ENGLISH  |  ARABIC  |  NNBDJOBS  |  BLOG

আলেক্সান্ড্রা বোর্চার্ড

১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১৪:০৯

সাংবাদিকতার প্রত্যাবর্তন

37_8.jpg
সংবাদমাধ্যম ব্যবসার জন্য বেশ কয়েক বছরের খারাপ খবরের পরে সাম্প্রতিক তথ্য-উপাত্ত দেখে মনে হচ্ছে, এর ওপর গ্রাহকদের আস্থা ধীরে ধীরে আবার ফিরে আসছে। এই প্রবণতা বজায় রাখার জন্য সাংবাদিকদের অবশ্যই মানসম্পন্ন কনটেন্ট বা বিষয় তৈরি অব্যাহত রাখতে হবে। একইসাথে যারা মানসম্পন্ন কনটেন্টের জন্য অর্থ প্রদান করতে পারে না, তাদের প্রয়োজন পূরণ করার জন্য নতুন বিকল্প বের করতে হবে সরকারকে।

বেশ ক’বছর দুরবস্থা চলার পর সংবাদমাধ্যম শিল্পে অবশেষে একটি মাঝারি গোছের পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ডিজিটাল মিডিয়া ব্যবহারের ওপর সবচেয়ে ব্যাপক-ভিত্তিক জরিপকারী ‘ডিজিটাল নিউজ রিপোর্ট ২০১৮’ অনুযায়ী সংবাদমাধ্যম শিল্পে গ্রাহকদের আস্থা স্থিতিশীল রয়েছে এবং গ্রাহক সৃষ্টিতে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। অনেক অজ্ঞাত ব্যবসার মতো আস্থা বা বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে যে ব্যবসা পরিচালনা করা হয়, তাদের জন্য এই সামান্য অর্জনও অর্থপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে রয়টার্স ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব জার্নালিজম প্রকাশিত রিপোর্ট অনুসারে,বিশ্বের গণমাধ্যমে অস্থিরতা রয়ে গেছে। রিপোর্টটিতে দেখা যায়, শুধু ৪৪ শতাংশ সংবাদ গ্রাহক বিশ্বাস করেন যে, প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমগুলো ব্রান্ডেরই (গুণগতমান নিশ্চিত করে) প্রকাশ। কিন্তু গত বছরের তুলনায় আস্থা এক শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় মনে করা যেতে পারে, সংবাদমাধ্যম শিল্পের ওপর বিশ্বাসের ঘাটতি বেড়ে যাওয়ার প্রবণতাটি হয় বন্ধ হয়েছে; নয়তো আসলে অবিশ্বাসের বিষয়টি কমে আসছে।

অন্য সমীক্ষাগুলোতে অবস্থার আরো বেশি উন্নতি হচ্ছে বলে মনে হয়। উদাহরণস্বরূপ- বার্ষিক অ্যাডেলম্যান ট্রাস্ট ব্যারোমিটারে দেখা যায় যে, সাংবাদিকেরা তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। ঐতিহ্যগত ও অনলাইন-ভিত্তিক সাংবাদিকতার ওপর সামগ্রিক বিশ্বাস সাত বছরের মধ্যে এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এই ফলাফলগুলোতে এটি দৃঢ়ভাবে প্রকাশ পায় যে, খবরের ব্যাপারে ‘বিশেষজ্ঞ প্রত্যাবর্তনকে স্বাগত জানানো হচ্ছে।

মিডিয়া এক্সিকিউটিভদের জন্য বিজয় অর্জন আসন্ন- এ কথা বলার সময় এখনো আসেনি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই শিল্পের গ্রহণযোগ্যতা যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে গ্রহণযোগ্যতা পুনরায় ফিরে আসা এই শিল্পের জন্য সুস্পষ্টভাবে ইতিবাচক। রাজনৈতিক মেরুকরণের ফলে গণমাধ্যম জনগণের সন্দেহ-সংশয়ের মধ্যে পড়ে যায় এবং তারা মনে করতে থাকেন যে, সংবাদমাধ্যমগুলো আসলে সাধারণ মানুষের মতামতের প্রতিফলন ঘটায় না। অন্য দিকে, সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলোতে খরচ সাশ্রয়ের জন্য লোকবল কমানোর ফলে এর গুণগত মানের অবনতি ঘটে। কিন্তু, নতুন তথ্য-উপাত্তে, সাংবাদিকেরা এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার উপায় খুঁজে পেয়েছেন বলে মনে হচ্ছে।

সম্ভবত, এই বছরের ডিজিটাল নিউজ রিপোর্টে সর্বাধিক প্রকাশিত প্রবণতা হলো- সোস্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদে ক্রমবর্ধমান অবিশ্বাস। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের গবেষণায় দেখা যায়- শুধু ২৩ শতাংশ উত্তরদাতা সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে যে সংবাদগুলো পেয়েছেন, সেগুলোকে বিশ্বাস করেন এবং ৩৪ শতাংশ সার্চ ইঞ্জিনগুলোর তথ্যে বিশ্বাস করেন। এই পরিসংখ্যান সম্ভবত গুগল, ফেসবুক এবং অন্য কারিগরি প্রতিদ্বন্দ্বী; যাদের ব্যবসা প্রথাগত মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বিশ্বাসের ওপর কম নির্ভর করে না, তাদের ব্যাপারে প্রযোজ্য।

তবে ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মের অনেকগুলো প্রথাগত মিডিয়া আউটলেট তাদের ভিত্তি খুঁজে পাচ্ছে, তাদের গ্রাহক প্রবণতা এই উপসংহারকে সমর্থন করে। সমীক্ষার ৭৪ হাজার উত্তরদাতার মধ্যে ১৪ শতাংশ বলেছেন, তারা গত ১২ মাসে কমপক্ষে একবার ডিজিটাল সংবাদের জন্য অর্থ প্রদান করেছেন। নর্ডিক দেশগুলোতে এর গড় সংখ্যা ৩০ শতাংশের কাছাকাছি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তথাকথিত ‘জাল খবরের গণমাধ্যম’ বলে যে আক্রমণ চালাচ্ছেন, তার বিপরীত প্রভাবই সেখানে দেখা যাচ্ছে। এটি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি উৎসাহিত করছে জনগণকে স্বাধীন সাংবাদিকতার সমর্থন জোগাতে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৬ সালে কেবল ৯ শতংশ আমেরিকান গ্রাহক অনলাইন খবরের জন্য টাকা খরচ করতেন। এটি ২০১৭ সালে ১৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে এবং এই বছরও তা স্থিরভাবে বাড়ছে।

বিনামূল্যের সংবাদ ওয়েবসাইটের কোনো অভাব নেই এমন দেশ- যুক্তরাজ্যেও লোকেরা গুণগত প্রতিবেদনের জন্য বিনিয়োগ করছেন। অর্থ দান করা অথবা সদস্যপদ গ্রহণের অনুরোধের বেলায় গার্ডিয়ানের মডেলটি অর্থ সংস্থানের একটি উপায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। জরিপে অংশগ্রহণকারী প্রায় প্রতিটি দেশে রাজনৈতিকভাবে বামপন্থী তরুণদের মধ্যে অর্থ প্রদানের সর্বোচ্চ প্রবণতা দেখা যায়।

কিছু সমালোচক যুক্তি দেখান যে, গণমাধ্যমের পেমেন্ট মডেল ইন্টারনেটের মূল ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ, বিনামূল্যে তথ্য বিনিময় করার একটি স্থান হলো ইন্টারনেট। এর বিরোধীরা বলছেন, সেরা কাহিনীগুলো মূল্যপরিশোধ দেয়ালের ওপারে লভ্য হওয়ার অর্থ হলো- দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকদের জন্য দ্বিতীয় শ্রেণীর খবর সহজলভ্য করা।

এই যুক্তিটিতে অবশ্য তিনটি প্রধান পয়েন্ট বাদ পড়ে যায়। ডিজিটালভাবে সংযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে যারা খবরের জন্য টাকা প্রদানের সামর্থ্য রাখেন না, সে সব নতুনদের জন্য সেগুলো খুব সঙ্কীর্ণ মনে হতে পারে। তবে খরচ করার ইচ্ছার চেয়েও অনেক বড় বিষয় হলো, খরচের অগ্রাধিকার কী হবে, সেটি। উপরন্তু, যেকোনো কিছুর জন্য মূল্য দেয়া মানে হলো, সেটাকে মূল্যবান বলে মনে করা। তাই বিশদভাবে লেনদেনের নির্দেশনার চেয়ে সদস্য মডেলকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে।

সবশেষে বলা যায়, যারা প্রকৃতপক্ষেই টাকা দিতে পারে না, সেসব নি¤œ আয়ের পরিবারের জন্য গুণমানসম্পন্ন সাংবাদিকতা পেতে ভালো বিকল্প রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, সাংবাদিকতার অনুশীলন আরো সাশ্রয়ী করার জন্য ট্যাক্স কোডগুলো সংস্কার করা যেতে পারে, তবে সরকারি বা ফাউন্ডেশনের অর্থায়ন গণ প্রচারমাধ্যমের জন্য সমর্থন বৃদ্ধি করতে পারে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, যখন লোকেরা কনটেন্টের জন্য অর্থ প্রদান করে, তখন সাংবাদিকরা কাজ করার অনুপ্রেরণা লাভ করেন। তারা তাদের পণ্যের গুণগত মান বা মূল্য বাড়ানোর জন্য পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন, ঘটনাগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করেন, গভীর অনুসন্ধান করেন এবং অনেকগুলো সামাজিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের সস্তা মনোযোগ আকর্ষণের প্রচেষ্টাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেন। সব থেকে সেরা বিষয়টি হলো- এই প্রবণতা পারস্পরিক স্বার্থেই ফিরে আসছে। সাংবাদিকতা ভালো হলে ভোক্তারা এ জন্য আরো বেশি মূল্য দিতে প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে।

একটি দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেছে যখন সংবাদমাধ্যম শিল্প নিজের সম্পর্কে ভালো রিপোর্ট করার জন্য কিছু ছিল না। এখন সেই ভালো খবর পাওয়া যাচ্ছে। এখন আমরা যা করতে পারি সেটি হলো, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আমাদের বেশি কঠোরভাবে কাজ করতে হবে। গুণগত মান, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং আর্থিক লাভজনক হওয়া নিশ্চিত করতে এটার প্রয়োজন বিশেষভাবে।

* আলেক্সান্ড্রা বোর্চার্ড রয়টার্সের ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব জার্নালিজম কৌশলগত উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক।
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে অনুবাদ মাসুমুর রহমান খলিলী
mrkmmb@gmail.com