বিভ্রান্তির কারণে তৈরি হয়েছে। তিনি আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র মনে করে হোয়াইট হাউজ অবশ্যই মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্য নির্ধারণ করবে। তাই আরব বিশ্বের সম্পদ লুটে নিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।’

নিপীড়নকারী ও দখলদার এবং তাদের দোসরদের উদ্ধত অপশক্তির বিরুদ্ধে বিশ্বের সব মুসলিম দেশ এক জোট হলে আমাদের বিজয় ইনশাআল্লাহ হবেই।

সত্যিকার অর্থে আমরা মুসলিম হলে আমাদের মধ্যে জাতপাতের কোনো বিভেদ-বিদ্বেষ থাকতে পারে না। মহান স্রষ্টার নামে বলছি, যদি সৌদি আরব-ইরান-তুরস্ক ও পাকিস্তান মিলে মুসলিম বিশ্বকে বিভেদমুক্ত করতে পারে এবং ওআইসির অধীনে শক্তিশালী সেনা ইউনিট গঠন করতে পারে, তাহলে আগামী দিন হতে পারে মুসলমানদের। মুসলিম সমাজের নেতাদের এমন কোনো ভুল করা উচিত হবে না, যে ভুলে মুসলমানেরা কার্যত হারিয়ে যাবে। সব ক্রুসেডের ন্যায্য ও সমুচিত জবাব দিতে তাদের একটি ছাতার নিচে মিলিত হয়ে নেতৃত্বের গুরুদায়িত্ব পালন করতে হবে।